Alexa প্রসিদ্ধ নগরী পিসায় একদিন

প্রসিদ্ধ নগরী পিসায় একদিন

দিয়া চক্রবর্তী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:২০ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৩:০৪ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পিসার বহু চর্চিত হেলানো মিনার

পিসার বহু চর্চিত হেলানো মিনার

পিসা, নামটি অনেকের কাছেই পরিচিত। ইতালির পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরের প্রায় কোল ঘেঁষে পাহাড়ে ঘেরা একটি সুপ্রসিদ্ধ নগরী। গত ডিসেম্বরের কোনো এক সকালে গিয়েছিলাম সেখানে। রেলপথে তাসকানি উপত্যাকারই অন্য আরেকটি শহর ফ্লোরেন্স থেকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পিসা পৌঁছনো যায়। এই যাত্রাপথে চোখে পড়ল পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে সাজানো সুন্দর বাগানঘেরা ছোট ছোট বাড়ি। প্রত্যেকটি বাগান থেকে উপচে পড়া কমলালেবুর ঢল।

স্টেশনের বাইরে পা রাখতেই চোখে পড়লো সারি সারি বাড়ি আর প্রচুর কমলা লেবুর গাছ। স্টেশনের সামনের রাস্তাটি দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে কয়েকটি বাঁক নেয়ার পর প্রথম দর্শন মিলল পিসার বহু চর্চিত হেলানো মিনারটির। বইতে পড়েছিলাম এই মিনারটির ওপর থেকেই নাকি গ্যালিলিও পৃথিবীর অভিকর্ষ বল সংক্রান্ত তার বিখ্যাত পরীক্ষাটি করেছিলেন। যদিও পরে বুঝেছিলাম ওটা নিছকই একটা গল্প।

মিনারের কাছে গিয়ে দেখলাম থিকথিকে ভিড়। সবাই ব্যস্ত বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে। মিনার সংলগ্ন ক্যাথিড্রাল এবং মিউজিয়াম। তাই ওই তিনটি জায়গার টিকিট একসঙ্গে কেটে নির্ধারিত সময়ে প্রবেশ করলাম মিনারের ভেতর। ঘুটঘুটে অন্ধকার! যদিও দেয়ালের জানলাগুলো থেকে আলো এসে তা অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা। পাথরের তৈরি বিশালাকার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে যত ওপরে উঠতে লাগলাম, সিঁড়ির বেধ তত সংকীর্ণ হতে লাগল। আর একেবারে উপরের স্তরে সিঁড়িগুলো এতটাই সংকীর্ণ যে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় না। এমনকি একটি সিঁড়িতে পা রেখে তার পরেরটাতে পা রাখার জন্য শরীরকে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে নেয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না।

পিসা ক্যাথিড্রাল

মিনারটি একদিকে হেলে থাকার জন্য ওই সর্পিলাকার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় মাথা ঘুরতে থাকে। প্রথমে যে শক্তি ও উদ্দীপনা নিয়ে সিঁড়িগুলো দিয়ে উঠতে শুরু করেছিলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই তাতে ভাটা পড়ল। তখন একটাই রাস্তা। দেয়ালের লাগানো জানালার পাশে একটু জিরিয়ে নেয়া আর সিদ্ধান্ত নেয়া যে এবার ওপরে না উঠে নিচেই নেমে যাবো। স্বামীর দিকে চেয়ে দেখলাম তার উদ্দীপনা বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি! তাকে দেখেই অনেক কষ্টে জেদের বশে পৌঁছলাম মিনারের মাথায়। ভাগ্যিস উঠলাম! নাহয় মিনারের মাথা থেকে পাহাড় ঘেরা পিসা শহরকে দেখে মুগ্ধ হওয়াটা এ জীবনে আর হয়ে উঠতো না।

মিনারের কাছেই মিউজিয়াম ও ক্যাথিড্রাল। সেটা দেখার পালা এবার। দেয়ালের নানা ধরণের তৈলচিত্র সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। এসবের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল প্রাচীনকালে পিসার নাবিকদের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির সাক্ষ্যবাহী চিত্রগুলো। নানা ধরণের প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহ ছিল সেগুলোয়। লোমগার্ড, এমিলিয়ান, বাইজানটাইন এবং ইসলামিক শিল্পসামগ্রীগুলো আলাদাভাবে নজর কাড়ে। চারদিক ঘেরা অট্টালিকার মধ্যে এক টুকরো বাগানে টের পাওয়া যায় যত্নের ছোঁয়া।

দেখা শেষ, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ফেরার পালা। এবার রেলপথটা শুধু পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নয়। একদিকে বিশালাকার পাহাড় আর অন্যদিকে দিগন্তবিস্তৃত ভূমধ্যসাগর। এই রেলপথের বেশ খানিকটা গিয়েছে পাহাড়ের সুড়ঙ্গ দিয়ে। এখানে সমুদ্র আর পাহাড় মিলে মিশে একাকার। মনে হচ্ছিল ট্রেনটা একটু বেশিক্ষণ কোথাও দাঁড়ালে ভালো করে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ভোগ করতাম। ট্রেনের গতির তালে তাল মিলিয়ে এই সৌন্দর্যকে লেন্স বন্দি করার চেষ্টা বৃথা। তাই এই অনাবিল সুন্দরকে মনে মেখে ফেলাই বোধ হয় বুদ্ধিমানের কাজ। নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম ওই পাহাড় আর বিপুল জলরাশির দিকে। একের পর এক সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে ট্রেন এগিয়ে চলল আমাদের পরবর্তী গন্তব্যে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে