পলিথিন গলিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করেছেন ৭০ বছরের বৃদ্ধা

পলিথিন গলিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করেছেন ৭০ বছরের বৃদ্ধা

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১৪ ২৮ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৮:১৪ ২৮ মার্চ ২০২০

ছবি: এমিলিয়া রায়

ছবি: এমিলিয়া রায়

শিল্পকর্ম তৈরি এবং তা প্রদর্শনের মাধ্যমে খ্যাতি কুড়িয়েছেন অনেকেই। তবে খ্যাতি নয় নিজের স্বপ্ন আর ইচ্ছেগুলোকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে এক বৃদ্ধা পলিথিন গলিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

যে বয়সে মানুষ বার্ধক্যের কারণে ঠিকভাবে চলাফেরা করতেই পারে না সেই বয়সে তিনি কিনা পলিথিন গলিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। দিন রাত পরিশ্রম করে তিনি তার এই স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাহুৎপাড়া গ্রামের পাঁচ সন্তানের জননী বৃদ্ধা এমিলিয়া রায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকতে, কবিতা ও গান লিখতে ভালোবাসতেন। নিজের লেখা গানে কণ্ঠ দেয়ার প্রতিও ছিল তার প্রচণ্ড ঝোঁক। এসএসসি পাশ করার পরেই তার বিয়ে হয় আলফ্রেড রায়ের সঙ্গে। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় লেখাপড়া থেমে গেলেও দমে যায়নি তার উদ্ভাবনী ইচ্ছাশক্তি। 

স্বামীর সংসারে এসে তিনি আবারো শুরু করেন ছবি আঁকা, কবিতা ও গান লেখা। দাম্পত্য জীবনে দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জননী এমিলিয়া রায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার ও ছেলে মেয়েদেরও দেখাশুনার সব দ্বায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার সৃষ্টিশীল কাজও চালিয়ে যান। নানা গুণের অধিকারী এই নারী নিজের কল্পনা আর ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সহজ উপায় এবং কম খরচে সৃষ্টিশীল কিছু করার চেষ্টা করেন। আর তাই সে বেছে নেয় ফেলনা পলিথিনগুলো। 

তিনি বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে এই পলিথিন সংগ্রহ করে তা চুলায় গলিয়ে শুরু করেন ভাস্কর্য তৈরির কাজ। শিল্প দক্ষতা আর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় পর্যায়ক্রমে তিনি তৈরি করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ১৫ আগস্টের শহিদ শেখ রাসেল, মানব সেবার পথিকৃৎ মাদার তেরেসা, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাস্কর্য। এছাড়াও ছোট বড় নানা ধরনের বিভিন্ন ভাস্কর্য পলিথিন গলিয়ে তৈরি করেছেন তিনি। তবে এগুলো তিনি বিক্রির জন্য তৈরি করেননি। 

১৯৯০ সালের কোনো একদিন রান্না করা গরম কড়াই পাশের পলিথিন ব্যাগের উপর রাখায় পলিথিন ব্যাগ গলতে দেখে ওই পলিথিনের মাধ্যমেই নতুন করে তার এই উদ্ভাবনীর ইচ্ছা কড়া নাড়ে তার মনে। সেদিন থেকে পরিবারের ফেলে দেয়া পলিথিন ব্যাগসহ বিভিন্ন মানুষের মাধ্যমে তা সংগ্রহ করে আগুনে পুড়িয়ে শুরু হয় বৃদ্ধার ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ। শারীরিক অসুস্থতায় হাঁটাচলা করতে ও কথা বলতে কষ্ট হলেও মনের মাধুরী মিশিয়ে আজো তিনি এসব শিল্পকর্ম তৈরির কাজ করেই চলেছেন।

তার অভিনব সৃষ্টি দেখতে সর্বদাই ভিড় জমায় নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই আবিষ্কারকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ করা গেলে দেশে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলবে বলে জানায় এমিলিয়া রায়। তার মেয়ে জানায়, যদি গ্রামের অন্যান্যরাও এ ধরনের শিল্পকর্ম করতে পারতো তবে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ হতো। পাশাপাশি পলিথিন পুড়িয়ে এসব করার মাধ্যমে পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকতো। 

শুধু পলিথিন দিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণই নয় বরং গুণী শিল্পী এমিলিয়া রায় ছবি আঁকাতেও পারদর্শী। তিনি তার ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের বিভিষীকাময় দৃশ্যগুলো। এছাড়াও মানুষের মাথার চুল সংগ্রহ করে তা দিয়ে তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর মুখমণ্ডল সম্বলিত অপরূপ বাংলাদেশের মানচিত্র। শিল্পী এমিলিয়া রায় জানায়, শেষ জীবনে তার ইচ্ছা নিজের হাতে তৈরি করা ভাস্কর্যগুলো মমতাময়ী মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয়া। তবে সব ভাস্কর্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও শেখ রাসেলের বাঁচার আকুতি ভরা নিপুণ ভাস্কর্যটি নিজের কাছেই রাখতে চান তিনি। 

কারণ হিসেবে তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার তিন বছরের ছেলে তিনু রায় অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের অভাবে বিনা চিকিৎসায় চোখের সামনে ধুকে ধুকে মারা যায়। শেখ রাসেলের আকুতি ভরা ভাস্কর্যের মধ্যে তিনি খুঁজে পেতে চান নিজের হারানো ছেলে তিনুকে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস