ফজর নামাজের ফজিলত (শেষ পর্ব)

ফজর নামাজের ফজিলত (শেষ পর্ব)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:২২ ১৫ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ২০:২৩ ১৫ এপ্রিল ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

রাত জাগার প্রবণতা: ইসলামি আলোয় নিজকে পরিচালিত করাতেই রয়েছে সাফল্যের নিগূঢ় রহস্য। ইসলামি জীবন ব্যবস্থায়ই রয়েছে কল্যাণ ও বরকত।

মুসলিম মিল্লাত আজ সর্বত্রই ইসলামি কৃষ্টিকালচারকে পেছনে রেখেছে। পশ্চিমা কৃষ্টিকালচারকে আপন করেছে। পশ্চিমাদের প্রতি ডাকেই খুঁজে ফিরে তারা প্রগতির সাফল্যকে। যার ফলে ইসলামি জীবন ব্যবস্থার বরকত থেকে তারা বঞ্ছিত হচ্ছে।

ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত আমলগুলোকে পশ্চিমার ধোঁকার ফানুশ দুর্বোধ্য করে ফেলেছে। ফিরিঙ্গি কালচার মুসলমানদের ধর্মীয় অবকাঠামোর ওপর প্রচণ্ড আঘাত করছে। শেকড় কেটে ফেলছে। কোনো কোনো বিধানের ওপর আমল করা অসাধ্য হয়ে গেছে। শরিয়তের স্বভাব হলো- রাতে ইশার নামাজ আদায় করে দ্রুত শুয়ে পড়া। এর গুরুত্ব স্বয়ং জগতের শিক্ষক রাসূল (সা.) দিয়েছেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) ইশার পূর্বে শোয়া এবং ইশার পর আলাপ চারিতাকে অপছন্দ করতেন (তিরমিযী)।

হজরত সালমান ফারসী (রা.) বলেন, তোমরা রাতে আলাপচারিতা পরিত্যাগ কর। কেননা এটি পরকালকে বিনাশ করে দেয়। যদি তোমরা এমনটি করে ফেল তাহলে ঘুমের পূর্বে দু’রাকাত নামাজ পড়। (মুসান্নেফে ইবনে আবী শারা)। 

হজরত সুফিয়ান সাওরী (রহ.) বলেন, একদিন এশার পর আলোচনা করলাম। চিন্তা করলাম এ অবস্থায় ঘুমানো বাঞ্জনীয় নয়। ফলে উঠে ওজু করে দু’রাকাত নামাজ পড়লাম। আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইলাম, একথা নিজ আল্লাহ ভীরুতা  ও পবিত্রতা প্রকাশের জন্য বলছি না বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মানুষ এর ওপর আমল করুক। কিন্তু আজ মুসলমান শরিয়তের এ নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে চলেছে। ভুলে গেছে এ হেদায়াত কোনো কারণ ছাড়াই রাত জাগার স্বভাব শরিয়ত সম্মত নয় এবং নিন্দনীয়। এ অনুভূতিও বিদায় নিয়েছে। ফলে অনেক মুসলিম ভাই অনেক রাত পর্যন্ত অনর্থক কথা বার্তা খেল তামাশায় মগ্ন থাকে। বন্ধু বান্ধব নিয়ে আসড় জমিয়ে সময় নষ্ট করে। জীবনের অমূল্য সময় বিনাশ করে। বিশেষত ব্যবসায়ীরা রাত ১০-১১ অফিস দোকান বন্ধ করে ক্লান্ত দেহে বাড়ি ফেরে। রাতের আহার সারে ১২টায়। রাত যখন গুটিয়ে আসে তখন তারা বিছানায় যায়। আবার মোবাইল, ফেসবুক এসব তো আছেই। মোট কথা ক্লান্তিকর দেহ নিয়ে রাত ২/২.৩০ যখন ঘুমাতে যায় তাহলে সে কী করে ফজরের সময় চোখ খোলার আশা করে! মসজিদে মহান রবের দরবারে কপাল ঝুকাবে কী করে? তাই আবশ্যকীয় হলো, আল্লাহর ওয়াস্তে আমরা আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করি। ঘুম খাবার বরং পুরো জীবন ব্যবস্থাকে এমন করে গড়ে তুলি যাতে শরিয়াতের হুকুমে বিঘ্ন না ঘটে। মানুষ ডাক্তারের ফর্মূলা মানতে যতোটা আগ্রহী শরিয়তে তা নয় কেন?

প্রত্যেহ মহা পরাক্রমশালীর পক্ষ থেকে ডাক আসছে, মুয়াজ্জিন দরাজ কণ্ঠে ঘোষণা করছে ‘নামাজ ঘুমের চেয়ে উত্তম। উভয় জাহানের সফলতায় যামিন’। কিন্তু আমরা বিছানা ছাড়তে ইচ্ছুক নই। জীবন রুটিন বানানোর জন্য প্রস্তুত নই যাতে সকালে উঠা এবং আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেয়া সহজ হয়ে যায়।

খাদ্যাভাসে অসমতা: একটি জিনিস যা ফজর নামাজে উদাসীনতার কারণ। আমরা খাবার গ্রহণের এমন সময় নির্ধারন করি যার প্রভাব শুধু ইবাদতেই নয় বরং শরীয়তেও বিরূপ প্রভাব পড়ে, নাশতা সাধারণত আমরা দশটা-এগারটায় করি, মধ্যাহ্নভোজ হয় বেলা তিনটা চারটায়। রাতের খাবার হয় এগারটা-বারোটার মাঝামাঝিতে। রাতের খাবারই যখন বিলম্বে হয় বিছানায় যাওয়া তো বিলম্ব হবেই। রাতের এক বড় সময় পার করে বিছানায় যাওয়ার ফলে ফজর নামাজে জাগ্রত হওয়াটা দুস্করই বটে। এজন্য এটাও জরুরি খাদ্যাভাসে এমন স্বাস্থ্য সম্মত সময় নির্ধারণ করব যাতে শরীয়তের আমলেও কোনো উদাসীনতার পরিচয় বহন করবে না। বিশেষ করে রাতের খাবার এশার পূর্বেই সেরে নেয়ার প্রতি লক্ষ রাখা। এশার নামাজের পরপরই শুয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। ফলে ফজর নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে। 

ঘুম থেকে উঠার কয়েকটি তাদবির: রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার প্রতি সবিশেষ লক্ষ্য রাখা। কেননা কম পক্ষে ৬ ঘণ্টা ঘুমানো প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। সুস্থ্যতার পূর্বশর্ত। এশার পর দ্রুত শুয়ে যাওয়া। রাতে ছয় ঘণ্টা ঘুমালে মানুষ প্রফুল্ল থাকে। তনুমন সতেজ থাকে। দিনের ক্লান্তি অবসাদ বিতারিত হয়। ফজরে উঠা তার জন্য সহজ হয়। 

রাতে স্বল্প আহার: রাতে স্বল্প আহার ফজরে উঠতে সহায়কের ভূমিকা রাখে। নাশতা ও মধ্যাহ্নভোজ পেট পুরে গ্রহণ করা। কিন্তু রাতে অল্প ও হাল্কা খাদ্য গ্রহণ। রাতে পেট ভর্তি খেলে বা ভারি খাবার গ্রহণ করলে হজম হয় দেরিতে। ফলে এতে শরীরে আলস্য ভর করে, ফজরে উঠতে প্রতিবন্ধক হয়।

পানি পানে স্বল্পতা: রাতে খাবারের পর পানি পানে স্বল্পতার দিকে সতর্ক থাকা। পানি পান বেশি হলে শরীরে তারল্য বেশি হয়, শরীর নরম ও আদ্র হলে ঘুম গভীর হয়, অলসতা ঝেকে বসে।

৪০ পা চলা: রাতে খেয়ে কিছুটা হাঁটাহাঁটি করা। যাতে খাদ্য কিছুটা হজম হয়। খাবারের পর শরীরে যে আলস্য চেপে বসে তা দূর হয়। এতে সকালে উঠা সহজ ও  সহায়ক হবে।

এলার্ম: ঘুমুতে যাওয়ার পূর্বে এলার্ম দিয়ে ঘুমানো। এতে যথা সময়ে চোখ খুলতে সাহায্য করে। 

সূরা কাহাফের কয়েক আয়াত পড়ে ঘুমানো: সূরা কাহাফের শেষ চার আয়াত পড়ে ঘুমানো। এর শেষ চার আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এমন কার্যকারিতা রেখেছেন এর পাঠকারীকে রাতে যে সময়ই জাগ্রত হওয়ার ইচ্ছা করবে তার ঘুম ওই সময়ই ভেঙ্গে যাবে। এ আয়াত পড়ে ফজর নামাজ পড়ার নিয়ত করবে ইনশাআল্লাহ ফজর নামাজ নিয়মিত পড়া সহজ হবে।

আরো পড়ুন>>> ফজর নামাজের ফজিলত (পর্ব-১)

নিজকে শাস্তি দেয়া: ফজর নামাজ নিয়মিত পড়ার লক্ষ্যে উপরিউক্ত তদবিরগুলোই যথেষ্ট। কিন্তু কখনো কারো নফস বেশি অলস হলে উদাসীনতায় তাকে পেয়ে বসলে আমলগুলো করা সত্তেও ফজর নামাজে উঠা কষ্ট সাধ্য হয়ে যায়। তার প্রতিকার হলো, বান্দা দৃঢ় সংকল্প করে নেবে যখনই আমার ফজর নামাজ কাযা হবে। আমি ১০০ টাকা সদকা করব। বিশ রাকাত নফল নামাজ পড়ব। এভাবে নিজেকে কষ্টে ফেললে ইনশাআল্লাহ নফস অনুগত হবে। আমরা ইবাদত ও আনুগত্যে কোনো প্রকার ছাড় দেবো না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে