Alexa নয় আঙুলের মেয়ে

নয় আঙুলের মেয়ে

অনুবাদ উপন্যাস ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:২৫ ১০ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ১৭:৩০ ১০ এপ্রিল ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

(হারুকি মুরাকামির ‘Hear the wind Sing’ উপন্যাসের একটি গল্পের ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ। লেখক এখানে একটি বিশেষ চরিত্রের গল্পকে তুলে এনেছেন। অনুবাদটির স্বত্ব সংরক্ষিত।)


ভোর ছয়টার আগে ঘুম থেকে জাগলাম। নিজের রুম ছাড়া অন্য কোথাও ঘুমালে মনে হয় অন্য কোন আত্মার শরীরে বন্দী হয়ে আছি। সর্বশক্তি দিয়ে সরু বিছানা থেকে নিজেকে টেনে তুললাম। দরজার পাশের বেসিনে গিয়ে জলপান করলাম। ঘোড়ার তৃষ্ণা নিয়ে। এক নাগাড়ে কয়েক গ্লাস। অতঃপর আবার বিছানায় ফিরে এলাম।
খোলা জানালা দিয়ে সমুদ্রের একাংশ দেখা যাচ্ছিল। সকালের রোদে ছোট ছোট ঢেউগুলো চিকচিক করছিল। কয়েকটা ক্লান্ত ও বিষণ্ণ মালবাহী জাহাজ দূর সমুদ্রে ভাসছিল। সবকিছু মিলে একটা নতুন উষ্ণ দিনের আগমনী সংকেত বহন করছিল। চারপাশের বাসস্থানগুলোর বাসিন্দারা তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শুধুমাত্র কিছুক্ষণ পর পর দূরাগত কোন রেলগাড়ির ক্যাঁচক্যাঁচ ঘ্যাচঘ্যাচ কর্কশ আওয়াজ ভেসে আসছিল। আর শোনা যাচ্ছিল বেতার কেন্দ্র থেকে অনুষ্ঠান শুরু করার পূর্বের মূহুর্তের বিলীয়মান অস্পষ্ট সুর। আর কোন শব্দ ছিল না।
খাটের হেডবোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে শরীরটাকে ওপরের দিকে টেনে তুলে একটা সিগারেট ধরালাম এবং আমার পাশে শুয়ে থাকা মেয়েটাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। দক্ষিণ দিকে মুখ করে শুয়ে ছিল। জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো লম্বভাবে তার শরীরের উপরে পতিত হয়ে তার শরীরকেও আলোকিত করে রেখেছিল। টেরিকাপড়ের তৈরি কম্বলের নীচে সে গভীর ঘুমে অচেতন। কম্বলটা হাঁটু পর্যন্ত নামানো। একটু পর পর তার শ্বাস দ্রুততর হচ্ছিল এবং সুগঠিত বুক ঊঠানামা করছিল। সাগরের বেলাভূমিতে শুয়ে শুয়ে সূর্যের আলোতে গভীরভাবে ট্যান করা তার শরীর। তবে চিবুকের কাছের ট্যানের বর্ণ ইতিমধ্যেই ম্লান হয়ে এসেছিল। পরনের সুইমস্যুটের কারণে তার শরীরে সাদা সাদা ডোরা কাটা দাগ। মনে হচ্ছিল ক্রমশ পচে যাচ্ছে।
সিগারেট শেষ করে পরবর্তী দশ মিনিট আমি মেয়েটির নাম স্মরণ করার চেষ্টা করলাম। সমস্যাটা হল দেখা হবার পর সে তার নামটা আদৌ আমাকে বলেছিল কিনা সেটাই মনে করতে পারলাম না।
হাল ছেড়ে দিয়ে হাই তুললাম এবং তার শরীরের দিকে পুনরায় দৃষ্টিপাত করলাম। খুবই শীর্ণ -দেহী। বয়স সম্ভবত বিশের চেয়েও কম হবে। আমার খালি হাতটা দিয়ে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেহের দৈর্ঘ মাপলাম। কাঁটায় কাঁটায় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি।
তার ডান বুকের একটু নীচে একটা চিহ্ন। অবিকল মুদ্রার মত। শুধু রঙটাই ভিন্ন। ওরচেস্টারশায়ার সসের মত। তার শরীরের লোমগুলোকে দেখে আমার বন্যা পরবর্তী নদীতীরের ঘাসের কথা মনে পড়ে গেল। সর্বোপরি একটা জিনিষটা উল্লেখ না করলেই নয়। তার বাম হাতে আঙুলের সংখ্যা মাত্র চার।


প্রায় তিন ঘন্টা পর সে ঘুম থেকে জাগল এবং আরও পাঁচ মিনিট সময় নিল পরিপার্শ্ব সম্পর্কে অবহিত হতে। এই পুরো সময়কালেই আমি দিগন্তের ওপরে ঘন মেঘেরা কীভাবে আকার বদলায় তা পর্যবেক্ষণ করছিলাম। 
শেষবার আমি যখন তার দিকে তাকালাম তখন সে তার টেরিকোটের তৈরি কম্বলটা গলা পর্যন্ত টেনে এনেছে এবং একটা পরিপূর্ণ শুন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছিল তার পাকস্থলীতে অবশিষ্ট হুইস্কির ধুঁয়ার সাথে তখনও সে যুদ্ধ করছিল।
“তুমি …… কে?”
“তোমার মনে নেই?”
দ্রুত মাথা নাড়াল। আমি সিগারেটে আগুন ধরিয়ে একটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। 
সে তাকিয়েও দেখল না।
“ব্যাখ্যা কর।“
“কোত্থেকে শুরু করব?”
“শুরু থেকে।“
“শুরু?”
আসলে আমার ধারনাই ছিল না শুরুটা কিভাবে করা যেতে পারে। এমনকি এটাও বুঝতে পারছিলাম না যে, কীভাবে তার জন্যে গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাখ্যা দেয়া যায়। আমার ব্যাখ্যা কাজ করতেও পারে, আবার নাও করতে পারে। সুতরাং চিন্তাগুলোকে যথাযথ ক্রমে সাজাতেই দশ সেকেন্ড সময় অতিবাহিত হয়ে গেল।
“সেটা ছিল একটা সুন্দর স্বাভাবিক দিন,” আমি শুরু করলাম। দুপুরের পর পুরো বিকেল সুইমিং পুলে সাঁতার কাটলাম। বাসায় গেলাম। ঘুমালাম। অতঃপর ঘুম থেকে উঠে ডিনার করলাম। রাত আটটার পর গাড়ি নিয়ে বের হলাম। বেলাভূমির রাস্তায়। কারের রেডিও শুনতে শুনতে সাগরের দিকে তাকালাম। নিত্য দিনের মত।
“আধা ঘন্টা পর আমার মনে হল আমার একজন সঙ্গী প্রয়োজন। সাগরের পানে তাকালেই আমার নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ মনে হয়। অদ্ভুত একটা ব্যাপার। আমি ‘জে’র বারে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা শীতল বিয়ার আমাকে টানছিল। মনে হল ওখানে গেলে আমি সঙ্গীও পেতে পারি। যদিও কেউই সেখানে ছিল না। সুতরাং একা একা বিয়ার পান করতে লাগলাম। এক ঘন্টার ভেতরেই তিনটা বিয়ার শেষ করলাম। তারপর সিগারেটের ছাই ছাইদানির ভেতরে ফেললাম।“
“আচ্ছা, তুমি কি কখনও ‘Cat on a Hot Tin Roof’ বইটা পড়েছ?”
উত্তর না দিয়ে সে ঘরের সিলিঙের দিকে তাকিয়ে রইল। ডাঙায় তোলা মৎস্য কন্যার মত। এক হাতে কম্বলটাকে আঁকড়ে ধরে থাকল। আমি পুনরায় আমার গল্প বলতে থাকলাম।
“দেখ, আমি যখন একাকী ড্রিঙ্ক করি, তখন আমি সাধারণত একটা খেলা খেলে থাকি। খেলাটা হল ড্রিঙ্ক করতে করতে আমি ভাবতে থাকি যে, একটা বিশেষ মূহুর্তে আমার মাথার ভেতরে একটা বিশেষ অনুরণন সৃষ্টি হবে এবং তারপরেই আমার জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কখনই তা হয়নি। এমনকি কখনই আমার মাথার ভেতরে ভিন্ন ধরণের অনুভূতির সৃষ্টি হয়নি। যাই হোক, সঙ্গীর জন্যে অপেক্ষা করতে করতে এক সময়ে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম এবং তার বাসায় ফোন করলাম। আমার সাথে বিয়ার পান করার জন্যে। কিন্তু তার পরিবর্তে একটা মেয়ে ফোনটা ধরল……। আমি রীতিমত হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। কারণ আমার বন্ধুটি কখনই ঐ ধরণের মানুষ ছিল না। পঞ্চাশজন মেয়ের দ্বারা পরিবৃত থাকলেও সে নিজের ফোন নিজেই ধরে থাকে।“
“আমি মেয়েটিকে ভুল নম্বরে ফোন করেছি বলে ফোনটি নামিয়ে রাখলাম। কিন্তু একটা অদ্ভূত কারণে এই ফোন কলের বিষয়টি আমার মনের ভেতরে গেঁথে রইল। আমি আরও একটা বিয়ার পান করলাম। কিন্তু সেটা আমাকে উল্লসিত করল না। সুতরাং বিয়ার পান শেষ করে মূল্য পরিশোধ করার জন্যে ‘জে’কে ডাকলাম। ইচ্ছে ছিল বাসায় ফিরে যাব এবং সেখানে রেডিওতে বেসবল খেলার ফলাফল শুনে ঘুমাব। কিন্তু ‘জে’ আমাকে ওয়াশ রুমে যেয়ে মুখ ধুয়ে আসতে বলল। ‘জে’র ধারণা যে। এক কেইস পরিমান বিয়ার পান করার পরেও কেউ যদি মুখে এক ঝলক পানি ছিটায় তবে সে যত খুশী গাড়ি চালাতে সক্ষম হবে। কাজেই আমি ওয়াশ রুমের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। তবে তোমাকে সত্যটাই বলি। আমি আসলে মুখ ধোয়ার জন্যে ওয়াশ রুমে যাচ্ছিলাম না। ‘জে’র নিকট অভিনয় করছিলাম। ‘জে’র ওয়াশ রুমের সিঙ্কের বেসিন সাধারণত জলে পূর্ণ থাকে। আমি সেখানে যাওয়া কখনই পছন্দ করি না। কিন্তু গতরাতে তার ওয়াশ রুমের সিঙ্কের অবস্থা খারাপ ছিল না। তবে অবাক হয়েছিলাম এই কারণে যে, তুমি ওয়াশ রুমের মেঝেতে শুয়েছিলে।“
মেয়েটি একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে চোখ বন্ধ করল।
“তার পর?”
“আমি তোমাকে ওয়াশ রুমের মেঝে থেকে তুলে কোলে করে বারের ভেতরে নিয়ে আসলাম। আমার ধারণা ছিল এমন কাউকে পাওয়া যাবে যে তোমাকে চেনে। কিন্তু কাউকেই পাওয়া গেল না। সুতরাং আমি আর ‘জে’ মিলে তোমার ক্ষতস্থানটা বেঁধে দিলাম।“
“ক্ষতস্থান?”
“তুমি পড়ার সময়ে মেঝেতে তোমার মাথা ঠুকে গিয়েছিল। ছোট একটা ক্ষত।“
মেয়েটি মাথা নেড়ে কম্বলের ভেতর থেকে তার হাতটা বের করে কপালের ক্ষতস্থানের ওপরে রাখল।
“তোমাকে নিয়ে কি করা যায় সে সম্পর্কে জে আর আমি আলোচনা করলাম। অবশেষে আমার নিজের কারে করে তোমাকে তোমার বাসায় নিয়ে এলাম। তোমার ব্যাগ খুঁজে একটা পার্স, একটা চাবি এবং একটা পোস্ট কার্ড পেয়েছিলাম। পোস্ট কার্ডটার ওপরে তোমার নাম-ঠিকানা লেখা ছিল। তোমার পার্সের ভেতর থেকে টাকা নিয়ে তোমার বিল পরিশোধ করেছিলাম। পোস্টকার্ডের ঠিকানা অনুযায়ী গাড়ি চালিয়ে তোমাকে নিয়ে আসার পর চাবি দিয়ে দরজা খুলে তোমার বাসার ভেতরে প্রবেশ করেছিলাম। এবং শেষে তোমাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলাম। আমার গল্পের শেষ এখানেই। বারের বিল পরিশোধের রশিদ তোমার পার্সের ভেতরে আছে।“
সে পুনরায় একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
“কিন্তু তুমি এখনও এখানে কেন?“আমাকে বিছানায় শুইয়ে দেবার পরেই তুমি চলে যাওনি কেন?”
“আমার এক বন্ধু। এলকোহল পয়জনিং এর কারণে মারা গিয়েছিল। হুইস্কি পান করার পর হাসিমুখে সবাইকে বিদায় জানিয়ে বাসায় প্রত্যাবর্তন করেছিল। দাঁত ব্রাশ করে পায়জামা পরে বিছানায় ঘুমাতে গিয়েছিল। পরদিন সকালে তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল পাথরের মত ঠান্ডা অবস্থায়। অবশ্য তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অসাধারন জনসমাগম হয়েছিল।“
“তার মানে কি এই যে, গত সারারাত ধরে তুমি আমার সেবায় নিয়োজিত ছিলে?”
“রাত চারটের দিকে পরিকল্পনা করেছিলাম বাসায় ফিরে যাবার। কিন্তু তখন আমার ভীষণ ঘুম পেয়ে গেছে। সকালেও ঘুম থেকে ওঠার পর চলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কি মনে করে থেকেই গেলাম।“
“কেন?”
“আমার মনে হয়েছিল যে, তোমার অন্তত জানা উচিৎ কী ঘটেছিল।“
“তুমি তো দেখছি আসলেই একজন ভদ্র মানুষ!”
তার কথাগুলো খুবই বিষময় ছিল। তথাপি আমি কোন ধরণের প্রতিরোধ ছাড়াই কথাগুলোকে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিলাম এবং পুনরায় আকাশের মেঘ পর্যবেক্ষণের দিকে মনোনিবেশ করলাম।
“আমি কি ... কোন কথা বলেছিলাম?”
“কয়েকটা।“
“যেমন?”
“কয়েকটা বিষয় নিয়ে। কি বলেছিলে তা আমার মনে নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ তেমন কিছু ছিল না।“
চোখ বন্ধ অবস্থাতেই সে কান্না করে উঠল।
“পোস্টকার্ডটা কোথায়?”
“তোমার ব্যাগের ভেতরে।“
“তুমি কি ওটা পড়েছ?”
“না।”
“কেন?”
“কেন আমি অন্যের পোস্টকার্ড পড়ব?”
আমি ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছিলাম। তার কথার ঝাঁঝ আমাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। তবে এটাও স্বীকার করতে বাঁধা নেই যে, সে ক্রমশ আমাকে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করে ফেলছিল। ভাগ্যক্রমে যদি আরও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হত, তবে হয়তবা আমরা দুজনেই আরেকটু বেশী আনন্দময় সময় পার করতে পারতাম। অন্তত আমার তাই ধারণা। তবে আমার জীবনে এর চেয়ে বেশী স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কোন মেয়ের সাথে সাক্ষাতের স্মৃতি আমার নেই।
“এখন কয়টা বাজে?” সে জিজ্ঞেস করল।
প্রসঙ্গান্তরে যাবার কারণে আমি কিছুটা স্বস্তি বোধ করলাম। বিছানা থেকে নেমে তার ডেস্কের ওপরে রাখা বৈদ্যুতিক ঘড়িটা চেক করলাম। তারপর গ্লাসে জল ভর্তি করে তার কাছে নিয়ে আসলাম।
“নয়টা বাজে।“
সে দুর্বল ভাবে মাথা নেড়ে উঠে বসল এবং দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে এক চুমুকে গ্লাসটা শূন্য করে দিল।
“আমি কি খুব বেশী পান করেছিলাম?”
“আমার ধারণা তাই। তোমার জায়গায় আমি হলে হয়তবা মরেই যেতাম।“
“আমি নিজেও অর্ধেক মৃত বলে অনুভব করছি।“
বিছানার পাশে রাখা প্যাকেট থেকে সে একটা সিগারেট নিয়ে আগুন ধরাল এবং প্রথম নির্গত ধুয়ার সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর দেশলাইটাকে খোলা জানালার ভেতর দিকে দূরের পোতাশ্রয়ের দিকে ছুড়ে মারল।
“পরার জন্যে কিছু একটা নিয়ে আস।“
“কিছু একটা মানে?”
সে চোখ পুনরায় বন্ধ করল। সিগারেটটা তখনও তার ঠোট থেকে ঝুলছিল।
“যে কোন পুরনো জিনিস।“
আমি রুমের অপর পাশে স্থাপিত ওয়ারড্রবের পাশে গেলাম। দরজা খুলে কিছুটা ইতস্তত ভাব নিয়ে একটা নীল রঙের সিল্ভলেস শার্ট বের করে এনে তার হাতে দিলাম। কোন ধরণের অন্তর্বাস ছাড়াই সে সেটা পরে ফেলল। তারপর পুনরায় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
“যেতে হবে আমাকে।”
“কোথায়?”
“কাজে।“ 
টলটলায়মান পায়ে দাঁড়িয়ে থুথু ফেলল। আমি বিছানার ধারে বসে বসে তাকে দেখতে লাগলাম। সে মুখ ধুয়ে মাথার চুলের ভেতরে চিরুনি চালাল।
তার কক্ষটা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। তবে পুরোপুরি নয়। সম্ভবত এই কক্ষ এর চেয়ে বেশী সুন্দর করে সাজানো শোভা পায় না। সুন্দর করার প্রচেষ্টা থেকে তার এই অব্যাহতিগ্রহণ কক্ষের বাতাস থেকেই বোঝা সম্ভব।
দশ বর্গফুট আয়তন বিশিষ্ট কক্ষ। সস্তা আসবাবপত্র দিয়ে ভর্তি। শোবার জায়গা ছাড়া আর কোন জায়গা অবশিষ্ট নেই। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে শুরু করল।
“কি কাজ কর তুমি?”
“সেটা কি তোমার জানার কোন বিষয়?“
এ বিষয়ে তর্ক চলে না। সুতরাং কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে একটা সিগারেট ধরালাম। আয়নার ভেতর দিয়ে সে আমার দিকে তাকাচ্ছিল এবং আঙুলের অগ্রভাগ দিয়ে তার চোখের নীচের কাল লাইনগুলো ম্যাসেজ করছিল।
“এখন সময় কত?” সে পুনরায় আমাকে জিজ্ঞেস করল।
“দশটা বেজে নয় মিনিট।“
“আমাদেরকে যেতে হবে। তোমার জামাকাপড় পর এবং বাড়িতে যাও,“ সে বলল বগলের নীচে ‘EAU DE COLOGNE’ স্প্রে করতে করতে। “তোমার কি বাসা আছে, নাকি নেই?”
“আছে।” বিছানা থেকে আমার টি-শার্টটা তুলে নিতে নিতে আমি জবাব দিলাম। আমি শেষবার জানালার ভেতর দিয়ে বাইরে তাকালাম।
“কোনদিকে যাবে তুমি?”
“পোতাশ্রয়ের কাছে। তোমার জানার দরকার কেন?”
“সেক্ষেত্রে আমি তোমাকে একটা লিফট দিতে পারি। তাহলে তোমার আর দেরী হবে না।“
চিরুনিটা হাতের ভেতরে রেখেই সে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকাল। যে কোন মুহূর্তেই তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে পারে। আমি ভাবলাম কেঁদে ফেললেই তার জন্যে ভাল হবে। কিন্তু সে কাঁদল না।
“দ্যাখো, একটা বিষয় পরিষ্কার না করলেই নয়। আমি যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম তার চেয়ে অনেক বেশী আমি পান করে ফেলেছিলাম। সুতরাং এর পর থেকে যা ঘটেছে তার দায়দায়িত্ব আমার নয়।“
সে চিরুনির হাতলটা দিয়ে নিজের হাতের ওপরে বার বার আঘাত করছিল। একজন ব্যবসায়ীর মত। আমি কিছু না বলে তার কথার অপেক্ষা করতে লাগলাম।
“আমি কি ঠিক?”
“নিশ্চয়ই।“
“কিন্তু যে মানুষ এরকম একজন নেশগ্রস্ত মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়, তার চেয়ে বেশী ঘৃণার পাত্র কি কেউ আছে?“
“কিন্তু আমি তো কিছুই করিনি।“
মুহূর্ত অতিক্রান্ত হবার পর আমি দেখলাম সে তার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
“তাই? তাহলে আমার গায়ে জামা ছিল না কেন?”
“তুমি নিজেই তোমার জামা খুলে ফেলেছিলে।“
“মিথ্যাবাদী!”
সে চিরুনিটাকে বিছানার ওপরে ছুঁড়ে দিল এবং তাড়াহুড়া করে তার কাঁধ ব্যাগের ভেতরে তার মানিব্যাগ, লিপস্টিক, এসপিরিন ঢুকাতে লাগল।
“তুমি কি প্রমাণ করতে পারবে যে, আমরা কিছুই করিনি?”
“তুমি নিজ থেকে পরীক্ষা করে দ্যাখো না।“
“আমি কিভাবে পরীক্ষা করব?” তাকে যথার্থই ভীষণ রকমের বিপন্ন দেখাচ্ছিল।
“তুমি আমার কথা বিশ্বাস করতে পার। আমি শপথ করে বলছি।“
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি না।“
“তাহলে আর কোন উপায় নেই।“ এই বার আমিও আমার আসল মেজাজ প্রদর্শন করলাম।
আমাদের আলাপচারিতার এখানেই সমাপ্তি। সে ধাক্কা দিয়ে আমাকে তার কক্ষ থেকে বের করে দিল। দরজা বন্ধ করে আমাকে অনুসরণ করল।
গাড়িটাকে একটা নির্জন স্থানে পার্ক করার পর নদী তীরের এসফল্ট বিছানো পথ ধরে দুজনে হাঁটলাম। নিঃশব্দে।
অতঃপর ফিরে আসার পর টিস্যু দিয়ে গাড়ির উইন্ডশিল্ডের ওপরে জমে থাকা জমে থাকা ময়লাগুলোকে পরিষ্কার করতে লাগলাম। সে খুব ধীরে গাড়ির চারদিকে বৃত্তাকারে ঘুরল। চোখে প্রবল সন্দেহ। গাড়ির হুডের ওপরে আঁকা একটা ষাঁড়ের মাথার সামনে সে থামল। ষাঁড়টার নাকের ভেতরে একটা বিশাল আংটি এবং দুই পাটি দাঁতের মধ্যখানে একটা গোলাপ ফুল। এছাড়াও ষাঁড়টার মুখে ছিল দুশ্চরিত্রের হাসি।
“এই ছবিটা কি তুমি এঁকেছ?”
“না। এই গাড়ির পূর্বের মালিক এঁকেছিল।“
“একটা ষাঁড়কে আঁকতে হল কেন?”
“এটা আমারও প্রশ্ন।“
দুই পা পিছিয়ে যেয়ে সে পুনরায় পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। তারপর গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। সম্ভবত বেশী কথা বলার জন্যে সে অনুতপ্ত।
গাড়ির ভেতরে দম বন্ধ করা গরম। কিন্তু পোতাশ্রয় পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত সে নীরবে একটার পর একটা সিগারেট খেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর পর তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছছিল। একটার পর একটা সিগারেট ধরাচ্ছিল সে। প্রতিটা সিগারেটে তিনটা টান দিয়ে বাটের ওপরে তার লিপস্টিকের দাগ পড়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখছিল। তারপর সেটাকে গাড়ির এশট্রের ভেতরে নিক্ষেপ করে পুনরায় একটা সিগারেট ধরাচ্ছিল।
“শোন, কালরাতে আমি কি কি বলেছিলাম?” সে চিৎকার করে বলে উঠল।
আমরা ততক্ষণে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছি।
“সব ধরনের বিষয় নিয়েই কথা বলেছ।“
“যেমন? বল আমাকে।“
“উদাহরণ হিসেবে বলা যায় তুমি জন এফ কেনেডির কথা বলেছ।“
“কেনেডি?”
“হ্যা, জন এফ কেনেডি।“
মাথা নেড়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমার কিছুই মনে নাই।“
শেষে এক হাজার ইয়েনের একটা নোট আমার কারের রিয়ারভিউ মিররের পেছনে গুঁজে দিয়ে গাড়ি হতে হনহন করে বের হয়ে গেল।


কয়েকদিন পরের সকাল। নতুন টি–শার্ট পরে পোতাশ্রয় শহরের রাস্তা দিয়ে ঘোরাফেরা করছি। ছোট্ট একটা রেকর্ডিং এর দোকান। ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলাম। কোন ক্রেতা ছিল না সেখানে। শুধুমাত্র খুবই নিরানন্দ এক অল্প বয়সী যুবতী কাউন্টারে বসে কোক পান করছিল। রেকর্ডের তাকের ভেতরে কয়েক মিনিট ধরে রেকর্ডগুলো নাড়াচাড়া করার পর মনে হল এই মেয়েকে আমি পূর্বে দেখেছি। এই সেই কনিষ্ঠা আঙ্গুলহীনা মেয়ে। এক সপ্তাহ পূর্বে যাকে আমি বাথরুমের মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। “হেই,” আমি বললাম। হতচকিত হয়ে সে প্রথমে আমার দিকে এবং তারপর আমার টি-শার্টের দিকে তাকাল। তারপর এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের অবশিষ্ট কোক গিলে ফেলল।
“তুমি কিভাবে জানলে যে আমি এখানে কাজ করি?” চরম বিরক্তি সহকারে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল।
“সম্পূর্ণ ভাগ্যক্রমে। আমি একটা রেকর্ড কিনতে এসেছি।“
“কোনটা?”
“The Beach boys LP, যেটায় ‘California Girls’ গানটা আছে?“
সন্দেহের চোখে সে ঘাড় নাড়ল। উঠে দাঁড়াল। রেকর্ডগুলোর তাকের কাছে গেল। অতঃপর একটা রেকর্ড হাতে করে ফিরে এল। প্রশিক্ষিত কুকুরের মত।
“এটা, ঠিক?”
আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। আমার হাতগুলো তখনও পকেট থেকে বের করিনি। দৃষ্টি দিয়ে দোকানটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম।
“Bithoven এর Piano Concerto Number3 টাও আমার দরকার।“
এবার সে দুটো রেকর্ড সহকারে ফিরে আসল।
“আমাদের কাছে Glen Gould এবং Backhaus দুটোই আছে। তুমি কোনটা চাও?”
“Glen Gould.”
সে একটা রেকর্ড কাউন্টারে রেখে অন্যটা তাকে রেখে এল।
“আর কিছু?”
“The Miles Davis এর এ্যালবাম যেখানে ‘A Gal in Calico’ আছে?“
এবারে সে কিছুটা সময় বেশী নিলেও রেকর্ডটা নিয়েই ফেরত আসল।
“তারপর?”
“এগুলোই সব। ধন্যবাদ।“
“এগুলো কি তোমার নিজের জন্যে?” কাউন্টারের ওপরে রেকর্ডগুলো সাজিয়ে রাখতে রাখতে সে জিজ্ঞেস করল।
“না। এগুলো উপহার।“
“বিশাল হৃদয়ের মানুষ তুমি!”
“আমিও নিজেকে নিয়ে তাই ভাবি।“
সে অস্বস্তির সাথে মাথা নাড়ল। তারপর সবগুলো বিল যোগ করল। ৫৫৫০ ইয়েন। আমি মূল্য পরিশোধ করে রেকর্ডের পার্সেলটা হাতে নিলাম।
“যাই হোক, তোমাকে ধন্যবাদ। দুপুরের পূর্বেই আমি তিনটে রেকর্ড বিক্রয় করতে সমর্থ হয়েছি।“
“আমিও খুশী।“
একটা দীর্ঘশ্বাস সহকারে সে কাউন্টারের পেছনে বসল। তারপর বিক্রয় রশিদগুলো পুনরায় নিরীক্ষণ করতে লাগল।
“তুমি কি সব সময়েই এখানে বস?”
“অন্য একটা মেয়ে আমার সাথে কাজ করে। এই মুহূর্তে সে লাঞ্চ করতে বাইরে গেছে।“
“তুমি লাঞ্চ করবে না ?”
“সে ফিরে আসার পর আমি যাব।“
আমি একটা সিগারেট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করলাম। তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার কাজ দেখতে লাগলাম।
“শোন,” আমি বললাম। “কেমন হয় যদি আমরা দু’জন আজ একসাথে লাঞ্চ করি?”
সে তার মাথা নাড়ল।
“আমি একাকী খেতেই পছন্দ করি,“ বলল সে। তার দৃষ্টি কখনই বিক্রয় রশিদগুলোর ওপর থেকে অন্যত্র সরছিল না।
“আমিও তাই করি।“
‘সত্যি?”
বিমর্ষ ভাবে সে বিক্রয় রশিদগুলো নামিয়ে রাখল। তারপর Harper এর Bizaree এ্যালবামটি টার্নটেবিলের ওপরে রেখে বলল,
“তাহলে আমাকে প্রস্তাব করলে কেন?”
“মাঝে মধ্যে আমি আমার অভ্যাসগুলোকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে থাকি।“
“ তাহলে একা একাই চেষ্টা কর।“ সে বিক্রয় রশিদগুলো কাছে টেনে নিল এবং কাজে ফিরে গেল।
“এখন অনুগ্রহ করে আমাকে একাকী থাকতে দিলে আমি খুশী হব।“
আমি মাথা নাড়ালাম।
“আমি তোমাকে আগেও বলেছি যে, তুমি একটা ফাজিল ধরনের মানুষ।“
তারপর ঠোঁটদ্বয়কে কুঞ্চিত করে হাতের চার আঙুল দিয়ে সে রশিদগুলোকে উল্টাতে লাগল।


ফোন বাজলো। হেলান চেয়ারে আমি তখন অর্ধ ঘুমের ভেতরে। দৃষ্টি কোলের ওপরে রাখা বইয়ের পাতায়। চোখ অর্ধ-নিমীলিত। দৃষ্টি অস্বচ্ছ। বাইরে গোধুলীর আলো অন্তর্হিত। সামনের বাগানের গাছগুলোর ভেতরে অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছিল। দক্ষিণের সাগর থেকে বাতাস ভেসে আসছিল। বাতাসের গায়ে সমুদ্রের লোনা গন্ধ। ব্যালকনিতে ঝুলন্ত লতানো গাছের পাতাগুলো সেই বাতাসে কম্পমান। জানালার পর্দাগুলোও দুলছিল।
“হ্যালো,“ একটা মেয়েলী কন্ঠ। কথার ধরণ দেখে এমন একজনের কথা মনে পড়ে যায় যে এবড়ো থেবড়ো টেবিলের ওপরে একটা ভঙ্গুর কাঁচের গ্লাসকে সন্তর্পণে স্থাপন করছে।
“মনে আছে আমাকে?”
আমি কয়েক মুহূর্তের জন্যে তাকে আমার স্মৃতির ভেতরে স্থাপন করার ভান করলাম। অতঃপর জিজ্ঞেস করলাম,
“রেকর্ডের ব্যবসা কেমন চলছে, তোমার?”
“খুব ভাল না। সবখানেই এখন বাজার খারাপ। রেকর্ডের বাজার আরও।“
“তাই?”
আমি শুনতে পাচ্ছিলাম নখ দিয়ে সে ফোনের ওপরে মৃদু আঘাত করছে।
“তোমার নম্বরটা জোগাড় করতে কষ্ট হয়েছে।“
“সত্যিই?”
“এজন্যে আমাকে জে’র বারে যেতে হয়েছিল। যে লোকটা সেখানে কাজ করে সে তোমার বন্ধুর নিকট আমার হয়ে নম্বরটা জিজ্ঞেস করেছিল। তোমার সেই বন্ধু। দীর্ঘদেহী বেঢপ ধরণের সেই মানুষটা। বারে বসে সে Moliere এর একটা নাটক পড়ছিল।“
“তাকে নিয়ে মজা করো না।“
কিছুক্ষণ নীরবতা।
“তোমার আকস্মিক উধাও হয়ে যাওয়া নিয়ে প্রত্যেকেই অবাক। সবাই ভাবছে তুমি অসুস্থ্য অথবা অন্যকিছু।“
“আমি যে এতটা জনপ্রিয় ছিলাম তা আমি কখনই জানতাম না।“
একটু ইতস্ততভাব। তারপর সে বলল, “তুমি কি আমার ওপরে রেগে আছ?”
“ হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন ?”
“আমি তোমার সাথে সেদিন সত্যিই খারাপ আচরণ করেছিলাম। পরবর্তীতে আমার মনে হয়েছে যে, তোমার নিকট আমার ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।“
“দ্যাখো, তোমার কোন সহানুভূতিই আমার প্রয়োজন নেই। ব্যাপারটা যদি সত্যিই তোমাকে বিব্রত করে থাকে তাহলে এক কাজ করতে পার। পার্কে গিয়ে কবুতরদের আহার দিতে পারো।“
সে একটা দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করে টেলিফোন লাইনের অপর প্রান্তে একটা সিগারেট ধরালো। আমি শুনতে পেলাম। Bob Dylon এর Nasville Skyline গানটার শব্দ শোনা গেল। সম্ভবত সে তার কর্মস্থল থেকে ফোন করেছে।
“তুমি বিষয়টা নিয়ে কি ভেবেছ সেটা আমার জন্যে সমস্যা নয়। তবে আমার উচিৎ হয়নি তোমার সাথে ওভাবে কথা বলা।“ সে খুবই দ্রুত কথা বলছিল।
“তুমি দেখি নিজের ওপরে খুবই ক্ষুব্ধ।“
“ঠিক তাই।“
সে কিছুক্ষণের জন্যে নীরব।
“আজ রাতে তোমার সাথে আমার দেখা হবার কোন সম্ভাবনা কি আছে?”
“নিশ্চয়ই।“
“রাত আটটায় জে’র বারে?”
“ঠিক আছে।“
পুনরায় নীরবতা।
“শোন, সাম্প্রতিককালে আমার খুব খারাপ সময় গেছে।“
“আমি বুঝতে পারছি।“
“ধন্যবাদ।“
সে ফোন ছেড়ে দিলো।


মেয়েটি জে’র বারের কাউন্টারে বসেছিল। কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে। ইতিমধ্যেই ড্রিংক হিসেবে এক গ্লাস Ginger Ale (আদার রস) পান করেছে। আমি প্রবেশ করার সময়ে সে একটা স্ট্র দিয়ে গ্লাসের তলায় জমে থাকা বরফের কুচিগুলো নাড়ছিল।
“আমি ভেবেছিলাম তুমি আসবে না,” কিছুটা চিন্তামুক্ত সুরে সে বলল।
“তোমাকে অপেক্ষা করানোর জন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত। আসার পূর্বে আমাকে একটা কাজ শেষ করে আসতে হল।“
“কি ধরণের কাজ?”
“জুতা। একজোড়া জুতা পালিশ করছিলাম।“
“তোমার পায়ের ঐ Sneaker জুতো জোড়া?" আমার বেসবল শ্যু’র দিকে প্রবল সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলল।
“না, আমার পিতার জুতা। এটা আমাদের পারিবারিক নিয়ম। আমার পিতা বিশ্বাস করেন যে, শিশুদের উচিৎ তাদের পিতাদের জুতাগুলো পালিশ করা।“
“কেন?”
“আমিও সঠিক জানি না। তবে আমার ধারণা বিষয়টিকে তিনি কোনকিছুর প্রতীক হিসেবে মনে করেন। প্রতিদিন ঠিক রাত আটটায় ঘরে ফিরেন তিনি। ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়। তার পূর্বেই আমি তার জুতাগুলো পালিশ করা সম্পন্ন করি এবং তারপর একটা বিয়ার পান করি।“
“অভ্যাস হিসেবে আসলেই চমৎকার।“
“তুমি কি তাই মনে কর?”
“অবশ্যই। নিজেকে তোমার কৃতজ্ঞ ভাবা উচিৎ।“
“ঠিক। তবে আমি কৃতজ্ঞ একারণে যে আমার পিতার শুধুমাত্র দুইটা পা আছে।“
সে খিলখিল করে হাসল।
“তুমি নিশ্চয়ই বনেদী ঘরের সন্তান।“
“ঠিক বলেছো। বনেদী কিন্তু পতনশীল। বিষয়টা আমাকে এতই আনন্দিত করে যে, এটা নিয়ে আমি কান্না শুরু করে দিতে পারি।“
“কিন্তু,” স্ট্র দিয়ে গ্লাসের ভেতরে নাড়তে নাড়তে সে বলল, “আমার পরিবার অনেক গরীব।“
“কিভাবে তুমি বুঝো যে তারা গরীব?”
“গন্ধ থেকে। গন্ধ থেকে ধনীদেরও চেনা যায়। একইভাবে গরীবদেরকেও।“
জে’র দেয়া বিয়ার আমার গ্লাসের ভেতরে ঢাললাম।
“আমি কি জানতে কি পারি তোমার পিতামাতা কোথায় থাকেন?”
“বিষয়টা নিয়ে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।“
“কেন?”
“ভদ্র ঘরের সন্তানেরা আগন্তুকদের সাথে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে কথা বলে না। তাই নয় কি?”
“তুমি কি নিজেকে ভদ্র ঘরের বলে মনে কর?”
সে প্রায় পনের সেকেন্ড ধরে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করল।
“আমার তাই ধারণা। আমিও সব সময়ে তাই হবার চেষ্টা করে থাকি। সবাই কি তাই করে না?”
আমি নিরুত্তর থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
“তারপরেও তোমার উচিৎ পারিবারিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা।“
“কেন?”
“প্রথম কারণ, কোন না কোন সময়ে তোমাকে কাউকে তো বলতেই হবে। দ্বিতীয় কারণ, তুমি আমাকে বললে আমি তা কারও কাছেই প্রকাশ করব না।“
সে মৃদু হাসল। সিগারেট ধরালো। অতঃপর তিনটে লম্বা সুখটান দিয়ে কাঠের তৈরী বারের দেয়ালটা নিরীক্ষণ করতে লাগল।
“পাঁচ বছর পূর্বে,” নীরবতা ভেঙে সে শুরু করল, “আমার বাবা ব্রেইন ক্যান্সারে মৃত্যু বরণ করেন। তার মৃত্যুটা ছিল খুবই কষ্টের। দুটো পুরো বছর তিনি নিজে ভোগান্তির ভেতরে ছিলেন। পৃথিবীতে আমাদের যা আয় হয়েছিল তার সমস্তটাই আমরা তার রোগমুক্তির জন্যে খরচ করেছিলাম। এটা আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এরপর পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করার জন্যে আমাদের পরিবারটাও ভেঙে গিয়েছিল। আমরা একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিলাম। এগুলোই হয়ে থাকে, তাই নয় কি?”
আমি মাথা নাড়ালাম।
“সুতরাং তোমার মায়ের কি হয়েছিল?”
“তিনি এখন অন্য জায়গায় বাস করেন। প্রতিবছর আমাকে নতুন বছরের কার্ড পাঠান।“
“মনে হচ্ছে তুমি তাকে খুব একটা পছন্দ কর না?”
“ঠিক।“
“কোন ভাই-বোন?”
“আমার একটা জমজ বোন আছে। আর কেউ নেই।“
“কোথায় থাকে সে ?”
“তিরিশ সহস্র আলোকবর্ষ দূরে।“
একটা ম্রিয়মাণ হাসি দিয়ে সে গ্লাস্টাকে দূরে সরিয়ে রাখল।
“নিজের পরিবার সম্পর্কে কটুকথা বলা কখনই উচিৎ নয়। কারণ বিষয়টা প্রকারান্তরে তোমাকেই আস্তাকুড়েতে নিক্ষেপ করবে।“
“এটা মনে করার কোন যৌক্তিকতা নেই। আমাদের বেশীরভাগ পরিবারেই এধরণের সমস্যা রয়েছে।“
“তোমারও?”
“ইয়েস, প্রতিদিন সকালে আমি সেভিং ক্রিমের কৌটা হাতে নিয়ে কান্নাকাটি করে থাকি।“
সে সুখীভাবে হাসল। তার হাসি দেখে মনে হল অনেক বছর সে হাসেনি।
“এতই যদি দুঃখ তোমার, তাহলে আদার রস (ginger ale) পান করছ কেন? দুঃখ থাকলে তোমার তো মদ পান করার কথা, জল নয়,“ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম।
“তা ঠিক। আমি এক্ষুনি এলকোহল পান করব।“
“কি পান করতে চাও তুমি?”
“White wine, যত ঠাণ্ডা হয়, তত ভাল।“
আমি জে’কে ডাকলাম। তার জন্যে এক গ্লাস মদ এবং আমার জন্যে আরেকটা বিয়ার আনতে বললাম।
“জমজ বোন থাকার অভিজ্ঞতাটা কেমন সে সম্পর্কে আমাকে বলো।“
“বিষয়টা আসলেই অদ্ভূত অনুভূতির সৃষ্টি করে। আমি বলতে চাচ্ছি দুজনের মুখই এক রকম দেখতে, দুজনেরই আইকিউ লেভেল এক, ব্রা’র আকৃতিও এক… আসলেই বিব্রতকর।“
“লোকজন কি তোমাদের দেখে খুবই বিভ্রান্ত হয়?”
“আমাদের আট বছর বয়স পর্যন্ত হতো। তবে আমার আঙুল যখন থেকে নয়টা হয়ে গেল, তারপর থেকে আর হতো না।“
বারের টেবিলের ওপরে সে তার হাত দুটোকে স্থাপন করল। পিয়ানো বাদক যেভাবে তার আঙুলগুলোকে বাজানোর পূর্বে সাজিয়ে নেয় সেভাবে। আমি আমার হাতের ভেতরে তার বাম হাতটিকে নিলাম এবং বারের প্রায়ান্ধকারের ভেতরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলাম। হাতটা খুবই ক্ষুদ্র আকৃতির ও ককটেল গ্লাসের মত শীতল। তবে তার চারটা আঙুল আর হাতের তালু মিলে মনে হচ্ছিল খুবই স্বাভাবিক। যেন জন্মের সময় থেকেই এমন ছিল। অলৌকিক ধরণের স্বাভাবিক। অন্তত এক হাতে ছয় আঙুল থাকার চেয়ে অনেক বেশী স্বাভাবিক।
“আট বছর বয়সে ভ্যাকিউম ক্লিনারের ভেতরে আমার কনিষ্ঠা আঙুলটি ঢুকে গিয়েছিল। অতঃপর সেখানেই রয়ে গিয়েছিল।“
“এখন কোথায় আছে সেটি?”
“কোথায় মানে? কিসের কথা বলছ তুমি?”
“তোমার কনিষ্ঠা আঙুল।“
“আমি ভুলে গেছি,” সে হাসতে হাসতে বলল।
“তুমি কি জান যে জীবনে তুমিই প্রথম ব্যক্তি যে আমাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল?”
“আঙ্গুলটা হারানোর কারণে তোমার কি কোন মনঃকষ্ট আছে?”
“আমি যখন গ্লোভস পরি, তখন আঙ্গুলটার কথা আমার খুব মনে হয়।“
“অন্য সময়ে মনে পড়ে না ?”
সে মাথা নাড়ল।
“আমি যদি বলি কখনই মনে পড়ে না, সেটা মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু আমার অবস্থা নিশ্চয়ই মোটা ঘাড় আর লোমশ পায়ের অধিকারিণী মেয়েদের চেয়ে ভাল।“
“আমি সায় দিলাম।
“তুমি কি কর?” সে জিজ্ঞেস করল।
“কলেজে পড়ি। টোকিওতে।“
“ছুটি কাটাতে বাড়িতে এসেছি।”
“কি বিষয়ে পড়াশুনা কর?”
“জীববিদ্যা। আমি পশুদেরকে ভালবাসি।“
“আমিও,“ সে বলল।
আমি চুমুক দিয়ে বিয়ারের গ্লাস শুন্য করে কয়েকটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই হাতের ভেতরে নিলাম। তারপর বললাম, “শোন..., ভারতের ভাগলপুরে বিখ্যাত একটা চিতাবাঘ ছিল। মাত্র তিন বছর সময়ের ভেতরে সে ৩৫০ জন ভারতীয়কে হত্যা করেছিল এবং তাদের মাংশ দিয়ে আহার করেছিল।“
“সত্যিই?”
“একজন ইংরেজ কর্ণেল জিম করবেট, যিনি একজন বিখ্যাত চিতাবাঘ শিকারী ছিলেন, তিনি মাত্র আট বছর সময়কালে সেই চিতাটি সহ সর্বমোট ১২৫টি বাঘ ও চিতা শিকার করেছিলেন। এর পরেও কি তুমি বলতে চাও যে তুমি পশুদের ভালবাস?”
সে তার মুখের সামনে সিগারেটের একটা ধূম্র জাল সৃষ্টি করল। এক চুমুক ওয়াইন পান করল। অতঃপর মুহূর্তের জন্যে মুগ্ধ দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ তুমি কি জান যে তুমি একটু পাগল ধরণের?”


টেলিফোনটা অনবরত বেজে চলছিল। আমি তখন মুখমন্ডলে লোশন মাখছিলাম। CALAMINE LOTION। বিগত কয়েকদিন নিয়মিতভাবে স্থানীয় সুইমিং পুলে নিয়মিত যাতায়াত করার কারণে আমার মুখের চামড়া তামাটে হয়ে গিয়েছিল। দশটা রিং বাজার পর আমি আলস্য ঝেড়ে ফেললাম। চেয়ার থেকে উঠলাম এবং হ্যান্ডসেট তুললাম।
“হ্যালো, ” অপর প্রান্তের কণ্ঠস্বর।
“তুমি?”
“তুমি কি করছিলে?”
“তেমন কিছু না।“
আমি ঘাড়ের ওপর থেকে টাওয়েলটা নিয়ে আমার আঠালো মুখটা মুছলাম।
“গতরাতে খুব আনন্দ করলাম। অনেকদিন পর প্রথমবার।“
“শুনে খুশী হলাম।“
“তুমি কি BEEF STEW খেতে পছন্দ কর?”
“খুবই।“
“আমি এক পাত্র রান্না করেছি। এক সপ্তাহেও আমার পক্ষে খেয়ে শেষ করা সম্ভব না। তুমি কি এসে আমাকে সাহায্য করবে?”
“লোভনীয় প্রস্তাব।“
“তাহলে এক ঘন্টার ভেতরে চলে আসো। এর ভেতরে যদি আসতে না পার, তাহলে আমি পুরোটাই ময়লার স্তূপে নিক্ষেপ করব। বুঝতে পেরেছ?”
“কিন্তু…”
“আমি অপেক্ষা করা একদম পছন্দ করি না।“
আমার কথা শুরু করার আগেই সে টেলিফোন ছেড়ে দিল।
আমি সোফার ওপরে শুয়ে থাকলাম। দশ মিনিট কাল। তারপর ছাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ এবং রেডিওতে TOP 40 গান শুনলাম। বাথরুমে গেলাম। শেইভ করলাম। গরম জলে স্নান করলাম। এক জোড়া BERMUDA SHORTS পরলাম। ধুপির দোকান থেকে নিয়ে আসা পরিচ্ছন্ন ও মসৃণ একটা শার্ট পরলাম।
অসাধারণ একটা বিকেল ছিল সেদিন। বেলাভূমির রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে সূর্যাস্ত দেখলাম। একটা দোকানে থেমে দুই বোতল শীতল WHITE WINE ও এক কার্টুন সিগারেট কিনলাম। অতঃপর তার বাসস্থানের দিকে যাত্রা শুরু করলাম।
ডাইনিং টেবিলটা পরিস্কার করে সে ওপরে সাদা প্লেট এবং একটা গামলা রাখল। আমি ফল কাটার ছুরির অগ্রভাগ মদের বোতলের কর্কের ভেতরে ঢুকালাম। তার সমস্ত রুম STEW এর বুদ্বুদ নিঃসৃত বাষ্প দিয়ে ঢেকে আছে।
“আমি বুঝতে পারি নাই যে এতটা গরম হবে,” সে বলল।
“ একেবারে নরকের মত।“
“নরক এর চেয়েও অনেক বেশী উষ্ণ।“
“মনে হচ্ছে তুমি সেখানে ছিলে।“
“না, আমি একজনের কাছ থেকে শুনেছি। নরককে ক্রমশ উত্তপ্ত করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে তোমার মনে হবে উত্তপ্ততার কারণে তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ। অতঃপর তোমাকে সেখান থেকে সল্পক্ষনের জন্যে অপেক্ষাকৃত শীতল কোন স্থানে স্থানান্তর করা হবে। তবে তুমি পুরোপুরি সুস্থ হবার পূর্বেই পুনর্বার তোমাকে নরকে প্রত্যাবর্তন করানো হবে।“
“তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে, নরক অনেকটা পার্থিব SAUNA’র মত?“
“অনেকটা তাই। তবে নরকে যাবার পর অনেকেই পুরোপুরি পাগল হয়ে যায়।“
“এদেরকে তখন কি করা হয়?”
“স্বর্গে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে তারা স্বর্গের দেয়াল রঙ করে। সারা দিনমান। কারণ স্বর্গের দেয়াল সকল সময়ে দুগ্ধধবল বর্ণের থাকা বাধ্যতামূলক। বিন্দুমাত্র নোংরা দাগও সেখানে অগ্রহণযোগ্য। আয়নার মত। ফলে, শেষ পর্যন্ত তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসে বড় ধরণের সমস্যা হয়।“
এরপর সে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা বন্ধ করল। আমি খুব সতর্কতা সহকারে চিমটি দিয়ে বোতলের ভেতরে পড়ে যাওয়া কর্কের টুকরাগুলো বের করে ফেললাম। তারপর দুইজনের গ্লাসে মদ ঢেলে দিলাম।
“ঠাণ্ডা মদ এবং উষ্ণ হৃদয়,” সে আমার জন্যে কামনা করল।
“কি বললে?”
“এটা টিভি কমার্শিয়াল থেকে শিখেছি। ঠাণ্ডা মদ এবং উষ্ণ হৃদয়। তুমি দ্যাখোনি?”
“না।“
“তুমি কি টিভি দ্যাখো না?”
“মাঝে-মধ্যে দেখি। এক সময়ে খুব দেখতাম। আমার প্রিয় ছিল LASSIE। যেখানে একটা আসল কুকুর ছিল।“
“তাই তো, তুমি তো পশু ভালবাস।“
“ঠিক।“
“সময় থাকলে আমি সারাদিন টিভি দেখতে পারি। তুমি যা কিছুর নাম বলবে, আমি তাই দেখেছি। গতকাল আমি একজন জীববিজ্ঞানী এবং রসায়নবিদের মধ্যে বিতর্ক দেখেছি। তুমি কি এটা দেখেছিলে?”
“না।“
সে এক চুমুক ওয়াইন পান করল এবং মৃদু মাথা নাড়াল। মনে হল সে কিছু মনে করার চেষ্টা করছে।
“তুমি তো জান যে, PASCAL এর বিজ্ঞানভিত্তিক অনূভুতি বা SCIENTIFIC INTUITION খুব প্রখর ছিল।“
“SCIENTIFIC INTUITION?”
“যেমন, ধর একজন সাধারণ মানুষ এরকম ভাবেঃ ক সমান খ, খ সমান গ, সুতরাং ক সমান গ। ঠিক?”
আমি মাথা নাড়ালাম।
“কিন্তু PASCAL এর ভাবনা ছিল ভিন্ন রকম। তিনি প্রথমেই ভাবতেন ক সমান গ। এটা প্রমাণ করা নিয়ে তিনি কখনই চিন্তিত ছিলেন না। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় থিয়োরিগুলো সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং তিনি অনেক মূল্যবান আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।“
“যেমন, VACCINE।”
সে তার মদ নামিয়ে রেখে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল।
“VACCINE? ওটা তো আবিষ্কার করেছিলেন Jenner। কলেজের পরীক্ষায় কিভাবে পাশ করেছ তুমি?”
“তাহলে সম্ভবত তিনি Rabbis এর ANTIBODY এবং নিম্ন তাপমাত্রার জীবাণুনাশক তৈরি করেছিলেন।“
“হায়, প্রভু।“
সে একটা আত্নতৃপ্তির হাসি দিল, গ্লাসের মদ পুরোটাই এক চুমুকে উজাড় করে দিল এবং পুনরায় গ্লাস ভর্তি করে নিল।
“টেলিভিশন বিতর্কে ঐ বিশেষ সামর্থকে বলে ‘Scientific Intuition’। তোমার কি এ বিষয়ে ধারণা আছে?”
“মনে হয় না।“
“তোমার কি এই ধরণের সামর্থবান হতে ইচ্ছে করে?”
“ কখনও, কখনও।”
“কখন?”
“যখন আমি কোন মেয়ের সাথে একই বিছানায় শুয়ে থাকি।“
সে হাসল এবং রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। একটু পর STEW এর পাতিল, এক গামলা সালাদ, এবং কিছু ROLL নিয়ে আসলো। এই সময়ে একটা শীতল বাতাস খোলা জানালা দিয়ে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করল।
আমরা আরাম করে বসলাম। তার রেকর্ড গুলো শুনতে শুনতে ডিনার করলাম। আমাকে সে অজস্র প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। বেশীরভাগই আমার স্কুলের ছাত্রজীবন এবং টোকিও’র জীবন নিয়ে। আমার জন্যে এটা ছিল যথেষ্টই বিরক্তিকর। আমি তাকে বিড়ালের ওপরে আমরা বালকেরা যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলাম সে সম্পর্কে বললাম। (তবে আমি তার নিকট গোপন রাখতে বাধ্য হলাম যে বিড়ালগুলোকে আমরা হত্যা করেছিলাম। তাকে শুধুমাত্র এটুকুই জানালাম যে, বিড়ালগুলোর মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতি নিয়ে আমরা শুধুমাত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলাম। কিন্তু সত্যটা ছিল যে মাত্র দুইমাস সময়কালে আমি এককভাবে ছত্রিশটি বিভিন্ন আকার ও আকৃতির বিড়ালের প্রাণহানির কারণ হয়েছিলাম।) আমি তাকে ছাত্রদের আন্দোলন এবং হরতাল সম্পর্কে বললাম। তাকে এটাও জানালাম একজন রায়ট পুলিশ কিভাবে আমার সম্মুখের একটা দাঁত সম্পূর্ণভাবে উপড়ে দিয়েছিল।
“তুমি কি এর প্রতিশোধ নিতে পেরেছিলে?”
“কি বলছ তুমি?”
“কেন নয়? তোমার জায়গায় আমি থাকলে আমি সেই পুলিশকে খুঁজে বের করতাম এবং হাতুড়ি দিয়ে তার সবগুলো দাঁতই উপড়ে দিতাম।“
“তাই? আমি তোমার মত না। আমার মনে হয়েছে যে বিষয়টা শেষ হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে উত্তেজিত হয়ে বা বাড়াবাড়ি করে লাভ নেই। এছাড়াও কোন পুলিশের পেছনে আমি ছুটতাম, সেটা নিয়েও আমার সন্দেহ ছিল। আমার কাছে সকল রায়ট পুলিশকে দেখতেই এক রকম লাগে।“
“তার মানে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।”
“কোন বিষয়?”
“এই যে তোমার দাঁতটা উপড়ে ফেলে দিল।“
“না।“
সে খুব বিরক্তি সহকারে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল এবং STEWতে পুনরায় কামড় দিল।
ডিনারের পর আমরা কফি পান করলাম। দুইজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ডিশগুলো ধুয়ে পরিস্কার করলাম। পুনরায় টেবিলে ফিরে গেলাম। সিগারেট জ্বালালাম। রেকর্ড প্লেয়ারে MJQ শুনলাম।
“খাবার কি ভাল লেগেছে?”
“খুবই ভাল লেগেছে।“
“তাহলে এতক্ষণ বলনি কেন?” তার নীচের ঠোঁট কামড়ে সে আমাকে বলল।
“এটা আমার একটা বদ অভ্যাস। আমি সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বলতে ভুলে যাই।“
“আমি কি তোমাকে একটা উপদেশ দিতে পারি?”
“অবশ্যই।“
“তুমি যদি তোমার এই অভ্যাস পরিবর্তন না কর, তবে শেষ পর্যন্ত তুমিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।“
“আমি জানি। তবে আমার অবস্থাটা অনেকটা পুরনো উড়োজাহাজের মত। একপাশে মেরামত করা হলে অন্যপাশে ভেঙে যায়।“
সে হাসল। ঘড়িতে তখন প্রায় আটটা বাজে।
“আজ কোন জুতা উজ্জ্বল করোনি?”
“আমি শুতে যাবার পূর্বে করি। যখন আমি দাঁত ব্রাশ করি।“
কথা বলার সময়ে সে আমার চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তার শীর্ণ বাহু দুটো টেবিল থেকে ওপরে প্রসারিত। তার কপোল দুই হাতের মাঝখানে। তার দৃষ্টি ক্রমশ আমাকে আবেশিত করে তুলছিল। আমি সিগারেট ধরাবার ছলে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলাম। ভাব দেখাচ্ছিলাম যে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। কিন্তু এটা শুধুমাত্রই তার মুগ্ধতাকেই সমৃদ্ধ করছিল।
“সুতরাং, আমার ধারণা আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারি।“
“কি বিষয়ে?”
“যে সেই রাতে তুমি আমার সাথে অবাঞ্ছিত কোন আচরণ করোনি।“
“কীভাবে বুঝতে পারলে?”
“তুমি কি সত্যিই চাও যে আমি তোমাকে বলি?”
“না।“
“আমি জানতাম যে তুমি এটাই বলবে,” সে উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে বলল। তারপর সে আমার গ্লাস ভর্তি করে দিল এবং অন্ধকার জানালার দিকে দৃষ্টি ফেরাল। কি বিবেচনা করে তা আমি জানি না।
“অনেক সময়ে আমি ভাবি অন্যদেরকে বিরক্ত না করে যদি জীবন যাপন করতে পারতাম, তাহলে কি ভালই না হতো। তোমার কি মনে হয় এটা সম্ভব?”
“আমার মনে হয় না, “ আমি বললাম।
“সুতরাং বল, আমি কি তোমাকে বিরক্ত করছি?”
“আমি অসুবিধা বোধ করছি না।“
“এখন পর্যন্ত, তাই তো?”
“ঠিক। এখন পর্যন্ত।“
সে টেবিলের ওপরে হাত প্রসারিত করে আমার হাতের ওপর তার হাত স্থাপন করল। কিছুক্ষণ সেটাকে সেখানে রাখল। তারপর ফিরিয়ে নিল।
“আমি একটা ভ্রমণে যাচ্ছি। আগামীকাল।“
“কোথায়?”
“এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। এমন একটা জায়গা যেটা নির্জন ও শান্ত। আমার পরিকল্পনা এটাই। এক সপ্তাহের জন্যে।“
আমি মাথা নাড়ালাম।
“আমি ফিরে আসার পর তোমাকে রিং দেবো।“

কারে করে বাসায় ফেরার সময়ে আমার হঠাৎ করে আমার জীবনের প্রথম ডেটের কথা মনে পড়ে গেল। সাত বছর পূর্বে।
মনে হল যে, আমি মেয়েটিকে বার বার জিজ্ঞেস করছিলাম, “তুমি কি নিশ্চিত যে আমি তোমাকে বিরক্ত করছি না?”
আমরা দু’জনে মিলে এল্ভিস প্রিসলি’র একটা মুভি দেখতে গিয়েছিলাম। মুভিটার থিম সং এর লিরিকটা ছিল এরকমঃ
আমাদের ঝগড়া হয়েছিল, একটা ভালবাসার খুনসুটি,
আমি তাকে লিখলাম যে আমি দুঃখিত, কিন্তু আমার চিঠিগুলো বারবার ফিরে আসতে লাগলো।
চিঠির ওপরে সে লিখেছেঃ
“প্রেরকের কাছে ফেরত প্রেরণ করা হলো, ঠিকানা জানা নেই,
কোন টেলিফোন নম্বর নেই, নাই কোন এলাকা।“
সময় কত দ্রুত চলে যায়!


টেলিফোনটা বেজে উঠলো।
“আমি ফিরে এসেছি,” সে বলল।
“আমি কি তোমাকে দেখতে পারি?”
“তুমি কি ফ্রি আছো?”
“অবশ্যই।“
“ঠিক আছে। তাহলে ঠিক পাঁচটার সময়ে এসো। YWCA তে।“
“ওখানে কি করো তুমি?”
“ফ্রেঞ্চ ক্লাস।“
“ফ্রেঞ্চ?”
“জী।“
আমি টেলিফোন ছেড়ে দিয়ে স্নানে গেলাম। ফিরে এসে একটা বিয়ার পান করলাম। এমন সময়ে বৃষ্টি শুরু হলো।
আমি YWCA তে পৌঁছবার পূর্বেই বৃষ্টি শেষ। তারপরেও দেখলাম যে ফ্রন্ট গেইটে মেয়েরা সন্দেহের চোখে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। বার বার ছাতা খুলছে আর বন্ধ করছে। একবার ভেতরে যাচ্ছে। পুনরায় ফিরে আসছে। রাস্তার অপর পাশে গাড়ি থামালাম এবং একটা সিগারেট ধরালাম। গেইটের বৃষ্টিস্নাত পিলারগুলোকে মনে হচ্ছিল প্রান্তরের ভেতরের কালো সমাধি স্তম্ভ। YWCAর পাশেই একটা অফিস বিল্ডিং। নতুন হবার কারণে ওটাকে সস্তা মনে হচ্ছিল। ওর ছাঁদের ওপরে রেফ্রিজারেটরের বিশালাকার এক বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে প্রায় তিরিশ বছর বয়সী ফ্যাঁকাসে রঙের নারী। ছবির সেই নারী মহা আনন্দের সাথে ফ্রিজের দরজা খুলে ধরেছে। ফলে ফ্রিজের ভেতরের সবকিছুই দৃশ্যমান।
ফ্রিজার কম্পার্টমেন্টের ভেতরে একটা বরফের ট্রে। ভেতরে এক কোয়ার্ট ভ্যানিলা আইসক্রিম, এক প্যাকেট বরফে জমে যাওয়া চিংড়ি। পরের অংশে এক কার্টুন ডিম, এক বক্স বাটার, Camembert cheese, চিকেনের পা এবং হাড্ডি বিহীন শুকরের মাংশ। সবচেয়ে নীচে স্তূপীকৃত করে রাখা হয়েছে টম্যাটো, মিষ্টি কুমড়া, অ্যাস প্যারাগাস, লেটুস এবং আঙুর। দরজার ভেতরের দিকের কোটরে তিনটে করে কোলা ও বিয়ার এবং এক কার্টুন দুধ।
আমি গাড়ির স্টিয়ারিং এ বসেই ভাবতে লাগালাম সবচেয়ে ভালো কোন পদ্ধতি অনুসরণ করে আমি খাবারগুলো দ্রুত গলাধকরন করতে পারি। আমার কাছে সবচেয়ে বেশী আকর্ষণীয় মনে হলো আইসক্রিম এবং সবচেয়ে বিস্বাদ সালাদ ড্রেসিং।
ঠিক পাঁচটার পরেই সে গেইট দিয়ে বের হলো। তার চুল পনিটেইল করা। পরেছিলো একটা গোলাপী Lacoste polo শার্ট, একটা সাদা মিনিস্কার্ট এবং চশমা।
“কী বিশ্রী বৃষ্টি!” প্যাসেঞ্জার সীটে বসতে বসতে সে বলল।
“তুমি কি ভিজে গেছো?”
“একটু।“
গাড়ির ব্যাক সীট থেকে সে বীচ টাওয়েলটা নিয়ে আমি তাকে দিলাম। শেষবার আমার সুইমিং পুলে যাবার পর থেকে ওটা ওখানেই পড়ে ছিল। অব্যবহৃত। সে তার মুখের ঘাম মুছলো এবং ভেজা চুলের ওপর দিয়ে সেটাকে হালকাভাবে স্পর্শ করলো কয়েকবার। অতঃপর আমাকে ফিরিয়ে দিলো।
“বৃষ্টির সময়ে আমি কোণার কফিশপে বসে কফি পান করছিলাম। মুষলধারে বৃষ্টি।“
“একারণেই চারপাশটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।“
“ঠিক,” সে মাথা নাড়ালো। তার হাত জানালা দিয়ে বাইরে প্রসারিত। তাপমাত্রার পরিবর্তন বোঝার জন্যে। একটা নতুন ধরণের অপ্রতিভ ভাব বিরাজ করছে আমাদের মধ্যে।
“নিশ্চয়ই তোমার ভ্রমণ ভালো হয়েছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“কোন ভ্রমণে যাইনি আমি। তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম।“
“কেনো মিথ্যে বলবে?”
“আমি পরে তোমাকে বলবো।“


আহার করার জন্যে নয় আঙুলের মেয়ে আর আমি বন্দর সন্নিকটের ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম। খাবার শেষে আমরা Bloody Mary ককটেল আর Bourbon হুইস্কি পান করবো বলে। 
“তুমি কি জানতে চাও আসলে কি ঘটেছিলো?” সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো।
“তুমি কি জানো যে গতবছর আমি একটা গরুকে ব্যবচ্ছেদ করেছিলাম?” আমি বললাম প্রত্যুত্তরে।
“সত্যিই?”

“পেট কাটার পর দেখা গেলো ভেতরে একটা বিশাল আকারের ঘাসের জাবর। আমি তৎক্ষণাৎ সেটাকে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরলাম এবং বাসায় নিয়ে এলাম। তারপর সেটাকে পড়ার ডেস্কের ওপরে এক কোণায় স্থাপন করলাম। সেদিন থেকে আমার যখনই মন খারাপ হতো, আমি সেই অর্ধেক পরিপাক হওয়া ঘাসের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম কোন অদ্ভূত কারণে গরু কষ্ট করে জাবরকাটে? এমন বিস্বাদ ও হৃদয়স্পর্শী জিনিসকে বার বার চিবোয়?” 
সে তার ঠোঁট বাঁকা করে সামান্য একটু হাসলো এবং মুহূর্তের জন্যে আমার মুখটা নিরীক্ষা করে দেখলো।
“বুঝতে পেরেছি,” সে বলল। “যা বলতে চেয়েছিলাম সে সম্পর্কে আমি আর কিছুই বলবো না।“
আমি সায় দিয়ে মাথা নাড়লাম।
“অন্য একটা বিষয় নিয়ে তোমার কাছ থেকে জানতে চাচ্ছিলাম,” সে বলল। “জিজ্ঞেস করবো?”
“অবশ্যই।“
“মানুষেরা মরে যায় কেন?”

“বিবর্তনের কারণে। কারণ বিবর্তন সম্পন্ন হবার জন্যে যে পরিমান শক্তির প্রয়োজন তা কোন একক প্রাণীর থাকে না। ফলে একটা বিবর্তন পূর্ণভাবে সাধিত হতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেগে যায়। এটা অবশ্য একটা মতবাদ।“
“তোমার কি ধারণা আমরা মানুষেরা এখনো বিবর্তিত হচ্ছি?”
“অবশ্যই। তবে খুব ধীরে ধীরে এবং একটু একটু করে।“
“এর আদৌ কি দরকার ছিলো?”

“এ বিষয়েও মত-দ্বৈততা রয়েছে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত যে, শুধু প্রাণী বা উদ্ভিদেরা নয়, যে বিশাল মহাজগতে আমরা বসবাস করি তা নিজেও বিবর্তনের শিকার। যদিও বলা সম্ভব নয় যে বিবর্তনের কারণে মহাজগৎ কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে। অথবা এমনও হতে পারে যে, কোন বৃহত্তর শক্তি আমাদেরকে চালিত করছে। তবে সবকিছুই হচ্ছে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। তাই এটা নিশ্চিত যে বিবর্তন সত্য এবং আমরা মানুষেরা বিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র।“
আমি হুইস্কির গ্লাস্টাকে নীচে নামিয়ে রেখে একটা সিগারেট ধরালাম।
“বিবর্তনের শক্তি কোথা থেকে আসে, তা কেউ জানে না,” আমি বললাম।
“সত্যিই?”
“সত্যি।“

সে গ্লাসের ভেতরের বরফগুলোকে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করলো এবং সাদা টেবিল ক্লথটাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।
“আমার ধারণা আমি মরে যাবার এক শতাব্দীর মধ্যেই আমাকে কেউ মনে রাখবে না।“
“সম্ভবত না,” আমি বললাম।
আমরা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে নির্জন রাস্তার ওপরে হাঁটলাম। রাস্তার পাশে সারি সারি গুদাম। সময়টা গোধুলিকাল। চারপাশটা অদ্ভূত রকমের উজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত। আমি তার পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। তার চুল থেকে মৃদু শ্যাম্পুর গন্ধ আসছিলো। উইলো গাছের পাতা নড়ছিলো। বাতাসে শেষ গ্রীষ্মের আবহ।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমার হাত ধরলো। তার পাঁচ আঙুলের হাতটি দিয়ে।
“তুমি টোকিওতে ফিরে যাচ্ছ কবে?”
“আগামী সপ্তাহে। একটা পরীক্ষা আছে।“
সে কোন কথা বলল না।
“আমি শীতের সময়ে ফিরে আসবো। Christmas এর পূর্বেই। আমার জন্মদিন ডিসেম্বরের ২৪ তারিখে।“
“তুমি মকর রাশির, তাই না?”
“ঠিক। তোমারটা কি?”
“একই। জন্ম তারিখ ১০ জানুয়ারী।“
“ আমার ধারণা এই রাশিতে জন্মানো মানুষেরা ভাগ্যবান হয় না, ঠিক? যেমন যীশু খৃষ্ট।“
“ঠিক,“ সে আমার হাতটাকে ঠিকভাবে আঁকড়ে ধরতে ধরতে বলল।
“আমার মনে হয় তুমি চলে যাবার পর আমি তোমাকে মিস করবো।“
“আমাদের আবার দেখা হবে নিশ্চয়ই।“
সে কোন উত্তর করলো না।

যে গুদামগুলোর পাশ দিয়ে আমরা অতিক্রম করছিলাম, সেগুলো ছিল যথেষ্টই পুরনো। ইটের ফাটলের ভেতর দিয়ে সবুজ শ্যাওলা জমেছিলো। কালো কালো জানালাগুলো অনেক উপরের দিকে স্থাপিত ছিলো। বাইরে দিয়ে লোহার গারদ দেয়া। মরিচা পড়া দরজার ওপরে কোম্পানির নাম লেখা ছিলো।
গুদামগুলো অতিক্রম করে সামনে যেতেই সাগরের গন্ধ। রাস্তার পাশের উইলো গাছের সারিগুলোও হঠাৎ অন্তর্হিত। ফলে জায়গাটাকে দেখতে লাগছিলো দাঁত খসে যাওয়া কোন চোয়ালের মতো। আমরা বন্দরের তৃণ আচ্ছাদিত পথ দিয়ে একটা নির্জন জেটি পর্যন্ত এগিয়ে গেলাম। সেখানে সাগরের দিকে মুখ করা একটা গুদামের সামনের পাথরের সিঁড়িতে বসলাম।

শীপ ইয়ার্ড ডকের আলো সরাসরি একটা গ্রীক মালবাহী জাহাজের উপর সরাসরি পতিত হয়েছে। জাহাজটাকে ইতিপূর্বেই আনলোড করা হয়েছে। উঁচু জল রেখা দেখেই বোঝা যায়। জাহাজটাকে মনে হলো পরিত্যাক্ত। ওটার সাদা রঙের ডকের ওপরে সমুদ্রের লবনাক্ত জলের কারণে লাল মরিচা ধরে গিয়েছিলো এবং পার্শ্বদেশে গুগলি-শামুকের আস্তরণ জমে গিয়েছিল। রোগাক্রান্ত শরীরের খোসপাঁচড়ার মতো।
আমরা অনেক সময় ধরে সেখানে বসে থাকলাম। সাগর, বিকেলের আকাশ এবং জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে। সমুদ্র বায়ু কম্পমান ঘাসগুলোর ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিলো। রাতের প্রায়ান্ধকার নেমে আসার সাথে সাথে ডকের ওপরে কয়েকটা তারা মিটিমিট করছিলো।
সেই প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করলো। তার বাম হাতের মুষ্ঠি দিয়ে ডান হাতের মুষ্ঠির ওপরে বারবার আঘাত করতে করতে। তার হাতের তলা লাল বর্ণ ধারণ করার সময় পর্যন্ত। সে তার মুষ্ঠির দিকে নিস্তেজ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। যেন হঠাৎ করে জীবনের সকল আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
“আমি সবাইকে ঘৃণা করি।“ নির্জনতার ভেতরে তার কথাগুলো ঝুলতে লাগলো।
“আমাকেও?”
রক্তিম বর্ণ ধারণ করে সে হাতদুটোকে হাঁটুর কাছে নামিয়ে আনলো।
“দুঃখিত, তোমাকে ঘৃণা করি না।“
“মানে, খুব বেশী ঘৃণা কর না, তাই তো?”

সে মাথা নাড়ালো এবং একটা ম্লান হাসি হাসলো। সিগারেট ধরানোর সময়ে আমি দেখলাম তার হাত কাঁপছে। তার মাথার চুলকে অতিক্রম করে ধুঁয়া সাগরের দিকে উড়ে গেলো এবং অন্ধকারের ভেতরে বিলীন হয়ে গেলো।
“আমি যখন একা থাকি, তখন অনেকগুলো কণ্ঠস্বর আমার সাথে কথা বলতে থাকে,” সে বলল।
“সব ধরনের মানুষেরা। যাদের কয়েকজনকে আমি চিনি এবং কয়েকজনকে চিনি না। এদের মধ্যে আমার পিতা, মাতা এবং শিক্ষকেরাও আছেন।“
আমি মাথা নাড়ালাম।
“তারা সবাই আমাকে কটু কথা বলে। আমাকে মরে যেতে বলে, অথবা গালিগালাজ করে।“
“কি ধরণের কটু কথা বলে?”
“আমার পক্ষে পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়।“
তার চামড়ার স্যান্ডেলের তলায় সে সদ্য ধরানো সিগারেটটা পিষে ধরলো। অতঃপর আঙুলের অগ্রভাগ দিয়ে তার চক্ষুদয়কেচেপে ধরলো। মৃদুভাবে।
“তোমার কি ধারণা আমি অসুস্থ?”
“বলা কঠিন।“ আমি মাথা নাড়লাম শুধুমাত্র তাকে বোঝানোর জন্যে যে আমি সত্যিই জানি না।
“তুমি যদি চিন্তিত হয়ে থাকো, তবে ডাক্তার দেখাতে পারো।“
“ভেবো না, আমি ঠিক হয়ে যাবো।“
সে দ্বিতীয় সিগারেট ধরালো এবং হাসার চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না।
“তুমিই প্রথম ব্যক্তি যাকে আমি কথাগুলো বললাম।“
তার হাত আমার হাতের ভেতরে নিলাম। তার হাত কাঁপছিল এবং আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঘাম বের হচ্ছিলো।
“আমি সত্যিই তোমার কাছে মিথ্যে বলতে চাইনি।“
“আমি জানি।“

আমরা পুনরায় নীরবতার ভেতরে ডুবে গেলাম। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ জেটিতে নরম ভাবে আঘাত করছিলো। আমি যতটুকু ভেবেছিলাম তার অনেক বেশী সময় এই নিস্তব্ধতার মধ্যে পার হয়ে গেলো।

সে কাঁদছিল। আমি আঙুল দিয়ে তার কপোলের অশ্রু মুছে দিলাম এবং আমার বাহু দিয়ে তার কাঁধকে আলিঙ্গন করলাম।
অনেক বছর পূর্বে আমি গ্রীষ্মের সুবাস অনুভব করেছিলাম। সেই সুবাসের সাথে ছিলো সাগরের ঢেউয়ের গন্ধ, দুরাগত ট্রেনের বাঁশির গান, একজন নারীর চামড়ার স্পর্শ, লেবুফুলের মতো তার চুলের গন্ধ, বিকেলের বাতাস, আশার ক্ষীণ আভাষ আর গ্রীষ্মকালের স্বপ্ন।
এর পরেও আমি এগুলোকে অনুভব করেছি। কিন্তু তখনকার মতো করে নয়। কারণ সেগুলো ছিলো অনুজ্জ্বল। ম্লান। বাতাসে ক্রমাগত উড়ে যাওয়া ট্রেসিং পেপারের মতো।


হেঁটে হেঁটে তার এপার্টমেন্টে পৌঁছাতে আধাঘণ্টা লাগে। উজ্জল নক্ষত্রের রাত। কান্নাকাটি করার কারণে তার মানসিক অবস্থা বিস্ময়কর রকমের ভালো। পথের পাশের কয়েকটা দোকানে থেমে দু’জনে অপ্রয়োজনীয় বেশকিছু জিনিসপত্র কিনলাম। স্ট্রবেরী ফ্লেভারের টুথপেস্ট, একটা সমুদ্র সৈকতের টাওয়েল, ডেনমার্কের তৈরী একটা Jigsaw Puzzle, ছয় রঙের কালিযুক্ত একটা বলপেন, এবং আরো কিছু। কেনা জিনিসগুলো নিয়ে আমরা পুনরায় পোতাশ্রয়ে ফিরে গেলাম। সেখানে আমার গাড়িটা পার্ক করা ছিলো। গাড়ির ভেতরে জিনিস গুলো জড়ো করে রাখলাম।
“গাড়িটাকে কি এখানে রেখে যাওয়া যাবে?”
“হু। আমি পরে এসে এখান থেকে নিয়ে যাবো।“
“সারা রাত কি এখানে রাখা সম্ভব?”
“তাও সম্ভব,” আমি বললাম। আমরা তখন টালি পাথরের পথ দিয়ে হাঁটছিলাম।
“আজ রাতে আমি একা থাকতে চাই না, “ টালি পাথরের দিকে তাকিয়ে সে বললো।
আমি মাথা নাড়ালাম।

“কিন্তু তোমার পিতার জুতা পালিশের কি হবে?”
“আজকে না হয় তিনি নিজেই পালিশ করবেন।“
“কিন্তু তিনি কি তা করবেন?”
“অবশ্যই। কারণ সর্বোপরি তিনি একজন নীতিবান মানুষ।“
সেটা ছিল শান্ত নির্জন রাত। সে আমার দিকে মুখ ফিরালো। তার নাকের অগ্রভাগ আমার কাঁধ স্পর্শ করে আছে।
“আমার শীত লাগছে।“
“শীত? এখন তো নব্বই ডিগ্রি তাপমাত্রা!”
“তাতে কিছুই যায় আসে না। আমি শীত অনুভব করছি।“
আমাদের পায়ের কাছে রাখা টেরিক্লথ কম্বলটা টেনে উপরের দিকে তুললাম। ঠান্ডায় সে গাছের পাতার মতো কাঁপছিল।
“তুমি কি অসুস্থ বোধ করছো?”
মাথা নাড়লো।
“আমি ভীত,” সে বলল।
“কি নিয়ে?”
“সবকিছু নিয়েই। তুমি ভয় পাও না?”
“না।“
সে চুপ হয়ে গেলো। আমার উত্তরটাকে সে মনে হলো তার হাতের তালুতে রেখে ওজন করে দেখছে।
“আমরা কি আজ রাতে পরস্পরের সাথে মিলিত হবো?”
আমি মাথা নাড়ালাম।
“সম্ভব নয়। আমি দুঃখিত।“
আমি সম্মতি জানালাম। আমার বাহু তখনো তাকে ঘিরে আছে।
“সম্প্রতি আমার একটা অপারেশন হয়েছে।“
“এবরশন?”
“হ্যাঁ।”
সে তার বাহুদ্বয়কে আমার শরীর থেকে সরিয়ে নিল।
“আসলেই অদ্ভূত। আমি কিছুই মনে করতে পারছি না।“
“কি মনে করতে পারছো না?”
“তাকে। পিতাটাকে। এমনকি সে দেখতে কেমন ছিলো, তাও না।“
আমি তার মাথার চুলের ওপরে আমার হাতের তালু রাখলাম।
“আমার মনে হয়েছিলো আমি তাকে ভালোবাসি। যদিও তা খুব অল্প সময়ের জন্যে।“ সে একটু দম নিল।
“তুমি কি কখনো প্রেমে পড়েছিলে?”
“হ্যা।“
“তুমি কি মনে করতে পারো সে দেখতে কেমন ছিলো?”
তিনজন মেয়ের সাথে আমার ভাব হয়েছিলো। আমি তাদের প্রত্যেকের মুখ মনে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অদ্ভূত কারণে কারো মুখই স্পষ্টভাবে মনে করতে পারলাম না।

“না,” আমি বললাম।
“অদ্ভূত! এমন কেন হয়?”
“সম্ভবত এটাই আমাদের জীবনকে সহজ করে দেয়।“
সে কয়েকবার মাথা নাড়লো। অতঃপর বাহু দিয়ে পেছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমার ভীষণ রকম বিয়ারের তেষ্টা পেয়ে গেলো।
“অনেক বছর ধরে আমার কিছুই ঠিক নেই।“

“কত বছর?”
“বারো, তেরো......যেদিন থেকে আমার পিতা অসুস্থ হয়ে গেলেন। সেই দিনের পূর্বের সময়ের আর কোন কিছুই আমার মনে নেই। সবকিছু সেদিন থেকে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। মনে হয় কোন এক অপয়া বাতাস আমাকে গ্রাস করেছিলো।“
“বাতাসের গতিপথও তো পরিবর্তিত হয়ে যায়।“
“যায় নাকি? তুমি কি তাই মনে কর?”
“হ্যা, তুমি যদি অনেকদিন অপেক্ষা করতে পারো।“

সে কিছুই বলল না। তার নীরবতা ছিল মরুভূমির মতোই শুষ্ক। সেটা আমার কথাগুলোকে গ্রাস করে ফেললো। শুধুমাত্র মুখের ভেতরে বিস্বাদটা রয়ে গেলো।
“আমিও সেটাই বিশ্বাস করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোনো কাজে দেয়নি। এমনকি প্রেমে পড়ার চেষ্টাও করেছিলাম এবং চেয়েছিলাম ধৈর্য ধারণ করতে। কিন্তু তারপরেও......।’

আমরা আর কথা বলার চেষ্টা করিনি। শুধু পরস্পরকে ছুঁয়ে ছিলাম। নিঃস্পন্দভাবে সে শুয়ে ছিল। যেনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই নীরবতা ছিলো দীর্ঘস্থায়ী। এতোটাই দীর্ঘস্থায়ী যে আমি অর্ধ অবচেতনে কালো ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। অনন্ত সময় ধরে।

“মা,” সে অস্ফুটভাবে উচ্চারণ করেছিল সে। তারপর আমি নিশ্চিত যে একটা গভীর ঘুমে নিমগ্ন হয়ে গিয়েছিল।
(শেষ)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

Best Electronics
Best Electronics