Alexa প্রকাশ্যে রাজপরিবারকে হত্যার ঘটনাটিই রূপ নেয় বিশ্বযুদ্ধে

প্রথম পর্ব

প্রকাশ্যে রাজপরিবারকে হত্যার ঘটনাটিই রূপ নেয় বিশ্বযুদ্ধে

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৫২ ১৭ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৮:০৬ ১৭ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

রাজপুত্র ফার্দিনান্দের বয়স তখন ৫০ বছর। একদিন তিনি তার স্ত্রী সোফিয়াকে নিয়ে সারাজেভোতে রাষ্ট্রীয় কাজে বের হয়। যদিও তার বিশ্বস্ত গোয়েন্দারা তাকে নিষেধ করেছিল। তবে ফার্দিনান্দ তা উপেক্ষা করে সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

১৯১৪ সালের ২৮ জুন, রবিবার। ট্রেনে চেপে ফার্দিনান্দ তার স্ত্রীসহ সারাজেভোতে পৌঁছান। ছয়টি রাষ্ট্রীয় গাড়ি বহরের পাহারায় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাস্তার দু’পাশে তখন উৎসুক জনতার ভিড়। একটা সময় গাড়ি ইউটার্ন নেয়ার জন্য গতি কমায়। তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বিদ্রোহী ফার্দিনান্দের গাড়ি লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়েন। সৌভাগ্যবশত গ্রেনেডটি লক্ষ্য ভেদ করতে না পারলেও পেছনের গাড়িতে ধাক্কা লেগে বিস্ফোরিত হয়।

অতঃপর পেছনের গাড়িতে থাকা সৈন্যরা রক্তাক্ত হন। তাৎক্ষণিক ফার্দিনান্দ তাদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এদিকে যে বিদ্রোহী গ্রেনেড ছুঁড়েছিলেন তিনি বিষ পান করে রাস্তার পাশের হৃদে ঝাঁপ দেয়। তবে বিষে তেমন কাজ না করায় বিদ্রোহী বেঁচে যায়। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। 

ফার্দিনান্দের পরিচয় কী? ১৮৬৬ সালে হাঙ্গেরি এবং অস্ট্রিয়া একত্রিত হয়ে নতুন নাম নেয় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। আর আসল অস্ট্রিয়ার ফ্রান্সিস জোসেফ তখন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাট হয়ে যান। তার উত্তরসূরী এবং রাজপুত্র ছিলেন ফ্রান্স ফার্দিনান্দ। ১৯০৮ সালে সম্রাট ফ্রান্সিস জোসেফ বসনিয়া, হারজেগোভিনা নামে একটি দেশ দখল করেন। দেশটির রাজধানী ছিল সারাজেভো। যেহেতু তারা দেশটি জিতে অধীনস্ত করে নেয়, তাই সে দেশের বাসিন্দারা দখলকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।   

এবার ঘটনায় ফিরে যাওয়া যাক- অতঃপর ফার্দিনান্দ তার স্ত্রীকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য কার্যালয়ে এলেও কোনো কাজ করেননি। কিছুক্ষণ পর ফার্দিনান্দ এবং তার স্ত্রী সোফিয়া আহত সৈন্যদের দেখতে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হন। হাসপাতালে যাওয়ার পথে দূর্ঘটনা স্থলে পৌঁছালে আবারো এক বিদ্রোহী তাদের গাড়িকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। এসময় ফার্দিনান্দের গলায় একটি গুলি ও সোফিয়ার পেটে আরেকটি লাগে। ঘটনাস্থলেই ফার্দিনান্দের মৃত্যু হয়। কিছুক্ষণ পর গত হন সোফিয়াও। সেই বিদ্রোহীকে ঘটনাস্থলেই ধরা হয়। জানা যায়, সে সার্ভিয়ার বাসিন্দা।

সবকিছু জেনেও সম্রাট ফ্রান্সিস এ ঘটনাকে দূর্ঘটনা ভেবে চুপ করে থাকেন। কারণ তিনি সার্ভিয়ার সঙ্গে শত্রুতা বাড়াতে চাননি। তবে সম্রাটের সেনাপতি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাকে পুঁজি করে সার্ভিয়াকে আক্রমণ করে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির আওতায় নিয়ে আসার ফন্দি আঁটছিলেন। তারা বিভিন্ন কুমন্ত্রে সম্রাটের কান ভারী করছিলেন। এরপর ১৯১৪ সালের ২৩ জুলাই সার্ভিয়াকে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ১০ টি দাবি জানিয়ে একটি পত্র পাঠায়। যার মধ্যে আটটি দাবিই সার্ভিয়া সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেয়। 

তবে দুটি দাবি তারা মানতে নারাজ ছিল। কেননা তাতে নাকি সেদেশের রীতির অবমাননা করা হয়। যদিও এজন্য তারা অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির কাছে ক্ষমাও চেয়ে নেয়। তবে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এটি মেনে নেয়নি এবং ঠিক তিনদিন পর সার্ভিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। আর ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্ভিয়ার দিকে ট্যাংকের মাধ্যমে গোলাবর্ষণ শুরু করে। 

আর এটিই ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিন। এখানে হয়তো আপনার মনে হতে পারে, ফার্দিনান্দ যদি সেদিন গোয়েন্দাদের কথা বিশ্বাস করে বের না হতেন। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়তো আর হতই না। আবার ভাবছেন সার্ভিরার যুদ্ধ কীভাবে বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হলো?

চলুন তবে জেনে নেয়া যাক কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৃষ্টি হলো- 

তিনটি কারণেই মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটে। প্রথমত, সেসময় পুরো ইউরোপ দুটিভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ইউরোপের কূটনৈতিক ব্যবস্থা অনুসারে, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সমর্থনে একটি ভাগ ছিল এবং অন্যটি ছিল সার্ভিয়ার সমর্থনে। আর এ যুদ্ধে ক্রমেই রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স এবং অবশেষে বেলজিয়াম ও গ্রেট ব্রিটেনও জড়িয়ে পড়ে।   

দ্বিতীয়ত, আধুনিক অস্ত্র। সেসময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক অস্ত্র মজুদ রেখেছিল। যার মধ্যে অন্যতম ছিল মেশিন গান এবং ট্যাংক। এর পূর্বে বন্দুক থেকে একটি গুলো ছুঁড়তে প্রতিবার ট্রিগার চাপতে হতো। তবে ইউরোপের সংগ্রহে তখন এমন মেশিন গান ছিল যা একবার ট্রিগার চাপলে ৬০০ টি পর্যন্ত গুলি বের হতো। আর যা হঠাৎ করে কোনো দেশকে ভয় পাইয়ে দিতেই যথেষ্ট ছিল! আর তাছাড়া এই যুদ্ধে আরো শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ছিল তাদের যুদ্ধ বিমানগুলো।

জার্মান, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন যুদ্ধ বিমানে সমৃদ্ধ ছিল। যা তাদের শক্তির প্রকাশ করেছিল যুদ্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সদ্য আবিষ্কৃত সাবমেরিন। যা একাই ব্রিটেনের সমুদ্রে রাজ করত। জার্মান চেয়েছিল ব্রিটেনের এই সমুদ্র শাসন বন্ধ করতে। এজন্যই জার্মানরা সাবমেরিন তৈরি করে তাদের শক্তি দ্বিগুণে রুপান্তরিত করে। এরপরের ঘটনাটি পড়ুন দ্বিতীয় পর্বে। ততক্ষণ ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকুন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস