নুসরাত হত্যায় আরো ১২ জনকে খুঁজছে পিবিআই

নুসরাত হত্যায় আরো ১২ জনকে খুঁজছে পিবিআই

ইদ্রিস আলম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:২০ ১৫ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ০৯:২১ ১৬ এপ্রিল ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ফেনীর মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরো অন্তত ১২ জন জড়িত রয়েছে বলে খোঁজ পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

রোববার মামলার অন্যতম দুই আসামি নুরুদ্দিন এবং শাহাদত হোসেন শামীম আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সন্দেহভাজন ওই সব ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেছেন।

এর মধ্যে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের নামও রয়েছে। বাকিদের বেশিরভাগই ওই মাদরাসার আলিম ও ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঘটনায় জড়িত ছিলেন মাদরাসা কয়েকজন শিক্ষকও। এর ফলে অন্তত ২৫ জন আলোচিত নুসরাত মামলায় আসামি হতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।

রোববার দীর্ঘ ৯ঘণ্টা ধরে ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন নুরুদ্দিন ও শামীম জবানবন্দি রেকর্ড করেন। বিকেল ৩টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এজাহারভুক্ত আসামি নুরুদ্দিন ও শাহাদাত পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন।

জবানবন্দি শেষ হলে রাত ১টা ৫ মিনিটের দিকে পিবিআই এর স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন এন্ড অপারেশনের এএসপি তাহেরুল হক চৌহান সংবাদমাধ্যমে ব্রিফ করেন। এ সময় পিবিআই এর এএসপি মনিরুজ্জামান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা-পিবিআই'র পরিদর্শক মো. শাহ আলম উপস্থিত ছিলেন।

দুই আসামি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আদালতের নিকট জবানবন্দি দিয়েছেন উল্লেখ করে এএসপি চৌহান বলেন, দুই আসামি পুরো বিষয়টি খোলাসা করেছেন। কারা কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, কী প্রক্রিয়ায় ঘটিয়েছেন, তা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। কিন্তু মামলার তদন্তের স্বার্থে সবকিছু এখনই বলা যাবে না। আসামিরা অপরাধ স্বীকার করেছেন। তারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তারা জেলখানা থেকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার হুকুম পেয়েছেন।

তাহেরুল হক বলেন, নুসরাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এ পর্যন্ত ১৩ জনের নাম পাওয়া গেছে। এছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে আরো কিছু নাম এসেছে। সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখে, নিশ্চিত করা হবে।

এর আগে ঢাকায় পিবিআই সদর দফতরে এজাহারভুক্ত আসামিসহ মোট ১৩ জন হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত বলে জানান পুলিশের এই ইউনিটের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। 

এদিকে তদন্ত সূত্র জানায়, যৌন হয়রানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেফতার হওয়ার পর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের সহায়তায় নুরুদ্দিন ও শাহাদাত মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করে। এজন্য আরেক এজাহারভুক্ত আসামি আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর তাদের ১০ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন। এছাড়া মাদ্রাসার আরেক শিক্ষক আন্দোলন ও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য ৫ হাজার টাকা দেন।

সরাসরি হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া শাহাদাত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর সে দৌঁড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যায়। এর মিনিট খানেকের মধ্যে নিরাপদ স্থানে গিয়ে সে রুহুল আমিনকে ফোনে আগুন দেয়ার বিষয়টি জানায়। সে সময় রুহুল আমিন বলে, আমি জানি। তোমরা চলে যাও।

শাহাদাত বলেছে, নুসরাতের দায়ের করা মামলার পর রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিল। এজন্য সে অধ্যক্ষ সিরাজের পরিবারের কাছ থেকেও টাকা নেয়।

নুসরাতের প্রতি নিজেরও ক্ষোভ থাকার কথা উল্লেখ করে শাহাদাত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, দেড় মাস আগেও সে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নুসরাত তাকে প্রত্যাখান করার পাশাপাশি অপমান করে। এ কারণে সে নিজেও নুসরাতের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। যার ফলে অধ্যক্ষ সিরাজের নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

অন্যদিকে জবানবন্দিতে আসামি নুরুদ্দিন জানায়, তার সঙ্গে অধ্যক্ষ সিরাজের ভালো সম্পর্ক। গত ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে ফেনী কারাগারে দেখা করেন শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ আরো কয়েকজন। সেখানে মামলা দায়ের করার কারণে নুসরাতকে কঠিন সাজা দিতে অধ্যক্ষ সিরাজের অনুমতি চান তারা। এসময় শামীম নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেন। তখন অধ্যক্ষ সিরাজ তাতে সায় দেন এবং ওই কাজ হাসিলের জন্য তার অনুসারীদের পরামর্শ দেন।

নুরুদ্দিন তার জবানবন্দিতে আরো বলেন, এতে শামীম বেশি উৎসহ বোধ করেন। কারণ সে রাফিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত ও অপমানিত হয়েছে। সে নিজেও তার বন্ধুকে রাফির অপমানের প্রতিশোধ নিতে অনেক দিন ধরেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।

নুরুদ্দিনের জবানবন্দিতে আরো জানা যায়, সে ও তার সহযোগীরা ওস্তাদের (সিরাজ উদ দৌলা) নির্দেশনা পাওয়ার পর ৫ এপ্রিল মাদরাসার পাশের পশ্চিম হোস্টেলে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে গোনীয়তা রক্ষা করে কীভাবে হত্যা করা হবে, তার পরিকল্পনা করা হয়। পরের দিন ৬ এপ্রিল সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। তবে ঘটনার সময় সে ভবনের নিচে ছিল বলে জবানবন্দিতে দাবি করেন নুরুদ্দিন। 

পরিকল্পনা অনুযায়ী মাদরাসার শিক্ষার্থী ও অধ্যক্ষ সিরাজের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। মূলত এই পপিই হলো নুসরাতের জবানবন্দিতে উল্লেখিত আলোচিত শম্পা। পুলিশ ও নুসরাতের পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে শম্পা নামে কল্পিত চরিত্রের গল্প ফাঁদে নুরুদ্দিন। ওই সময় ছাদে কামরুন নাহার মণিও ছিল। সে এবং হাফেজ আবদুল কাদেরসহ অপর পাচজন আগে থেকেই গেট পাহারা দিচ্ছিল।

নুরুদ্দিন আরো জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা নানা সময়ে ছাত্রীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের যৌন হয়রানি করতো।

এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

এর আগে ২৭ এপ্রিল ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর পর থেকে তিনি কারাগারে। ওই ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

এসব ঘটনায় গত ১১ এপ্রিল রাতে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে নূর উদ্দিন ও ১২ এপ্রিল সকালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে শাহাদাত হোসেন শামীমকে গ্রেফতার করে পিবিআই। নূর উদ্দিন নুসরাত হত্যা মামলার ২ নম্বর ও শাহাদাত হোসেন শামীম ৩ নম্বর আসামি।

সোনাগাজীর চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ছয় আসামি ছাড়াও সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর/এলকে