বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পাহাড়াদার বেগম ফজিলাতুন্নেছা

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পাহাড়াদার বেগম ফজিলাতুন্নেছা

রনি রেজা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:৫০ ১১ আগস্ট ২০১৯  

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা

বাঙালির স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর চোখে। কিন্তু সেই স্বপ্ন যিনি যত্নে রেখেছিলেন, পাশে থেকে শক্তি যুগিয়েছিলেন; তাকে আমরা কতটা জানি। হ্যাঁ, আমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের (রেণু) কথাই বলছি।

বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছায়ার মত লেগে ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসার ছায়াতলে আগলে রেখেছিলেন অপার মমতা আর সাহস দিয়ে তিনি। যার ছিল না কোনো মোহ, লোভ কী জিনিস তাই বুঝতেন না তিনি।

তিনি শুধু চেয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুর মত আপোষহীন এক মহান জাতীয়তাবাদী নেতার নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হোক। তার সে চাওয়াই ছিল ভুল, যার ফলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জীবন দিতে হয় এই সাহসী মাকেও।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের যে নবধারা, সে থেকে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অবধি বেগম মুজিব এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন, যা সত্যি অনস্বীকার্য। বাঙালি জাতির একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নের মূল বাহন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ।

এদের মধ্যে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারা বঙ্গবন্ধুর অনুমোদিত সংগঠন, আন্দোলন এবং সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে আপোষহীন ভূমিকা রেখেছিলেন। আর তাদের প্রেরণার উৎস ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে ছিলেন, তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের মধ্যে যখনই কোনো সংকটের কালো ছায়া ঘনিভূত হয়েছে। পর্দার অন্তরালে থেকে দৃঢ়, কৌশলী এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

তাছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে বেগম মুজিব যতটুকু অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছিলেন তার পুরোটাই তিনি ব্যয় করেছেন নিজের সংসার এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত রাজনীতির পিছনে। একদিকে কিছু কিছু টাকা জমিয়ে বসতবাড়ি নির্মাণ, অন্যদিকে পরিবারের জন্য বঙ্গবন্ধু ভবন খ্যাত ৩২ নম্বর বাড়িটির কাজ তিনি সু-সম্পন্ন করেন।

পুত্রসম ভাগ্নে শহীদ শেখ ফজলুল হক মনি, নিজ পুত্র শহীদ শেখ কামাল, বড় মেয়ে শেখ হাসিনা, ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, ছোট ছেলে শহীদ শেখ জামাল এবং কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার সব দায়িত্বই নিজের ঘাড়ে নিয়েছিলেন বেগম মুজিব। আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের পেছনে যতটুকু আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল, তাও নিজের মালিকানাধীন অর্থ থেকে দিয়েছেন তিনি।

ছাত্র এবং তরুণদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিয়ে কখনো কোন বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তা একজন দক্ষ সংগঠক ও নেতার ন্যায় সমাধান করেছিলেন তিনি। এটিও ইতিহাসের এক অনুলিখিত অধ্যায় ছিল।

এদিকে, ১৯৬২ সালের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যখন অন্দোলন শুরু হয়, তখনই গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু। ওই সময়ই নিজ বাসা থেকে আন্দোলন পরিচালনা ও নির্দেশনা দিতেন বেগম মুজিব। তাছাড়া ১৯৬৬ সালে মুজিব যখন বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ঘোষণা করেন।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানের শুরুতে সামরিক শাসকরা একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। ওই সময় তাদের গুলিতে শহীদ হন আগরতলা মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক। এরপর ছাত্র জনতা রাজপথে নেমে আসে। শহীদ হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শামসুজ্জোহা। ওই সময় আসাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। তাকে নিয়ে কবি লেখেন ‘আসাদের রক্তমাখা শার্ট আমার পতাকা’। তাছাড়া শহীদ হন নব কুমার ইন্সটিটিউটের দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর। এরপর ছাত্ররা অগ্নিসংযোগ করে বিচারপতির বাসভবন এবং তৎকালীন দৈনিক পূর্ব পাকিস্তান পত্রিকা অফিসে।

তারপর সামরিক জান্তা আইয়ুবের কাছ থেকে প্রস্তাব আসে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোল টেবিল আলোচনায় বসানোর জন্য। ওই সময় আওয়ামী লীগের কতিপয় প্রভাবশালী নেতা বঙ্গবন্ধুর ভবন ৩২ নাম্বারে বেগম মুজিবের কাছে ছুটে আসেন। কিন্তু বেগম মুজিব এক অনমনীয় দৃঢ় মনোভাব প্রদর্শন করেন। পরবর্তীতে তিনি কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন এবং প্যারোলে মুক্তি না নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পরে বঙ্গবন্ধু নিজেও মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

এরপর সামরিক শাসকরা রাষ্ট্রীয় প্রচারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিল শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি পাচ্ছেন এবং আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন। তবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় পাকিস্তানী শাসকের সমস্ত পরিকল্পনাও লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, কিন্তু পাকিস্তানীরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা শুরু করে। এরপর শুরু হয়ে যায় পূর্ব বাংলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব। ভেতরে ভেতরে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতির ওপর ইতিহাসের এক ন্যাক্কারজনক নগ্ন হামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ২৫ মার্চের কাল রাতে যার সূচনা হয়।

শুরু হয় চূড়ান্ত মুক্তির সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। তাদের মধ্যে ছিলেন বেগম মুজিব, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেল। তবে বঙ্গবন্ধু পুত্র শহীদ শেখ কামাল ও শেখ জামাল পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এরপর দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাঙালি জাতি ফিরে পান পূর্ণ স্বাধীন একটি দেশ। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। বিজয়ের পর বেগম মুজিবও তার পরিবারসহ মুক্ত হন মিত্র বাহিনীর সহায়তায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর