ফরিদপুরে পুলিশের মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত

ফরিদপুরে পুলিশের মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত

হারুন আনসারী, ফরিদপুর   ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:১২ ৪ জুন ২০২০   আপডেট: ১৯:২৭ ২০ জুন ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সিনিয়র স্টাফ নার্স কাকলী বেগম ঢাকার একটি হাসপাতালে ২২ দিন আগে মেয়ে সন্তান জন্ম দেয়ার তিনদিন পরেই মারা যান। এর কদিন পরেই ঈদুল ফিতরের দিনে তার স্বামী মোবারক হোসেনের করোনা ধরা পড়ে। বর্তমানে তিনি আইসোলেশনে রয়েছেন। বৃদ্ধা দাদি এখন দেখাশোনা করছে কাকলী বেগমের সদ্যজাত শিশুটির। পুরো বাড়িতে চলছে শোকের পাশাপাশি করোনার থাবা।

বিষয়টি জানতে পেরে তাদের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ফরিদপুরের পুলিশ প্রশাসন।  তাদের সার্বক্ষণিক খবর নিতে পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিযুক্ত করেছেন।

তাদের জন্য পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন উপহার। নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে যেনো তারা মনোবল না হারায়।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মোবারক হোসেন বলেন, এসপি স্যারের এই মহানুভবতায় নিদারুণ কষ্টের মাঝেও একটু সান্তনা পেয়েছি। আশার আলো দেখছি।

শুধু মোবারক হোসেনের পরিবারেই নয়, সাম্প্রতিক করোনাভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ফরিদপুরের পুলিশ প্রশাসনের গৃহিত নানা মানবিক কার্যক্রম অসংখ্য অসহায় পরিবারে স্বস্তি এনেছে। 

ফরিদপুরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার কমলেশ চক্রবর্তীর সৎকারে কেউ এগিয়ে না আসায় পুলিশ সদস্যরাই তাকে দাহ করে। বিষয়টি জনমনে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে।

ফরিদপুরের পুলিশ সদস্যদের বেতনের টাকার একটি অংশ দিয়েই চলছে নিয়মিত এ সহায়তা কার্যক্রম। 

জানা গেছে, এ পর্যন্ত ফরিদপুর পুলিশ সদস্যদের বেতন থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকা সংগ্রহ করে ফরিদপুরের অসংখ্য অসহায় পরিবারে মানবিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপারের আহবানে জেলা পুলিশের ১৫৫০ জন সদস্যের বেতনের টাকার একটি অংশ মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রতি মাসে যুক্ত হচ্ছে এই তহবিলে। সেচ্ছায় সবাই এগিয়ে আসেন এই কাজে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর সভাপতি শিপ্রা গোস্বামী বলেন, করোনাকাল শুরু হতেই ফরিদপুরের পুলিশ বিভাগের গৃহীত নানা কার্যক্রম শুধু জনসাধারণের নজরই কাড়েনি, তাদের মাঝে আশার আলো ছড়িয়েছে এই ক্রান্তিকালে বেঁচে থাকার। 

এদিকে জেলা পুলিশের পক্ষ হতে অসহায় মানুষের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুজ্জামানকে প্রধান করে গঠন করা হয়েছে একটি ত্রাণ বিতরণ কমিটি। চালু করা হয়েছে হটলাইন। অসহায় মানুষের ফোন পেলেই পুলিশের রিজার্ভ অফিসার এসআই আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পৌঁছে দেয়া হয় খাবার সামগ্রী। যেই পুলিশ অফিসে একসময় ভুক্তভোগীরা যেতো আইনী সহায়তায় সেখানে এখন ত্রাণের জন্য অসহায় মানুষের দীর্ঘ সারি।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই সময়ে পুলিশ তাদের নিয়মিত ডিউটি হিসেবে জনসাধারণকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জীবনযাপনে উৎসাহিত করার জন্য সড়কে আল্পনা এঁকেছে, দোতারা ও গিটার হাতে স্বরচিত গান গেয়েছে করোনা সচেতনায়। পাশাপাশি খবর পেলেই অসহায় মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে ত্রাণ। অন্য জেলা হতে আগত যেসব দিনমুজর আটকে ছিলো তাদের মাঝে গভীর রাতে সেহরিসহ রান্না করা খাবার বিতরণ করেছে। মৃত্যু পথযাত্রী মানুষকে রক্ত দিয়ে প্রাণে বাঁচতে সাহায্য করেছে।

তিনি বলেন, ঈদুল ফিতরের সময় চাল, ডাল, তেল, লবন, আলুর সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে দেয়া হয়েছে দুই প্যাকেট সেমাই, চিনি, দুধ, চারটি ডিম। প্রত্যেক থানায় গ্রাম পুলিশকেও দেয়া হয়েছে এসব উপহার। কর্তব্যরত অবস্থায় যে সব পুলিশ সদস্য মারা গেছেন তাদের পরিবারকেও বিশেষ সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ইমাম ও মুয়াজ্জিন, বাউল শিল্পী ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট যারা করোনাযুদ্ধে কাজ করছেন তাদেরকেও নানাভাবে সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে। এছাড়া গোপনে দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

লকডাউনে বন্ধ হওয়া পতিতা পল্লীর ১৬২ যৌনকর্মীর মাঝে তারা খাদ্য সহায়তা বিতরণ করেছে। খ্রিষ্টান চার্চ ও পরিবহন শ্রমিকদেরও খবর নিয়েছে তারা।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাশেদুল ইসলাম বলেন, ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান (পিপিএম সেবা) এর চৌকস নেতৃত্ব ও আন্তরিকতার কারণেই আমরা এই দুর্যোগকালে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি। তার আহ্বানে সব পুলিশ সদস্য বেতনের একটি অংশ ত্রাণ তহবিলে দিচ্ছেন।  

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান বলেন, সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের বিষয়টি পুলিশ সদস্যদের জানানোর পরে তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের বেতনের একটি অংশ দিয়ে কর্মহীনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমরা এই সমাজেরই অংশ। করোনাকালে সাধারণ মানুষের জন্য পুলিশ সদস্যরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন সেজন্য সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।   

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএইচ/