পরিসংখ্যানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সিজিপিএ রনির

পরিসংখ্যানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সিজিপিএ রনির

আরাফাত হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩৫ ১৬ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৭:১২ ১৬ মার্চ ২০২০

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকও

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকও

বলা হয়ে থাকে মানুষের জীবনে প্রতিটা সীমাবদ্ধতা নতুন কোনো সম্ভাবনার পথ উন্মোচন করে দেয়। প্রতিটি বাধার ধার খুলে দেয় নতুন কোনো সাফল্যের। তার জলজ্যান্ত প্রমাণ সাজেদুর রহমান রনি।

রনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারেননি আর্থিক সমস্যার কারণে। তাই বাধ্য হয়ে পরিসংখ্যান নিয়ে ভর্তি হয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুরুতে ভেবেছিলেন বিএসসি শেষ করতে পারবেন না হয়তো। অথচ চার বছর পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জনের রেকর্ডধারী হলেন তিনি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকও।

পুরো নাম সাজেদুর রহমান হলেও সবার কাছে রনি নামেই। জন্ম রাজশাহী জেলার দূর্গাপুর থানার কয়ামাজমপুর গ্রামে। বেড়ে ওঠেন গ্রামেই। কৃষক বাবার সংসারে তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। লেখাপড়া শুরু করেন কায়ামাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোট থেকেই মেধাবী ছিলেন রনি, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বৃত্তি পেয়েছিলেন। এরপর ভর্তি হন কায়ামাজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় মায়ের কিডনিজনিত সমস্যার দেখা দিলে ব্যস্ত হয়ে যান বাবা। তখন পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে সংসারের হাল ধরতে হয় রনিকে। নেমে পড়েন কৃষিকাজে, তবে বন্ধ করেননি পড়ালেখা। প্রায় তিন বছর চলে মায়ের চিকিৎসা। ততদিনে বিজ্ঞান গ্রুপ থেকে এসএসসি শেষ করেন। 

একদিকে গ্রামের স্কুল হওয়ায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে অর্থাভাবে প্রাইভেট-কোচিং করতে না পারা; সব মিলিয়ে এসএসসি রেজাল্ট খুব একটা ভালো হলো না তার। এসএসসির পর এইচএসসিতে ভর্তি হন স্থানীয় তাহেরপুর ডিগ্রী কলেজে। আর্থিক দৈন্যদশার কারণে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিলেও প্রাইভেট কোচিং করারও কোনো সুযোগ পাননি তিনি। তাই এইচএসসিতে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর খুঁটিনাটি ভালো করে শেখা হয়নি তার। তাছাড়া এইচএসসির পর অর্থাভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ কিছুই হয়ে ওঠেনি। 

ছোটোবেলা থেকে গ্রামের বাইরে কোথাও যাওয়া হয়নি কখনো। প্রথমবারের মতে গ্রাম থেকে রাজশাহী শহরে এসে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।  এদিকে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর প্রতি, বিশেষ করে গণিতে আলাদা একটা ভালোলাগা কাজ করতো। তাই ভেবেছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতেই অনার্স করবেন। কিন্তু ফলাফল প্রকাশ হলে জানতে পারেন তিনি পরিসংখ্যান পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। পরবর্তীতে মাইগ্রেশন করে গণিতে যাওয়ার চিন্তা করলেও পারিপার্শ্বিক কিছু বিষয় চিন্তা করে পরিসংখ্যানেই থেকে যান। অনার্সের শুরুতে ক্যালকুলাস সম্পর্কিত কিছু সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে মনে হয়েছে অনার্সটা বুঝি শেষ করা হবে না তার। এসময় স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা স্যারের ব্যাপারে জানতে পারেন। রনি তখন গোলাম মোস্তফা স্যারের শরণাপন্ন হলে স্যার ধীরে ধীরে রনির মন থেকে ক্যালকুলাস, ফান্ডামেন্টাল অব ম্যাথম্যাটিক্সের ভয় দূর করেন। রনিও ধীরে ধীরে মজে যান পরিসংখ্যানে। 

অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে সবাইকে রীতিমতো চমকে দেন তিনি। কারণ রাজশাহী কলেজে পরিসংখ্যান ডিপার্টমেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেন তিনি। সেবার তার এসজিপিএ ছিলো ৩.৯১। পরের বছর পোড়াশোনায় আরো মনযোগ বাড়িয়ে দেন। তার প্রভাব পড়ে দ্বিতীয় বর্ষের ফলাফলে। দ্বিতীয় বর্ষে তার এসজিপিএ ছিলো ৩.৯৩। ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল অর্জন করায় সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন তিনি। সেসময় নিজের কয়েকজন ব্যাচমেটকে পড়ানো শুরু করেন। এছাড়াও ইমিডিয়েট জুনিয়র কয়েকজনও রনির কাছে পরিসংখ্যানের বিভিন্ন বিষয় পড়া শুরু করে। তৃতীয় বর্ষের শুরুতে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন। প্রতিষ্ঠিত করেন রাজশাহী কলেজ স্ট্যাস্টিস্টিক্যাল পাইওনিয়ার ক্লাব। এটা ছাড়াও ক্যাম্পাস ভিত্তিক বেশ কয়েকটা ক্লাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এতকিছুর পরেও তৃতীয় বর্ষেও পরীসংখ্যান ডিপার্টমেন্টে দেশসেরা হন রনি। অর্জন করেন সিজিপিএ ৩.৯৪। ভালো ফলাফলের ধারা বজায় রাখেন শেষ বর্ষেও। শেষ বর্ষে তার এসজিপিএ ছিলো ৩.৯৮। সব মিলিয়ে রনির গড় সিজিপিএ ছিলো ৩.৯৪। যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে পরিসংখ্যান ডিপার্টমেন্টে সবচেয়ে ভালো ফলাফল। এর স্বীকৃতি স্বরুপ ২০১৮ সালে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একমাত্র শীক্ষার্থী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকের জন্য নির্বাচিত হন। গত ফ্রেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর নিজ কার্যালয়ে স্বর্ণপদক বিজয়ী অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রনির হাতেও তুলে দেন এ পদক।

ভালো ফলাফলের রহস্য জানতে চাইলে সাজেদুর রহমান রনি বলেন, ভালো ফলাফল বলতে কৃষক বাবার কষ্টের টাকা যেনো বৃথা না যায় সে চেষ্টাই করেছি। আমি আমার ভালো ফলাফলের জন্য মা-বাবা ও সকল শিক্ষদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাদের ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। পাশাপাশি আমার সহপাঠী জাকির হোসেনকেও ধন্যবাদ আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য।

বর্তমানে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে পরিসংখ্যানে মাস্টার্স করার পাশাপাশি বিসিএস এর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ভবিষ্যতে শিক্ষক হয়ে মানুষ গড়ার কারিগর হতে চান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম