পরিবারের কেউ মারা গেলেই কেটে ফেলা হয় অন্যদের আঙুল

পরিবারের কেউ মারা গেলেই কেটে ফেলা হয় অন্যদের আঙুল

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৫৮ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৪:০৮ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

প্রিয়জন বিয়োগের ব্যথা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউই টের পান না! এজন্যই বোধ হয় বলে, যার চলে যায় সেই বোঝে! তাই বলে প্রিয়জনের মৃত্যুতে নিজের একটি আঙুল কেটে ফেলার সাহস কি আপনার আছে? সম্ভবত নেই! 

তবে ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম নিউ গিনির এক পাহাড়ি আদিবাসীরা কিন্তু এই কাজ সহজেই করতে পারে। নির্মম এক প্রথা বটে! ধারণা করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন উপজাতির মধ্যে তারা অন্যতম। তাদেরকে বলা হয় দানি উপাজাতি। এদের বেশ কয়েকটি আজব রীতি রয়েছে যেগুলো সাধারণ মানুষের পক্ষে করা খুবই কঠিন। অথচ তারা অবলীলায় এসব কর্মকাণ্ড করতে পারে। 

উৎসবে দানিরাআজব যত রীতি

তাদের রীতিনীতির মধ্যে একটি হলো অন্তর্বাস হিসেবে একটি অস্বাভাবিক টুকরা যা কোটেকা নামে পরিচিত। এটি সাধারণত পুরুষরা ব্যবহার করেন। অন্যদিকে নারীরা ছোট স্কার্ট দিয়ে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখলেও শরীরের উপরের অংশ উন্মুক্ত রাখে। পোশাকের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি এই উপজাতির আরেকটি অদ্ভুত রীতি রয়েছে। 

প্রিয়জনের মৃত্যুর পরে আত্মীয়-স্বজনরা তাদের আঙুলের উপরের অংশটি শ্রদ্ধা ও শোকের চিহ্ন হিসেবে কেটে ফেলে। প্রিয়জনের হারানোর পর যে ব্যথা অনুভূত হয় তারই প্রতীক হিসাবে দেখা হয় কাটা আঙুলটি। তবে এই নিয়মটি শুধু নারীদের উপরই বর্তায়। পুরুষরা কখনো আঙুল কাটেন না। নারীদেরকেই এই রীতি মানতে হয়।

দানি পুরুষআবার তারা মৃতদেহ সংরক্ষণও করে থাকেন নিজ বাড়িতে। কতটা ভয়ঙ্কর বিষয় ভাবুন তো একবার! মৃত ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা জানাতে দানিরা মৃতদেহ সংরক্ষণ করেন। এমনকি তাদের প্রধান উৎসবেও যোগ দেয় এসব মৃতদেহ। দানিদের কারো ঘরে রয়েছে ৩৬০, ২০০, ১৫০ কিংবা ৫০ বছর বয়সের পুরনো মৃতদেহ। তবে সবাই কিন্তু মৃতদেহ সংরক্ষণ করেন না। অনেকেই মৃতদেহকে কবর দেন।

মৃতদেহ এভাবেই সংরক্ষণ করা হয়ইতিহাস ও ঐতিহ্য

১৯৩৮ সালে সমাজসেবী, রিচার্ড আর্চবোল্ডের এক অভিযানে প্রথম দানি সম্প্রদায়ের সন্ধান মেলে। সেই তখন থেকে আজো অব্দি তারা একই নিয়ম কানুন ও ঐতিহ্যকে আগলে রেখেছেন। দানি উপজাতির নারীরা রান্না করেন মাটির গর্তের ন্যায় করা এক চুলায়। ওভেনের মতো এটি তারা ব্যবহার করেন। বেশিরভাগ খাবারই তারা সিদ্ধ করে খেয়ে থাকেন। 

দানি নারীরাখাবারের মেন্যু শুনলেই চমকে উঠবেন! আস্ত মুরগি কলা পাতায় মুড়িয়ে সিদ্ধ করে খান তারা। এভাবেই শূকরের মাংসও খান তারা। তারা অত্যাধিক মিষ্টি আলু, কলা খেয়ে থাকেন। তাদের উৎপাদিত ফসলের মধ্যে অন্যতম হলো মিষ্টি আলু। বাঁশ কেটে তারা ছুরি তৈরি করেন এবং কলার পাতাকেই চামচ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে দানিরা। 

দানি উপজাতিরা আবার অতিথি আপ্যায়নে বেশ পটু। তারা নিজ এলাকায় বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার দিয়েছেন। বিগত কয়েক দশক ধরে তাদের অঞ্চলে পর্যটকদের সমাগম লেগেই থাকে। কারণ তাদের অদ্ভুত জীবন ধারণের পদ্ধতি। বহিরাগতদের সবসময় স্বাগত জানায় তারা। যদিও দানিরা বাহাসা ইন্দোনেশিয়া বা ইংরেজি বলতে পারে না। তবে দর্শনার্থীদের শারীরিক ভাষা এবং হাতের চিহ্নের মাধ্যমে তারা সবটাই বুঝতে সক্ষম হন।

চুলায় সেদ্ধ হচ্ছে খাবার, তুলে নিতে প্রস্তুত নারীঐতিহ্যবাহী উৎসব

প্রতি বছরই দানিরা একটি প্রধান উৎসব উদযাপন করেন। সেই অঞ্চলেরই অন্যান্য উপজাতির সঙ্গে সেদিন মক যুদ্ধে অংশ নেয়া হয়। এটি আগস্ট মাসের দিকে অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে সমস্ত উপজাতি- দানি, ইয়ালি এবং লানিরা তাদের সেরা যোদ্ধাদের নিয়ে আসেন। কারা শক্তিতে সেরা তা প্রমাণের চেষ্টা করেন আদিবাসী এসব সৈন্যরা। ওইদিনই দানিরা শূকর রান্নার অনুষ্ঠান পালন করেন। এটি রান্নার জন্যও তারা মাটির ওভেন ব্যবহার করে। 

যুদ্ধে কে কত বেশি শক্তিশালী?তাদের প্রধান ফসল- মিষ্টি আলু, কলা এবং কাসাভা। এগুলোও শূকর রান্নায় ব্যবহৃত হয়। প্রথমে তারা ওভেনটি অত্যন্ত উত্তপ্ত করেন। এরপর কয়েকটি পাথরের উপর মাংসের কাটা টুকরা, কলা পাতার ভিতরে মিষ্টি আলু বা কলার টুকরা রাখা হয়। সেই পাথর আবার চুলার মধ্যে রাখা হয়। অতঃপর তার উপর আরো কয়েকটি পাথর এবং পরে ঘাস দিয়ে পুরো মাটির চুলাটিই ঢেকে রাখা হয়। কয়েক ঘণ্টা পর গর্ত খুলে খাবারগুলো বের করা হয়। 

দানি দুই শিশুবিয়ের রীতি

দানিরা বহুগামী। তবে বিয়ের ক্ষেত্রে বরের কয়টি শূকর রয়েছে তা নির্ধারণ করা হয়। যে পুরুষের যত বেশি শূকর রয়েছে তিনিই সবচেয়ে বেশি বিয়ে করতে পারবেন। সমাজে তার খ্যাতিও অন্যদের তুলনায় অনেক। অল্প বয়সী নারীদের খুব দ্রুত বিয়ে হয় সেখানে। আর পুরুষরা স্বাবলম্বী হলেই তাদের বিয়ে করার অনুমতি মেলে।

ম্যালেরিয়া ও এইডস রোগে আক্রান্ত হয়েই বেশিরভাগ দানিরা প্রাণ হারায়। এছাড়াও চিকিৎসার অভাব, পারিপার্শ্বিক কুসংস্কার ও নোংরা পরিবেশই বিভিন্ন রোগ ব্যাধির জন্য দায়ী। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতীদের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ইন্দোনেশিয়ার এই অঞ্চলটি। 

সূত্র: ডেইলিমেইল

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস