প্রাচীন রাজধানীতে একদিন

ঈদ ভ্রমণ (বগুড়া পর্ব)

প্রাচীন রাজধানীতে একদিন

সজল জাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৯:৫৮ ১৮ মে ২০১৯   আপডেট: ১১:২৯ ১৮ মে ২০১৯

মহাস্থানগড়

মহাস্থানগড়

ছোটবেলা থেকে অনেকের মুখে শুনে এবং ইতিহাস থেকে প্রচীন বাংলার রাজধানী সম্পর্কে জেনে এই ইতিহাস মিশ্রিত স্থানে পা রাখার অদম্য ইচ্ছে দিনের পর দিন মনে দানা বাঁধছিল। কবে আসবে সেই মহেন্দ্রক্ষণ! সাক্ষাৎ হবে ধর্ম প্রচারক আর রাজা বাদশার সঙ্গে! বলছি, পর্যটক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় মহাস্থানগড়ের কথা।

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত বগুড়া জেলা সদর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই স্থানটির ঘটনাবহুল ইতিহাস, ধর্মীয় অনুভূতি, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব—সব মিলিয়ে সবার কাছে এটির মানসিক ধারণাও অনেক উঁচুতে। অসংখ্য প্রাচীন রাজা ও ধর্ম প্রচারকদের বসবাসের কারণে এই উচ্চ ভূমিটি ‘মহাস্থান’ বা গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মহাস্থানে রয়েছে মাজার শরীফ, গোবিন্দ ভিটা, ভাসু বিহার, শিলাদেবীর ঘাট, বেহুলার বাসরঘর, জাদুঘরসহ দেখার মতো বেশকিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা। এছাড়া পত্রিকার পাতায় আদিরূপে, অথচ নতুন সাজে সাজার খবর পড়ে আমার আকর্ষণ বেড়ে যায় আরো বহুগুণ। অবশেষে সৌভাগ্য হলো নতুন চেহারায় হাজির হওয়া ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ে পা রেখে নিজেকে আরেকটি স্বপ্ন পূরণ করার।

অনন্য সৌন্দর্যের দুর্গপ্রাচীর

বগুড়া শহর থেকে সিএসজি, রিকশা বা অটোরিকশায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিটেই যাওয়া যায় মহাস্থানগড়। যারা বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক ধরে উত্তরে যান তারা বাসের জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়বে অস্বাভাবিক উচ্চ ভূমি। আরেকটু তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালে গাছপালার সবুজ পেরিয়ে চোখে পড়বে দুর্গনগরীর প্রাচীর। দীর্ঘাকৃতির এই প্রাচীরই বলে দেয় সমৃদ্ধ সেই নগরবাসীরা নিরাপত্তাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন। লাখ লাখ পোড়ামাটির ইট আর সুড়কি দিয়ে ১ বর্গমাইল এলাকাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। নিজের চোখে না দেখলে এ বর্ণনা বিশ্বাস করা কঠিন। দেয়ালের মতো যে বিশাল কাঠামো মহাস্থানগড়কে ঘিরে রেখেছে তার দৈর্ঘ্য ৫,০০০ ফুট, আর প্রস্থ ৪,৫০০ ফুট। সমতল ভূমি থেকে এ দেয়ালের উচ্চতা ১৫ থেকে ৪৫ ফুট।

মহাস্থাগড়

জানা যায়, এরইমধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে এখানে কয়েক দফা খনন ও সংস্কার কাজ করা হয়েছে। পর্যটকরা দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে পারেন এই প্রাচীরের ওপর দিয়ে হেঁটে। ভ্রমণপিপাসুরা এখানে নির্বিবাদে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। প্রাচীরঘেরা এ অংশের ভেতরে অনেক চিহ্নিত স্থাপনা রয়েছে। বিভিন্ন রাজার সময়ে নির্মিত এসব পুরোনো ভবনের ধ্বংসাবশেষের বেশিরভাগই রয়েছে মাটির নিচে। বিভিন্ন সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এসব খুঁড়ে তাদের পর্যবেক্ষণ সমাপ্ত করে আবার সংরক্ষণের তাগিদেই মাটি দিয়ে ঢেকে রেখেছেন।

নজরকাড়া মাহী সওয়ারের মাজার

বগুড়া শহর থেকে মহাস্থানগড় পৌঁছালেই প্রথমে আপনার সামনে পড়বে বর্তমান মহাস্থানগড়ের অন্যতম আকর্ষণ হযরত শাহ সুলতান বলখী (রঃ) মাহী সওয়ারের মাজারটি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মাজারটি জিয়ারত ও পরিদর্শন করতে আসেন। শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই নয়, অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও এখানে আসেন প্রার্থনা করতে। মহাস্থানগড় দুর্গপ্রাচীরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে এই মাজারটি অবস্থিত। সমতল ভূমি থেকে টিলার ওপর ওঠার জন্য রয়েছে অসংখ্য ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি। মাজার চত্ত্বরে রয়েছে একটি প্রাচীন কুয়া ও অনেকগুলো বেদি। এছাড়া অতিথিদের জন্য রান্নার জায়গা ও বিশ্রামের ছাউনিও রয়েছে। এছাড়া এখানে শুধু শাহ সুলতানের মাজারই নয়, রয়েছে তার অনুসারিদের বেশকিছু সমাধি।

কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানকার একটি মাত্র যে প্রাচীন মসজিদ পাওয়া গেছে তা সুলতান ফারুক শাহের রাজত্বকালে, ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা। ব্রিটিশ শাসনামলে এই মাজারটি থেকেই ফকির বিদ্রোহের কর্মসূচি পরিচালিত হতো। প্রতিবছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার মাজারটি ঘিরে বিশাল এক মেলার আয়োজন হয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের প্রবেশদ্বার

প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর

মহাস্থানগড় দুর্গপ্রাচীরের উত্তর পাশে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের স্থাপনকৃত জাদুঘর। জাদুঘরে মহাস্থানগড় ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা অসংখ্য প্রত্নতত্ত্বের নমুনা রয়েছে। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও অন্যান্য রাজবংশের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন এখানে যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত আছে। রয়েছে কালো পাথরে খোদাইকৃত দেব-দেবীর মূর্তি, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি, নকশা করা ইট-পাথরের টুকরো ও মূল্যবান পাথরের অলঙ্কার। আরো রয়েছে বিভিন্ন ধাতুর তৈরি অস্ত্র ও পাত্র, মুদ্রা ও স্মারক। যা আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিয়ে যাবে সেই রাজ-রাজাদের আমলে। মহাস্থানগড়ের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্রের দেখাও এখানেই মিলবে। এছাড়া জাদুঘরের প্রদর্শন কক্ষের বাইরে রয়েছে সুদৃশ্য বাগান। বাইরের চত্ত্বরেও রাখা হয়েছে বেশকিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা। চাইলেই এই বাগানের সবুজ ঘাসে নিজেকে এলিয়ে নিতে পারবেন প্রকৃতির স্বাদ।

জাদুঘরের সীমানার ঠিক পূর্ব পাশে রয়েছে গোবিন্দ ভিটা নামে পরিচিত একটি প্রাচীন স্থাপনা। ধারণা করা হয়, এখানে একটি বিষ্ণু মন্দির ও প্রমোদ ভবন ছিল। গোবিন্দ ভিটার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে করতোয়া নদী। শোনা যায়, এই করতোয়া নদী এক সময় সুদূর ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কালের বিবর্তনে এখন শুধু থেকে গেছে শীর্ণ একটি জলধারা। গোবিন্দ ভিটার দক্ষিণে রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের নিজস্ব রেস্টহাউজ। পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে এখানে থাকাও যাবে। মহাস্থানগড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তি। সবকিছু দেখতে চাইলে হাতে সময় নিয়ে আসতে হবে। যেহেতু এখানে বৌদ্ধ, হিন্দুসহ আরো ধর্মের রাজত্বকাল অতিবাহিত হয়েছে, তাই সব ধর্ম ও সমাজের আদি সংস্কৃতির নমুনাই এখানে একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

এখানে আরো রয়েছে মৌর্য শাসনামলের নান্দাইল দীঘি, গুপ্ত আমলের ওঝা ধনন্তরীর বাড়ি, চাঁদ সওদাগরের বাড়ি, বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর, নরপতির ধাপসহ অসংখ্য প্রত্নস্থল।

এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে সবসময়

বেহুলার বাসরঘর

মহাস্থানগড় আসবো আর বেহুলার বাসরঘরের সাথে পরিচিত হবো না এটা আবার হয় নাকি! তাই অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম কিছু দেখি আর না দেখি বাসরঘর দেখতেই হবে। মহাস্থানগড় বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে গিয়েই দেখা মিললো এই বাসরঘরের। এটি মূলত একটি বৌদ্ধ স্তম্ভ, যা সম্রাট অশোক নির্মাণ করেছিলেন বলে জনশ্রুত আছে। স্তম্ভটির উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। স্তম্ভের পূর্বার্ধে রয়েছে ২৪ কোণ বিশিষ্ট চৌবাচ্চা সদৃশ্য একটি গোসলখানা । আর এটিই বেহুলার বাসরঘর নামে সমধিক পরিচিত।

ভাসু বিহার

মহাস্থানগড় থেকে ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে বিহার ইউনিয়নের ভাসু বিহার নামক গ্রামে গেলেই দেখা মিলবে আরেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ভাসু বিহার। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা একে নরপতির ধাপ হিসেবে চেনে। ধারণা করা হয়, এটি একটি সংঘারামের ধ্বংসাবশেষ। খননকার্যের ফলে সেখানে ব্রোঞ্জের বৌদ্ধমূর্তি, পোড়ামাটির ফলকসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। মহাস্থান থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমের এই গ্রামটিতে বিপুলসংখ্যক বৌদ্ধযুগীয় ইমারতের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে। গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নাগর নদের তীরে ৭০০ থেকে ৬০০ ফুট আয়তন বিশিষ্ট প্রাচীন ইমারতের ধ্বংসাবশেষকেই ১৮৭৯ সালে স্যার আলেকাজান্ডার কানিংহাম, হিউয়েন সাং বর্ণিত এবং ইতিহাসখ্যাত ভাসু বিহার বলে শনাক্ত করেছিলেন। দশম শতাব্দিতে নির্মিত বৌদ্ধ বিহার দুটোর মধ্যে একটি বড় অন্যটি ছোট। 

দুর্গের মতো করে বানানো বড় বিহারটি ১৮৪ ফুট বা সাড়ে ১৬১ ফুট আয়তনের পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা দক্ষিণমুখী বিহারের সাড়ে ৮ ফুট পুরু প্রাচীরকে পেছনের দেয়াল হিসেবে ব্যবহার করে ৩১টি কক্ষ নির্মিত হয়েছিল। ১১ বা ১০ ফুট আয়তনের ঘরগুলোর সামনের দেয়াল ছিল সাড়ে ৬ ফুট পুরু। অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের পশ্চিম বিহারটি বড় বিহারের ৭৫ ফুট দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। কাদার গাঁথুনি দিয়ে ইটের সাহায্যে নির্মিত উত্তরে ১৬২ ফুট লম্বা ও দক্ষিণে ১৫২ ফুট চওড়া প্রায় বর্গাকারে নির্মিত এই বিহারের কক্ষ সংখ্যা ছিল ২৬টি। পূর্বদিকে ৫টি এবং বাকি তিন দিকে ৭টি করে কক্ষ ছিল। পূর্বমুখী এই বিহারে একটি প্রবেশ হল ছিল। স্তম্ভযুক্ত এই হলের আয়তন ছিল ২৪ বা ১৯ ফুট। সাড়ে ৮ ফুট পুরু বিহার প্রাচীরকে পেছনের দেয়াল হিসেবে ব্যবহার করে নির্মিত এসব কক্ষের সামনের দেয়াল ছিল সাড়ে ৬ ফুট পুরু। সাড়ে ৩ ফুট পুরু দেয়ালঘেরা সাড়ে ৮ ফুট চওড়া বারান্দার সঙ্গে কক্ষগুলো যুক্ত ছিল। বিহারের কেন্দ্রে ছিল ৮২ বা ৮০ ফুট আয়তনের প্রায় বর্গাকার প্রাঙ্গণ। পশ্চিম দিকের বারান্দা থেকে সামান্য প্রসারিত একটি অংশ থেকে ৫টি ধাপবিশিষ্ট একটি সিঁড়ি নেমে গেছে কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণে। এই বিহারে বাঁকানো ইটের কার্নিশযুক্ত দেয়াল দেখলে এর নির্মাতাদের উন্নত শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। 

নির্দেশনা

ঢাকা থেকে খুব সহজেই সড়ক পথে বগুড়া যাওয়া যায়। সময় লাগে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা এবং ভাড়া পড়বে ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনেও বগুড়া আসা যায়। বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে এবং দত্তবাড়ি থেকে টেম্পু অথবা সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে আধা ঘণ্টার মধ্যেই পা রাখা যাবে মহাস্থানগড়ে। আর থাকার জন্য বেছে নিতে পারেন বগুড়া শহরের হোটেলগুলো। সব ধরনের ও মানের থাকা-খাওয়ার জায়গা পাবেন শহরে। ৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকায় রাত যাপনের উন্নত ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখানে রয়েছে হোটেল নাজ গার্ডেন, হোটেল সেফওয়ে, সেঞ্চুরি মোটেল, সিয়াস্তা কিংবা পর্যটন মোটেলসহ বেশকিছু উন্নতমানে হোটেল। তবে বগুড়া এলে এখানকার প্রসিদ্ধ দই, ক্ষিরসা ও মহাস্থানগড়ের ‘কটকটি’ নিতে ভুলবেন না!

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে