Alexa প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও এক রাজপুত্রের হত্যাকাণ্ড

শেষ পর্ব

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও এক রাজপুত্রের হত্যাকাণ্ড

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৫৪ ২০ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:১৫ ২০ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

রাজপুত্র ফার্দিনান্দের সঙ্গে ঘটা নৃশংস ঘটনা সম্পর্কে প্রথম পর্বেই জানানো হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তাকে হত্যার ঘটনাটির বেশ যোগসূত্র রয়েছে।  ১৯১৪ সালের ২৮ জুন রবিবার রাজপুত্র ও তার স্ত্রীকে প্রকাশ্যে গুলি করে মারে এক বিদ্রোহী। এবার তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘটার তৃতীয় কারণটি ও কীভাবে সংঘটিত হয়েছে সে সম্পর্কে জানানো হলো- 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘটার তৃতীয় কারণটি ছিল, ইউরোপের সবকয়টি দেশ একটি আরেকটির সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে অঙ্গিকারবদ্ধ ছিল। সেই চুক্তি অনুসারে কোনো দেশ যদি যুদ্ধে লিপ্ত হয় তবে অন্য দেশগুলো বন্ধুদেশকে যুদ্ধে সাহায্য করতে হবে। 

আর এভাবেই রাশিয়া, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন চুক্তিবদ্ধ ছিল। আর সার্বিয়া চুক্তিবদ্ধ ছিল রাশিয়ার সঙ্গে। অন্যদিকে, ইতালি, অস্ট্রিয়া- হাঙ্গেরি এবং জার্মানি একই চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। এজন্যই অস্ট্রিয়া- হাঙ্গেরি সার্ভিয়াকে আক্রমণ করার পর রাশিয়া সার্ভিয়াকে সমর্থন দিয়েছিল। রাশিয়ার সম্রাটের বিরুদ্ধে তখন মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল। তাই সম্রাট চেয়েছিলেন জনগণকে যুদ্ধের মধ্যে সম্পৃক্ত রেখে ব্যস্ত রাখা। আর সেজন্য তার সেনাবাহিনীর এক অংশ ১৯১৪ সালের ৩০ জুলাই সার্ভিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। 

রাশিয়ার এই পদক্ষেপ জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় কেসার উইলিয়ামকে চিন্তায় ফেলে দেয়। কারণ চুক্তি অনুযায়ী, জার্মানকে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিকে যুদ্ধে সাহায্য করতে হবে। আর তারা এ যুদ্ধে গেলে রাশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। তাই জার্মানরা রাশিয়াকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের সব সৈন্য ফিরিয়ে নেয়ার আল্টিমেটাম দেয়। আর ফ্রান্স কাদের সমর্থনে আছে তা জানাতে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে আল্টিমেটাম পাঠায়। তবে রাশিয়া জার্মানির এ আল্টিমেটামকে নাকচ করে দেয়। 

এজন্য জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ফ্রান্স ব্রিটেনের কাছে তাদের রাষ্ট্রদূতকে পাঠায়। এরপরের দিনই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হার্ভার্ট হেনরি আসকুইথের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এসময় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত ব্রিটেনের কাছে যুদ্ধ চালিয়ে নেয়ার জন্য সাহায্যের আবেদন করে। তবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তাকে সাহায্য করতে পারবে না জানিয়ে ফিরিয়ে দেয়। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতকে খালি হাতেই দেশে ফিরে আসতে হয়। 

২ আগস্ট ১৯১৪ সাল জার্মানি ফ্রান্সের কাছে জানতে চায়, তারা কাদের সঙ্গে আছে। সেসময় ফ্রান্স তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, যুদ্ধ হলে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিবে। এভাবে কথা বলা জার্মান সম্রাটের একেবারেই পছন্দ হয়নি। আর ভাবেন, হয়তো ফ্রান্স যে কোনো সময় যুদ্ধ শুরু করার সুযোগ খুঁজছে। তবে ফ্রান্সের এ ধরনের কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। 

অন্যদিকে জার্মানির সম্রাট ভাবতে থাকেন, যুদ্ধ হলে তার পূর্ব দিকে রাশিয়া এবং পশ্চিমে থাকা ফ্রান্স একসঙ্গে দখল করা কঠিন হয়ে যাবে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন আগে ফ্রান্সকে আক্রমণ করে দখল করে নেয়ার। এসবের যদিও কোনো প্রয়োজনই ছিল না। এদিকে ফ্রান্স তাদের এবং জার্মানির বর্ডারে ১০ লাখ সেনা মোতায়েন করেছিল। তখন জার্মান সম্রাট পরিকল্পনা করেন বর্ডার দিয়ে আক্রমণ করলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

তাই অন্য উপায় খুঁজতে থাকে জার্মান সম্রাট। তিনি ফ্রান্স এবং জার্মানির মধ্যবর্তী ছোট্ট দেশ বেলজিয়ামের ভেতর দিয়ে ফ্রান্সে ঢোকার পরিকল্পনা করেন। তাই পরের দিনই জার্মান সম্রাট বেলজিয়ামের রাজার কাছে একটি পত্র পাঠায়। সেখানে ৪ লাখ জার্মান সেনাকে বেলজিয়ামের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সে যাওয়ার অনুমতি চাওয়া হয়। এতে বেলজিয়ামের রাস্তাঘাট বা যা কিছুর ক্ষয়ক্ষতি হবে তার ক্ষতিপূরণ দেবে বলে আশ্বাসও দেয়া হয়। তবে বেলজিয়াম এতে রাজি হয়নি। 

তারা ভেবেছিল জার্মানের প্রায় ৪৫ লাখ সেনা আছে। আর সেখান থেকে ৪ লাখ সেনা তাদের দেশে ঢুকে পড়লে তারা বেলজিয়ামকেও দখল করে নেবে। কারণ বেলজিয়ামের কাছে তখন মাত্র এক লাখ ১৭ হাজার সৈন্য ছিল। যে কারণে বেলজিয়ামের রাজা এ চুক্তিকে নাকোচ করে দেন। তবে এটি করে নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই ডেকে আনে তারা। এরপর ৩ আগস্ট বেলজিয়ামের রাজা ব্রিটেনের কাছে সাহায্যের আবেদন জানায়। যদিও তাদের মধ্যে আগেই সামরিক চুক্তি ছিল। 

ব্রিটেন এসময় তাদেরকে সাহায্য করার আশ্বাস দেয়। কারণ তারা ভেবেছিল জার্মান যদি ফ্রান্স ও বেলজিয়ামকে আক্রমণ করে জিতে যায় তবে তাদেরও আক্রমণ করতে পারে। পরের দিন ৪ আগস্ট জার্মান সেনারা বেলজিয়ামের নিষেধের তোয়াক্কা না করে তাদের দেশে ঢুকে পড়ে। তখন ব্রিটেনও জার্মানের সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। আর এতে করে যুদ্ধ অনেক জটিল আকার ধারণ করে। 

কেননা ব্রিটেন যুদ্ধ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেনের অধীনস্ত যেসব দেশ ছিল যেমন- ভারত, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, সাউথ আফ্রিকা, মিশরসহ আরো অনেক দেশ যুদ্ধে হারিয়ে যায়। আর শুধুমাত্র ভারতবর্ষ থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার সৈন্য জাহাজে করে জার্মানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে রওনা হয়েছিল। এদিকে ব্রিটেন জার্মানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পর ইউরোপে একের পর এক দেশ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে শুরু করে। 

৬ আগস্ট অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি রাশিয়ার সঙ্গে, ৮ আগস্ট সার্ভেরিয়ার বন্ধুরাষ্ট্র মন্টেনগ্রো অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সঙ্গে, ৯ আগস্ট ফ্রান্সও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সঙ্গে, ১২ আগস্ট ব্রিটেন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সঙ্গে আর মন্টেনগ্রো জার্মানির সঙ্গে, ২৩ আগস্ট জাপান জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর দুইদিন পর ২৫ আগস্ট অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি জাপানের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস