ফিকাহশাস্ত্রের অমর মনীষী আবু হানিফা (রহ.)

শহীদুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১৯:৫১ ১০ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৯:৫১ ১০ জানুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ফিকাহশাস্ত্রে অবদানের জন্য, যে কজন মনীষী ইসলামি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাদের অন্যতম। 

তার জীবন ছিলো ইসলামের জন্য। দীন ও শরীয়তের খেদমতে তিনি নিজের জীবনকে ব্যয় করেছেন। তার দ্বারা ইসলামি ফিকহ সমৃদ্ধি লাভ করে। 
 
শুধু বংশগত মর্যাদা কাউকে এগিয়ে নিতে পারে না। যোগ্য হলে বংশগত মর্যাদা ছাড়াও এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কারণ, তিনি ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। কারো কারো মতে তার পূর্বপুরুষরা গোলাম বা দাস ছিলো। তাহলে বংশগত মর্যাদা কতটুকু? কিন্তু হাদীস ও ফিকহে অগাধ জ্ঞানের কারণে, ইতিহাসের পাতায় পাতায় পাওয়া যায় তার নাম।

আবু হানিফা (রাহ.) এর জন্ম:

হিজরী ৮০ সাল। ইরাকের কূফা নগরীতে জন্মগ্রহন করেন যুগশ্রেষ্ঠ ফকিহ ইমাম আবু হানিফা (রহ.)। তখন ওই নগরীর বয়স ৬৬-৬৭ বছর। ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী। তাই মুসলিম বিশ্বে ইরাকের কূফা সর্বদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আবু হানিফা (রহ.) হায়াত পেয়ে ছিলেন কম, কিন্তু কালের বহু পরিবর্তনের তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি যখন জন্মগ্রহন করেন উমাইয়া খেলাফতের সূর্য তখন মধ্য গগনে।

উমাইয়া প্রতাপশালী খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান রাজ্য পরিচালনা করেন। অল্প কিছুদিন পরেই মুসলিম সেনাপতিরা ভারতবর্ষ, স্পেন ও বুখারা-সমরকন্দের মত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো জয় করেন। তার সময়েই উমাইয়া শাসনের অবসান এবং আব্বাসীয়দের উত্থান। যৌবনকালে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কর্তৃক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার নির্মম নিষ্ঠুরতা। 

আবু হানিফা (রাহ.) এর বংশ: 

অনেকে মনে করেন, আবু হানিফা (রহ.) এর বংশ ক্রীতদাস ছিলো। তবে প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, অনারব নওমুসলিম সম্ভ্রান্ত গোত্রগুলোর ন্যায় তার বংশও সম্ভ্রান্ত একটা বংশ এবং তারা কখনো ক্রীতদাস ছিলো না। এ-ব্যাপারে ‘আইম্মায়ে আরবাআ’ নামক গ্রন্থে লেখা হয়, ‘ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) এর নাম হচ্ছে নোমান। উপনাম আবু হানিফা। তার বংশধারা হচ্ছে, আবু হানিফা নোমান ইবনে ছাবেত ইবনে নোমান ইবনে মারযুবান তাইমী কূফী (রহ.)। 

নোমান ইবনে মারযুবান কাবুলের নেতৃস্থানীয় ও অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে খুবই জ্ঞানী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লোক ছিলেন। তিনি হজরত আলী (রা.) এর খেলাফত কালে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং কূফায় এসে বসবাস শুরু করেন। হজরত আলী (রা.) এর সঙ্গে এই বংশের বিশেষ সম্পর্ক ছিলো। ইমাম আবু হানিফার পৌত্র ইসমাইলের বর্ণনা হচ্ছে, ‘আমার নাম ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ ইবনে নোমান ইবনে ছাবেত ইবনে নোমান ইবনে মারযুবান। আমার মূল বংশ পারসিক। আল্লাহর শপথ, আমাদের বংশ কখনো গোলাম ছিলো না।’ (কাজী আতহার মুবারকপুরী, আইম্মায়ে আরবায়া, পৃষ্ঠা-৪১) 
 শিক্ষা জীবন 

খেলাফতে রাশেদার চতুর্থ খলিফা ছিলেন আলী (রা.)। তার খেলাফত কালে, ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী মদিনা থেকে কূফায় স্থানান্তরিত হয়। তাই সেখানে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবয়ীগণের আধিক্য ছিলো। তাদের উপস্থিতির কারণে, কূফার অলিগলিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। ওই পরিবেশেই আবু হানিফা (রাহ.) বড় হন। শৈশবে তিনি কোরআন হেফজ করেন। কেরাত ও কোরআনের তাজবিদ শিক্ষা সম্পন্ন করেন কারী আসেম (রাহ.) এর নিকট। তারপর তিনি পারিবারিক ব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর মধ্যে একদিন তৎকালিন সময়ের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি হজরত আমের শাবী (রাহ.) এর সঙ্গে তার সাক্ষাত হয়। হজরত আমের শাবী (রাহ.) এর নসীহত শুনে আবু হানিফা (রাহ.) নতুন করে ইলেম অর্জনে মনযোগী হন।

তাবেয়ী হওয়ার মর্যাদা:
 
যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কেরামের জিয়ারত ও সাহচর্য লাভ করেন, শরয়ী পরিভাষায় তাকে তাবেয়ী বলা হয়। প্রসিদ্ধ চার মাজহাবের ইমামগণের মাঝে শুধু আবু হানিফা (রাহ.) সাহাবায়ে কেরামের জিয়ারত ও সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছেন; সে জন্য তিনি তাবয়ী। আবু হানিফা (রাহ.) যে সকল সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন, 

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.)। তিনি বসরায় বসবাস করতেন এবং হিজরী ৯৩ সালে ইন্তেকাল করেন। 

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রা.)। তিনি কূফায় বসবাস করতেন এবং হিজরী ৮৭ সালে ইন্তেকাল করেন।

হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা)। তিনি মদিনায় বসবাস করতেন এবং হিজরী ৮৮ সালে ইন্তেকাল করেন। 

হজরত আবু তোফায়েল আমের ইবনে ওয়াছেলা (রা.)। তিনি হিজরী ১০২ সালে ইন্তেকাল করেন এবং মক্কায় বসবাস করতেন। (সূত্র: কিতাবুন নাওয়াজেল, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-১৪৬)

ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর শিক্ষক:
 
ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর শিক্ষকের সংখ্যা অনেক। কেউ কেউ এর সংখ্যা উল্লেখ করেছেন চার হাজার। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন হচ্ছেন’

হজরত হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান (রাহ.)। আঠার বছর তার তত্তাবধানে থেকে যুগের শ্রেষ্ঠ ফহীক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আমের ইবনে শুরাহবিল হিম্য়ারী কূফী (রাহ.), আতা ইবনে আবি রাবাহ মক্কী (রাহ.), আবু জাফর আল-বাকের মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন (রাহ.)।

ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর রচনা:
 
আবু হানিফা (রাহ.) এর যুগের আলিমগণ সাধারণত প্রচলিত পরিভাষায় গ্রন্থ রচনা করতেন না। তাদের সময়ের পদ্ধতি ছিলো, তারা যা বলতেন ছাত্ররা তা লিখে সংরক্ষণ করতো এবং পরবর্তিতে ছাত্ররা উস্তাদের নামে রচনা বের করতো। এ জন্য তাবিয়ী যুগে বা ১৫০ সালের  মধ্যে মৃত্যুবরণকারী আলেমদের লেখা বা সংকলিত পৃথক গ্রন্থাদির সংখ্যা খুবই কম। আবু হানিফা (রাহ.) এর রচনা-
আল ফিকহুল আকবার  (শ্রেষ্ঠ ফিকহ) আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকীদার ওপর রচিত সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ।

> আল ফিকহুল আবসাত (বিস্তারিত ফিকহ)
> আল-আলিম ওয়াল মুতাআল্লিম (জ্ঞানী ও শিক্ষার্থী)
> আর রিসালা (উসমান আল বাত্তিকে লেখা পত্র)
> ওসিয়্যাহ

আবু হানিফা (রাহ.) এর ছাত্র:
 
শিক্ষকের সুনাম বয়ে আনে তার ছাত্ররা। এ-জন্য কোনো শিক্ষকের জন্য যোগ্য শাগরিদ পাওয়া আল্লাহ তায়ালার অনেক বড় নেয়ামত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর সৌভাগ্য যে, তিনি  মেহনতি ও যোগ্য কিছু শাগরিদ পেয়েছিলেন; যাদের দ্বারা ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর ইলেম সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন,

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ)। তিনজন আব্বাসিয়া শাসকের শাসনামলে তিনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রসিদ্ধ রচনা ‘কিতাবুল খেরাজ’ স্ব বিষয়ে উৎসগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হাসান আশ শায়বানী (রহ.)। তার রচনাগুলোকে হানাফি ফিকহের মূল উৎস মনে করা হয়। প্রসিদ্ধ আছে এক ইহুদী ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) এর কিতাব ‘মাবসূত’ পড়ে মুসলমান হয়ে যায় এবং বলে ‘এই যদি হয় ছোট মুহাম্মাদের জ্ঞান তাহলে বড়জনের জ্ঞান কেমন ছিলো? তার রচিত ‘আস সিয়ারুল কাবীর’ ও ‘আস সিয়ারুস সগীর’ যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে প্রাচীন রচনা সমূহের অন্যতম।

ইমাম যুফার ইবনে ফুযাইল (রহ.)। হানাফি ফকিহদের মাঝে যুক্তির দিক থেকে তিনি ছিলেন সবচেয়ে অগ্রসর। এ-জন্য তিনি ‘কায়্য়াস’(যুক্তিবাদী) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর দানশীলতা: 

একবার হজরত ইবরাহীম ইবনে ওয়াইনাহ (রাহ.) ঋনের কারণে জব্দ হন। আবু হানিফা (রহ.) তা জানার পর সমস্ত ঋন পরিশোধ করে, তাকে মুক্ত করেন। ঋনের পরিমাণ ছিলো চার হাজার দেরহাম (প্রায় দশ লক্ষ টাকা) 

হজরত হাসান ইবনে সুলাইমান বলেন, আমি আবু হানিফা (রহ.) এর চেয়ে বড় কোনো দাতা দেখি না। তিনি প্রতি ক্লাসের  ছাত্রদেরকে নিজের পক্ষ থেকে মাসিক ভাতা প্রদান করতেন এবং এই ভাতা  দেয়া হতো বাৎসরিক ভাতার বাহিরে। বর্ণিত আছে, ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) যখনই নিজের জন্য কোনো বস্তু ক্রয় করতেন তখন পরিচিত আলেমদের জন্য তা কিনে হাদিয়া দিতেন। ( সূত্র: কিতাবুন নাওয়াজিল, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-১৫৪)

আবু হানিফা (রাহ.) সম্পর্কে অন্যান্য মুহাদ্দিস, ফকিহগণের মন্তব্য:

ইমাম শাফী (রাহ.)। তিনি নিজে এক মাজহাবের ইমাম। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ফিকহের ক্ষেত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে চায় সে যেন ইমাম আবু হানিফার অনুসরণ করে।

ইমাম শাফী (রাহ.) একবার ইমাম মালেক (রাহ.)-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কী ইমাম আবু হানিফাকে দেখেছেন? উত্তরে মালেক (রাহ.) বলেন, সুবাহানাল্লাহ! আমি তার মত আলেম দেখিনি। আল্লাহর শপথ! আবু হানিফা যদি বলতেন এই স্তম্ভটি স্বর্ণের তাহলে যুক্তি দ্বারা তা প্রমাণ করে দিতে পারতেন। 

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)। হাম্বলী মাজহাবের ইমাম। তিনি বলেন, সুবাহানাল্লাহ! ইমাম আবু হানিফা ইলেম, আখেরাতমুখিতা ও তাকওয়ায় এত উঁচু স্থরে পৌঁছেছেন, যা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়। (আইম্মায়ে আরবায়া, পৃষ্ঠা-৬৮)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর ব্যবসা: 

পূববর্তি আলেমগণ দীনি কাজ দ্বারা ব্যক্তিগত কোনো ফায়দা নিতেন না। তারা দীনি কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে কোনো কাজ-কারবার করতেন। এ-জন্য অনেক বড় বড় ফকিহ, মুহাদ্দিসের নামের সঙ্গে তাঁর পেশাগত উপাধিও ইতিহাসের পুস্তকগুলোতে পাওয়া যায়। কিছু উপাধি যেমন ‘বাজ্জার’ (কাপড় বিক্রেতা) ‘হাত্তাব’ (জ্বালানী কাঠ বিক্রেতা) ইত্যাদি। তাদের এই কর্মপন্থা অবলম্বন করার কারণ ছিলো, যেন পরবর্তিরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তো ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) ছিলেন কাপড় বিক্রেতা। তার রেশমি কাপড় তৈরির কারখানাও ছিলো। আল্লাহ তায়ালা তাদের অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন-আমীন।

ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর মৃত্যু: 

খলিফা মনসুর, ইমাম আবু হানিফাকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব পেশ করে। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলে, তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়-ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তখন ছিলো, রজম মাস, হিজরী ১৫০ সাল ।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে