Alexa প্রাইভেটকার চালকের ছেলে পাচ্ছেন ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’

প্রাইভেটকার চালকের ছেলে পাচ্ছেন ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’

রুমান হাফিজ, চবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০৫ ১৪ জানুয়ারি ২০২০  

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

প্রথমবর্ষে ভর্তির পর চারটি টিউশনি ছিলো। ক্লাস আর টিউশনিতে অনেক সময় চলে যায়। পড়ার সময় কম থাকে। বেশ চিন্তায় পড়েছিলাম তখন। তৃতীয়বর্ষে দুইটি বাদ দেয়া হয়। এ সুযোগে পড়া যাবে অনেক। তাই ছুটি দিলাম টিউশনি। কাজে লাগাতাম বন্ধের দিনগুলো। গুছিয়ে রাখতাম পড়া।     

উপরের কথাগুলো আবু বকর ছিদ্দিকের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আইন বিভাগের এই শিক্ষার্থী পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক- ২০১৮।

আবু বকরের বাবা প্রাইভেটকার চালক। মা গৃহিণী। গ্রামের বাড়ি বরগুনায় হলেও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরে। ছোটো দুইবোনসহ বাবার পাঁচজনের সংসার। তাই সবার ভরণপোষণের খরচ জোগাতে বেশ হিমশিম খেতে হয় তাকে। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। 

আলহাজ্ব ছফেয়া খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের গরীবে নেওয়াজ উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ। সরকারি কমার্স কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকেও জিপিএ ফাইভ পেলে স্বপ্নের জায়গাটা বড় হতে থাকে। এবার চাই বিশ্ববিদ্যালয়। চললো পুরোদমে প্রস্তুতি। আগ্রহ ছিলো মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হওয়ার কিন্তু সুযোগ হয় নি। সুযোগ পেয়ে যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে।

অন্যরকম গল্পের শুরু:

চবির আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরপরই ভাবনার জায়গায় দোলা লাগে। ভাবনাটা পরিবার নিয়ে। শুরু করেন প্রাইভেট পড়ানো। দুটো টিউশন আর নিজের পড়ালেখা চলে সমান তালে। সকাল থেকে বিকেল অবধি ক্লাস। তারপর সোজা টিউশন। সেখান থেকে ঘরে ফিরে ছোট বোনদেরকে পড়ানো। অতঃপর নিজের জন্য একটু সময়। আবারো নতুন আরেকদিনের শুরু ঠিক আগের মতোই। এতোসব ব্যস্ততা আর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রমাণে একচুল ছাড়া দিতে নারাজ তিনি। সব পরিশ্রমের ফলাফল মিললো আইন বিভাগের স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার। যেখানে সিজিপিএ ছিলো ৩ দশমিক ৬২।

পাশে ছিলো যারা

২০১৭ সাল। আচমকা দুটো টিউশনের একটি চলে গেলে চিন্তায় পড়ে যান তিনি। কিভাবে কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। এমন সময় হাত বাড়িয়ে দেয় ‘পে ইট ফরওয়ার্ড’ ফেসবুকভিত্তিক সংগঠনটি। তবে সেখানে আবেদন করেছিলেন তারই বন্ধু মুহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান। সেই সংগঠন থেকে প্রতি মাসে পাওয়া কিছু টাকা আবু বকর ছিদ্দিককে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। তিনিও ভুলে যাননি সেই দিনের কথা। 

স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বললেন, টিউশন ছাড়া তখন আর কিছু করার ছিলো না। একটা চলে যাওয়াতে মন ভীষণ খারাপ হয়, এই বুঝি থামিয়ে দিলো সব। কিন্তু ‘পে ইট ফরওয়ার্ড’ থেকে পাওয়া বৃত্তির কৃতজ্ঞতা বলার মতো নয়। আজীবন মনে থাকবে তাদের সহযোগিতা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধু মুহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান এবং সাজ্জাদ হোসেন ফয়সালের অবদান অনস্বীকার্য।

অনুপ্রেরণা বাবা-মা

পরিবার চালাতে বরাবরই হিমশিম খেতে হয় বাবাকে। কিন্তু আমাদেরকে বুঝতে দেন নি কখনো, যা চেয়েছি দিতে চেষ্টা করেছেন। প্রাইভেটকার চালিয়ে পাওয়া উপার্জনে আমাদের জন্য যেটুকু বাবা করেছেন সেটি বলে শেষ করবার নয়। বাবা মা যদি সুযোগ করে না দিতেন শুরু থেকে তাহলে এতদূর আসা সম্ভব ছিলো। বাবার সাহস আর মায়ের দোয়া আছে বলেই সব বাধা মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ। সেই সঙ্গে মো. ফয়েজুল্লাহ খোকন নামের আমার এক ভাই অনেক সাপোর্ট করছিলেন পড়ালেখার কাজে। উনার প্রতি কৃতজ্ঞতা সবসময়।

প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পেতে যাচ্ছেন। কেমন লাগছে? প্রশ্নের উত্তরে আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার পর অনেকেই বলেছিলেন এরকম অর্জনের কথা, প্রত্যাশায় ছিলাম। এখন দেখছি বাস্তবে রূপ নিলো সেটি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার নেবো এটা ভাবতেই অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। মহান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি যিনি আমাকে এমন একটা অর্জনের মালিক করেছেন, অর্জনের পেছনে মা-বাবার পাশাপাশি শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদান অনেক বেশি ছিল। সহপাঠী ও বন্ধুবান্ধবদের সবসময়ই পাশে পেয়েছিলাম। তারা অনেক সাহায্য করেছিল। যারা সবসময় আমার পাশে থেকেছেন,  সহযোগিতা করেছেন সবার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা।

স্বপ্ন আরো বেশি

অভাবের সংসারে দূর করতে চান সব অপ্রাপ্তি। সব বাধা মাড়িয়ে এতো পথ চলে এসে মূল লক্ষ্যের পূর্ণতা বাস্তবে রূপ দিতে চান, স্বপ্ন এখন আরো বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ফুটবে বাবা মায়ের মুখে স্বর্গীয় হাসি। সেটির অপেক্ষায় আবু বকর ছিদ্দিক।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম