পরকালের ভয়’ই পারে মানুষকে পাপ থেকে ফেরাতে

পরকালের ভয়’ই পারে মানুষকে পাপ থেকে ফেরাতে

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৫৭ ৫ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ২১:০০ ৫ আগস্ট ২০২০

পরকালের জবাবদিহিতার বিষয়টি যদি মানুষের দৃষ্টির সামনে না থাকে তাহলে দুনিয়ায় কঠিনতর আইনও তাকে অপরাধ ও চরিত্রহীনতা থেকে ফেরাতে পারে না।

পরকালের জবাবদিহিতার বিষয়টি যদি মানুষের দৃষ্টির সামনে না থাকে তাহলে দুনিয়ায় কঠিনতর আইনও তাকে অপরাধ ও চরিত্রহীনতা থেকে ফেরাতে পারে না।

যেসব বিশ্বাসের ওপর ইসলামের ভিত্তি, তন্মধ্যে তাওহিদ ও রিসালাতের পর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো পরকালে বিশ্বাস। 

পরকালে বিশ্বাসের অর্থ হলো মৃত্যুর পর মানুষ এমন একটি চিরস্থায়ী জীবনে পদার্পণ করবে যেখানে দুনিয়ায় কৃত সব কাজের হিসাব দিতে হবে। সেই চিরস্থায়ী জীবনকে পরকাল বলা হয়। 

কোরআনুল কারিমের বহুস্থানে এই বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে যে, পরকালে মানুষকে তার ভালো ও নেক কাজের পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তি দেয়া হবে।

فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ

অর্থ: ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ নেক কাজ করবে পরকালে সে তা দেখতে পাবে এবং অণু পরিমাণ গুনাহর কাজ করবে সেও তা দেখতে পাবে। (সূরা: যিলযাল, আয়াত: ৭)।

পরকালে চিরস্থায়ী জীবন যদিও এখন আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না কিন্তু পরকালের পুরস্কার ও শাস্তি আমাদের এই পার্থিব জীবনের অবধারিত পরিণতি।

আমরা বিশ্বজগতের সুনিপুণ, সুশৃঙ্খল ও হেকমতপূর্ণ ব্যবস্থাপনা দেখে বুঝতে পারি যে, বিশ্বজগত নিজে নিজে অস্তিত্ব লাভ করেনি বরং তাকে এমন কোনো সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন, যার কোনো কাজ হেকমত থেকে খালি নয়। আমরা দেখি পৃথিবীতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বসবাস করছে। ভদ্রজনও আছে। নীচ প্রকৃতির লোকও আছে। পরহেজগার লোকও আছে, গুনাহগারও আছে। জালেমও আছে, মজলুমও আছে।

যদি পার্থিব এ জীবনেই সবকিছু হয়ে যায় এরপর কোনো জীবন না থাকে তা হলে এ সব কর্মকাণ্ড অর্থহীন হয়ে যায়। কারণ এতে করে ভালো মানুষেরা ভালো কাজের পুরস্কার পাবে না এবং গুনাহগার ও জালেমদেরকে তাদের জুলুম, অত্যাচার ও নাফরমানির শাস্তি দেয়া যাবে না। এ বিষয়টি বিশ্বজগতের স্রষ্টার প্রজ্ঞার অনুকূল নয় যে, তিনি জালেম ও মজলুম এবং নেককার ও বদকারদের সঙ্গে একই আচরণ করবেন। অতএব, বিশ্বজগত এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, মৃত্যুর মাধ্যমেই মানুষের জীবন চিরকালের জন্য শেষ হয়ে যায় না বরং মৃত্যুর পর মানুষ সেই জগতে চলে যায়, যেখানে সে দুনিয়ার জীবনের পুরস্কার ও শাস্তি পায়।

কোরআনুল কারিমে এ দিকে ইঙ্গিত করে ইরশাদ হয়,

أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ

অর্থ: ‘তোমরা কি মনে কর আমি তোমাদেরকে অর্থহীন সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে না।’ (সূরা: মুমিনুন, আয়াত: ১১৫)।

এ থেকে বুঝা যায়, পরকাল, পুরস্কার ও শাস্তির বিষয়টি একটি বিবেকসম্মত বাস্তবতা। এ ছাড়া বিশ্বজগতের সব কর্মকাণ্ড অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অদেখা বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত করার জন্য এবং তার বিধি-বিধান শিক্ষা দেয়ার জন্য যত নবী-রাসূল পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, সবাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পরকাল বিশ্বাসের শিক্ষা দান করেছেন এবং পরকালের ঘটনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। কোরআনুল কারিমের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে পরকাল ও পারলৌকিক পুরস্কার ও শাস্তির বর্ণনা আছে।

কোরআন ও হাদিস এবং নবীদেরর শিক্ষায় পরকাল বিশ্বাসের ওপর এতটা গুরুত্বের সঙ্গে এ জন্য জোর দেয়া হয়েছে যে, মানুষকে মানুষ বানানোর জন্য পুরস্কার ও শাস্তির দৃঢ়বিশ্বাসের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী ও কার্যকর কোনো জিনিস নেই। মানুষের হৃদয় ও মস্তিষ্কে যতক্ষণ পর্যন্ত এই বাস্তবতা গেঁথে না যায় যে, তাকে আল্লাহ তায়ালার সামনে নিজের প্রতিটি কথা ও কাজের জবাব দিতে হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের নফসানি খাহেশাতের কৃতদাস বনে থাকে। ফলে গুনাহ, বদঅভ্যাস ও চরিত্রহীনতা থেকে তার মুক্তি নসিব হয় না।

পরকালের জবাবদিহিতার বিষয়টি যদি মানুষের দৃষ্টির সামনে না থাকে তাহলে দুনিয়ায় কঠিনতর আইনও তাকে অপরাধ ও চরিত্রহীনতা থেকে ফেরাতে পারে না। কারণ পুলিশ ও আদালতের ভয় বেশির চেয়ে বেশি দিনের আলোয় এবং শহরের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে তাকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে। কিন্তু রাতের অন্ধকার ও জঙ্গলের নির্জনতায় মানুষের হৃদয়ে পাহারা বসাতে পারে একমাত্র আলাহর ভয় ও পরকালের ফিকির।

হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেইশ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে যে বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটিয়েছেন তার অন্যতম প্রধান রহস্য হলো, তিনি দিনরাতের শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে পরকালের ধারণা এতটা দৃঢ়তার সঙ্গে গেঁথে দিয়েছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম আখেরাতের হিসাব-কিতাবকে প্রতিমুহূর্তে এমনভাবে দৃষ্টির সামনে রাখতেন যেন তারা তা খালি চোখে দেখছেন।

আখেরাতের এই ফিকির তাদের দ্বারা এমন এমন কঠিন কাজ সহজে করিয়ে নিত, যা বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা দানের পরও আনজাম দেয়া অসম্ভব মনে হয়। যেমন, মদ্যপানের একটি অভ্যাসের কথাই ধরুন। মদ্যপান একটি খারাপ অভ্যাস। এটি আজ পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্যজাতি কর্তৃক স্বীকৃত। মদ্যপান শরীরের জন্য ক্ষতিকর এবং এটি চরিত্রকেও নষ্ট করে। এ বিষয়ে আজকাল অনেক বড় বড় গবেষণাপত্র লেখা হচ্ছে এবং এর নানাদিক নিয়ে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কিন্তু আজকের সভ্য পৃথিবী, যারা নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক উন্নতিতে গর্বিত। নিজেদের অকাট্য দলিল-প্রমাণ, আকর্ষণীয় প্রচারপত্র, বিশেষ সাময়িকী এবং প্রচার-প্রচারণার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং মন-মানসিতা ও চিন্তাধারা পরিবর্তনের সর্বাধুনিক উপকরণ ব্যবহার করা সত্তেও মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি থেকে মদ ছাড়াতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। 

আজ সভ্যপৃথিবী মদ্যপান থেকে বিরত রাখার জন্য শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত এবং হাসপাতাল থেকে শুরু করে কবরস্থান পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে ও সর্বপ্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কিন্তু মদ্যপায়ীদের সংখ্যা দিন দিন শুধু বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে আরবের সেই সমাজের কথা চিন্তা করুন, যেখানে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হয়েছেন। জাহেলি যুগে ও ইসলামের প্রাথমিক যুগ পর্যন্ত আরবদের মদের সঙ্গে ছিল আবেগময় ভালোবাসার সম্পর্ক। আপনি সেযুগের আরবি কাব্যগুলো দেখুন, শুধু মদের জন্য কমবেশি আরাইশ শব্দের ব্যবহার আপনি পাবেন। মদ্যপান তাদের কাছে দোষণীয় হওয়া তো দূরের কথা, এটি তাদের কাছে ছিল গৌরব ও অহংকারের বিষয়। কিন্তু যখন কোরআনুল কারিম মদকে হারাম ঘোষণা করে তখন আরবজাতি তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের প্রিয়তম পানীয়কে এমনভাবে বিসর্জন দিয়েছিল, ইতিহাসে এর উদাহরণ পাওয়া কঠিন।

হজরত বুরাইদা রাদি. বলেন, যখন মদ হারাম হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হলো তখন একটি মজলিসে মদ্যপান চলছিল। যখন আমি তাদেরকে উক্ত আয়াত শোনালাম, তখন কারো কারো ঠোঁটে মদের পেয়ালা লাগানো ছিল। কারো কারো মদের ঢোক মুখে ছিল, যা এখনো গিলেনি তারা আয়াতটি শোনার পর ওই ঢোক গিলে নেয়াকেও মেনে নেয়নি। মুখ থেকে তা কুলি করে ফেলে দিয়েছেন এবং পাত্রগুলো উপুর করে মদ ফেলে দিয়েছেন। হজরত আনাস রাদি. বলেন, আমি এক মজলিসে লোকদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম। হঠাৎ একজন ঘোষকের আওয়াজ শুনলাম যে, মদ হারাম করা হয়েছে। তখন মজলিসের সবাই মদের পাত্রগুলো ঢেলে দিয়েছে এবং মটকাগুলো ভেঙ্গে ফেলেছে। সেদিন মদিনার অলি-গলি পানির মতো মদে ভেসে গিয়েছে।

অভ্যাস ও চরিত্রের এ বিস্ময়কর পরিবর্তন মূলত আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা এবং তাঁর পুরস্কার ও শাস্তির বিশ্বাসের কারণেই ঘটেছিল। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিশ্বাস সাহাবায়ে কেরামের রক্ত-কণিকায় মিশিয়ে দিয়েছিলেন। এ বিশ্বাসের ফলশ্রুতিতে রাসূলের (সা.) যুগে অপরাধ কমে কমে শূন্য পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। যদি মানবিয় চাহিদা ও স্বভাবের কারণে কারো থেকে কোনো অপরাধ ঘটে যেত তা হলে তাকে করার জন্য কোনো পুলিশের প্রয়োজন পরেনি বরং নিজেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে এবং অনুনয়-বিনয় করে নিজের ওপর শাস্তি প্রয়োগ করাতেন। কারণ তাদের হৃদয়ে এই কথা গেঁথে গিয়েছিল যে, দুনিয়ার শাস্তি পরকালের শাস্তির তুলনায় অনেক বহুগুণে সহজ ও সহনীয়। 

আজও যদি কোনো জিনিস অপরাধ ও সন্ত্রাস এবং ধোঁকা ও প্রতারণা থেকে পৃথিবীকে মুক্তি দিতে পারে সেটা হলো শুধু এবং একমাত্র আল্লাহর ভয়। পরকালের চিন্তা এবং পুরস্কার এবং শাস্তির বিশ্বাস কিন্তু এর জন্য এ বিশ্বাসসমূহের মৌখিক স্বীকারোক্তি যথেষ্ট নয় বরং প্রতিমুহূর্তে সেগুলোকে স্মরণ রাখা আবশ্যক। এর উপায় হলো কোরআন ও হাদিসে পরকালের যে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে সেগুলো বার বার পড়তে হবে, শত ব্যস্ততার মধ্যেও চিন্তা-ভাবনা করার জন্য কিছু সময় বের করতে হবে। চিন্তা-ভাবনার বিষয় হবে, মৃত্যুর পর কি হবে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘স্বাদ বিনষ্টকারী জিনিস অর্থাৎ মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ কর’।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ কথার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে