Alexa প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে সন্তানেরই মতো

প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে সন্তানেরই মতো

প্রকাশিত: ১৮:৪০ ২৪ অক্টোবর ২০১৯  

প্রথম পরিচয়ে শাওন মাহমুদকে শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের কন্যা হিসেবেই সবাই চেনে। যদিও তিনি নিজেকে বাংলাদেশের কন্যা চাষি শাওন হিসেবে- পরিচয় দিতে স্বাচ্ছ¡ন্দ্যবোধ করেন। নগর কৃষি বা ছাদ বাগানে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নিয়মিত লিখছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোতে

ঘরে, উঠোনে, বারান্দায় বা ছাদে বাগান করার জন্য সবচেয়ে আগে দরকার ভালোবাসা। 

আগে মনে করতে থাকি, একটি গাছ তার সম্পূর্ণ আয়ুটুকু আমার সঙ্গে পাশে থেকে পার করবে। তাই যে কোনো গাছকে ঘরে আনার আগে মানসিকভাবে প্রস্তুত হই যে আমি তাকে শুধু ঘর সাজানো বা নিজের চোখে সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য নয়; তাকে সারা জীবনের জন্য দত্তক নিতে যাচ্ছি। সেই পুরো জীবনকালে তার মাঝে ঘটে যাওয়া অসুখ বিসুখ, ফলন চক্র, পোকার আক্রমণ, অতি খরা বা বর্ষণের মতো যে কোনো বিপদ আপদে পাশে থাকার অঙ্গিকার নিয়ে থাকবো বলে নিজেকে নিজে কথা দিয়ে রাখি। 

একবার কে-নাইন কুকুর সম্পর্কে জানার ইচ্ছে জেগেছিলো। ওয়েব সাইটটিতে ঢুকতেই প্রথম লাইনে লেখা- আপনি কি আপনার পরিবারে একজন সন্তান দত্তক নেয়ার জন্য প্রস্তুত? যদি মানসিকভাবে তাতে প্রস্তুত হন শুধু তাহলেই এই জাতীয় কুকুর বাসায় পুষবার জন্য এগোতে পারেন। নাহলে নয়। থমকে গিয়েছিলাম সেই কয়টি লাইন পড়ে। একটি প্রাণকে নিজের কাছে আনার জন্য কতটা মানসিক প্রস্তুতি দরকার, তা ছুঁয়ে দিয়েছিল লেখাটুকু। সেই থেকে আমি পুরোদুস্তর ঘরকন্যা থেকে গাছপালা ভালোবেসে চাষি হয়ে উঠি। এর পেছনে ওই কথাগুলো বেদবাক্য হয়ে আছে। গাছেরও তো প্রাণ আছে, তাদেরও কষ্ট আছে, সুখ আছে। 

ছেলেবেলা থেকেই প্রকৃতি আমার একান্ত ভালোবাসার বিষয়। অবাক বিস্ময়ে প্রকৃতির খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করা আমার নেশা। বিশেষ করে পাখপাখালী আর গাছ ফুল লতাপাতার জীবনচক্র আমাকে অভিভূত করে। ভালোবাসা শুধু প্রকৃতির একটি ক্ষুদ্র অংশ, মানুষের সঙ্গেই ঘটে তা নয়, প্রকৃতির সৃষ্ট যে কোনো প্রাণের সঙ্গেও ভালোবাসা ঘটে থাকে বলে আমি বিশ্বাস করি। আবার মানুষের মাঝেই পিশাচ বাস করে তাও বিশ্বাস করি।

আমি সবময়ই বিশ্বাস করি, যারা ফুলকে ক্ষতবিক্ষত করে তারা শিশু ধর্ষণকামী। যারা গাছকে দুমড়ে মুচড়ে মারে, নির্মম অত্যাচারে পশু হত্যা করে তারা মানুষ পিটিয়ে হত্যা করতে এক চুলও কাঁপে না।। যারা নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস করে তারা মানব সমাজ তথা পৃথিবীর প্রাণীকূলের শত্রু। সময়ে এইসব মানুষের মুখে পিশাচের মুখের ছায়া স্পষ্ট দেখা যায়। শত্রুকে শায়েস্তা করতে নিজের সন্তানকে হত্যা করে বাবা। নিজ কামবসনা পূরণ করতে দুই বছরের শিশুকে ধর্ষণ করতে দ্বিধা করে না চাচা। নেশার টাকা না পেলে মাকে কুঁপিয়ে হত্যা করতে ছেলের একটুও হাত কাঁপে না। পৈশাচিকতায় ভর করে সহপাঠীকে পিটিয়ে হত্যা করতে ভয় পায় না তারই সহপাঠীরা। কুপ্রস্তাবে সম্মতি না পেলে ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করতে ভয় পায় না শিক্ষকেরা। পিশাচ আমাদের সবার ভেতরে বসবাস করে। কেউ দেখায় অথবা কেউ অবদমন করে রাখে। আমিও মানুষ। পৈশাচিকতার হাত মুচড়ে দিয়ে ভালোবাসার হাতে হাত রেখে পথ চলি। অবদমতি করতে বাধ্য করি মানুষের মাঝে পাওয়া প্রকৃতি প্রদত্ত কুগুণগুলোকে।

গত দুইদিন একটি ভিডিও অনলাইনে ঘুড়ে বেড়িয়েছে। এক মহিলা তার প্রতিবেশীর ছাদবাগানের গাছগুলো দা দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করছে। হিংসায় উন্মত্ত সেই মানুষটিকে বর্তমান সময়ে আমাদের সবাইকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। অস্থির সময়ে পৃথিবীর সবার এখন জিঘাংসা ভরা হৃদয়। সময়ে সেই মুখ বের হয়ে আসে। আমরা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত নই। আমাদের কখনো মানসিক অবসাদে কাউন্সেলিং করবার সুযোগ হয় না। ভালোবাসবার উপাদানগুলো তাই তলিয়ে যায় হিংসার অথই ঢেউয়ের তোড়ে। আমরা বেছে নিতে পারি না আমাদের ভালো থাকবার সঠিক পথ। আমরা বুঝতে পারি না বিবাদ নয় শুধু আলোচনায় যে কোনো কঠিন সমস্যার সহজ সমাধান করা যায়। আমরা ভুলে যাই একটু হেসে হাত বাড়ালে পাথর হৃদয়ও নরম হয়। কুতর্ক শত্রুতা বাড়ায়, সুযুক্তি আলোর পথ দেখায়। নিজেকে শুধরানোর জন্য সময় একদমই নেই আমাদের। 

মানুষই প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শত্রু, আবার মানুষই প্রকৃতির কাছের বন্ধু। আত্মসমালোচনা করবার অভ্যাস, সবার মাঝে নেই। অথচ আমরা জানিই না যে ভালো থাকতে হলে ভালোবাসতে হয়। শুধু মানুষকে নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি প্রাণকে ভালোবাসতে হয়। প্রকৃতির প্রতি আমার অসীম ভালোবাসায় উপহার পেয়েছি জীবনের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি, ভালোবাসলে ভালোবাসা আসে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর