‘প্রেম নয় পড়ালেখা করব’ বলায় অ্যাসিডে ঝলসে গেল মনিকার মুখ

‘প্রেম নয় পড়ালেখা করব’ বলায় অ্যাসিডে ঝলসে গেল মনিকার মুখ

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৪৬ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৪:১৬ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পোড়া মুখের কারণে অনেক অপমান সহ্য করেছেন তিনি। একে তো এসিডদগ্ধ তার উপরে পরিবারেও এই নারী ছিলেন নিস্পেষিত। অ্যাসিডে পোড়া মুখটি রোজ আয়নায় দেখতেও বিরক্ত হয়ে যেতেন তিনি। তার তো কোনো দোষ নেই, তবে কেন তার ভাগ্য এমন বদলে গেল?

বলছি মনিকা সিংয়ের কথা। জ্বি হ্যাঁ, তিনি একাধারে একজন পুরষ্কারপ্রাপ্ত বক্তা, ফ্যাশন ডিজাইনার, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং মহেন্দ্র সিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। তার অ্যাসিডে পোড়া মুখটিই এখন অন্যান্য অ্যাসিডদগ্ধ নারীর ভরসার জায়গা। তিনি কীভাবে এই অবস্থানে আসলেন, কীভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন? এমন প্রশ্নের সম্মুখীন তিনি প্রায় প্রতিদিনই হয়ে থাকেন। ইন্ডিয়াটুডেতে দেয়া সাক্ষাতকারে সংগ্রামী এই তার জীবনের গল্প জানিয়েছেন-

মনিকা সিং২০০৫ সালেই জীবন তছনছ হয়ে যায়!

আমি বরাবরই পড়ালেখায় মনোযোগী ছিলাম। আমি তখন সবে ফ্যাশন ডিজাইনে দিল্লীর ন্যাশনাল ফ্যাশন টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে পড়তে শুরু করেছি। নতুন স্বপ্ন দেখছি ভবিষ্যতে একজন নামজাদা ফ্যাশন ডিজাইনার হবো। এরই মধ্যে আমি একজনের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাই। তবে আমি রাজি হইনি কারণ পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে চেয়েছিলাম। তখন আমার বয়স সবে ১৯। পরিবারের সঙ্গেই আমি লাখনাওতে বসবাস করতাম।

একদিন কলেজের ফাঁকে এক বান্ধবীর সঙ্গে গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলাম। বান্ধবী বলল গাড়ির কাঁচটি নামিয়ে রাখতে, তার নাকি দম বন্ধ লাগছিল। অতঃপর তার কথা মতো কাঁচ নামালাম। আকস্মিকভাবে একটি বাইক আমার গাড়ির পাশে এসে অ্যাসিড নিক্ষেপ করল। বাইকারের পিছনে যিনি বসে ছিলেন তিনিই এ কাজটি করেন। এক ঝলকেই আমি অপরাধী ও তার সঙ্গীর মুখটি দেখতে পাই। আরে এটা তো ওই লোকটি, যিনি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। 

সাজছেন মনিকা‘প্রেম নয় পড়ালেখা করব’ বলায় অ্যাসিডে ঝলসে গেল আমার মুখ। ভাবতেও পারছিলাম না, মানুষ কীভাবে এতোটা নিষ্ঠুর হয়! মুখে সামান্য একটা ব্রণ বা কালো দাগ নিয়ে আমার বরাবরই দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। অথচ আমার সৌন্দর্য মুহূর্তে নষ্ট করে দিল এক বখাটে। আমার তো কোনো দোষ ছিল না। এই ঘটনায় আমার মুখ গলা ও বুক একেবারে ঝলসে যায়। টানা এক বছর হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। বিভিন্ন অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে আরো নিরাশ হয়ে পড়ছিলাম। বিগত ১০ বছরে মুখে মোট ৪৬ বার অস্ত্রোপচার করেছি আমি। 

২০০৯ সালে ঘুরে দাঁড়ায়

হাসপাতালে থাকা অবস্থায় নিজের মনের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করেছি। কেন আমি স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারব না? চেহারা নষ্ট হয়েছে তো কী, মেধা তো আছে। আমি কলেজে যাওয়া শুরু করি। আমার সহপাঠিরাও বেশ আন্তরিক ছিলেন। তারা আমাকে সর্বাত্মকভাবে সাহায্য করেন। ২০০৯ সালে আমি ফ্যাশন ডিজাইনিং এর ডিগ্রি অর্জন করি। আমি কখনো চাইনি পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করব, ওড়ানায় মুখ পেঁচিয়ে থাকব।

তিনি একজন ফ্যাশন আইকনবাবা প্রথম থেকেই আমার প্রতিটি কাজে উৎসাহ দিতেন। তার কারণেই বোধ হয় আমি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি। সে সবসময় আমাকে মনোবল শক্ত রাখার পরামর্শ দিতেন। সামান্য এই কারণে আমার পুরো জীবনটা যেন নষ্ট না হয়ে যায় এই প্রয়াসে দিন রাত খেটেছেন বাবা। জানেন? অপরাধীরা ঠিকই গ্রেফতার হয়েছিলেন। মাত্র ২৫ হাজার টাকার মাধ্যমে তারা মুক্ত হয়ে যায়। আমার জীবনের মূল্য কি মাত্র এই কয়েক হাজার টাকা?

২০১৪ সালে আমার গন্তব্য বদলে যায়

বিশ্বের সেরা ফ্যাশনের বিদ্যাপীঠে সুযোগ পায় আমি। পারসন্স স্কুল অব ডিজাইনে অধ্যায়নের সুযোগ পাই। এটা আমার জন্য সত্যিই এক আনন্দের বিষয় ছিল। অতীতের ময়লা ধুলা ঝেড়ে আমি যেন নতুন করে জীবন শুরু করার উদ্যম ফিরে পেলাম। এরই মধ্যে আমার বাবার মৃত্যু আমাকে আবার ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আনন্দের পর আবারো বেদনা গ্রাস করল আমাকে। আমি আবার দিশা হারিয়ে ফেলি। 

সব প্রতিবন্ধকতা জয় করেছেন তিনিনামকরা স্কুলে পড়তে অনেক অর্থের প্রয়োজন। অর্থ সংকট গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেখানকার টিউশন ফি না দিলে পড়তে পারব না। এরপর ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য চাই। সেসময় এভাবে অর্থ জোগাড় করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। এভাবে আমার গন্তব্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

২০১৬ সালে স্বপ্ন পূরণ হয়

আমি পারসন্স থেকে স্নাতক সম্পন্ন করি ২০১৬ তে। শেষ বর্ষে থাকাকালীন ২০১৫ সালে বাবার নামে মহেন্দ্র সিং ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করি। অ্যাসিডদদ্ধ নারী, যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের হয়ে কাজ করতে শুরু করি। আমার দল ভারী হতে থাকে। আমরা নিজ প্রচেষ্টা অসহায় এসব নারীদের কল্যাণে কাজ শুরু করি। বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়িত করার চেষ্টা করি। রূপ নয় বরং গুণই মানুষের সেরা অর্জন।

পারসন্স থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনিবর্তমান যে অবস্থানে রয়েছেন মনিকা সিং

আপনার নিশ্চয়ই লক্ষ্মী আগরওয়ালকে চিনেন। যার জীবনের গল্পই দীপিকা পাড়ুকোন তার ছাপাক সিনেমায় তুলে ধরেছেন। এই চলচ্চিত্রটির গল্পের জন্য পরিচালকরা আমার সঙ্গেই প্রথমে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে আমি ব্যস্ততার কারণে তাদের প্রকল্পে সংযুক্ত হতে পারিনি। লক্ষ্মী এবং আমার যাত্রা অন্যরকম হতে পারে। তবে জীবনের এক দুঃসময়ের সম্মুখীণ আমরা দু’জনেই হয়েছিলাম।

জাতিসংঘে বক্তব্য রাখছেন মনিকাবর্তমানে আমি মহেন্দ্র সিং ফাউন্ডেশন নিয়েই ব্যস্ত থাকি। শত শত অসহায় নারী আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তাদের ভরসার জায়গা আমি। তাদের প্রতি আমার অনেক দায়িত্ব। তাদের অধিকার আদায়ে আমি সর্বদা অগ্রদূত। তারা যাতে সমাজের কোনো সুযোগ হাতছাড়া না করে তা নিশ্চিত করতে চাই। সবাই যেন অন্যায়ের বিচার পায় সেদিকেও কঠোর দৃষ্টিপাত রাখেন মনিকা সিং। ইচ্ছাশক্তির কারণেই আজ জীবনযুদ্ধে জয়ী এক নারী তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস