Alexa পঁচাত্তরের পিতৃহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবি ও কবিতা

পঁচাত্তরের পিতৃহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবি ও কবিতা

প্রকাশিত: ১১:২৮ ১৫ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১১:২৮ ১৫ আগস্ট ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

কলকাতার ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাটের বৈঠকখানায় এক সকালে বসে আছেন সুনীলদা। উল্টোদিকে একজন বাংলাদেশের কবি এসেছেন দেখা করতে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলে বসলেন- আমাদের বঙ্গবন্ধু...।

বেমক্কা ক্ষেপে গেলেন সুনীলদা। বললেন,’ শোন হে, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ যেমন শুধু আমাদের নন, তেমন বঙ্গবন্ধুও তেমন শুধু তোমাদের নন। উনি সারা বিশ্বের। উনি রাজনীতির কবি। কবি কথাটার মানে বোঝ?’ বাংলাদেশের সেই কবির তখন ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি অবস্থা ।

১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশিত নিউজউইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছিল- তিনি একজন রাজনীতির কবি, প্রকৌশলী নন। এই কথাটা সুনীলদা বহুবার উল্লেখ করে বলেছেন- কবিরা সেই বিরল প্রজাতিভুক্ত যাদের সৃষ্টির ব্যাখ্যা কোনো পরিমাপক যন্ত্রে মাপা যায় না, যা মাপা যায় একজন প্রকৌশলীর। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই কবি-শ্রেণিভুক্ত। তার সৃষ্টির পরিমাপ করা যায় না। শুধু বাংলাদেশ সৃষ্টি নয়, পৃথিবীতে উনি একটি দর্শনের জন্ম দিয়েছিলেন যাকে কবিতা ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আবেগ উচ্ছ্বাস চিরকালীন। তাকে নিয়ে যত কবিতা আজ অবধি বাংলায় লেখা হয়েছে, তত কবিতা আজ অবধি কোনো বাঙালিকে নিয়ে হয়নি। এমন কি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দকে নিয়ে লেখা মিলিত কবিতার চেয়েও বহুগুণ বেশি।

একটি অসাধারণ কবিতা যেটি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গান হয়ে বাঙালির হৃদয় উদ্বেলিত করেছিল, তা হলো- ‘শোনো, একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি। বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।’ অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতা ‘যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরী যমুনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ তো অমর হয়ে রয়েছে।

কবি নির্মলেন্দু গুণ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন অনেক কবিতা- ‘প্রচ্ছদের জন্য: শেখ মুজিবুর রহমানকে’, ‘সুবর্ণ গোলাপের জন্য’, ‘শেখ মুজিব ১৯৭১’। কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘ধন্য সেই পুরুষ’- ‘ধন্য সেই পুরুষ, যার নামের ওপর পতাকার মতো, দুলতে থাকে স্বাধীনতা’।

অনেকে অনেক কবিতা লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়। কিন্তু তার হত্যার পরে। রাতারাতি পাল্টে গেল পত্রিকাগুলো তথা প্রচারমাধ্যম। পরিস্থিতি পাল্টে গেল দ্রুত। চারদিকে শুধু আশঙ্কিত মুখ। সবার মুখে কুলুপ। কিন্তু কলকাতা চুপ করে থাকেনি। ভারতে তখন জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় নির্দেশ জারি করেছেন যে বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা চলবে না। সে সময় কবিরা মিলিত হতেন কফি হাউজে। অনুপত্রিকায় বেরিয়েছিল এই হত্যার বিরুদ্ধে প্রচুর কবিতা।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই দিনটি বর্ণনা করছেন এই ভাবে- ‘ঘটনাটি ঘটে শেষ রাতে। আমরা কলকাতায়। খবর পেয়ে যাই দুপুরের আগেই। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি, মনে হয়েছিল বাজে গুজব। বাংলাদেশের কোনো মানুষ কি জাতির মুক্তিদাতাকে খুন করতে পারে? অবশ্য ভারতের মানুষই তো খুন করেছিল মহাত্মা গান্ধীকে। রাসেলকে নিয়ে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম সে সময়- রাসেল, অবোধ শিশু, তোর জন্য আমিও কেঁদেছি খোকা, তোর মরহুম পিতার নামে যারা একদিন তুলেছিল আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি, তারাই দুদিন বাদে থুতু দেয়, আগুন ছড়ায় বয়স্করা এমনই উন্মাদ, তুই তো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বয়েসেতে ছিলি, তবুও পৃথিবী আজ এমনই পিশাচি হলো, শিশুরক্ত পানে গ্লানি নেই? সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে! যত নামহীন শিশু যেখানেই ঝরে যায় আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই!’  (সূত্র: এম নজরুল ইসলাম সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু স্বারকগ্রন্থ থেকে)

শোকাবিভূত হয়ে অমিয় চক্রবর্তী লেখেন- ‘আশ্চর্য নেতার নামে জড়ো হয় আয়ামির দল, মুজিবের মুখে চেয়ে সারা পাকিস্তানে ভোটে জেতে, সংঘশক্তি মুক্তির নিশানী, রোধ করবে সাধ্য কার?’ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত মনিপুরের প্রথম সারির কবি এলাংবম নীলকান্ত ‘শেখ মুজিব মহাপ্রয়াণে’ শীর্ষক কবিতায় লেখেন- ‘হে বঙ্গবন্ধু, নিষ্ঠুর বুলেটের আঘাতে নিহত হয়েছ শুনে পেরিয়েছি আমি এক অস্থির সময়, খোলা জানালা দিয়ে সুদূর আকাশের দিকে পলকহীন তাকিয়ে থেকেছি, উত্তরহীন এক প্রশ্ন নিয়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে গড়ে তুলেছিলে স্বদেশ তোমার, কিন্তু এ কোন প্রতিদান পেলে তুমি?’ (অনুবাদক: এ.কে. শেরাম) শঙ্খ ঘোষ লিখলেন- ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, ‘একশ মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।’

পশ্চিম বাংলার বনফুল, বুদ্ধদের বসু, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, রাজলক্ষ্মী দেবী, মনীষ ঘটক, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, বিমল চন্দ্র ঘোষ, দীনেশ দাস, দক্ষিণা রঞ্জন বসু, করুণা রঞ্জণ ভট্টাচার্য, অমিয় মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র কুমার গুপ্ত, নলিনীকান্তি গঙ্গোপাধ্যায়, নির্মল আচার্য, বিভূতি বেরা, অমিত বসু, শান্তিময় মুখোপাধ্যায়, শান্তিকুমার ঘোষ, গোলাম রসুল, অমিতাভ দাশগুপ্ত, তরুণ সান্যাল, দেবেশ রায়, গৌরী ঘটক, রাম বসু, তারাপদ রায়, মনীন্দ্র রায়, বিনোদ বেরা, অমিতাভ চৌধুরী অনেকেই লিখলেন এই হত্যার প্রতিবাদে কবিতা।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাল্য সুহৃদ মৌলভী শেখ হালিম, আরবি ভাষায়। বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কবরস্থ করার পর বাড়ি ফিরে তিনি যা লিখেছিলেন তার বাংলা এরকম- ‘হে মহান, যার অস্থি-মজ্জা, চর্বি ও মাংস এই কবরে প্রোথিত, যার আলোতে সারা হিন্দুস্তান, বিশেষ করে বাংলাদেশ আলোকিত হয়েছিল, আমি আমার নিজেকে তোমার কবরের উদ্দেশে উত্সর্গ করছি, যে তুমি কবরে শায়িত আমি তোমার মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছি, ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা- নিশ্চয়ই তুমি জগতে বিশ্বের উত্পীড়িত এবং নিপীড়িতদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলে, সেহেতু অত্যাচারীরা তোমাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে, আমরা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের কাছে তাদের বিচারের প্রার্থনা জানাই, যারা তোমাকে বিনা-বিচারে হত্যা করেছে, আমরা মহান আল্লাহর নিকট তোমার আখিরাতের মঙ্গল কামনা করি। বিদায়! বিদায়! বিদায়! হে মহান জাতির জনক।’ কিন্তু কবিতায় দ্রোহের অভাব স্পষ্ট এবং আরবি ভাষায় লেখা কবিতা বলে প্রথম প্রতিবাদী কবিতা হিসেবে মান্যতা পায়নি।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে প্রথম প্রতিবাদী কাব্য সংকলন ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ছাত্র আবদুল আজীজ ছিলেন এর উদ্যোক্তা। কেউ কিছু বলছে না। সবাই চুপ। কেবলই তিনিই জেগে উঠলেন, হয়ে উঠলেন প্রতিবাদী। তার কথায়- ‘অতি গোপনে আমার তিন বন্ধু ভীস্মদেব চৌধুরী, আলতাফ আলী হাসু ও সিরাজুল ফরিদকে পরিকল্পনার কথা জানালাম। যারা লিখেছেন, তাদের কাছ থেকে এক বসায় লেখা সংগ্রহ করা হয় সে জন্য। যাতে এ খবর বাইরে না যায়।

বইটির প্রকাশনা সংগঠন হিসেবে ‘সূর্য তরুণ গোষ্ঠী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ লেখা হলেও এ নামে আদৌ কোনো সংগঠন ছিল না। বইটির মূল্য ছিল পাঁচ টাকা। আর এটি যে বিলি করবে, গ্রেফতার করা হতে পারে তাকে- এমন আশঙ্কায় বাচ্চাদের দিয়ে বিলি করা হয়েছিল। ছাপা হয়েছিল মাত্র পঁচিশ কপি। হৈচৈ পড়ে যায় তাতেই।

বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করে ৩০ জন কবি ও লেখকের ৩০টি কবিতা ও ছড়া স্থান পেয়েছিল বইটিতে। শুরুতেই ছিল অন্নদাশংকর রায়ের বিখ্যাত সেই ছড়া- ‘যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরী যমুনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

সিলেট অঞ্চলের কবি দিলওয়ার লিখেছিলেন ‘এ তো ভঙ্গ বঙ্গ নয়’ শিরোনামের ছড়া। যার শেষ পঙ্‌ক্তিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আট কোটি খুলবে এবার দাঁত কটি।’ শিক্ষাবিদ হায়াৎ মামুদ লিখেছিলেন ‘মুজিবের এপিটাফ’। প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক রাহাত খান ‘যখন সময় হবে’, মাশুক চৌধুরী ‘চিৎকার’, ফরিদুর রহমান বাবুল ‘সাম্প্রতিক’, সুকুমার বড়ূয়া ‘৭ই মার্চ’, মোহাম্মদ মোস্তফা ‘আবার আসে বাং-কর্ণো’, মাহমুদুল হক ‘বকুল গন্ধ বাঘের চোখে’, আমিনুল ইসলাম ‘বেদু প্রণাম তোমাকে বঙ্গবন্ধু’, নির্মলেন্দু গুণ ‘মুজিব মানে মুক্তি’, তুষার কর ‘বঙ্গবন্ধুর জন্যে’, আলতাফ আলী হাসু ‘অঙ্গীকার’, মোহাম্মদ রফিক ‘ব্যাঘ্র বিষয়ক’, আবদুল আজীজ ‘সরম লাগার ছড়া’, শান্তিময় বিশ্বাস ‘পিতার জন্য’, আখতার হুসেন ‘সোনার বরণ ছেলে’, ভীস্মদেব চৌধুরী ‘পিতা :তোমার জন্য’, জিয়াউদ্দীন আহমদ ‘শেখ মুজিব’, জাহিদুল হক ‘গোলাপ’, ইউসুফ আলী এটম ‘ছবির ছড়া’, সিরাজুল ফরিদ ‘ছড়া’, ফজলুল হক সরকার ‘শেখ মুজিব’, মহাদেব সাহা ‘আবার আসিব ফিরে’, জাফর ওয়াজেদ ‘একটি মুজিব’, লুৎফর রহমান রিটন ‘একটি ছেলের জন্য’, নূর-উদ্‌দীন শেখ ‘সেই ছেলেটি’, ওয়াহিদ রেজা ‘জাতির পিতা’, কামাল চৌধুরী ‘একজন প্রেমিকের কথা’ এবং খালেক বিন জয়েন উদ্দীন লিখেছিলেন ‘রাখাল রাজার জন্য’ শিরোনামের ছড়া ও কবিতা।’ প্রসঙ্গত সংকলনটি কলকাতা থেকে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে এবং বিক্রি হয়েছিল হাজার হাজার।

এ সংকলনটি প্রকাশের গল্প পাওয়া যায় লুৎফর রহমান রিটন সম্পাদিত নেপথ্য কাহিনী বইয়ে। এ বইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী- ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়’ সংকলনটির অর্থবহ প্রচ্ছদটি অত্যন্ত দরদ দিয়ে এঁকে দিয়েছিলেন মানিক দে। মুদ্রণ ব্যয় কমাতে লাল এবং কালো এ দুই রঙের মধ্যেই চার রঙের ইফেক্ট নিয়ে এসেছিলেন মানিক। আর প্রচ্ছদে ছিল ক্লোজআপ শটে মোটা ফ্রেমের কালো একটা চশমা। আর এই চশমাটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতীক।... এ রকম একটি প্রচ্ছদ তখনকার অবরুদ্ধ সময়ে ঢাকার কোনো প্রসেস প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়াটা রিস্কি বিবেচনা করে আবদুল আজীজ গোপনে সংবাদের প্রসেস সেকশনেই কাজটি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন।

খেলাঘর পাতার কাজ করার ছলে শুধু প্রসেসই নয়, প্লেট মেকারের সহায়তায় চারটি প্লেটও গেরিলা কায়দায় বানিয়ে নিয়েছিলেন আবদুল আজীজ। পুরনো ঢাকার বাবুবাজারের দোতলা একটা আধাভাঙা প্রেসে ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়’-এর ইনারপেজগুলো ছাপা হয়েছিল। কম্পোজিটর এবং ম্যাশিনম্যানদের সঙ্গে আলাদা খাতির তৈরিতে আজীজ ভাইয়ের জুড়ি ছিল না। তাছাড়া একটানা ছাপার সিডিউলও নিতেন না তিনি। যে ম্যাটারটা যেদিন ছাপা হতো সেই ম্যাটার সেদিনই প্রেস থেকে সরিয়ে নিতেন আজীজ ভাই। কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতার শিরোনামকেই বেছে নেয়া হয়েছিল সংকলনের নাম হিসেবে।’

আবার রিটনভাইয়ের আরেকটি লেখায় তিনি বলেছেন- ‘একটি ঐতিহাসিক ঘটনাই ছিল ১৯৭৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভোর বেলায় প্রকাশিত ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়’ সংকলনটি। এখনকার প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, সংকলনটি প্রকাশকালে, ৪০ বছর আগে কী ভয়ংকর দমবন্ধ একটা অন্ধকার সময় বিরাজ করছিল বাংলাদেশে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামোচ্চারণও একটা দুঃসাহসের ব্যাপার ছিল তখন। [সূত্র: বঙ্গবন্ধু সমগ্র,লুৎফর রহমান রিটন, প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ, প্রকাশক কথা প্রকাশ, প্রকাশকাল ২০১৭।]

এরপরে ১৯৭৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে রচিত এ দেশের দ্বিতীয় কাব্য সংকলন ‘পৃথিবীর কাছে নোটিশ’। মোট সাতাশ জন কবি এই সংকলনে অগ্নিসম কবিতা সম্ভার নিয়ে হাজির হয়েছেন। সংকলনটির শুরুতে ছাপা হয়েছে বাংলা ভাষার মহানতম লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের একটি কবিতা। তার কবিতায় তিনি এই নিকৃষ্টতম হত্যাকে ধিক্কার জানিয়েছেন।

কবি অন্নদাশঙ্কর রায় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে’ কবিতায় লিখেছেন- ‘নরহত্যা মহাপাপ, তার চেয়ে পাপ আরো বড়ো করে যদি যারা, তার পুত্রসম বিশ্বাসভাজন জাতির জনক যিনি অতর্কিতে তারেই নিধন, নিধন সবংশে হলে সেই পাপ আরো গুরুতর।... বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! থেকো নাকো নীরব দর্শক, ধিক্কারে মুখর হও। হাত ধুয়ে এড়াও নরক।’

কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘সিন্দাবাদ’ কবিতায় লিখেছেন- ‘অভ্যন্তরে জাগিছে পিতৃভূমি, আমিও জেগেছি যমুনার জলে, অতল গর্ভ থেকে। আমাকেই যদি জাগালে হে নাথ এবার তুমিও জাগো, সত্য শুভ্র কান্তিতে তব অগ্নিভস্ম মেখে উঠে এসো ফের তুমি, বজ্রকণ্ঠে জাগিছে পিতৃভূমি, তোমার গর্ব পথের ধূলায় আর হেলায় হারাব নাগো।... এখনো ফেরার সময় হয়নি পিতা?’

কবি মহাদেব সাহা ‘কফিন কাহিনী’ কবিতায় লিখেছেন-  ‘চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন, একজন বলল দেখো ভেতরে রঙিন, রক্তমাখা জামা ছিল হয়ে গেছে ফুল, চোখ দুটি মেঘে মেঘে ব্যথিত বকুল!’

কথাশিল্পী রাহাত খান ‘আমার সৌভাগ্য’ শিরোনামে কবিতায় লিখেছেন- ‘বন্ধু, সজ্জন সবাইকে ভালোবাসি। ভালোবেসে বলে যেতে ইচ্ছে হয়, হয়তো কিছুই পাইনি, ঠাঁই সময়ের ইতিহাসে, আমি পুত্রকে কন্যাকে বলে যাব, বলে যাব শেখ মুজিবের সময়ের মানুষ আমি, আমি এই সৌভাগ্য পেয়েছি’।

কবি ওয়াহিদ রেজা ছিয়াশি লাইনের একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন ‘পৃথিবীর কাছে নোটিশ’ শিরোনামে- ‘আমি হারিয়ে ফেলেছি আমার রঙিন পুরনো ঘুড়ি, স্বপ্নের সুষমা মুখ, সবুজ জলাশয়, ফুলের সংসার;, জীবন্ত স্মৃতির জ্বলন্ত উপকূল ভূমি!, .... পৃথিবী; রক্তের সন্ধানে যারা লাল করেছে মুজিবের বুক, কালো রাত্তিরে যারা রক্ত পায়ে হেঁটে অপবিত্র করেছে ছবি;, তুমি তাদের চিতা দ্যাখাও, চিতার অনলে জ্বালো নারকীয় কীট;, নইলে আমি কবিতার পাণ্ডুলিপি জ্বেলে টকটকে চিতায়, মুজিব হত্যার প্রতিশোধ নেব..., আজো বাঙলায় নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের গন্ধে, মুজিবের শূন্যতার ব্যথা!’

কবি ইউসুফ পাশা ‘কাঠের নৌকা’ শিরোনামে কবিতায় লিখেছেন- ‘নিস্তব্ধ শুয়ে আছে ৩২ নম্বর রোড, ধানমন্ডি লেক, পরিমিত জ্বলের দু-একটি মাছ, সেই আশ্চর্য মুখের ছবি খোঁজে ফিরে।, যার মুখ বহুদিন দেখেছে শহীদ মিনার, রেসকোর্স পল্টন ময়দান, পায়ের স্পর্শ পেলেই সশ্রদ্ধ ছেড়ে দিতো, নির্দিষ্ট মঞ্চের আসন,.... অথৈ গাঙের জলে তার সবটা শরীর, এই বাংলাদেশ, স্থির বিশ্বাসে নোঙর গেড়েছে দেখ মুজিবের কাঠের নৌকা।’

কবি মোহাম্মদ রফিক ‘ব্যাঘ্র বিষয়ক’ কবিতায় লিখেছেন- ‘আগস্টের পনের তারিখ ঊনিশ শ পঁচাত্তর;, অতর্কিত শিকারির পদশব্দে অরণ্য শংকিত, বাদুড়ের ডানার ঝাপ্টায় গজারির মৃত পাতা, খসে পড়ে, প্রমত্ত গর্জনে সাড়া তুলবে অকস্মাৎ;, বাঙালির শুদ্ধ নাম শেখ মুজিবুর রহমান।’

কবি হালিম আজাদ ‘মুজিব একটি বিশুদ্ধ বাংলাদেশ’ কবিতায় লিখেছেন- ‘কার জন্যে মাদুর বিছিয়ে রাখব!, স্বদেশের বুক শূন্যতায় নিবিড় হয়ে আছে, জাতির মাটিতে প্রিয়জন নেই, বাতাসে প্রচণ্ড বিক্ষোভ! ভূমির কর্ষণে অপূর্ণ শোকধ্বনি;, হায় মুজিব! হায় মুজিব! হায় মুজিব!’

কবি বজলুর রায়হান ‘শব্দ উঠেছে কার?’ শিরোনামে কবিতায় লিখেছেন- ‘স্বদেশের এই সরস মাটিতে শব্দ উঠেছে কার, আলো হাতে বলে মুগ্ধ প্রেমিক ‘জাতির পিতার স্বদেশের এই ক্ষুব্ধ মাটিতে শব্দ উঠেছে কার, বলে দুখী জনতার প্রত্যয়ী মিছিল ‘জাতির পিতার।’

কবি বাকী বিল্লাহ ‘বিবৃতি,’৭৯’ কবিতায় লিখেছেন- ‘আর যদি একটা গুলি চলে,তাহলে আমিও জাগাবো স্বদেশ।, আমিও বিক্ষোভ হবো, প্রিয় দেশবাসী;, ওই যে ঘাতক বসে আছে দর্পিত মুখে; ওকে প্রত্যেকে ঘৃণাস্পর্শ কর, ওকে প্রত্যেকে অভিশাপ দাও,....ভাসাব শেখের নাও; যেন মুজিবের বাঁশি বাজাতে রাখাল ফিরে আসে, প্রতিদিন এই বাংলায়, এই শান্ত শীতল ঘরে।’

কবি নজরুল ইসলাম মিন্টু ‘স্বগত উক্তি’ কবিতায় লিখেছেন- ‘অতঃপর একদিন দেখো মোশতাক বলতে, বিশ্বাসঘাতকদেরই বোঝাবে। যেমন বোঝায়, মীর জাফর আলী খাঁ’...

কবি মণীন্দ্র ঘটক ‘ভায়েরা আমার’ কবিতায় লিখেছেন- ‘একজন মানুষের কথা কিভাবে বলা যায়, আমি জানি না, আমরা সব ভুলতে পারি, কেবল ভুলতে পারি না-, পৃথিবীতে শেখ মুজিব আছেন!, তিনি বলতেন, ‘ভায়েরা আমার... ‘বাঙলার সেই বজ্রকণ্ঠ আমরা ভুলি নাই, ভুলবো না।’

ছড়াশিল্পী ইউসুফ আলী এটম লিখেছেন ‘বদলা নেব খুনের’- ‘কোথায় মুজিব, শেখ মুজিবুর নেই কেন আজ তার দেশে, নেই কেন আজ দেশের পিতা, বলরে খুনি কার দেশ এ?, কার দেশে তুই ঘুরিস-ফিরিস বুকের সিনা টান করে, কার হুকুমে লাফাস-দাফাস, পিতার খুনে স্নান করে?,...মুজিব আমার বাংলাদেশের সাগর সেচা রক্ত।

কবি রফিউর রাব্বি তার ‘সাম্প্রতিক ছড়া’য় লিখেছেন- ‘লেটেং পেটেং নেংটা হয়ে, ছিঃ ছিঃ কত লজ্জা;, নতুন করে আজকে আবার, পাল্টাল সাজ-সজ্জা!, ‘জয় বাংলা’ উল্টে দিয়ে, ধরল গাজীর গীত;, সিওর সিওর হবেই এবার, জিন্দাবাদের জিত!’

কবি নাহিদ আজাদ ‘ব্ল্যাক-ডে’ কবিতায় লিখেছেন-’ আমাকে তোমরা যদি আরেকবার স্বাধীনতা দিতে, তাহলে সারা পৃথিবীকে চিৎকার করে জানিয়ে দিতাম:, ভাইসব- ১৫ই আগস্ট কালো নিশান, ১৫ই আগস্ট ব্লাক-ডে।’

এতে আরো লিখেছেন- মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, শিখা চৌধুরী, আনিছুর রহমান, শামিমা বেগম, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, গৌতম সরকার, মেহেদী ইকবাল, অশোক গুহ, ফজলুল বারী, মো. আসাদুজ্জামান, নিরঞ্জন রায় নীরু এবং স্বপন দেব।

‘পৃথিবীর কাছে নোটিশ’ সংকলনটিতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপটে তোলা ফটোগ্রাফ থেকে প্রচ্ছদ করা হয়। এতে কোনো প্রকাশকের ঠিকানা দেয়া হয়নি। শুধু উল্লেখ করা হয়- ‘ড্যাফোডিল এফিউসন গ্রুপ’ কর্তৃক নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ও মুদ্রিত। মুদ্রাকরের নামও লেখা হয়নি।

এ প্রসঙ্গ শেষ হবে না একজন কবির কথা না বললে।  তিনি হলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তার ভাষ্যে পাই- ‘এ ব্যাপারে সামরিক শাসকদের কোনো বিধি-নিষেধ আরোপিত না থাকলেও, তাদের আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়া অলিখিত বিধি-নিষেধ দেশের মানুষের মধ্যে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রেখেছিল। যার ফলে ১৯৭৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কোনো কবিতা পাঠ করার সাহস অর্জন করতে পারিনি।

১৯৭৬ সালে আমি একুশের কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে পড়েছিলাম ‘ভয় নেই’ নামের একটি কবিতা। ১৯৭৭-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমি যে কবিতাটি পাঠ করি (আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি) সেটি আমি লিখেছিলাম বেশ কিছুদিন আগেই। বাংলা একাডেমিতে একুশের ভোরের কবিতা পাঠের আসরে আমি ওই কবিতাটি পাঠ করার সিদ্ধান্ত নেই এবং অনুষ্ঠানে সমবেত সবাইকে চমকে দিয়ে আমি ওই কবিতাটি পাঠ করি। ওই কবিতা পাঠের পর পুলিশ আমাকে কিছুদিন নাজেহাল করেছিল বটে, কিন্তু তা আমার জন্য এমন অপ্রীতিমূলক কিছু ছিল না। শুধু জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যেই তা ছিল সীমাবদ্ধ।’ (কবিতায় বঙ্গবন্ধু, শিল্পকলা একাডেমি)। এই কবিতাটি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিরুদ্ধে উচ্চারিত কবিতায় প্রথম প্রতিবাদ।

এরপর যার কথা বলে শেষ খরব তিনি হলেন পাকিস্তানের পাঞ্জাবি কবি আহমেদ সালিম। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলে তিনি জেলে যান। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে মুক্তি পান। তারপর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে তিনি লিখলেন ‘সিরাজউদ্দৌলাহ’ কবিতাটি - ‘স্বদেশি মীর জাফরদের সহযোগিতার কারণে রক্তস্নাত হলো বাংলাদেশ।’ এ জন্যেই বলা হয় কবিদের দেশ নেই, ধর্ম নেই, গোত্র নেই, আছে শুধু মন। তাই তারা প্রতিবাদী। আঘাতের পরোয়া করে না তারা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর