পৃথিবীর পঞ্চম হিরা, হাড়কিপটের টেবিলে থাকা পেপারওয়েট!

পৃথিবীর পঞ্চম হিরা, হাড়কিপটের টেবিলে থাকা পেপারওয়েট!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৪৭ ১৪ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৬:৫৮ ১৪ মার্চ ২০২০

ছবি: জ্যাকব হিরা

ছবি: জ্যাকব হিরা

কোটিপতি এক ব্যক্তি। অর্থের জোয়ারে ভাসতেন তিনি। বলছি, বিশ্ব ইতিহাসের সর্বোচ্চ ধনকুবের হিসেবে খ্যাত মীর উসমান আলি খান বাহাদুরের কথা। ১৯৬৭ সাল অর্থাৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

কোটি টাকার মালিক হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি ছিলেন মিতব্যয়ী। কৃপণ বলতে আপনার যা ধারণা তাও পাল্টে যাবে ধনকুবেরের কাহিনী শুনলে। এতটাই নিম্নভাবে নিজের জীবন কাটাতেন তিনি। অথচ তার ইশারাতেই চলত একটি রাজ্য। তিনি ছিলেন দানবীর। আর তাইতো তার দানের কথা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে আছে। 

ইতিহাসের প্রথম ধনকুবের

নিজাম থাকাকালীন সময় উসমান পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হন। ১৯৪০ এর শুরুর দিকে তিনি দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদের মালিক ছিলেন। সেসময় নবগঠিত ভারতীয় ইউনিয়ন সরকারের কোষাগারের রিপোর্ট মোতাবেক বার্ষিক রাজস্ব ছিল এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৩৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি বর্ণনা করে প্রচ্ছদে তার ছবি ছাপা হয়। ধারণা করা হয়, ১৯৬৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। তবে সে সময় তার সম্পদ এক বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। কারণ তার সম্পদের বেশিরভাগই ভারত সরকার কর্তৃক সরিয়ে নেয়া হয়।

উসমানের শাসনকাল

হায়দ্রাবাদ ও বেরার রাজ্যের শেষ নিজাম ছিলেন তিনি। ১৯১১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত হায়দ্রাবাদ শাসন করেছেন মীর উসমান আলি খান বাহাদুর। এরপর অপারেশন পোলোর ফলে হায়দ্রাবাদ ভারতের অংশ হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি হায়দ্রাবাদ রাজ্যের রাজপ্রমুখ হন। ১৯৫৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। এসময় রাজ্যকে ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করে অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের অংশ করা হয়। 

অপারেশন পোলো

উসমান তার রাজ্যকে রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন বরাবরই। কখনো তিনি তার রাজ্যকে ভারত বা পাকিস্তানের অধীনস্থ করতে চাননি। নিজ রাজ্যকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন উসমান। চৌধুরী রহমত আলি এই রাষ্ট্রের নাম দেন উসমানিস্তান। তবে ভারত সরকার উসমানের এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হায়দ্রাদবাদ আক্রমণ করে। মেজর জেনারেল জয়ন্ত চৌধুরীর নেতৃত্বে এই আক্রমণ চলে।   

এই আক্রমণেরই সাংকেতিক নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন পোলো’। উসমানের ছিল মাত্র পাঁচ হাজার সেনা। তাদের পক্ষে ভারতের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর স্থল ও আকাশ পথে হামলা প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না। তাই কয়েক ঘণ্টায় হার মানলেন উসমান। তার হায়দ্রাবাদ ও বেরার স্টেট ভারতের মানচিত্রে প্রবেশ করল। ভারতে অন্তর্ভুক্তির পর ২৫ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে নিজাম মীর উসমান আলিকে হায়দ্রাবাদ স্টেটের রাজপ্রমুখ পদে অভিষিক্ত করা হয়। 

মীর উসমান আলি খান বাহাদুরসেই পদে তিনি ৩১শে অক্টোবর ১৯৫৬ পর্যন্ত ছিলেন। সাতটি স্ত্রী, ৩৪টি সন্তান এবং অগনিত রক্ষিতা নিয়ে জীবন কাটান উসমান। তিনি ভারত বিরোধী ছিলেন। কেউ কেউ তাকে হিন্দু বিদ্বেষী কট্টর মুসলিম শাসক ও শোষক হিসেবে দেখিয়েছেন। যদিও ধর্মের ভিত্তিতে সদ্য তৈরি হওয়া পাকিস্তানের সঙ্গে তার রাজ্যকে যুক্ত করেননি।

ধনকুবেরের মিতব্যয়ীতার নমুনা

উসমান সবসময় কম খরচ করতেন। সবচেয়ে সস্তা মূল্যের সিগারেট ফুঁকতেন। কেনাকাটা নয় বরং অন্যের কাছ থেকে নিতেই বেশি পছন্দ করতেন তিনি। যিনি কোটি টাকার মালিক তিনি কিনা নিজ হাতে ছেঁড়া কাপড় সেলাই করতেন। তার পরা পোশাক আবার পরানো হত বাড়ির কিশোরদের। একেবারে নষ্ট না হলে নতুন জামা বা জুতা কেনা প্রায় নিষিদ্ধ ছিল উসমানের পরিবারের জন্য। বলা চলে, তিনি অত্যন্ত হাড়কিপটে একজন মানুষ ছিলেন। এমনো হত যে, দোকান থেকে কিছু কিনে টাকা না দিয়ে উল্টো দোকানদারের সঙ্গে ঝগড়া করতেন তিনি।  

বিত্তশালীর প্রকাশ

কৃপণ এই মানুষটির টেবিলেই কিন্তু পেপারওয়েট হয়ে শোভা পেত পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম হিরাটি। ১৮৫ ক্যারেটের জ্যাকব ডায়মন্ড। বর্তমানে যার দাম হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই দামী হিরাটি তিনি পেয়েছিলেন তার বাবা মাহবুব আলী খানের জুতা থেকে। এরপর সেই হিরা উসমান সংগ্রহ করে নিজ টেবিলে রেখেছিলেন। 

পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রোলস রয়েসের পঞ্চাশটিরও বেশি মডেল ছিল তার গ্যারেজভর্তি। একটি অলিম্পিক সাইজের সুইমিংপুল সমান মণি-মুক্ত ছিল তার। এই মানুষটিই রানি এলিজাবেথের বিয়েতে উপহার হিসেবে কয়েক কোটি মূল্যের হিরার গয়না পাঠিয়েছিলেন। যেটি আজো রানির ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ‘নিজাম নেকলেস‘ নামে বিখ্যাত।

ভারতের জন্য যা করেছেন

তখন ১৯৬৫ সাল। ভারতের দিকে তখন চীনে তীক্ষ্ণ নজর। সঙ্গে ছিল পাকিস্তানও। এদিকে দেশকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে ভারত সরকার। এ কারণে তৈরি করা হয় জাতীয় নিরাপত্তা তহবিল। তখনকার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এমতাবস্থায় হায়দ্রাবাদে যান। তিনি ভারতের নিজাম অর্থাৎ উসমানের সঙ্গে দেখা করেন। 

তাকে অনুরোধ করেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে কিছু দান করার জন্য। সব শুনে হাসলেন উসমান। অতঃপর নিজের সেক্রেটারিকে ডাকলেন। একটা কাগজে উর্দুতে একটি নোট লিখলেন। কাগজটি দেখেই সেক্রেটারির চোখ কপালে উঠে গেলে! ভারতের নিরাপত্তা তহবিলে নিজাম ওসমান আলি দিলেন পাঁচ টন সোনা। এর সঙ্গে নগদে দিলেন ৭৫ লাখ টাকা। 

১৯৬৫ সালে নিজামের দেয়া পাঁচ হাজার কেজি সোনা এখনো ভারতের জাতীয় কোষাগারে দান হিসাবে দেয়া সবচেয়ে বড় অর্থরাশি। ভারতীয় নিরাপত্তা তহবিলে দেয়া পাঁচ টন স্বর্ণমুদ্রায় ভর্তি ট্রাঙ্কগুলো যখন ভ্যানে লোড করা হচ্ছে। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো নিজাম ভুরু কুঁচকে অফিসারদের বলেছিলেন, আমি শুধু পাঁচ টন স্বর্ণমুদ্রাই দান করেছি, ট্রাঙ্কগুলো নয়। তাই খেয়াল রেখো, ওগুলো যেন আমার কাছে ফেরত আসে। 

উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে উসমান আলি খানদানবীর উসমান

এই হাড়কিপটে মানুষটিই তার প্রিন্সলি স্টেটের বাজেটের ১১ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতেন। তার সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল এবং গরীবদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময় অর্থ অনুদান হিসেবে দিয়েছেন উসমান। ভারতের অন্যতম ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়টিও তার তৈরি। জীবনকালে প্রচুর স্কুল, কলেজ, অনুবাদ কেন্দ্র নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন কৃপণ খ্যাত উসমান।  

ভারতের সে সময়কালের সব রাজা মহারাজাদের চেয়ে সব বিষয়েই এগিয়ে ছিলেন উসমান। ঐতিহ্যবাহী হায়দ্রাবাদ হাউসটি নিশ্চয়ই সবাই চেনেন! যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করেন। এই প্যালেসটিও কিন্তু নিজামের অর্থে বানানো। তার সময়কালে হায়দ্রাবাদে ঐতিহাসিক কিছু প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন উসমান। 

যেমন- ওসমানিয়া হাসপাতাল, হায়দ্রাবাদ হাইকোর্ট, টাউন হল (এখন অ্যাসেম্বলি হল নামে পরিচিত), জুবিলী হল, আসাফিয়া লাইব্রেরি (যেটি এখন পরিচিত স্টেট জেনারেল লাইব্রেরি নামে), হায়দ্রাবাদ মিউজিয়াম (বর্তমানে যেটি স্টেট মিউজিয়াম), নিজামিয়া অবজারভেটরিসহ অগণিত প্রাসাদ ও মনুমেন্ট।

নিজের ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা

কৃষিক্ষেত্রে গবেষণার হাতেখড়ি হয়েছিল উসমানের মাধ্যমেই। ১৯১৮ সালে পারভানিতে প্রথম পরীক্ষামূলক একটি খামার তৈরি করেন নিজাম। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, উসমান ১৯৪১ সালে নিজেই নিজের ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যাংকের নামকরণ করা হয় হায়দ্রাবাদ স্টেট ব্যাংক নামে। বর্তমানে স্টেট ব্যাংক অব হায়দ্রাবাদ হিসেবে পরিচিত এটি। উসমানের নামে মুদ্রারও নামকরণ করা হয় ওসমানিয়া সিক্কা। নোটের নাম ছিল হায়দ্রাবাদি রুপি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস