পর্দা প্রথার মাঝে থেকেও নারী শিক্ষা ও চিকিৎসায় অগ্রদূত যে নারীরা 

পর্দা প্রথার মাঝে থেকেও নারী শিক্ষা ও চিকিৎসায় অগ্রদূত যে নারীরা 

মো: হাসানুজ্জামান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৫৬ ৮ মার্চ ২০২০   আপডেট: ২০:০৮ ১২ মার্চ ২০২০

যে নারীরা স্বীয় প্রতিভায় নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছেন

যে নারীরা স্বীয় প্রতিভায় নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছেন

মানব সভ্যতার উৎকর্ষতার পেছনে নারী পুরুষের সমান অবদান। তবে সমাজ রাষ্ট্রের বেড়াজালে নারীকে যুগে যুগে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন, মুক্ত বুদ্ধির চর্চা, সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এরূপ নানাবিধ কারণে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থান অনেকটা সুসংহত। 

বাংলার ইতিহাসে যুগে যুগে নারীকে গৃহবন্দী করে রাখার প্রথাই বিদ্যমান ছিল। তা সত্ত্বেও সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতিতে আধুনিক যুগের সূচনালগ্ন থেকেই স্বীয় প্রতিভায় নারীরা নিজের অবস্থান জানান দিয়েছেন। এমনই কয়েকজন নারীর জীবনী সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ করা হলো-

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন একাধারে সমাজ সংস্কারক, সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, নারী অধিকার আন্দোলন এবং জাগরণের পথিকৃৎ। তিনি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার অন্তর্গত পায়রাবন্দ গ্রামে ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি সম্ভ্রান্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জহীরুদ্দীন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের বহু ভাষায় পারদর্শী হলেও নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে ছিলেন রক্ষণশীল। সুতরাং পিতৃগৃহে বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বড় বোন করিমুন্নেসার কাছ থেকে সামান্য বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেন। 

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনরোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

১৮৯৭ সালে ভাগলপুর নিবাসী উর্দুভাষী বিপত্নীক সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন পেশায় ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রগতীশীল দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। স্বামীর উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণাতেই বেগম রোকেয়া বাংলা ও ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করেন এবং সহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। ১৯০৯ সালে স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি সমাজ সেবা ও নারীশিক্ষা বিস্তার জীবেনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেন।

প্রথম পর্যায়ে স্বামীর প্রদত্ত অর্থ দ্বারা ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর পাঁচ জন ছাত্রী নিয়ে ভগলপুরে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল স্থাপন করেন। পারিবারিক বাঁধার কারণে তিনি ভাগলপুর ছেড়ে কলকাতায় বসবাস করতে বাধ্য হন। কখনো তিনি হাল ছাড়েননি। ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতার ১৩ নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়িতে আটজন ছাত্রী নিয়ে পুনরায় ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।

তারই অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯১৭ সালে এই স্কুল মধ্য ইংরেজি গার্লস স্কুলে এবং ১৯৩১ সালে উচ্চ ইংরেজি গার্লস স্কুলে রূপান্তরিত হয়। বেগম রোকেয়াআমৃত্য এই স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি লেখনীর মাধ্যমে সমাজের কুসংস্কার ও জড়তা দূর করার আহ্বান জানান। নারী শিক্ষা ও জগরণের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা চিরস্মরণীয়।
 ফজিলতুন্নেসাফজিলতুন্নেসা (১৮৯৯-১৯৭৭)

ফজিলতুন্নেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের প্রথম মুসলিম ছাত্রী হিসাবে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এম এ পাশ করেন এবং স্বর্ণ পদকে ভূষিত হন। ১৯২৮ সালে তিনি গণিত শাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য ইংল্যান্ড গমন করেন। ফজিলতুন্নেসাই নিখিল বঙ্গে প্রথম মুসলিম নারী স্নাতকধারী। তিনি ১৯৩০ সালের আগস্টে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সমাজ সেবক সংঘের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সওগাত, শিখা প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নারীমুক্তি এবং নারীশিক্ষা নিয়ে গল্প ও প্রবন্ধ রচনা করেন।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীনওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪-১৯০৩)

সমাজসেবী, নারী শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক এবং কবি ফয়জুন্নেসা চৌধুরনী কুমিল্লা জেলার লাকসামের পশ্চিম গাঁও গ্রামে ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কঠিন পর্দা প্রথার ভিতর থেকেও তিনি আরবি, ফারসি, উর্দু, বাংলা ও সংস্কৃত ভাষার ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে ১৮৭৩ সালে কুমিল্লায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন তিনি। 

এটি উপমহাদেশে বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের প্রাচীনতম স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম। কালক্রমে এটি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং নাম হয় নবাব ফয়জুন্নেসা কলেজ। পর্দানশীন ও দরিদ্র নারীদের চিকিৎসার জন্য তিনি নিজ গ্রামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। মহারানি ভিক্টোরিয়া কর্তৃক তিনি নওয়াব উপাধীতে ভূষিত হন। 

মাতঙ্গিনী হাজরামাতঙ্গিনী হাজরা (১৮৭০-১৯৪২) 

মাতঙ্গিনী হাজরা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হন। তিনি মানবতাবাদী এবং গান্ধীবাদী নেত্রী ছিলেন। তার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের মেদেনীপুর জেলায়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেন এই নারী। ৭২ বছর বয়সী মাতঙ্গিনী হাজরা ১৯৪২ সালে জাতীয় পতাকা হাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সৈন্যদের গুলিতে শহিদ হন। জাতীয় পতাকা উঁচুতে ধরে রেখেই মৃত্যুবরণ করেন এই দেশপ্রেমী।

মনোরমা বসুমনোরমা বসু (১৮৯৭-১৯৮৬)

সমাজসেবী, সংগঠক ও স্বদেশী আন্দোলের এই নেত্রী ১৮৯৭ সালে বরিশালের বনারীপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার স্বামীর প্রত্যক্ষ সমর্থনে স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন মনোরমা। ১৯৩২ সালে আইন অমান্য করে আন্দোলনে যোগ দেয়ায় ব্রিটিশ সরকার তাকে কারারুদ্ধ করে। দুস্থ নারীদের জন্য তিনি ‘মাতৃমন্দির আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করেন। আমৃত্যু তিনি এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি জীবনভর দেশপ্রেম, সমাজসেবা, মানব কল্যাণ এবং মানবমুক্তির জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।

সূত্র: বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান এবং বাংলাপিডিয়া

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এনকে/আরএজে