পাঁচটি আবিষ্কারেই সফল বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. বেলাল 

পাঁচটি আবিষ্কারেই সফল বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. বেলাল 

সাক্ষাৎকার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০২ ১৮ জুন ২০২০   আপডেট: ১৫:০৩ ১৮ জুন ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সম্প্রতি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষক এবং সমুদ্রবিজ্ঞানী ড. মো. বেলাল হোসেন নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ‘গ্লাইসেরা শেখমুজিবি’ নামে একটি জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণির সন্ধান দিয়েছেন। 

ড. বেলাল ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ‘ন্যাফটাইস বাংলাদেশি’ নামের প্রথম একটি অমেরুদন্ডী পলিকীটের নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেন। ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে ‘ন্যাফটাইস বাংলাদেশি’ এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেন। ব্রুনাইয়ে থাকার সময় সেই দেশের সাগর উপকূল চষে বেড়িয়েছেন তিনি। সেখান থেকে ‘ভিক্টোরিওপিসা ব্রুনেইয়েনসিস’ নামের আরেকটি অমেরুদণ্ডী নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেন। ২০১৬ সালের ১ জুন আবিষ্কৃত নতুন এই এম্পিপোডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন।

২০১৮ সালে এই কৃতি অধ্যাপক নোয়াখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে আরো দুটি ‘নিউমেনিয়া নোবিপ্রবিয়া’ ও ‘অ্যারেনুরাস স্মিটি’ নামের নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণী আবিষ্কার করেন। ২০১৮ সালে ১৪ মে মাইটস দুইটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন।

২০২০ সালে নোয়াখালীর হাতিয়া উপকূলের জলাভূমি থেকে ‘গ্লাইসেরা শেখমুজিবি’ নামে আরেকটি নতুন অমেরুদণ্ডী পলিকীটের নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেন ড. বেলাল। ২০২০ সালে ২৬ মে 'গ্লাইসেরা শেখমুজিবি ' এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেন। এখন পর্যন্ত ৫ টি আবিষ্কারেই সফল হয়েছেন ড. বেলাল।


বর্তমান কর্মব্যস্ততা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাইনুদ্দিন পাঠান। 


ডেইলি বাংলাদেশ: সম্প্রতি নতুন অমেরুদণ্ডী প্রাণির সন্ধান দিয়েছেন- এসম্পর্কে যদি একটু বিস্তারিত বলতেন

ড. বেলাল: সম্প্রতি হাতিয়ার নিকটবর্তী মেঘনা নদীর মোহনা থেকে ‘Glycera sheikhmujibi’ নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন  প্রজাতি আবিষ্কার করি। প্রজাতিটি বঙ্গোপসাগরে বসবাসকারী গ্লাইসেরা গণের ১১ টি প্রজাতির একটি এবং বাংলাদেশের উপকূলের দ্বিতীয় আবিষ্কৃত প্রজাতি। গত পাঁচ বছর পৃথিবীর বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ড. প্যাট হ্যাচিং এর সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করছি। গবেষণার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের নোয়াখালী উপকুলীয় অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কিছু পলিকীট নমুনা সনাক্ত করতে গিয়ে দেখতে পাই সদ্য আবিষ্কৃত প্রজাতিটি বৈশিষ্টের দিক থেকে Glycera গণভূক্ত অন্যান্য স্বীকৃত ৮০ টি প্রজাতি থেকে আলাদা। অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম রিসার্চ ইন্সটিটিউটে সংরক্ষিত এই গণভুক্ত আরো বেশ কিছু নমুনার সঙ্গেও তুলনা করা হয়। চূড়ান্তভাবে নতুন প্রজাতি হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অত্যাধুনিক Scanning Electron Microscope (SEM) প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়। গত চার বছর ধরে পৃথিবীর বিভন্ন দেশে এই গণ নিয়ে যেসব বিজ্ঞানী গবেষণা করেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় এবং অভিজ্ঞ মতামত নেয়া হয়। পরে ড. প্যাট হ্যাচিংস সহ এই প্রজাতিটির স্বীকৃতি লাভের জন্য গবেষণার ফলাফল সুইজারল্যান্ড থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ট্যাক্সনমিক জার্নাল ‘DIVERSITY’ তে পাঠানো হয়। গত ২৬ মে, ২০২০ তারিখে ‘Glycera sheikhmujibi n. sp. (Annelida: Polychaeta: Glyceridae): A New Species of Glyceridae from the Saltmarsh of Bangladesh’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। একই দিনে বিশ্ব স্বীকৃত ডাটাবেইজ  ‘Zoobank’  এ অন্তর্ভূক্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রজাতিটি নতুন হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।


ডেইলি বাংলাদেশ: এই জলজ প্রাণিটি দেখতে কেমন?

ড. বেলাল: ‘গ্লাইসেরা শেখমুজিবি’ দৈর্ঘ্যে ৪২ মি.মি.। এটি সর্বমোট ১৫৮টি ভাগে বিভক্ত এবং দেহের মধ্যভাগে ২.২ মি.মি. প্রস্থ। নলাকার, নমনীয় ও প্যাপিলা দ্বারা আবৃত ঘণ্টাকৃতির দীর্ঘায়িত চোষক মুখ এর অন্যতম শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। এই প্রাণীর চোখ নেই। চোষকের প্রান্তিক অংশে চারটি কালো হুকের মতো চোয়াল রয়েছে। চোষকে তিন ধরনের প্যাপিলা থাকে। চোষকের দুই জোড়া চোয়াল শক্ত ত্রিকোণাকৃতির এই লেরনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এছাড়া দেহের মাঝখানে সমান অঙ্গুালাকৃতির লোব আছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আর কে কে এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন?

ড. বেলাল: গবেষণার সঙ্গী হিসেবে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পলিকীট বিজ্ঞানী ড. প্যাট হ্যাচিংস।

ডেইলি বাংলাদেশ: বিজ্ঞানে কাজ করার জন্য কে বেশি আপনাকে উৎসাহ দিয়েছেন? 

ড. বেলাল: আমার বড় ভাই অধ্যাপক ড. জয়নাল আবেদিন ও আমার সুপারভাইসর  অধ্যাপক ড. নুরুদ্দিন মাহমুদ।

ডেইলি বাংলাদেশ: নতুন আবিষ্কৃত জলজ প্রাণিটি মানবকল্যাণে কিভাবে অবদান রাখতে পারে?

ড. বেলাল: এই প্রজাতিটি মানবকল্যাণে কিভাবে অবদান রাখতে পারে সেই বিষয়ে এখনো গবেষণা হয়নি। তবে এই প্রজাতিটি যে গণের অন্তর্ভুক্ত  অর্থাৎ গ্লাইসেরা এর অন্যান্য কিছু প্রজাতি গ্লাইসেরটক্সিন নামে এক ধরেণের নেউরটক্সিন নিঃসরণ করে যা ওষুধশিল্পে ব্যাবহার করা যেতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনার বর্তমান সন্ধানকৃত প্রাণিটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে নামকরণ করেছেন- কোনো ব্যাখ্যা আছে কি?

ড. বেলাল: সাধারণত একটা নতুন প্রজাতির নাম কী হবে তা নির্ভর করে আবিষ্কারকের উপর। আবিষ্কারক ইচযন নিয়ম মেনে কোনো প্রিয় বা বিখ্যাত ব্যক্তির/ প্রজাতিটির প্রাপ্তির স্থান/ প্রজাতিটির উল্লেখযোগ্য কোনো বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নামকরণ করেন। তাই আমরা নতুন প্রজাতির নামকরণ করেছি বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি ও বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গৌরবময় ভূমিকা ও গবেষণা ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনন্য অবদান চির স্মরণীয় করে রাখতে এই নামকরন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তার বাল্যকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এদেশের নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে গেছেন। স্বাধীনচেতা, মুক্তিপাগল, আলোর দিশারি, অন্যায়ের প্রতিবাদকারী ও আপোষহীন বঙ্গবন্ধুকে এ জন্য বছর এর পর বছর জেল- জুলুম  সহ্য করতে হয়েছে। স্বাধীনতাত্তোর ধ্বংসস্তূপের বাংলাদেশকে অতি স্বল্প সময়ে তার দক্ষতা ও দৃঢ়তার মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে নানা-মুখী সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তার সময়কালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)। এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১১ টি গবেষণা পরীক্ষাগার রয়েছে, যাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা বিষয়ে গবেষণা হয়ে থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ: গবেষণায় কোন ধরণের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে? 

ড. বেলাল: গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড ও ল্যাব সুবিধা না থাকা গবেষণার গতিকে মন্থর করে দেয়।

ডেইলি বাংলাদেশ: গবেষণার ক্ষেত্রে পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমন সমর্থন পেয়ে থাকেন?

ড. বেলাল: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান  উপাচার্য একজন গবেষক ও বিজ্ঞানী। তাই তিনি গবেষণার গুরুত্ব বুঝেন। তিনি সব সময় আমাদের গবেষণায় উৎসাহ দেন। আমার নতুন প্রাজিতির জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ মহোদয়ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। পরিবার  উচ্চ শিক্ষিত হওয়ায় সব সময় সমর্থন দেয়।

ডেইলি বাংলাদেশ: গবেষণা নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী? 

ড. বেলাল: আমাদের উপকূলীয় সামুদ্রিক অঞ্চল অত্যন্ত জীববৈচিত্রপূর্ণ। অপ্রতুল গবেষণার জন্য আমরা এখনো আমাদের জীববৈচিত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারিনি। তাই আমি চেষ্টা করব জীববৈচিত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করার।

ডেইলি বাংলাদেশ: গবেষণা করতে গিয়ে কি কোনো বরাদ্দ পেয়েছেন?

ড. বেলাল: এই নতুন প্রাজাতির জন্য পাইনি। তবে উপকূলীয় অঞ্চলে মেটাল দূষণ গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান সময়ের কিছু অংশ ডেইলি বাংলাদেশকে দেয়ার জন্য

ড. বেলাল: ধন্যবাদ ডেইলি বাংলাদেশকে

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর