প্রতিষেধক নয় ‘অ্যান্টিবডি’ দিয়েই বিভিন্ন মহামারির সঙ্গে লড়াই করছে বিশ্ব!

প্রতিষেধক নয় ‘অ্যান্টিবডি’ দিয়েই বিভিন্ন মহামারির সঙ্গে লড়াই করছে বিশ্ব!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫৫ ৩১ মার্চ ২০২০   আপডেট: ২১:১৯ ৭ মে ২০২০

ছবি: প্লাজমা দেয়া হচ্ছে

ছবি: প্লাজমা দেয়া হচ্ছে

পৃথিবীতে যুগে যুগে কয়েকবারই নানা ভাইরাস আঘাত হেনেছে। যা মহামারি রূপ ধারণ করে প্রাণ নিয়েছে হাজার হাজার মানুষের। বর্তমানে সারাবিশ্ব করোনার প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত। এটিকে অনেক আগেই মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এখনো এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তবে আধুনিক চিকিৎসা অনেক ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি করতে পারলেও অতীতের বিভিন্ন মহামারিতে কীভাবে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করা হয়েছিল জানেন কি? আর ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরির আগে কীভাবেই করা হতো এর চিকিৎসা? আজকের ডেইলি বাংলাদেশের সাতরংয়ের লেখাতে সে সম্পর্কেই জানানো হবে-

১৯৩৪ সাল। পেনসিল্ভেনিয়ার একটি ছেলেদের স্কুলের প্রাইভেট চিকিৎসক সম্ভাব্য মারাত্মক হামের প্রাদুর্ভাব দূর করতে একটি ব্যবস্থা নিলেন। সেসময় অন্যান্য ভাইরাসের মতো হাম খুব মহামারি আকারে দেখা দিত। যাতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছরই শিশুরা মারা যেত। ডা. জে রোজওয়েল গ্যালাগার একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তার রক্তের প্লাজমা নমুনা সংগ্রহ করেন। যে এরই মধ্যে হাম থেকে সেরে উঠেছিল।

এরপর তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দুইজন শিক্ষার্থীর শরীরে তিনি এ ইনজেকশন প্রয়োগ করেন। দেখা যায়, দুইজনই হাম থেকে সেরে উঠে। তখনো হামের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এরপর থেকে রোগীকে বাঁচাতে তার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করা হয়। ১৯ এর দশকের শুরুর দিকে চিকিৎসকরা ডিপথেরিয়া, স্প্যানিশ ফ্লু, হাম এবং ইবোলার বিরুদ্ধে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা শুরু হয়। 

জার্মান ব্যাকটেরিওলজিস্ট এবং ফিজিওলজিস্ট এমিল অ্যাডলফ ভন বেহরিং ১৮৯৫ সালে ডিপথেরিয়া অ্যান্টিটক্সিন নামে একটি অ্যান্টিবডি তৈরি করেন। যা প্রাণীর শরীর থেকে ডিপথেরিয়ার জীবাণু ধবংস করে। তিনি এ ইনজেকশন প্রথম একটি গিনিপিগের শরীরে প্রয়োগ করেছিলেন। এর জন্য তিনি ১৯০১ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।  

প্লাজমাক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা শরীরে কীভাবে কাজ করে? 

ভন বেহরিংয়ের অ্যান্টিটোক্সিন কোনো ভ্যাকসিন ছিল না। তবে ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা নামক এটি একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। যা এখন কোভিড-১৯ এর সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্যানভ্যালসেন্টস প্লাজমা হলো রক্ত বা প্লাজমা। যা এমন প্রাণী বা মানব শরীর থেকে নেয়া হয়, যে কোনো বিশেষ রোগের সংক্রমণ থেকে সেরে উঠেছে। 

গ্ল্যাডস্টোন ইনস্টিটিউটস-এর এইচআইভি কিউর রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ওয়ার্নার গ্রিন বলেছেন, সংক্রামক রোগের মুখোমুখি হওয়ার সময় এ ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা ব্যবহার করা হয়। যেটি সংগ্রহ করা হয় এমন ব্যক্তি থেকে যিনি এরই মধ্যে এ ভাইরাস থেকে সেই ব্যক্তি সেরে উঠেছেন। 

ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা একটি ভ্যাকসিনের চেয়ে বেশি প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তুলতে পারে। যখন কোনো ব্যক্তিকে একটি ভ্যাকসিন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, তখন তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে তার নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি করে। যা ভবিষ্যতে লাখো প্যাথোজেনের সঙ্গে লড়াই করতে সহায়তা করে। ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা প্যাসিভ ইমিউনিটি নামেও পরিচিত।

যে শরীর তার নিজস্ব অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে না। তাদের অ্যান্টিবডি তৈরি করতে ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা প্রয়োগ করা হয়। পরিবর্তে এটি সফলভাবে সেসব রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যা ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা নেয়া ব্যক্তি বা প্রাণী করেছিল। গ্রিন বলেছেন, ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা হলো ইমিউনোথেরাপি বাড়ানোর কৌশল। তবে এটি কার্যকর হতে পারে। 

১৮৯৫ সালে ভন বেহরিংয়ের অ্যান্টি টক্সিন ডিপথেরিয়ার চিকিৎসা বিশ্বব্যাপী বেশ সাড়া ফেলেছিল। এতে হাম, পোলিও এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা নিরাময়ের জন্য তিনি একই প্যাসিভ ইমিউনিটি কৌশল প্রয়োগ করেন। এরপর ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি আকারে দেখা দেয়। সেসময় ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা পদ্ধতিটি কার্যকর হবে ভেবে সংক্রমণের শুরুর দিন রোগীর শরীরে দেয়া হয়। এতে করে অনেক রোগী সুস্থ হতে থাকেন। 

জার্মান ব্যাকটেরিওলজিস্ট এবং ফিজিওলজিস্ট এমিল অ্যাডলফ ভন বেহরিংধারণা করা হয়, ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা ব্যবহারের কারণে স্প্যানিশ ফ্লুতে মৃতের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছিল। এরপর ১৯৩০ সালে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়েছিল প্যাসিভ ইমিউনিটি কৌশল বা ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা। ১৯৪০ এবং ১৯৫০ এর দশকে, বহু সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের চিকিত্সার জন্য ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা ব্যবহার করা হত।

এমনকি তা  অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভ্যাকসিনের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়। কারণ ভাইরাসের প্রতিষেধকের চেয়ে ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা বেশি কার্যকর বলে মনে করত সেসময়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান। কোরিয়ান যুদ্ধের সময় এ পুরানো পদ্ধতিটি আবার কাজে লাগানো হয়। 

যখন জাতিসংঘের কয়েক হাজার কোরিয়ান সেনা হেমোরজিক জ্বরে আক্রান্ত হয়। এটি হান্টাভাইরাস নামেও পরিচিত। সম্প্রতি এর কবলে পড়ে চীনে কয়েকজন মারাও গিয়েছেন। সেসময় এর অন্য কোনো চিকিত্সার ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসকরা অসুস্থ রোগীদের ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা স্থানান্তরিত করেছিলেন। এতে করে সেসময় অগণিত কোরিয়ান সেনার জীবন রক্ষা পেয়েছিল। 

গ্ল্যাডস্টোন ইনস্টিটিউটস-এর এইচআইভি কিউর রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ওয়ার্নার গ্রিন বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে মার্স, সার্স এবং ইবোলার প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল। এটি রোগীর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। যা তাকে এসব মারাত্মক ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করতে সহায়তা করে। সেসময় কৃত্রিমভাবে ল্যাবে ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা তৈরি করা হয়।    

কোরিয়ান যুদ্ধেও প্লাজমা ব্যবহৃত হয়করোনাভাইরাস চিকিৎসাতেও বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা 

২০২০ সালে ১৮  ফেব্রুয়ারি চীনের উহান শহরে কোয়ারান্টিন পেরিয়ে যাওয়া একজন কোভিড-১৯ রোগী ডা. কং ইউয়েফেং তার প্লাজমা দান করেন। এরপর মার্চ মাসে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকরা কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় ব্যবহার করতে থাকেন এই প্লাজমা।

তাদের মতে, অনেক করোনা রোগী এতে সুস্থ হয়েছেন। এছাড়াও চলছে করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের কাজ। এছাড়াও মারাত্মক সাপের কামড়ের চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা একটি সর্বাধিক পরিচিত আধুনিক ব্যবহার। অ্যান্টিভেনম উৎপাদনে এটি প্রথম ঘোড়ার উপর প্রয়োগ করা হয়েছিল। 

কোভিড-১৯ গবেষণার শীর্ষ গবেষক ইমিউনোলজিস্ট আর্টুরো কাসাদেভাল বলেছেন, ক্যানভ্যালসেন্ট প্লাজমা দিয়ে করোনার চিকিৎসা সম্ভব। তবে এটি প্রয়োগ ও ব্যবহারের জন্য দরকার সংস্থা, সবার প্রচেষ্টা। সেইসঙ্গে প্লাজমা দান করবে এমন লোকও প্রয়োজন।   

সূত্র: হিস্ট্রিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/