নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে নেই সেই কোলাহল

নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে নেই সেই কোলাহল

শাহরিয়ার নাসের, নোবিপ্রবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:২৮ ২৮ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৭:৩৮ ২৮ মার্চ ২০২০

করোনার ছুটিতে নোবিপ্রবির গোলচত্বর, প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবন- ১ ও ২। ছবি: উপম

করোনার ছুটিতে নোবিপ্রবির গোলচত্বর, প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবন- ১ ও ২। ছবি: উপম

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পড়েন আমরান রিয়াজ। করোনার ছুটিতে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। গত কয়েকদিন ধরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না হওয়ায় আবেগতাড়িত হয়ে পুরোনো অ্যালবাম থেকে বিভাগের গ্রুপে ছবি দিয়ে বন্ধুদের উদ্দেশে লিখেছেন বন্ধুরা খুব মিস করছি তোদের! আবেগতাড়িত হয়ে কেউ লিখছেন বন্ধুরা সবাই ভালো থাকিস, নিরাপদে থাকিস। যদি বেঁচে থাকি আবার দেখা হবে। কেউ আবার ফেসবুকে ক্যাম্পাসে আড্ডার গ্রুপ ছবি আপলোড দিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন। সবার মনে করোনা আতঙ্ক।

করোনাভাইরা থেকে বেঁচে থাকতে গত ১৮ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এ ছাড়াও ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়ানক হওয়ায় আবার প্রাক-প্রাথমিক থেকে সব রকমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির সময় বৃদ্ধি করা হয়। ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেয়া থাকলেও তা বাড়িয়ে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। 

সরকারি নির্দেশনা পেয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. দিদার-উল-আলম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন। আবাসিক শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে দেয়ার নোটিশ দেয়া হয়। ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার অনুপস্থিতিতে কোলাহলের ক্যাম্পাস আজ জনশূন্য। নেই জম্পেশ আড্ডা। পার্ক ক্যান্টিন, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, নীলদিঘী, শান্তি নিকেতনে নেই কারো আনাগোনা।

ক্লান্তির ক্লাস শেষে ঘোরাঘুরির বিকেলে বাংলাবাজারে চলে যেত একদল শিক্ষার্থী। সেই বাংলাবাজারও আজ নিস্তব্ধ। পার্ক ক্যান্টিনে এখন আর রাজনৈতিক কোনো মিটিং নেই। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন টং দোকানগুলোও আজ ক্রেতাশূন্য। দ্বিতল লালবাসে বন্ধুরা মিলে আর গাওয়া হয়না গান। ক্যাম্পাসের লাল আর সাদা বাসগুলোও যেনো আজ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। সংগীতপ্রেমীদের আড্ডা নেই আজ ক্যাম্পাসে। গীটার হাতে শান্তি নিকেতন কিংবা খেলার মাঠে দেখা যায় না কাউকে। নেই গ্রুপ অ্যাসাইনম্যান্ট আর প্রেজেন্টেশন মিটিং। ক্লাস টেস্ট, সেমিস্টার ফাইনালও নেই। 

পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়েন নাঈমুল হক। করোনার ছুটিতে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে এসেছেন নিজ এলাকা ময়মনসিংহে। মিস করছেন প্রিয় ক্যাম্পাসকে। তিনি বলেন, করোনার ছুটির কারণে ১৭ মার্চ বাসায় চলে আসি। বাসায় আসার পর থেকে রুমে গৃহবন্দী। কোথাও বের হতে পারছি না। বাসার সবাই উদ্বিগ্ন। খুবই মনে পড়ছে নোবিপ্রবির ১০১ একরকে। সারাদিন শুয়ে বসে অলস সময় পার করছি। সেই সঙ্গে মোবাইল ফোনের গ্যালারি চেক করে শুধু নোবিপ্রবির দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। খুব বেশি মিস করছি শান্তিনিকেতন, সেন্ট্রাল ফিল্ড, ক্যাফেটেরিয়া, পার্ক কেন্টিন, টং, বিশেষ করে পার্ক ক্যান্টিনের আড্ডা ও গানকে। মিস করছি মালেক হলের ৫২২ নাম্বার রুমটাকে। মিস করি আমার ডিপার্টমেন্ট একাডেমিক ভবন দুই এর ৬ষ্ঠ তলাকে। বন্ধুবান্ধব, বড় ভাইবোন, ছোট ভাইবোন সবাইকেই খুব মিস করছি। যে যেখানেই থাকি না কেন সবসময় নিজেদের প্রতি যত্ন নিই এবং বাড়ির মানুষগুলোকে সময় দিই। ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুত ফিরে আসা হবে নোবিপ্রবির ১০১ একরে। দেখা হবে বন্ধুবান্ধব, বড় ভাইবোন, ছোট ভাইবোনদের সঙ্গে। কথা হবে, আড্ডা হবে, গান হবে ফিরে আসবে সেই কর্মব্যস্তময় দিনগুলো।

সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রুহুল আমিন রাহিদ বলেন, ১৪-১৫ দিন নিজেকে ঘরে আবদ্ধ রাখা নতুন অভিজ্ঞতা। যারা আড্ডা প্রিয় মানুষ তাদের জন্য কষ্টের অভিজ্ঞতাও। কারণ, আমাদের প্রতিটি সকাল শুরু হয় বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে। তারপর একের পর এক ক্লাস, ক্লাসের ফাঁকে আড্ডা, টঙের চপ, লাল চা, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস, হলে জুনিয়র-সিনিয়র মিলে আড্ডা এভাবেই কাটে স্বপ্নিল দিনগুলো। এরকম প্রতিটা দিনের অজস্র মুহূর্তকে স্বভাবতই মিস করি। কিন্তু আমার এবং আমার আশেপাশের মানুষের জীবনের মূল্যের কাছে এ কষ্ট তেমন কিছু না। আমার একার ভুলে আক্রান্ত হতে পারি নিজে। একইসঙ্গে আক্রান্ত করতে পারি আশপাশের মানুষদের। এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই। তাই চাইলেই বইয়ে ডুব দেয়া যায়, মুভি দেখা যায়, স্কুল বা কলেজ ফ্রেন্ড যাদের সঙ্গে সচরাচর কথা হয় না, তাদেরও খবর নেয়া যায়। আর ফেসবুকে গেলে মনে হয় আমরা বন্ধুরা খুব একটা দূরে নেই। করোনা যেহেতু একটা ছোঁয়াচে রোগ সেহেতু জনসমাগম থেকে দূরে থাকা উচিত। অতি প্রয়োজনে বাইরে বের হলেও মাস্ক পরি।হ্যান্ডশেক বা কোলাকুলি থেকে দূরে থাকছি। গণপরিবহন ব্যবহার করছি না। বাসায় ফেরার পর হাত, মুখমণ্ডল সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করছি। হাঁচি বা কাশির সময় শিষ্টাচার মেনে চলছি। 

নীরবে দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীশূন্য নোবিপ্রবির লালবাস

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আতাহার সিফাত বলেন, আমরা সব সময় একটা রুটিনমাফিক ছুটি পাই, কিন্তু এবারই প্রথম তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটল। নিজেরাই অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি নিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাস্ততাই আমাদেরকে সতেজ রাখে। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, ক্লাস টেস্ট, সেমিনার, খেলাধূলা ছাড়াও নানান সংগঠনের দায়িত্ব পালন নিয়ে আমরা ব্যাস্ত থাকি। সেন্ট্রাল ফিল্ডগুলো নিয়মিত আমাদের দখলে থাকতো, একপাশে কেউ ক্রিকেট খেললে অপর পাশে আমরা ফুটবল নিয়ে নেমে পড়তাম। সন্ধ্যার পর জমে উঠতো ৭-৮ জন মিলে আড্ডা ও চা চক্র। দেশ ও বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি,সংস্কৃতি, খেলাধূলা, বিনোদন কোনো কিছুই আড্ডার বিষয় থেকে বাদ পড়তো না।

এখন সব কিছুর জন্যই মন খারাপ হয়ে যায়। বন্ধুবান্ধব, সিনিয়র-জুনিয়র ভাইয়া আপুরা, শিক্ষকবৃন্দ সবার অনুপস্থিতিটা অনুভব করছি। কোয়ারেন্টাইন সময়টাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। সংগ্রহে থাকা বইগুলো পড়া শুরু করেছি। কিছু বইয়ের পিডিএফ নিয়ে রেখেছি। অনলাইনে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও দেখতেছি। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার, ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিচ্ছি। একটা নির্দিষ্ট সময়ে মহামারীর সংবাদ নিয়ে বাকি সময়টাতে অন্যান্য কাজ করছি। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর রাখছি। সর্বোপরি বেশি বেশি ইবাদাত করছি, নিজে সচেতন থাকছি এবং পরিবার সহ আশপাশের অন্যান্য মানুষকেও সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ঘরে বসেই বিভিন্ন সংস্থাকে সাহায্য করছি। তাছাড়া, সবসময় ইতিবাচক চিন্তা ধরে রাখতেছি। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আবার ক্যাম্পাসে ফিরে যাব। সেমিস্টারটা দিয়েই আন্তঃডিপার্টমেন্ট ফুটবলের জন্য অনুশীলনে নেমে পড়ব। এই অল্প কযেকটা দিন সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে ধৈর্য্য ধারণ করার শক্তি দিক। সুস্থ থাকার তৌফিক দিক।

ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা পলি বলেন, ১৬ মার্চ হঠাৎ নোটিশ আসলো আগামীকাল সকাল ১০টার মধ্যে হল ছাড়তে। নোটিশটা পেয়েই খুব খারাপ লেগেছিল। আমার আবার এক জায়গায় অনেক দিন থাকতে থাকতে একটা মায়া ধরে যায়। সেজন্য ক্যাম্পাসে গেলে কখনো কখনো ২-৩ মাসও হয়ে যায় বাসায় যাই না এত কাছে বাড়ি হয়েও। আবার বাড়ি এসে অনেকদিন থাকলেও বাড়ি ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। যাই হোক! ১৭ তারিখ ভোরে চলে আসা প্রিয় ক্যাম্পাস ছেড়ে। এরপর এখন পর্যন্ত বাসায় স্টে করা। পরিবারের সঙ্গে রুটিনে আসলে মন্দ কাটছে না সময়টা। তবে আসার সময় একবারও ভাবিনি আমি আসলে অনির্দিষ্টকালের জন্য চলে যাচ্ছি। বা কখনো আবার প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে যাবো কি যাবো না এসব চিন্তাও একবারের জন্য মাথায় আসেনি। কিন্তু এখন খুব ভয় হচ্ছে। মনের মধ্যে অজান্তেই দানা বেঁধে উঠছে নানা প্রশ্ন। আবার কি প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে যেতে পারবো! আবার কি আগের মত সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে! 

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এসকে সুমন বলেন, ক্যাম্পাস ছেড়ে যখন বাড়িতে আসি তখন ভালোই লাগছিলো কিন্তু দিন যতোই যাচ্ছে ক্যাম্পাসের জন্য মন ততোই ব্যাকুল হচ্ছে। মিস করছি বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়টুকু। মিস করছি বড় ভাইয়া আপুদের কাটানো সময়। কিন্তু সব কিছু কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছে, সবাই একটাই মেসেজ দেই যদি বেঁচে থাকি তবে আবার দেখা হবে। এটা সত্যিই  বেদনাদায়ক। বন্ধের সময়টা শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ও মানুষের মাঝে  করোনা ভাইরাস  নিয়ে সচতনতা বৃদ্ধি কিভাবে হয় এটা নিয়ে কাজ করছি।

শিক্ষা বিভাগের আজগর হোসাইন বলেন, করোনা পুরো বিশ্বের জন্য আতঙ্ক। পুরো বিশ্ব এখন অনেক কঠিন সময় পার করছে। করোনার কারণে আমরা যে স্বাভাবিক চলাফেরা করতাম তা আর সম্ভব হচ্ছে না। হোম কোয়ারান্টাইনে থাকতে হচ্ছে। ক্যাম্পাসের সময় গুলোকে এখন অনেক মিস করছি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, হলে থাকা সব মিলেয়ে সেই আগের সময়ের অপেক্ষা আছি। আল্লাহ আমাদের মাফ করুক।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম