বইকে আমি পণ্য মনে করি : সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

বইকে আমি পণ্য মনে করি : সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

সাক্ষাৎকার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:৪৭ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে

ছবি: লেখকের ফেসবুক থেকে

পেশাগত পরিচয়ে সালাহ উদ্দিন মাহমুদ একজন সাংবাদিক। এছাড়া করেন লেখালেখি। তার জন্ম মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার উড়ারচর গ্রামে। তিনি বাংলা সাহিত্যে স্নাতকসহ প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর লাভ করেন। ছোটগল্প লেখক হিসেবে পরিচিতি পেলেও তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, কলাম, শিশুতোষ গল্প ও সাহিত্য সমালোচনা লিখে থাকেন। এর আগে তার চারটি বই প্রকাশ হয়েছে। এরমধ্যে তিনটি গল্পের বই এবং একটি কবিতার বই। তিনি সুনীল সাহিত্য পুরস্কারসহ একাধিক পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। তার লেখালেখি ও বেইমেলা নিয়ে কথা বলেছেন ডেইলি বাংলাদেশ’র সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: রনি রেজা

ডেইলি বাংলাদেশ: সাহিত্যে এলেন কেন এবং কিভাবে?

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: এটি আসলে একটি কঠিন প্রশ্ন। তবে বলতে গেলে অনেক বড় একটি গল্প। মূলত ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি একটি ঝোঁক তৈরি হয়েছিল। পাঠ্যবইতে কবি-লেখকদের জীবনী পড়ে উৎসাহিত হয়েছি। বড় হতে হতে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রকম বই আসে হাতে। সেগুলো পড়তে শুরু করি। কৈশোরের বেশিরভাগ সময় কেটেছে নানা বাড়ি। তখন দেখেছি, আমার নানা গভীর রাত পর্যন্ত বই পড়তেন। তার দেখাদেখি আমিও পড়তে শুরু করি। এরপর খাতা-কিংবা ডায়েরিতে লেখা শুরু। বন্ধুরা দেখে উৎসাহ দিত। পরিবারের লোকজন প্রথম দিকে বিরোধিতা করলেও পরে একসময় সাহস জুগিয়েছে। এভাবেই লেখালেখিতে প্রবেশ।  

ডেইলি বাংলাদেশ: মেলায় এবার কী বই আসছে? বইগুলো সম্পর্কে একটু বলুন—

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: এবারের বইমেলায় তিনটি বই আসছে। বইগুলো হচ্ছে—‘তুমি চাইলে’, ‘আমার আমি’ এবং ‘অগ্নিকাণ্ড সতর্কতা ও নির্বাপন কৌশল’। কবিতার বই ‘তুমি চাইলে’ প্রকাশ করেছে ছিন্নপত্র প্রকাশনী। প্রচ্ছদ করেছেন আইয়ুব আল আমিন। ১৫০ টাকা মূল্যের বইটি পাওয়া যাবে লিটল ম্যাগ কর্নারের ১২৪ নম্বর স্টলে। এ সময়ের জনপ্রিয় তরুণ লেখক সাদাত হোসাইনের সাক্ষাৎকার সংকলন ‘আমার আমি’ প্রকাশ করেছে অন্যধারা। প্রচ্ছদ করেছেন হৃদয় চৌধুরী। ২০০ টাকা মূল্যের বইটি পাওয়া যাবে ৫৯৯-৬০২ নম্বর স্টলে। আর সচেতনতামূলক বই ‘অগ্নিকাণ্ড সতর্কতা ও নির্বাপন কৌশল’ প্রকাশ করেছে মাতৃভাষা প্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন নাসিম আহমেদ। ২০০ টাকা মূল্যের বইটি পাওয়া যাবে ২০১-২০২ নম্বর স্টলে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনার অন্যান্য বই থেকে এগুলোর পার্থক্য কোথায়?

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: লেখকের পক্ষে পার্থক্য করা মুশকিল। এটি হয়তো পাঠক বা সাহিত্য সমালোচকরা ভালো বলতে পারবেন। তারপরও বলব, তিনটি বই-ই আমার আগের চারটি বই থেকে আলাদা। বিষয়-বৈচিত্র ও বার্তাও ভিন্ন ধরনের। আমার আগের কাব্যগ্রন্থ ‘মিথিলার জন্য কাব্য’র চেয়ে এ বছরের ‘তুমি চাইলে’ অনেকটাই পরিণত। এছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে অগ্নিকাণ্ড নির্বাপন বিষয়ক বই করেছি। এভাবেই পরিণত হতে হতে আরও অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করবেন।      

ডেইলি বাংলাদেশ: বছরের অন্য সময় প্রকাশ না করে মেলায় কেন?

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আমি শুধু মেলা উপলক্ষেই বই প্রকাশ করি তা নয়। আমার দুটি বই ডিসেম্বরেও প্রকাশ হয়েছে। তবে প্রকাশের কাজটি যেহেতু প্রকাশনা সংস্থা করে থাকে। তাই তাদের মর্জি মতোই বই প্রকাশিত হয়। আমাদের দেশে বইমেলাকে কেন্দ্র করেই বেশিরভাগ বই প্রকাশিত হয়। তবে আমি বরাবরই সারাবছর বই প্রকাশের পক্ষে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: সামগ্রিকভাবে মেলা সম্পর্কে আপনার ভাবনা জানতে চাই—

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। আমি চাইবো, লেখক-পাঠকের মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠুক মেলাকে কেন্দ্র করে। এ বছর মেলার পরিসর বাড়ানো হয়েছে। এটি একটি ভালো দিক। এছাড়া লিটল ম্যাগ চত্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আনা হয়েছে। তাতেও আমি খুশি। এখন চাইবো, মেলা শতভাগ সফলভাবে সম্পন্ন হোক। মুজিববর্ষকে কেন্দ্র করে বই ছড়িয়ে পড়ুক হাতে হাতে। নিরাপত্তা জোরদার থাকুক। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কাম্য নয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ: মেলা নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা—

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: মেলা নিয়ে অভিজ্ঞতা বলতে গেলে মধুরই। ২০১৪ সাল থেকে নিয়মিত মেলায় যাই। তখনো বই আসেনি আমার। আমিও অপেক্ষায় থাকতাম। স্টলে দাঁড়িয়ে অটোগ্রাফ দেওয়ার স্বপ্ন ছিল। ২০১৭ সালে যখন বই আসে, প্রথম অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে আমার সমস্ত শরীর কাঁপছিল। এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। 

ডেইলি বাংলাদেশ: লেখালেখি চর্চার ক্ষেত্রে প্রেরণা বা প্রভাব কার কাছ থেকে বা কিভাবে?

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: চর্চার ক্ষেত্রে মরহুম নানাজান মাওলানা আফছার উদ্দিন আমার প্রেরণা। তিনি প্রচুর পড়তেন। একজন বিজ্ঞ আলেম ছিলেন। সব ধরনের বই তাকে পড়তে দেখেছি। তিনি একটি কিতাবও লিখেছিলেন। অন্যদিকে প্রভাব বিস্তার করেছেন খালাতো ভাই মহিউদ্দিন মহিন। তিনি ছাত্রজীবনে কবিতা লিখতেন। ভালো আবৃত্তিও করতেন। উৎসাহ জুগিয়েছেন মামা মাওলানা মেজবাহ উদ্দিন ফয়েজী, বড়ভাই মোছলেহ উদ্দিন ও মেজভাই নুরুদ্দিন আহমেদ। এছাড়া আমার বাবা মাওলানা আব্দুল মাজেদ আমার একনিষ্ঠ পাঠক। আর এখন তো স্ত্রী মিথিলা ফারজানা লোপা, ছোটভাই মমিন উদ্দিন সবসময় প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: কাউকে বিশেষভাবে অনুসরণ করেন কি?

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: কাউকে সেভাবে অনুসরণ করি না। নিজের একটি ধরন তৈরি করার চেষ্টা করি। তবে অনেক লেখক-কবির লেখায় প্রভাবিত হই এটা অস্বীকার করা যাবে না। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় তরুণ লেখক সাদাত হোসাইনের লেখা আমাকে প্রভাবিত করে। তবে তাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি না। নিজেই একটা স্টাইল বিনির্মাণ করতে চাই।

ডেইলি বাংলাদেশ: আমাদের দেশে বইমেলার প্রয়োজনীয়তা কী? আপনার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বলুন—

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: আমাদের দেশে সব শিল্পেরই তো মেলা হচ্ছে। আর বইও তো একটি শিল্প। তাই প্রকাশনা শিল্পের বিকাশের জন্য বইমেলা অবশ্যই প্রয়োজন। বইকে আমি পণ্য মনে করি। যারা একে অস্পৃশ্য করে রাখতে চান, আমি তাদের বিরুদ্ধে। বই নিয়ে প্রচার হবে, বিজ্ঞাপন হবে। গলির মোড়ে মোড়ে বইমেলা হবে। তবেই এ শিল্প টিকে থাকবে। প্রসারিত হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ: প্রকাশকদের নিয়ে আপনার অভিমত কী?

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: প্রকাশকদের নিয়ে তিক্ত-মধুর, দু’ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে। এটা আসলে ম্যান টু ম্যান ভ্যারি করে। প্রকাশকরা তো আসলে ব্যবসায়ী। তাদের চিন্তা-চেতনা নিশ্চয়ই ব্যবসাকেন্দ্রিক। সেটাই স্বাভাবিক। তবে প্রকাশকরা যদি লেখক বান্ধব হন এবং লেখকরা যদি প্রকাশক বান্ধব হন; তাহলে এ দ্বন্দ্ব আর থাকবে না। তাই সবাইকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।      

ডেইলি বাংলাদেশ: কোন কোন ব্যাপারে কি মনোকষ্ট আছে আপনার?

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: কষ্ট তো কম-বেশি সবারই আছে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমি তো প্রকাশকের টাকায় বই করি। তাই প্রকাশক যা বলে, তা-ই শুনতে হয়। টাকা দিলে পাই; না দিলে নাই। 

ডেইলি বাংলাদেশ: লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? 

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: লিখতে চাই। অনেক বেশি লিখতে চাই। কিন্তু পারি না। এই না পারাটা কাটিয়ে উঠতে চাই। সাহিত্যের সব বিভাগেই কম-বেশি কাজ করেছি। এবার একটি উপন্যাস লিখতে চাই। এটা হবে আমার পরীক্ষামূলক কাজ। এর ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু। সর্বোপরি পাঠকের মাঝে বেঁচে থাকতে চাই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর