Alexa প্রার্থনা ও আত্মশুদ্ধির এক অতুলনীয় আলোচনা (পর্ব-১১)

সূরা ফাতেহা 

প্রার্থনা ও আত্মশুদ্ধির এক অতুলনীয় আলোচনা (পর্ব-১১)

মাওলানা কালিম সিদ্দিকি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৩১ ১৮ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ২১:৩৬ ১৮ আগস্ট ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আল্লাহ যখন এ দরখাস্ত লিখিয়েছেন এবং আমাদের শিখিয়েও দিয়েছেন, তখন কেমন যেনো তা মঞ্জুর করার নিমিত্তেই আমাদের শিখিয়েছেন। এ দরখাস্তের প্রতিটি শব্দ ও বাক্যই আমাদের জন্য একেকটি বিস্ময়। উপরন্তু তাতে আমাদের গোটা জীবন শুধরে নেয়ার পথ ও পদ্ধতি বাতলে দেয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন>>> সূরা ফাতেহা প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধির এক অতুলনীয় আলোচনা (পর্ব-১০)

এটা কী ছিল যে, সবার সামনে এসে বারবার ওই ব্যভিচারি নারী নিজেকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করছিলেন? এটাই হচ্ছে আখেরাতে লাঞ্ছিত হবার ভয় এবং তার প্রতি শতভাগ বিশ্বাস লালনের নমুনা। এখানে যদি আমি বেঁচে যাই, তো ওখানে আমি বাঁচতে পারবো না।

তাদের প্রতিটা আমল থেকে এটাই স্পষ্ট হত যে, তাদের শরীরটা দুনিয়ায় ঠিক, কিন্তু তারা জীবন যাপন করছেন মূলত আখেরাতে। এটাই ছিলো সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা। আর আমাদের অবস্থা হলো, আল্লাহর কাছে যে হিসেব দিতে হবে তার কোনো পাত্তাই নেই আমাদের মাঝে। হিসেব-নিকেশের কোনো চিন্তাই যদি থাকত, তাহলে সবক্ষেত্রে এই নিশ্চিন্ত ও বেপরোয়া মনোভাব কীভাবে সম্ভব? দীনি কাজে লেগে আছে ঠিক, দীনি ব্যস্ততাও নিজের করে নিয়েছে কিন্তু আখেরাতের কোনো চিন্তাই নেই তার মধ্যে। আখেরাতে প্রতাবর্তন এবং সেখানকার হিসাব-কিতাবের কোনো চিন্তাই আমাদের মধ্যে নেই। আমাদের এই লাগামহীন জীবন এবং বেপরোয়া ভাবই বলে দিচ্ছে যে, আখেরাতের এই হিসাব-কিতাবের প্রতি বিশ্বাসের কোনো ছিঁটেফোঁটাও নেই আমাদের মধ্যে।

আমাদের অনেক বন্ধু-বান্ধবদেরকে মাদরাসার জন্য কালেকশন করতে দেখি। এমন নয় যে, স্বভাবগত কারণে তাদের মধ্যে খেয়ানত বিদ্যমান। আবার এমনও নয় যে, কারো সম্পদ তারা লুটপাট বা নষ্ট করে। কিন্তু অসচেতনতার একটা প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যায়। আমাদের এক বন্ধু গত বছর কালেকশন করে সেই টাকা আরেক বন্ধুকে তার বিয়ে উপলক্ষে দিয়ে দিয়েছেন। মাদরাসায় টাকা জমা না হওয়ায় তাকে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন, তার এক সহকর্মীর বিয়েতে তা দিয়ে দিয়েছেন। কীভাবে দিলেন তাকে? এটা তো জাকাতের মাল ছিল! বললেন, তিনি পরে শোধ করে দেবেন। আর তাছাড়া বেতন হিসেবে তো তাকে দিতেই হতো।

এটা এমন হয়ে গেল যে, কোনো মেয়ের সঙ্গে কারো বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেল। অতঃপর সে বলল, বিয়ে তো হবেই। তাহলে আর বিয়ের পরে কেন, এখনই তার সঙ্গে রাত্রিযাপন করি এই মেয়ের সঙ্গে তো আমার বিয়ে হচ্ছেই। এমন চিন্তা-চেতনাকে আপনি কী বলবেন? এটা বেপরোয়া মনোভাব এবং আমলের মধ্যে অনাগ্রহিতা। আর এর মূল কারণ হচ্ছে, ‘মা-লিকি য়াওমিদ দীন’ এর ভাবনা অন্তরে না থাকা। আখেরাতের কোনো চিন্তা আমাদের মধ্যে নেই। এজন্যই আল্লাহর নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দিনে ২৫ বার মৃত্যুর কথা স্মরণ করবে, তার মৃত্যু হবে শহিদি মৃত্যুর ন্যায়। মৃত্যুর স্মরণকে এতটাই ফজিলত দেয়া হয়েছে। স্বাদ এবং মোহ পরিত্যাগকারী বস্তুর স্মরণ আমাদের বেশি বেশি করা চাই। নবী (সা.) বলেন, জেনে রাখো, আর তা হচ্ছে মৃত্যু। জেনে রাখো, আর তা হচ্ছে মৃত্যু।

হজরত ক্বারী সিদ্দিক সাহেব (রহ.) বলতেন, মৃত্যুর স্মরণ মানে এই নয় যে, বসে বসে মৃত্যু মৃত্যু বলে জিকির করতে হবে। বরং মানুষ মামলা-মোকাদ্দমার তারিখকে যেমন স্মরণ করে, তেমনি স্মরণ রাখতে হবে। মামলার তারিখকে কী কেউ এভাবে স্মরণ করে যে, ২৬ সেপ্টেম্বর ২৬ সেপ্টেম্বর? বরং তা এভাবে স্মরণ করে যে, ‘উকিল নিয়োগ করবো কাকে? সাক্ষী পেশ করবো কাকে? জরিমানা আরোপ করলে কী অবস্থা হবে? কী জানি কী শাস্তি হয়! সবার সামনে কী সেদিন খারাপ সাব্যস্ত হয়ে যাই কিনা কে জানে? সেদিন তো রায় হবে, চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে কীভাবে কী জবাব দেবো?’ এসব ভাবনা প্রতিনিয়ত তার মাথায় কাজ করতে থাকে। মৃত্যুকেও এভাবেই স্মরণ করা চাই যে, ‘হাশরের ময়দানে তো দাঁড়াতে হবে। মাফ পাবো নাকি গ্রেফতার হয়ে যাব জানি না। জেল হবে, শাস্তি হবে নাকি পুরস্কার পাব কিছুই জানি না।’ এভাবে ভাবতে হবে। এভাবে যদি কেউ চিন্তা করে তাহলে তার মধ্যে বেপরোয়া ভাব আসবে না। বরং হজরত শাইখুল হিন্দ (রহ.) এর ওস্তাদ ও হজরত নানুতুবী (রহ.) এর সমপর্যায়ের মাওলানা মাহমুদ ফুলাতি সাহেবের ছেলের যে ঘটনা তেমনটিও হতে পারে।

শাইখুল হিন্দ (রহ.) যখন তার ওস্তাদ হজরত মাহমুদ ফুলাতি সাহেবের সঙ্গে দেখা করার জন্য খোতুলি থেকে ফুলাতে আসতেন, তখন তিনি পায়ে হেঁটে আসতেন। তাঁর ছোট দুইটা ছেলে ছিল। একবার একজন ঝুপড়ির একটা গুল্ম ছিঁড়ে ফেললে অপর ভাই কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠিয়ে ফেলল ‘তুমি যে এই গুল্ম ছিঁড়ে ফেললে, আল্লাহর কাছে তুমি এর হিসেব দেবে কীভাবে? আল্লাহ তো পাকড়াও করবেন তোমাকে এর জন্য। কী জবাব দেবে তুমি তাঁর কাছে?’ অথচ আমাদের এজাতীয় কোনো চিন্তাই নেই। ওজুর সময় একবার অতিরিক্ত পানি অপচয় করতে দেখে মাওলানা আবরারুল হক সাহেব (রহ.) কত সতর্ক করে দিয়েছিলেন লোকদেরকে! তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা এত নিশ্চিন্ত মনে কীভাবে পানি ঢালতে থাকো? অথচ কোরআন পরিষ্কার বলছে, ‘অতঃপর সেদিন অবশ্যই তোমাদেরকে নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সূরা: আত-তাকাসুর, আয়াত ৮)।

হাশরের দিন কমপক্ষে চারটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগ পর্যন্ত কারো এক কদম এদিক সেদিক যাওয়ারও অনুমতি থাকবে না। তন্মধ্যে একটা প্রশ্নের আবার দুইটা অংশ। এই মোট পাঁচটা প্রশ্নের প্রশ্নপত্র হবে, যা আগেই ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। পরীক্ষা হবে তিন ভাগে। প্রথম পরীক্ষাটা হচ্ছে ‘ভাইভা’ যা কবরে হবে। এই ভাইভা পরীক্ষার প্রশ্ন তিনটাও আমাদেরকে অগ্রীম জানিয়ে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পরীক্ষাটি হবে হাশরের ময়দানে; এটি হচ্ছে মূল পরীক্ষা। আর তৃতীয় পরীক্ষাটি হচ্ছে প্র্যাকটিক্যাল; পুলসিরাতের ওপর। এই তিন পরীক্ষার কথাই আমাদের আগেভাগে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হয়েছে। হাশরের ময়দানে যে চারটি প্রশ্ন করা হবে, তার প্রথমটি হচ্ছে, জীবন কোন পথে ব্যয় করেছো? জীবন নামক এই ঘড়ির হিসেব দিতে হবে কাঁটায় কাঁটায়। জীবনের এই ঘড়ির হিসেব দেয়ার ভয় যার মধ্যে থাকবে, সে কী সময় নষ্ট করবে? আল্লাহর দরবারে হিসেব দেয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস যার থাকবে, সে কী সারাক্ষণ খেলাধুলায় মত্ত থাকবে? বসে বসে লুডু খেলা আর অর্থহীন কাজে সময় নষ্ট করবে?

আমাদের অবস্থা হচ্ছে, আমরা প্রচুর সময় নষ্ট করি। নিজেদের সময়ও নষ্ট করি, অপরের সময়ও নষ্ট করি। অথচ সময়ের ব্যাপারে আমাদেরকে এত বেশি সতর্ক করা হয়েছে যে, প্রত্যেক ওয়াক্ত নামাজের সময় নির্দিষ্ট। রোজার ক্ষেত্রে এক মিনিট পর যেমন সেহরি খাওয়ার সুযোগ নেই, তেমনি এক মিনিট আগেও ইফতারের অবকাশ নেই। হজের সময়টাও পূর্ব নির্ধারিত। জাকাতও বছর পেরুলেই কেবল ফরজ হয়। সবখানেই সময়ের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ গুরুত্ব দিয়ে আমাদেরকে শেখানো হয়েছে। অথচ আমাদের জীবনে সময়ের কোনো মূল্যই নেই। কোনো কাজ সময়মতো করলেও সেটা করা হয় সময়ানুবর্তে। অথচ সময়ানুবর্তী হবার সর্বাধিক তাগিদ ইসলামই আমাদেরকে দিয়েছে। দুই-তিনদিন আগেই আমি বলছিলাম যে, গত বছর রবিউল আউয়াল এবং তার আগে-পরে আমার বিভিন্ন সিরাতের অনুষ্ঠানে যাওয়া হয়েছে। এ বছরও প্রায় ২০০ অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ মিলেছে, আলহামদুলিল্লাহ! সিরাতের অনুষ্ঠানগুলো রবিউল আউয়াল কেন্দ্রিক নির্ধারিত হওয়ায় অংশগ্রহণ তেমন করা হত না। আমি তখন চিন্তা করলাম, হজরত নবী (আ.) এর আলোচনা যেহেতু; অল্প কিছু বলার দ্বারাও অন্তত কিছু অন্যায় রোধ হবে। সেই চিন্তা থেকেই এবার সিরাতের অনুষ্ঠানগুলোতে যাতায়াত আরম্ভ এবং প্রায় ২০০ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ!

এটা তো স্পষ্ট যে, সিরাতের এ অনুষ্ঠানগুলোর আয়োজক সব মুসলমান এবং দীনদার লোকেরাই। অথচ তবু কোথাও কোনো অনুষ্ঠানই নির্ধারিত সময়ের অন্তত একঘণ্টার মধ্যেও তা শুরু করা যায়নি। পূর্ণ একঘণ্টা পরই শুরু হয়েছে। আমার বরাবরই খেয়াল ছিল যে, একদম ঠিক সময়মতোই আমি উপস্থিত হয়ে যাব। আমার সঙ্গে আরো দু-চার জন সফরসঙ্গী থাকে গাড়িতে। তো সে হিসেবে ২০০ অনুষ্ঠান অনুপাতে আমাদের এ পাঁচজনের প্রায় এক হাজার ঘণ্টা নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি লোকদের যে সময় নষ্ট হয়েছে, তা তো হিসেবের বাইরে। অথচ তবু কোনো আয়োজকের মাথায় এই চিন্তা আসেনি যে, আমাদের এটা অপরাধ হচ্ছে। কী অবলীলায়ই না আমরা এমন মহামূল্যবান সম্পদ নষ্ট করে ফেলছি!  চলবে...

সংকলন: নুসরাত জাহান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে