Alexa পাহাড় কেটে সাবাড়!

পাহাড় কেটে সাবাড়!

মো. আবু কাওছার আহমেদ, টাঙ্গাইল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫৯ ১৩ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২২:০২ ১৩ নভেম্বর ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ও সখীপুরের পাহাড়িয়া এলাকায় অবাধে জমির শ্রেণী পরিবর্তনের হিড়িক পড়েছে। সমতল ভূমি বানিয়ে সবজি চাষের নাম করে ভেকু বসিয়ে ২০-৪০ ফুট গভীর করে উঁচু পাহাড় ও টিলা কেটে সাবাড় হচ্ছে।

পাহাড় কেটে প্রতিদিন শত শত ট্রাক, ড্রামট্রাক ও মাহেন্দ্র ট্রাক দিয়ে স্থানীয় ইটভাটায় লালমাটি বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে আশঙ্কা বাড়ছে পরিবেশ বিপর্যয়ের। 

সরেজমিন থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউপির জিগাডেঙ্গর, মাকরাই, ঘোড়ামারা, পাঞ্জাচালা, হরিণাচালা, তেঘড়ি, সন্ধানপুর ইউপির পাড়বাহুলী, চৌরাশা, দিগর ইউপির মাইদার চালা এবং সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউপির দিঘীরচলা, ছোটবাজার, বেড়বাড়ী, গড়বাড়ী, বহেড়াতৈল ইউপির গোহাইলবাড়ী, আমবাগ, এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাহাড় ও টিলা কেটে সমতল ভূমি বানানো হচ্ছে।

এক শ্রেণীর মাটি ব্যবসায়ী গত দুই মাস ধরে পাহাড় ও টিলার ভোগ দখলকারীদের সবজি চাষের উপযুক্ত জমি বানিয়ে দেয়ার নাম করে উঁচু পাহাড় ও টিলা কেটে লালমাটি আশপাশের ইটভাটায় বিক্রি করছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ সমতল ভূমিতে বাড়ি নির্মাণ করতেও পাহাড় কেটে মাটি নিচ্ছে। কেউ মাছ চাষের জন্য পুকুর তৈরি করতেও পাহাড় বা টিলা কেটে লালমাটি বিক্রি করছে।

আবার কোনো কোনো মাটি ব্যবসায়ী বনরক্ষীদের ম্যানেজ করে বনবিভাগের উঁচু পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করছে। লালমাটি কেটে বিক্রি করার কারণে অধিকাংশ ভূমির গজারি, মেহগনি, ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি প্রভৃতি গাছগুলোও বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে পাহাড়ি এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টসহ মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউপির জিগাডেঙ্গর গ্রামের এবাদত আলীর ছেলে আবুবকর এবং আ. বাছেদের ছেলে আবুল হোসেন ও তার ভাই টাঙ্গাইল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ারম্যান নুরুল ইসলাম নুরু প্রায় তিন একর ভূমির দুটি বড় পাহাড়ের গাছ ও পাহাড় কেটে এরমধ্যে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ওই এলাকা এখন অনেকটাই সমতল ও পুকুরে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে আবুল হোসেন ও নুরুল ইসলাম নুরু জানান, ওই ভূমি পাহাড় বা টিলা হলেও তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। তারাই ওখানে গাছ রোপণ করেছিলেন। প্রয়োজনের তাগিদে গাছ কেটে লালমাটি বিক্রি করেছেন। 

সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউপির দিঘীরচালা ও ছোটবাজার এলাকায় একটি গ্রাম্য রাস্তাসহ টিলা কেটে স্থানীয় প্রভাবশালী জনৈক মাটি ব্যবসায়ী লালমাটি বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করেন ওই গ্রামের আ. গফুর, আব্দুল আজিজ ও নুরুন্নবী।

একই ইউপির গড়বাড়ী এলাকার নওশের আলীর ছেলে ইদ্রিস আলী স্থানীয় বখতিয়ারচালা নামক টিলা কেটে সমতল করছেন। ইদ্রিস আলী জানান, বখতিয়ারচালার ওই জায়গাটুকু তার পৈত্রিক সম্পত্তি। শিয়ালের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে তিনি পাহাড় কেটে সবজি চাষের উপযোগী ভূমি তৈরি করছেন। এতে তিনি দোষের কিছু দেখছেন না। 
         
সরকারের ভূমি ব্যবহার আইন-২০১৬ অনুযায়ী ‘যেসব জমি বনভূমি হিসেবে টিলা, পাহাড় শ্রেণী, জলাভূমি, চা বাগান, ফলের বাগান, রাবার বাগান ও বিশেষ ধরনের বাগান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে; তার শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। এসব স্থানে কোনো ধরনের আবাসিক কিংবা শিল্প-কারখানা স্থাপন করা যাবে না। করলেই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। দেশের খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিল ও জলাভূমির শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। এসব স্থান শুধু মৎস্য উৎপাদনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বালু মহাল, পাথর মহাল, বাগান, প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না’।

এ আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও সর্বনিম্ন এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এ আইনের অপরাধ দমনে জরুরি প্রয়োজনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারবেন।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশএ বিষয়ে সখীপুরের কাকড়াজান ইউপি চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম বিদ্যুৎ জানান, দিঘীরচালা এলাকায় তিনি লোক পাঠিয়ে রাস্তার পাশে মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত তিনি তাদের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করবেন।

তিনি আরো জানান, পাহাড় কাটা হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। বৃহত্তর স্বার্থে এটা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

ঘাটাইল ইউএনও (ভারপ্রাপ্ত) ও উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভূমি) মোছা. নুরনাহার বেগম জানান, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। পূর্বানুমতি ব্যতীত জমির শ্রেণী পরির্তন করার এখতিয়ার কারো নেই। পাহাড় ও টিলা কাটার বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

টাঙ্গাইলের এডিসি(রাজস্ব) মোছা. মোস্তারী কাদেরী জানান, পাহাড় ও টিলা কেটে জমির শ্রেণী পরিবর্তন করার কোনো নিয়ম নেই। এ বিষয়ে তদন্ত করে জমির শ্রেণী পরিবর্তনকারীদের ডেকে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা হবে। তারা কেউ না এলে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম