Alexa পাহাড়ের শহর কালিম্পং যেন স্বর্গরাজ্য

পাহাড়ের শহর কালিম্পং যেন স্বর্গরাজ্য

ভ্রমণ প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:০৩ ১০ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৪:৩৪ ১০ আগস্ট ২০১৯

কালিম্পং

কালিম্পং

হটাৎ অদ্ভুত এক অনুভূতি। এই ছিল রোদ, হটাৎ ভিজে গেল হাত-মুখ-চোখ। বুঝতে কষ্ট হলো না, মেঘ ছুঁয়ে গেল আমাদের।

ঠিক আছিস তো, কই তুই?

আরে এই তো আমি! কিন্তু অন্যরা কই গেল? সামনেই তো ছিল! এত তাড়াতাড়ি গেলই বা কোথায়?

ওই যে, ওই যে, কিন্তু দেখা যাচ্ছিল না কেন?

মেঘে ঢেকে ছিল কী! হ্যাঁ... তাই তো! ওই যে আবার আসছে!

এই চলে গেল! কী দারুণ! কি অদ্ভুত! কী অসাধারণ! কী বিস্ময়! আমরা মেঘে ঢাকা! এগুলো মেঘেরই অশ্রু! মেঘেদের চলাচল, আমাদের চারপাশ ঘিরে।

এই ছিল কালিম্পংয়ের ডেলো লেকের উপত্যকায় আমাদের অনুভূতি। রোদের মধ্যে হটাৎ মেঘে ঢেকে গেল চারপাশ। কিছুটা ভিজে গিয়ে আর অন্যদের ক্ষণিকের জন্য দৃষ্টি সীমার বাইরে গিয়ে আমাদের বিষম বিস্ময়! সবাইকে ডেকে বললাম, বিতর্কটা স্বার্থক! কারণ আসার আগে ‘মিরিখ না কালিম্পং?’ এ নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। শেষমেষ সবাইকে বুঝিয়ে কালিম্পং এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি।

পাহাড়ের শহর কালিম্পং। ক্যাকটাস-অর্কিডের শহর কালিম্পং। তিব্বতী, সিকিমি, ভুটানী ও নেপালী জনগোষ্ঠির সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র কালিম্পং। সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য শহর কালিম্পং। পাহাড়ের বিশালতা, উপত্যকার নিবিড় সবুজ গালিচা, উপত্যকা মধ্যবর্তী তিস্তা, রেলি ও রিয়াং নদীর উচ্ছ্বল ছুটে চলা এবং মৌনি কাঞ্চনজঙ্ঘার চাহনি! এতো সুন্দর জায়গা, বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। নামটার মধ্যেই কেমন যেন অন্য রকম ভালো লাগার নির্যাস। শান্ত সৌম্য কিন্তু সজাগ। হাওয়া বদল কিংবা নিভৃতবাসের উত্তম জায়গা। পরিবেশ আর জীবন কীভাবে একাকার হয়ে গেছে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এটি।

আমাদের গাইড বললেন, মিনিট দশেকের মধ্যেই হোটেলে পৌঁছে যাব। পাইন ভিউ নার্সারি থেকে জিপে উঠলাম। দুই পাশে পাহাড়। মাঝ দিয়ে সরু রাস্তা। হাইওয়ে থেকে এটিই চলে গেছে কালিম্পং শহরে। কিন্তু আপাতত আমাদের গন্তব্য শহরের দিকে নয়। ‘ওই দেখেন দেখেন’ শাহেদ হঠাৎ বলে উঠলেন। কি দেখব? ওই যে লম্বা সাদা ফুল ফুটে আছে রাস্তার ধারে। সত্যিই তো। ফুলটা ব্যতিক্রমী। মিলটন গাড়ির ভেতর থেকেই ছবি নিলেন। ঠিক ভুভুজেলা বাঁশির মতো দেখতে। নাম জানিনা আমরা কেউই।

কালিম্পং এর চারপাশেই বিশাল বিশাল একেকটা পাহাড়। আকাশে হেলান দিয়ে আছে। অফুরন্ত সবুজ। তারই মাঝে বাড়িঘর। এখানে প্রাণ আছে, এখানে শান্তি আছে। এখানে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া যায়। আরো আছে নদী-উপত্যকা, মাঝে-মাঝে গা ছমছমে অন্ধকারে ঢেকে যাওয়া গুহার মতো লুপ! ইট বিছানো রাস্তা, কখনো পীচ ঢালা, কখনো শুকনো পাতা ঝরা মর্মর ধ্বনি, কখনো দূর ঝরনার জলের উচ্ছ্বাস, কখনো মিহি বাতাসের শীতল পরশ, কখনো নেমে যাওয়া আর নেমে যাওয়া আর কখনো জীপের হাইকিং!

কালিম্পং-এর একটি হোটেল থেকে তোলা

অদ্ভুত রোমাঞ্চের মাঝে, হারিয়ে যাওয়া এক-একটি মুহূর্ত। এই ডানে খাদের কিনারে তো এই বামে হাজার ফুট নিচে! এক-একটি পাহাড়ই যেন বার বার ঘিরে ধরছে আমাদের, যেতে দেবে না ওর কোল থেকে! পালাতে দেবে না ওর বুক থেকে! যেন ওর মাঝেই আমাদের ধারণ করে রাখতে চাইছে যে কোনো ছলনায়। একবার তো এমন হলো একটি পাহাড় ডিঙাতে ৮-১০টি লুপ পেরিয়ে আসতে হলো! মানে একটি পাহাড়ের নিচ থেকে উপর বা উপর থেকে নিচে নামতে ৮-১০ বার ঘুরতে হলো চরকির মতো, পেরোতে হলো ততগুলো গুহা আর কালভার্ট!

লামাহাটটা পৌঁছলাম, ঠিক যেন ভ্রমরের মতো ঘুরতে ঘুরতে। বেশ গোছানো, ছিমছাম, পরিছন্ন একটা ছায়া ঘেরা সবুজ অরণ্য আর রঙ-বেরঙের ফুলের রাজ্যে! কিন্তু প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো থাকতে না দিয়ে, ওর বুক চিরে আরো সৌন্দর্য বের করতে গিয়ে ওর আসল রূপ ঢেকে ফেলেছে। অনেকটা এরকম শুভ্র, সুন্দর, কোমল, মসৃণ, সোনা ছড়ানো কোনো রমণীকে একগাদা আটা লাগিয়ে রূপের বীভৎসতা তৈরি করার মতো! যে কারণে ওখানে বেশিক্ষণ চোখ ও মনের মাধুরীকে নষ্ট না করে, আবার চলতে শুরু করলাম।

নিঁচু পথ দিয়ে চলছি। বেশ ঘন জঙ্গল, শিশিরে ভেজা রাস্তা, দূরে পাহাড়ের পা জড়িয়ে তিস্তার ছুটে চলা। এই জায়গাটার নাম লাভারস মিট পয়েন্ট! ভাবলাম, এমন আজ নাম হতে যাবে কেন এই জায়গার? নেমে উপরের বেদীতে উঠতেই বুঝে গেলাম এই নামের নেপথ্যে রয়েছে দুটি নদীর মিলন। যেন কামড়ে ধরেছে, একে অন্যের ঠোঁট! মেটাচ্ছে অনেক দিনের ব্যাকুল তৃষ্ণা, চুমুর তৃষ্ণা! চোখে ভেসে উঠলো ২১ বছরের কেট উইন্সলেট আর ২২ বছরের লিওনার্দোর সেই বিখ্যাত, দৃষ্টি নন্দন আবেগময় মুহূর্ত।

জায়গটা দেখে বেশ ভালোই লাগলো। তবে খুব বেশিক্ষণ থাকলাম না। আবার নামছি, ঘুরছি আর নামছি। প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যেন তিস্তার উম্মত্ত আহ্বান! পাথরে পানিতে মাখামাখি! ছোট ছোট ঢেউ বড় বড় পাথরের প্রাচীর, একদম তিস্তার পা জড়িয়ে যাচ্ছি অনেক, অনেকটা পথ। ঠিক তক্ষুনি তিস্তার আহ্বান ওর জলে ভেজার, ভেসে বেড়াবার! কিন্তু আমরা তখন শীতের তোড়ে, দূরে পালাই। তিস্তার বুকে শাবল না বসিয়েই ওকে পেরিয়ে যাবার ভালোবাসার প্রাকৃতিক উপহার! এমনভাবেই ব্রিজ করেছে, বিশাল, বলিষ্ঠ কিন্তু কোনো করুণা বা কষ্ট দেয়নি তিস্তাকে।

আবার উঠছি, তিস্তাকে বামে রেখে, ঠিক উল্টো পথে! যে পথ দিয়ে এসেছিলাম সেই পথের দিকেই! কিন্তু এবার নদীর ওপর পাড় ঘেঁষে, যেন তিস্তার উৎসমুখে! এবার রাস্তা একদম ঝকঝকে, মসৃণ, এঁকেবেঁকে, বাঁকে বাঁকে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, নীল আকাশ, সবুজ গাছ, গভীর অরণ্য, ফুলেদের বর্ণিল বাহার, বন্য প্রাণীদের নির্জনতা ভাঙার ডাক, পাখিদের গান, তিস্তার বয়ে চলা, রাফটিংয়ের রোমাঞ্চ, সূর্যের উঁকিঝুঁকি, যেন কখনো নিঃশব্দ, কখনো সঙ্গীতের মূর্ছনা মেখে, নীলিমার পথ ধরে স্বর্গের কাছাকাছি।

লাভারস মিট পয়েন্ট

এরপরের গন্তব্য ছিল কালিম্পং শহর। পুরনো পাহাড়ি শহর, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। রাস্তার দুপাশে অসংখ্য ছোট ছোট দোকান-পাট। স্থানীয়দের সঙ্গে নেপালিদের চেহারার মিল। পুরুষ মহিলা সবারই পায়ের গোছা মোটা। শরীর বেঁটে। পাহাড় বাইতে বাইতে এরকম হয়েছে। আসলে কালিম্পং অবকাশ যাপনের জন্য সেরা জায়গা। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষজন এখানে আসতেন বেড়াতে, হাওয়া বদল করতে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সবশেষ এখানেই বেড়াতে এসেছিলেন। ১৯৪০ সালের কথা। কবির শরীর তখন খুব একটা ভালো যাচ্ছিলো না। ডাক্তারের পরামর্শে হাওয়া বদলের জন্য তাকে আনা হয়েছিলো কালিম্পং-এ। এখানে কিছুদিন কাটানোর পর তার শরীর আরো খারাপ হয়ে গেলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে পাহাড় থেকে সমতলে নামিয়ে নেয়া হয়েছিলো। এ্যাম্বুলেন্সে ফিরেছিলেন কোলকাতায়।

কালিম্পং এর গড় উচ্চতা ১২০০ মিটার। এক সময় এই শহরের মধ্য দিয়েই তিব্বতে বাণিজ্য হতো। সম্ভবত যখন সিকিম স্বাধীন ছিল। ইতিহাস বলে, কালিম্পংয়ে নাকি এক সময় ভুটানের রাজ্যপালের কেন্দ্রীয় দপ্তর ছিল। কালিম শব্দের অর্থ হচ্ছে রাজার মন্ত্রী। আর পং শব্দের অর্থ হচ্ছে ক্ষমতার কেন্দ্র। তার মানে এটি কি তখন ভুটানের অংশ ছিলো? এখান থেকে ভুটান খুব কাছে।

ছোটবেলায় আমরা অনেক ভুতের গল্প শুনেছিলাম। এখনো অনেক রহস্য গল্প নিয়ে নাটক সিনেমা হচ্ছে। গহীন বন, ঘন অরণ্য- এসব শব্দগুলো বলা চলে কালিম্পং এর জন্যই প্রযোজ্য। ফুল এবং অর্কিড চাষের জন্য জায়গাটি বিখ্যাত। ক্যাকটাসের কথা তো আগেই বলেছি। এখানে সোনালি ওক গাছ রয়েছে। এর মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলে অনেকটা ব্লাক ফরেস্টের অনুভূতি পাওয়া যায়।

আপনি যদি ঈদের ছুটিতে শীতের পরশ মেখে, এমন অনুভূতি, এমন প্রকৃতি আর এমন মেঘেদের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে হারিয়ে যেতে চান, তবে নির্দ্বিধায় চলে যেতে পারেন কালিম্পংয়ে। যেখানে এমন মেঘেদের লুকোচুরির সঙ্গে পাবেন সকল রকমের আধুনিকতাও। আর যদি চান একদম নির্জন কোনো প্রকৃতি বা পাহাড়ি পল্লী তাহলে চলে যেতে পারেন কালিম্পংয়ের যে কোনো পাহাড়ি গ্রামে, ইচ্ছে গাঁওয়ে। না গেলেই মিস!

ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা হয়ে শিলিগুড়ি থেকে বাসে বা জীপে করে চলে যেতে পারেন কালিম্পং। খুব সহজে আর অল্প খরচেই ঘুরে আসতে পারেন এই ঈদে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে