বঙ্গবন্ধুর কিশোরকাল

বঙ্গবন্ধুর কিশোরকাল

আখি আক্তার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৫১ ১৮ মার্চ ২০২০  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

‘আমার আব্বার শৈশব কেটেছিল টুঙ্গিপাড়ার নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে, মেঠোপথের ধুলোবালি মেখে। বর্ষার কাদাপানিতে ভিজে। বাবুই পাখি বাসা কেমন করে গড়ে তোলে, মাছরাঙা কীভাবে ডুব দিয়ে মাছ ধরে, কোথায় দোয়েল পাখির বাসা, দোয়েল পাখির সুমধুর সুর আমার আব্বাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করত। আর তাই গ্রামের ছোট ছোট ছেলের সঙ্গে মাঠে-ঘাটে ঘুরে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে বেড়াতে তার ভালো লাগত। ছোট্ট শালিক পাখির ছানা, ময়না পাখির ছানা ধরে তাদের কথা বলা ও শিস দেয়া শেখাতেন। বানর ও কুকুর পুষতেন, তারা তার কথামতো- যা বলতেন তাই করত।’  

বঙ্গবন্ধুর শৈশবের দুরন্তপনা সম্পর্কে এভাবেই লিখেছেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ এই বইয়ের ২৬ নম্বর পৃষ্ঠাটি পড়লেই জানা যায় জাতির জনকের শৈশব কেমন ছিল।

অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ের ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি নিজের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ছোট সময়ে আমি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এবং খুব ভাল ব্রতচারী করতে পারতাম।’এই বইতে তিনি আরো লিখেছেন, আমি খেলাধুলাও করতাম। ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলতাম। খুব ভালো খেলোয়াড় ছিলাম না। তবুও স্কুলের টিমের মধ্যে ভালো অবস্থান ছিল। এই সময় আমার রাজনীতির খেয়াল তত ছিল না।’

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা মোসাম্মৎ সাহারা খাতুন। তাদের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তৃতীয় সন্তান শেখ মুজিবুর রহমান। আদর করে বাবা-মা তাকে ডাকতেন খোকা বলে।

‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ের ২৭ নম্বর পৃষ্ঠায় শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘ আমার আব্বা ছিল বেশ রোগা। তাই আমার দাদি সবসময় ব্যস্ত থাকতেন কিভাবে তার খোকার শরীর ভালো করা যায়। তাই দুধ, ছানা, মাখন ঘরেই তৈরি হতো। বাগানের ফল, নদীর তাজা মাছ সবসময় খোকার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত থাকত। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খাবার সম্পর্কে শেখ হাসিনা এই বইয়ে লিখেছেন, ‘খাবার বেলায় খুব সাধারণ ভাত, মাছের ঝোল, সবজিই তিনি পছন্দ করতেন। খাবার শেষে দুধ-ভাত-কলা ও গুড় খুব পছন্দ করতেন।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘আমার আব্বার লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল। বিশেষ করে ফুটবল খেলতে খুব পছন্দ করতেন। দাদা আমাদের কাছে গল্প করতেন, ‘তোমার আব্বা এত রোগা ছিল যে, বলে জোরে লাথি মেরে মাঠে গড়িয়ে পড়তো।’

‘আব্বা যদি ধারে কাছে থাকতেন তবে সঙ্গে সঙ্গে দাদার কথার প্রতিবাদ করতেন। আমরা তখন সত্যিই খুব মজা পেতাম।’

তিনি যে একদিন অনেক বড় কিছু হবেন, তার কিছু নজির খুঁজে পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর ছোটবেলাতেই। শেখ হাসিনা এ বিষয়ে বইটির ২৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘তিনি ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত হৃদয়বান ছিলেন। তখনকার দিনে ছেলেদের পড়াশোনার তেমন সুযোগ ছিল না। অনেকে বিভিন্ন বাড়িতে জায়গির থেকে পড়াশোনা করত। চার-পাঁচ মাইল পথ হেঁটে স্কুলে আসতে হতো। সকালে ভাত খেয়ে স্কুলে আসত। আর সারাদিন অভুক্ত অবস্থায় অনেক দূরে হেঁটে তাদের ফিরতে হতো। যেহেতু আমাদের বাড়িটা ছিল ব্যাংকপাড়ায়, আব্বা তাদেরকে বাড়িতে নিয়ে আসতেন। স্কুল থেকে ফিরে দুধ-ভাত খাবার অভ্যাস ছিল এবং সকলকে নিয়েই তিনি খাবার খেতেন।

দাদির কাছে শুনেছি আব্বার জন্য মাসে কয়েকটি ছাতা কিনতে হতো। কারণ আর কিছুই নয়, কোনো ছেলে গরীব, ছাতা কিনতে পারে না, দূরের পথ, রোদ বা বৃষ্টিতে কষ্ট হবে দেখে তাকে ছাতা দিয়ে দিতেন। এমনকি পড়ার বইও মাঝে মাঝে দিয়ে আসতেন। দাদির কাছে গল্প শুনেছি, যখন ছুটির সময় হতো তখন দাদি আমগাছের নিচে এসে দাঁড়াতেন। খোকা আসবে দূর থেকে রাস্তার ওপর নজর রাখতেন। একদিন দেখেন তার খোকা গায়ের চাদর জড়িয়ে হেঁটে আসছে, পরনের পায়জামা-পাঞ্জাবি নেই। কী ব্যাপার? এক গরীব ছেলেকে তার শত ছিন্ন কাপড়ে দেখে সব দিয়ে এসেছেন।’

ছোটবেলা থেকেই নিজের উদারতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন বঙ্গবন্ধু। সেইসঙ্গে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী, অন্যায় দেখলে কখনো মুখ বুজে সহ্য করেননি। এ বিষয়টি শেখ হাসিনা তার লেখনির মাধ্যমে বইটির ২৯ নম্বর পৃষ্ঠায় তুলে ধরেছেন, ‘কৈশোরেই তিনি খুব বেশি অধিকার সচেতন ছিলেন। একবার যুক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা গোপালগঞ্জে সফরে যান এবং স্কুল পরিদর্শন করেন। সেই সময় সাহসী কিশোর মুজিব তার কাছে স্কুলঘরে বর্ষার পানি পড়ার অভিযোগ তুলে ধরেন এবং মেরামত করার অঙ্গীকার আদায় করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।’

মুজিব তার পূর্বপুরুষদেরই গড়ে তোলা গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। এ স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বাবার কাছে গোপালাগঞ্জ পাবলিক স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন। এর পেছনে একটা ঘটনা আছে। এ নিয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘একবার বর্ষাকালে নৌকা করে স্কুল থেকে ফেরার সময় নৌকাডুবি হয়ে যায়। আমার আব্বা খালের পানিতে পড়ে যান। এরপর আমার দাদি তাকে আর ওই স্কুলে যেতে দেননি। আর একরত্তি ছেলে, চোখের মণি, গোটা বংশের আদরের দুলাল, তার এতটুকু কষ্ট যেন সকলেরই কষ্ট!’

১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত তিনি গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলেই পড়াশোনা করেন। অর্থাৎ ৯ থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি একই স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৩৪ সালে ১৪ বছর বয়সে তিনি বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এই রোগে তার একটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কলকাতায় এনে তাকে অপারেশন করা হয়। চক্ষুরোগের কারণে তার লেখাপড়া চার বছর থেমে থাকে। ১৯৩৭ সালে চার বছর পর গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে তিনি সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন।

শেখ মুজিব নামটি রেখেছিলেন তার নানা। শেখ হাসিনার লেখা থেকে জানা যায়, ‘আমার আব্বার নানা শেখ আবদুল মজিদ আব্বার আকিকার সময় নাম রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। আমার দাদির দুই কন্যাসন্তানের পর প্রথম পুত্র সন্তান আমার আব্বা আর তাই আমার দাদির বাবা তার সমস্ত সম্পত্তি দাদিকে দান করেন এবং নাম রাখার সময় বলে যান, ‘মা, তোর ছেলের নাম এমন রাখলাম যে, নাম জগৎজোড়া খ্যাত হবে।’ নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর নানার কথা সত্যি হয়েছে। আজ জগৎজোড়া তার খ্যাতি।

সূত্র: ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থ

 

ডেইলি বাংলাদেশ/এস