এক ওষুধেই সমাধান ঘটত সর্বরোগের!

এক ওষুধেই সমাধান ঘটত সর্বরোগের!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৫৮ ৯ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৮:৫৭ ৯ এপ্রিল ২০২০

ছবি: থেরিয়াক ছিল সর্বরোগের ওষুধ

ছবি: থেরিয়াক ছিল সর্বরোগের ওষুধ

স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল হলেও রোগ ব্যাধিকে উপেক্ষা করা চলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এজন্য প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন রোগব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে আসছে। তবে প্রাচীনকালে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই সামান্য অসুখেও মৃত্যুবরণ করত।

এরপর একেক সময় চিকিৎসা বিজ্ঞান সাফল্যের মুখ দেখেছে। একের পর এক মানুষের জীবন বাঁচাতে উদ্ভাবিত হয়েছে নতুন নতুন ওষুধ। এই দীর্ঘ সময় অতিক্রমের পথে অসংখ্য যুগান্তকারী ঘটনা বিদ্যমান, তেমনই কয়েকটি বিষয়ের বর্ণনা নিম্নে দেয়া হলো-

১। প্রথম নারী চিকিৎসক

বর্তমান মিশরের কায়রো থেকে ২০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত সাক্কারা পৃথিবীর মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। প্রায় ৫ হাজার বছর পূর্বে প্রাচীন মিশরের মেমফিস নগরের গোরস্থান ছিল সাক্কারা। এখানেই পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা জোসারের পিরামিড অবস্থিত। এর পাশেই মেরিট পাথের ছবি যুক্ত একটি সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছে যিনি ছিলেন প্রথম নারী চিকিৎসক। সমাধিতে হাইরোগ্লেফিক্সে লেখা মেরিট পাথের পরিচয় বর্ণিত হয়েছে ‘প্রধান চিকিৎসক’ হিসেবে।  


২। ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে শুরু হয় চোখের ছানি অপারেশন

প্রাচীন ভারতীয় মহর্ষি ছিলেন সুশ্রত। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তার ছিল অনেক জ্ঞান। আনুমানিক ৬০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে সংস্কৃত ভাষায় ‘সুশ্রত সংহিতা’ তার লেখা চিকিৎসা শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ। ‘সুশ্রুত সংহিতা’ দুটি মূল অংশে বিভক্ত যেখানে প্রায় এক হাজার ১২০টি অসুস্থতার ধরণ বর্ণিত  হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে শারীরিক আঘাতজনিত সৃষ্ট বৈকল্য, বার্ধক্য জনিত অসুস্থতা, প্রসূতিদের বিভিন্ন রোগ, মানসিক রোগের বিভিন্ন দিক এবং তার প্রতিকার। এই গ্রন্থে শল্য চিকিৎসা বা সার্জারি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে চোখের ছানি সার্জারি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

৩। স্কার্ভি রোগ থেকে মুক্তি দেয় একটি গাছ

জ্যাক কার্টিয়ার ১৫৩৬ সালে জাহাজ নিয়ে কানাডার কুইবেক সিটির কাছাকাছি সমুদ্র এলাকা স্ট্যাডাকোনার বরফে আটকা পড়ে। কোনো উপায় না পেয়ে সঙ্গীদের নিয়ে তিনি অস্থায়ীভাবে সেখানেই নোঙর ফেলেন। প্রতিকূল এই অবস্থার মধ্যে তাদের মুখে স্কার্ভির প্রকোপ দেখা দেয়। ফলে মুখ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে, দাঁতের মাড়ি পঁচা শুরু হয় এবং দাঁতের গোড়া আলগা হতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের করণীয় কী তাও তারা জানত না। কার্টিয়া ১৫৩৪ সালে প্রথম যাত্রার সময় স্ট্যাডাকোনা থেকে দম অ্যাগায়া এবং তাইগোঁয়াগিঁ নামে দুই তরুণকে অপহরণ করেছিলেন। 

এই দুই যুবক কার্টিয়ার দলকে রোগ মুক্তির উপায় বলেন। তারা অ্যানেডা নামক একটি গাছের কথা বলেন যা থেকে ওষুধ তৈরি করা যায়। প্রথমে ফরাসি নাবিকরা তাদের কথায় সন্দিহান হলেও উপায় না দেখে গাছটির ব্যবহার করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তারা স্কার্ভি থেকে মুক্তি পায়। কার্টিয়ার সঙ্গীরা স্কার্ভি থেকে অ্যানেডা গাছের মাধ্যমে মুক্তি পেলেও সে সময় ওষুধটি পরিচিতি পায়নি। আর এ কারণেই প্রাণঘাতী স্কার্ভির চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে আরো ২০০ বছর সময় লেগে যায়।

৪। থেরিয়াক ব্যবহার করে সর্বরোগ থেকে মুক্তির চেষ্টা

প্রাচীনকালে রাজা হওয়া মানেই মৃত্যুর দূতকে সঙ্গে নিয়ে চলার মত ভয়াবহ ব্যাপার ছিল। রাজারা সবসময় আততায়ীর হাতে মৃত্যুর ভয়ে থাকত। অনেক সময় বিষ প্রয়োগে ষড়যন্ত্রকারীরা রাজাদের হত্যার চেষ্টা করত। এজন্য তুরস্কের পন্টাস অঞ্চলের রাজা ৬ষ্ঠ মিথ্রাডেটস নিজেকে বাঁচানোর জন্য একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাইছিলেন যাতে বিষ প্রয়োগ করলেও তার কিছু না হয়। সে কারণেই তিনি নিজের শরীরে অল্প অল্প করে বিষ প্রয়োগ করতে থাকেন। 

একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, তা হলো রাজা মিথ্রাডেটস বিষ সম্পর্কিত বিষয়ে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। বন্দিদের উপর পরীক্ষামূলক বিষ প্রয়োগ করেও বিভিন্ন গবেষণা শুরু করেন। এ থেকে তিনি তৈরি করেন মিথ্রিডেট নামের একটি ওষুধ যার সঙ্গে বেশ কয়েক প্রকার প্রতিষেধক যুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি রোমান সৈন্যদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার ওষুধের ফর্মুলাটি পৌঁছে যায় রোমে। সেখানকার সম্রাট নিরোর চিকিৎসক অ্যান্ড্রুমাচুস সেই ফর্মুলার সঙ্গে আরো ৬৪টি উপাদান সংযুক্ত করে তৈরি করেন থেরিয়াক। সর্বরোগের এই ওষুধ সে সময় মহামূল্যবান ছিল। উনবিংশ শতাব্দীতেও ইউরোপে এই ওষুধটির প্রচলন ছিল। 

৫। ক্যান্সারের রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়া

কান ইয়া একজন ৬০ বছর বয়সী জাপানি নারী ছিলেন। কান ইয়ার বোনেরা সবাই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার নিজের বাম স্তনেও একটি টিউমার হলে তিনি ভালো করেই বুঝতে পারেন পরবর্তীতে কী ঘটবে তার সামনে এটা থেকে বাঁচার উপায় ছিল একটিই তা হলো অস্ত্রোপচার করা। সেইশু হানাওকা (১৭৬০-১৮৩৫) কিটোতে মেডিসিনের উপর পড়া শেষ করে তখন নিজ এলাকা জাপানের হিরায়মাতে ফিরে আসেন। তিনি তৃতীয় শতকের চীনা শল্যচিকিৎসক হুয়া তো’র অ্যানেস্থেসিয়া বিষয়ক ওষুধ নিয়ে কাজ করেন। যার ব্যবহার করে তীব্র ব্যথার রোগীদের চেতনাহীন করা যেত। 

হানাওকা গবেষণা করে তৈরি করেন সুসেনসান নামের একটি ওষুধ। এটি মূলত এক প্রকার অ্যানেস্থেসিয়া বিষয়ক ওষুধ যার সাহায্যে একজন রোগীকে একদিন পর্যন্ত অচেতন করা সম্ভব ছিল। এর সাহায্যে ১৮০৪ সালের ১৩ অক্টোবর মাসে হানাওকা কান ইয়ার স্তনের টিউমার অপসারণ করেন। একইভাবে তিনি প্রায় দেড়শ রোগীর চিকিৎসা করেন। কান ইয়া অপারেশনের এক বছরের মধ্যে মৃত্যুবরণ করলেও এই অস্ত্রোপচারটিই আধুনিক শল্যচিকিৎসা পদ্ধতির যুগান্তকারী ঘটনা হিসবে দেখা হয়।

৬। উনিশ শতকে ইউরোপে চিকিৎসায় জোঁক ব্যবহার

চিকিৎসায় জোঁকের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। তবে উনিশ শতকে ইউরোপের দেশগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় জোঁকের ব্যবহার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফ্রাঙ্কোস-জোসেফ-ভিক্টর ব্রোসিস চিকিৎসা জোঁকের ব্যাপক প্রচলন করেছিলেন। তিনি একজন ফরাসি চিকিৎসক ছিলেন। 

৭। উগান্ডার চিকিৎসকদের হাতেই ঘটে প্রসূতির সিজার

১৮৮০ দশকেও সন্তান প্রসাবের জন্য সিজার কোনো নতুন ধারণা ছিল না। এর প্রচলন ছিল রোমান সম্রাট সিজারের সময় থেকেই। তবে এতে শিশু মৃত্যুহার কমলেও মাতৃমৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। শত শত বছর এভাবেই চলে আসছিল। রবার্ট ফ্রাঙ্কলিনের উগান্ডায় করা একটি সফল সিজার অপারেশন সম্পর্কে এডেনবার্গের সার্জনদের কাছে বর্ণনা করেন। 

তিনি বলেন, মা ও শিশু উভয়ের জীবন বাঁচানোই সিজারের মূল উদ্দেশ্য। তখন উগান্ডার ডাক্তারদের নানা সীমাবদ্ধতা ছিল, তার মধ্যে তারা মা ও শিশুর জীবন বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে সফল সিজার অপারেশন করে। ফ্রাঙ্কলিনের এই বর্ণনার পরপরই পশ্চিমা দেশগুলোতে সিজারের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। 

সূত্র: হিস্ট্রিএক্সট্রা

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস