Alexa প্রার্থনা ও আত্মশুদ্ধির এক অতুলনীয় আলোচনা (পর্ব-১০)

সূরা ফাতেহা 

প্রার্থনা ও আত্মশুদ্ধির এক অতুলনীয় আলোচনা (পর্ব-১০)

মাওলানা কালিম সিদ্দিকি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৫৭ ১৪ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ২১:৩৪ ১৮ আগস্ট ২০১৯

সূরা ফাতেহা (ফাইল ফটো)

সূরা ফাতেহা (ফাইল ফটো)

আল্লাহ যখন এ দরখাস্ত লিখিয়েছেন এবং আমাদের শিখিয়েও দিয়েছেন, তখন কেমন যেনো তা মঞ্জুর করার নিমিত্তেই আমাদের শিখিয়েছেন। এ দরখাস্তের প্রতিটি শব্দ ও বাক্যই আমাদের জন্য একেকটি বিস্ময়। উপরন্তু তাতে আমাদের গোটা জীবন শুধরে নেয়ার পথ ও পদ্ধতি বাতলে দেয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন>>> সূরা ফাতেহা প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধির এক অতুলনীয় আলোচনা (পর্ব-৮)

পূর্বে প্রকাশের পর থেকে...

সাহাবায়ে কেরামের আমল: সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এবং আমাদের মধ্যে পার্থক্য কী? আমরা আখেরাত বা পরকালকে নিছক কাল্পনিক একটি বিষয় মনে করি। আমাদের ধারণা এটি হয়তো একটি বিভ্রম বা অদেখা কোনো স্বপ্ন। পক্ষান্তরে সাহাবায়ে কেরাম কী ভাবতেন? তারা জান্নাত ও জাহান্নামকে এত বেশি বাস্তব ও নিশ্চিত ভাবতেন যে, হাদিসে আছে তারা বলেন, যদি আমরা জান্নাত-জাহান্নামকে স্বচক্ষে দেখতে না ও পাই, তবু এতে আমাদের বিশ্বাসে কোনো হেরফের হবে না। তাদের প্রতিটা আমলই এটার প্রমাণ বহন করে যে, তারা আখেরাতের আশায় বেঁচে আছেন। দুনিয়ার বিচ্ছিরি রকমের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং লাঞ্ছনা-গঞ্জনা তারা সহ্য করে যাচ্ছেন, কেবলমাত্র আখেরাতের অপমান-অপদস্থতা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। এক্ষেত্রে তাদের অবস্থা কেমন ছিলো তা একটা ঘটনা থেকে বোঝা যায়।

আরো পড়ুন>>> অন্তরদৃষ্টি দিয়ে কোরআন মুখস্ত করেন সাজ্জাতুল

একটি ঘটনা: বেশ প্রসিদ্ধ ঘটনা এটি। বারবার শোনাতে ইচ্ছে করে। জনৈকা নারী সাহাবি কর্তৃক একবার যে কোনো ভাবেই হোক ব্যভিচার হয়ে গেল। মানুষ যেহেতু, ভুল হতেই পারে। কিন্তু এ ঘটনার পর তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। ‘পরকালে তো আমাকে যেতে হবে। মৃত্যুর পর কী অবস্থা হবে আমার? তখন যদি এ গুনাহের মাফ না পাই, তাহলে তো সেখানে অপদস্থ হতে হবে আমাকে। বড় অসম্মান ও অসম্ভ্রম হবে। কঠোর শাস্তি হবে। কাজেই মৃত্যুর আগেই আমাকে এর সমাধান করতে হবে।’ যেই ভাবা সেই কাজ। রাসূলে আকরাম (সা.) এর দরবারে তিনি হাজির হয়ে গেলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি ব্যভিচার করে ফেলেছি। আমাকে আপনি পবিত্র করে দিন। হজরত নবী (আ.) তখন কী করেছিলেন? কী শিক্ষা রেখেছেন তিনি আমাদের জন্য?

নবী (আ.) করলেন কী সেই মহিলা যেদিক থেকে এসে কথা বলছিলেন, তিনি তার চেহারাকে সেদিক থেকে ঘুরিয়ে অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন। মহিলা ঘুরে ওই দিকে গেলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি ব্যাভিচার করে ফেলেছি। নবী (আ.) আবারো ওদিক থেকে মাথা ঘুরিয়ে অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন। অথচ আমাদের অবস্থা কী? আমরা বরং অন্যের দোষ তালাশে ব্যস্ত থাকি। কারো সামান্য থেকে সামান্য দোষ-ত্রুটি অন্বেষণকেও আমরা আমাদের দায়িত্ব বানিয়ে নিই। পক্ষান্তরে নবী (আ.) আমাদেরকে কী শিখিয়েছেন? অন্যের দোষ থেকে অমনোযোগিতা ও ভ্রুক্ষেপহীনতার শিক্ষা দিয়েছেন। এটাই তাঁর আদর্শ। তিনি তাঁর দোষ শ্রবণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু সেই মহিলা সাহাবি আবারো সামনে চলে এলেন। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে তখন নবী (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, এই মহিলা পাগল হয়ে যায়নি তো? সে কি সুস্থ আছে? উত্তরে সাহাবায়ে কেরাম বললেন যে, না ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে পাগল হয়নি; বরং সে সুস্থই আছে।

সাহাবাদের উত্তর শুনে নবী (আ.) এবার তার দিকে ফিরলেন এবং বললেন যে, আচ্ছা তুমি যে ব্যভিচার করেছ তার কি কোনো প্রমাণ আছে? অথচ মহিলা কিন্তু নিজেই বারংবার স্বীকার করছিলেন। আর আমাদের অবস্থা হলো, কেউ একটু ইঙ্গিত দিলেও আমরা তা নিশ্চিত ভেবে বসে থাকি। কারো নিকট কিছু শুনতে পেলেই তা কোনো প্রকার যাচাই বাছাইহীন ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় রত হয়ে পড়ি। যেন তা প্রচার করা আমাদের গুরুদায়িত্ব ‘অমুকের ছেলে এই করেছে, তমুকের মেয়ে ওই করেছে।’ অথচ আল্লাহর নবী (সা.) খোদ যে নিজেই তার অপকর্মের স্বীকারোক্তি দিচ্ছে, তাকেই আবার জিজ্ঞেস করছেন তুমি যে অপরাধ করেছো তার কী প্রমাণ আছে তোমার কাছে? মহিলা উত্তর দিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি গর্ভবতী। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, একজনের শাস্তি দু‘জনকে দেয়ার তো সুযোগ নেই। তোমার গর্ভস্থ বাচ্চাটিরও জীবন আছে। তোমাকে যদি এখন শাস্তি দিই তাহলে সে মরে যাবে। অথচ সে তো নির্দোষ। কাজেই বাচ্চা ভূমিষ্ট হলে তারপর এসো।

এই মহিলা সাহাবি নিজের পাপের দরুণ কতটা অনুতপ্ত ও বিপর্যস্ত ছিলেন! প্রতিটা মুহূর্ত কত অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কাটছিল তার! সারাক্ষণ তিনি আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতেন আর মিনতি করতেন হে আল্লাহ! আমাকে আখেরাতের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা থেকে হেফাজত করেন। মৃত্যুর আগেই আমাকে পবিত্র করে দেন এবং কবরে যাওয়ার পূর্বেই দুনিয়াতেই যে করে হোক আমার শাস্তির ব্যবস্থা করে দেন। নিজেই নিজেকে শাস্তির জন্য সমর্পন করে দিচ্ছেন। এটা কী ছিল? কতটা আবেগ ছিল তাদের!

আখেরাতের প্রতি শতভাগ বিশ্বাস: আখেরাতের প্রতি আমাদের শতভাগ বিশ্বাস লালন জরুরি। সেখানে প্রত্যেকের প্রতিটি আমলেরই হিসেব হবে। দুনিয়ায় যদি কেউ মাফ পেয়ে যায় কিংবা কোনো সাজা ভোগের মাধ্যমে পরকালীন শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়ে যায় তো সে বেঁচে গেল। এখান থেকেই যদি কেউ পাক হয়ে যেতে পারে এবং তার পাপ মুছে যায় তো মুছেই গেল। অন্যথায় আখেরাতে বড় লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে।  কোরআনের ভাষায়, ‘সেদিন কতক মুখ হবে উজ্জ্বল আর কতক মুখ হবে কালো।’ (সূরা আলে-ইমরান: ১০৬)। গোটা দুনিয়ার সমস্ত লোক উপস্থিত থাকবে সেখানে। মানুষ যাকে ভালোবাসতো এবং চেষ্টা করতো নিজের সব ভালো খবরাখবর তাকে জানাতে সেও থাকবে। আর যার থেকে মানুষ সব মন্দ খবর আড়াল করার চেষ্টা করতো সেও থাকবে সেখানে। এই সমস্ত অপকর্ম তাদের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়লে আমাদের চূড়ান্ত পর্যায়ের অপদস্থ হতে হবে সেদিন।

সেদিনের সেই অসম্মান ও অপমান থেকে মুক্তির জন্য ওই মহিলা সাহাবি কাঁদতে কাঁদতে বড় অস্থির সময় পার করছিলেন। বাচ্চা ভূমিষ্ট হবার পর তিনি আবার আল্লহর রাসূল (সা.) এর দরবারে এলেন। বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সন্তান তো ভূমিষ্ট হয়ে গেছে। এবার আমাকে পবিত্র করে দিন। আমার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করুন। মহিলা যেহেতু বিবাহিতা, তো শাস্তি আর কী হবে প্রস্তরাঘাত করা হবে তাকে। অর্থাৎ পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হবে। আল্লাহর নবী (সা.) তখন আবার বললেন, একজনের শাস্তি তো দু‘জনকে দেয়ার সুযোগ নেই। তোমার এ সন্তান এখন স্তন্যপায়ী। বুকের দুধ পানের মাধ্যমে তার জীবন নির্বাহ হয়। তোমাকে শাস্তি দিলে তাকে এরপর কে দুধ খাওয়াবে? যখন তাকে দুধ ছাড়াবে তখন এসো।

মহিলা চলে এলেন এবং ফের তার অপেক্ষার পালা শুরু হলো। তিনি খুব দ্রুততার সঙ্গে চাইলেন যেন বাচ্চাকে দুধ ছেড়ে রুটিতে অভ্যস্ত করানো যায়। বেশ অল্প বয়সেই তিনি বাচ্চাকে রুটি খাওয়ানো আরম্ভ করে দিলেন এবং যথারীতি আবারো রাসূলের (সা.) দরবারে এসে হাজির হলেন। সঙ্গে বাচ্চাকে নিয়ে এলেন এবং তার হাতে একটি রুটির টুকরোও ছিল। বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে এখন রুটি খেতে আরম্ভ করেছে। আপনি দেখেন, সে নিজে নিজেই আপনার সামনে রুটি খাচ্ছে। এখন তো আমাকে পবিত্র করে দিন। এবার স্পষ্ট হলো যে, শাস্তি প্রয়োগের বিষয়টা নবী (আ.) এর জিম্মাদারিতে ছিল। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে হুকুম দিলেন যে, তাকে প্রস্তরাঘাত করো এবং হলোও তাই। লোকেরা তাকে পাথর নিক্ষেপ করলো এবং তিনি শহিদ হয়ে গেলেন। 

এক সাহাবি পাথর নিক্ষেপের ফলে হঠাৎ কিছু রক্ত অপর এক সাহাবির গায়ে ছিটকে পড়ে। তিনি কিছুটা তাচ্ছিল্য প্রকাশ করলেন যে, একজন নিকৃষ্ট ব্যভিচারীনীর রক্ত এটা দ্রুত ধুয়ে ফেললেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) এর কানে গেল যে, প্রস্তরাঘাতের সময় এক সাহাবির শরীরে কিছু রক্ত ছিটকে গেলে এটা একজন ব্যভিচারীনীর নাপাক রক্ত হিসেবে তিনি বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তা দ্রুত ধুয়ে ফেলেছেন। রাসূল (সা.) বললেন, ওই সত্তার শপথ! যিনি আমাকে হেদায়েত দিয়ে প্রেরণ করেছেন, এই মহিলা এমন পবিত্রতর তওবা করেছে যে, যদি তা গোটা মদীনাবাসীর মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয়, তাহলে প্রত্যেকের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।  চলবে...

সংকলন: নুসরাত জাহান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics
Best Electronics