Alexa পূর্বপ্রস্তুতিতে ঘায়েল ফণি

পূর্বপ্রস্তুতিতে ঘায়েল ফণি

প্রকাশিত: ১৩:২৮ ৭ মে ২০১৯  

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

এক আতঙ্কময় সময় পার হলো আমাদের। মহা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণিকে নিয়ে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের প্রায় পুরোটাই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যম ছিল সরগরম।  সবার ভেতরে ছিল চাপা আতঙ্ক। ছিল প্রস্তুতিও। 

এর ভেতর দিয়েই গত ৩ মে শুক্রবার সকালে ভারতের উড়িষ্যায় আঘাত হানে ফণি। লন্ডভন্ড হয় সৈকত শহর পুরী আর রাজধানী ভুবনেশ্বরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। এরপর পশ্চিমবাংলা হয়ে প্রায় নির্বিষ ফণি শনিবার দুপুরে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে উত্তরাঞ্চল দিয়ে ভারতের আসামে পৌঁছে খেই হারিয়ে ফেলে। আর দূর্বল হয়ে পড়ায় ঘূণিঝড় ফণি লঘুচাপে পরিণত হয়। 

তবে ক্ষয়ক্ষতির যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল বাংলাদেশে তার চেয়ে অনেক কম হয়েছে ফণির ক্ষেত্রে। ৪৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বলা হয়েছে এটিকে। এছাড়া চার দশকের মধ্যে এপ্রিলে হওয়া এমন ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা দাঁড়ালো তিনে। আঘাত হানার আগে অনেক কালক্ষেপণ করে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করেছিল ফণি। তাছাড়া এত দীর্ঘ সময় ঘুরপাক খেয়ে এর আগে কোনো ঝড়ের আঘাত হানার ইতিহাস খুব একটা নেই। তাই চারদিন আগে দেশ থেকে ঘূর্ণিঝড় বিদায় নিলেও এই নিয়ে অব্যাহত আলোচনা এখনো একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। 
একটা সময় আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় মানেই ছিল অতঙ্কের নামান্তর। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ভয় আর উৎকণ্ঠার মধ্যে পার করেছে সময়। ব্যাপক প্রাণহানি ছিল সাধারণ ঘটনা। আমাদের স্মৃতিতে এখনো রয়ে গেছে ১৯৯১ সালের সেই বিভীষিকা। সেবার ঘূর্ণিঝড়ে এক লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তখনো ঘূর্ণিঝড়ের নামকরনের শুরু হয়নি। এরপর দীর্ঘদিন পর ২০০৭ সালের সিডর আর ২০০৯ সালের আইলার কথা বলতেই হয়। উভয় ক্ষেত্রেই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের মতো প্রাণহানি হয়নি। বস্তুত ১৯৯১ সালের ধ্বংসলীলা আমাদের জন্য ছিল বিশেষ শিক্ষা। 

তবে বলতে দ্বিধা নেই এবারের ফণি কিন্তু আমাদের পূর্বপ্রস্তুতিতে অর্জিত সাফল্যের অনবদ্য দৃষ্টান্ত। এই পূর্বপ্রস্তুতি একটা বিশেষ দিক হলো প্রচারণা। এখানে গণমাধ্যমের যেমন ভূমিকা রয়েছে তেমনি সরকারের তৎপর ভূমিকা ছিল প্রসংশনীয়। দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় যে ভূমিকা পালন করেছে তা এককথায় অসাধারণ। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়েরও বিশেষ ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সময় মতো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সার্বক্ষণিক তদারকি তো ছিলই। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকলেও খবর রেখেছেন নিয়মিত। সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি, প্রচারণাসহ সার্বিক কার্যক্রম গণমাধ্যম প্রশংসনীয়ভাবে পৌঁছে দিতে পেরেছে মানুষের কাছে। এসব উদ্যোগই উপদ্রুত এলাকার মানুষকে সতর্ক করেছে। 

একটু ইতিহাসের পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, এই ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। যেখানে বসবাস অন্তত ৪ কোটি মানুষের। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষ। ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষরা ঘূর্ণিঝড়ের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আশ্রয় কেন্দ্রে না যাওয়া। সবাই নিজের বসতবাড়িতে থেকে পাহারা দেয়াই যেন ছিল তাদের মূল কাজ। তবে এবার ফণির ক্ষেত্রে সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। বরং মানুষ যেমন সচেতন হয়েছে, তাদের সচেতন করে তোলার কাজটাও প্রশংসনীয়ভাবে করা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ব্যাপক প্রচারের কারণে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সময়মতো গিয়েছে মানুষজন। তাই মৃত্যুর সংখ্যাও অনেকটা কম হয়েছে। এছাড়া কেবল প্রচারণা নয় বরং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। 

বাস্তবতা হলো এখন সময় পাল্টেছে। ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপকতা বাড়লেও সরকারের নানামুখী ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষ সচেতন হয়ে ওঠায় ক্ষয়ক্ষতি বিশেষ করে প্রাণহানী ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এক্ষেত্রে এবারের ফণি বলাই বাহূল্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এর কারণ দীর্ঘদিনের কার্যকর পরিকল্পনার বাস্তবায়নের পাশাপাশি সঠিক, সময়োপযোগী এবং কার্যকর পূর্বপ্রস্তুতি। 

অবশ্য জানের তেমন ক্ষতি না হলেও মালামালের কিছু ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়নি ফণির ক্ষেত্রে। কারণ আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান হওয়ায় দেশের জনসংখ্যার বিশাল অংশ কৃষি কাজের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দূর্যোগ পরবর্তীতে উপদ্রুত এলাকায় মানুষ্যের খ্যাদ্যভাবের অনুঘটক হয় ফসলের ক্ষতি। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে দেখা দেয়া মানুষদের পুষ্টিহীনতা। এর জন্য এ বিষয়ে এখনই সময়পোযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। কাজ করতে হবে যার যার জায়গা থেকে। পরিশেষে ফণি নিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বলতেই হয় প্রচারণার পাশাপাশি কার্যকর পূর্ব প্রস্তুতি ফণীকে ঘায়েল করতে যে ভূমিকা রেখেছে তা অবশ্যই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে আগামী সময়ের জন্য। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর