Alexa নুসরাত হত্যার রায়: আশার বার্তা

নুসরাত হত্যার রায়: আশার বার্তা

প্রকাশিত: ১৬:৪৭ ২৮ অক্টোবর ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

নুসরাত হত্যার রায় বেরিয়েছে। হত্যাকারীদের মৃত্যু দণ্ডের রায়  দেয়া হয়েছে। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে এত দ্রুততম সময়ে আর কোনো বিচার সম্পন্ন হবার নজির নেই। রায় শোনার পর আশাবাদী হয়ে উঠেছি। এমনভাবে যদি সব অন্যায়-অপরাধের দ্রুততম সময়ে বিচার আর বিচারের রায় যথাযথভাবে কার্যকর হয় তাহলে অপরাধী অপরাধ করার আগে দুবার ভাববে। 

বর্তমানে অপরাধীদের অবস্থা এমন যে, যেন তারা অপরাধ করার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। এ দেশ যেন অপরাধীর অভয়ারণ্য। এরা অপরাধ করে সাঙ্গপাঙ্গসহ বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। থানা-পুলিশ এদের পকেটে থাকে। তাই অপরাধ করতে এদের হাত, বুক কোনোটাই কাঁপে না। আমরা যদি  পেছনের দিকে তাকাই, একের পর এক নৃশংস হত্যার চিত্র ভেসে উঠবে চোখের পাতায়। সাগল- রুনি সাংবাদিক দম্পতি হত্যার কাহিনি কাঁপিয়ে দিয়েছিল সারা দেশ। ঘরে ঢুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাদের। কেন, কোন অপরাধে তাদের হত্যা করা হলো এক দশক পেরিয়ে গেলেও  আজও জানা যায়নি। জানা যায়নি কে/ কারা তাদের হত্যাকারী। তাদের একমাত্র সন্তান বাবা মাকে হারিয়ে আত্মীয়-স্বজনের কাছে মানুষ হচ্ছে। বাবা-মার ভালবাসা কী জানতেও পারলো না এই দুর্ভাগা অবোধ শিশুটি! 

চট্টগ্রামে প্রকাশ্য দিবালোকে সিসিক্যামেরার আওতার মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হলো পুলিশ অফিসার বাবুল আকতারের স্ত্রী মিতুকে। এই হত্যা নিয়ে অনেক নাটক হলো। নানান বাঁকে ঘুরল  হত্যা কাহিনি। দেশবাসী তখন দিনের পর দিন উৎসাহের সঙ্গে নজর রাখতো পত্রিকার পাতায়। একসময় প্রায় নিশ্চিত মনে হলো বাবুলই তার স্ত্রীর হত্যাকারী। তারপর যেন কী হলো। পুলিশ বিভাগ থেকে বাবুলের চাকরি গেল। শুনেছি  বর্তমানে সে একটা বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করছে। মিতু হত্যার বিচার কবে হবে জানি না। 

এইতো সেদিন ছোট্ট মেয়ে সায়মাকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলল নিজেদের বাড়ির ভেতরে। মিন্নিকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারল উন্মত্ত জনতা। আবরারকে সহপাঠীরা পিটিয়ে মারলো  ফেসবুকে পোস্ট দেবার অপরাধে। মৃত্যু এখন খুবই সাধারণ। হত্যা করা গাছ কাটার মতোই সহজ ব্যাপার।  দিনের পর দিন অন্যায়ের স্রোতের ধারায় মিশছে আরো আরো অন্যায়। রক্তের স্রোতের ধারায় আরো আরো রক্ত। আমরা পথ চেয়ে আছি বিচারের আশায়। 

মাঝে মাঝে কিছু বিচার করে তো বিচার বিভাগ প্রমাণ করে দেয় তারা স্বল্পতম সময়ে যথোচিত বিচার করতে পারে। তাহলে যে বিচারগুলি ঝুলে যায় সেগুলোর নেপথ্যে কী থাকে কোনো প্রভাবশালী মহল!

নুসরাত মাদ্রাসা ছাত্রী। ফেনীর সোনাগাজির ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় পড়ত সে। ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষের লালসার শিকার হলো । নুসরাত ঘটনাটা চেপে গেল না । মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা তার সম্ভ্রমহানি করতে চাইল, সহজ বাংলায় যাকে বলে ধর্ষণ, সেটাই  করতে চাইল। ও ধর্ষিত হলো না মুখ বুজে। বরং অধ্যক্ষের বিরিুদ্ধে একটা মামলা করে বসল। কত বড় সাহস মেয়ের! কত বড়! অধ্যক্ষ গ্রেফতার হলো। মামলা তোলার জন্য উপর্যুপরি চাপ চলল নুসরাতের ওপর। কিন্তু নুসরাত একদম অনড়। তারপরই মঞ্চস্থ হলো একটা নাটক। নুসরাতের বন্ধুকে ছাদে ফেলে মারছে এই সংবাদ পরিবেশিত হল নুসরাতের কানে বিশ্বাসযোগ্য করে। ছুটে গেল নুসরাত। আর সেখানে ছিল বোরখা ঢাকা চারজন, হতে পারে পুরুষ,  হতে পারে নারী, তবে পশু যে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ওরা হাত মুখ বেধে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে জ্বালিয়ে  দিয়ে মত্ত উল্লাসে বলল, ‘পালা’। 

নুসরাতের শরীরের ৮৫ ভাগ দগ্ধ হল। ও পানি খেতে চেয়েছিল, পায়নি। পানি পেলেও খেতে পারত না! খাবার অবস্থা ওর ছিল না। গালের ভিতরের পুরোটাই ছিল পোড়া। হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দিতে বলেছিল, দেয়নি । মৃত্যুর সঙ্গে ধুঁকল চারদিন। সারাদেশ থমকে রইল, তার জন্য প্রার্থনা করল। 

আর হ্যাঁ, এদেশের কিছু মানুষরূপী পশু অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করল, মিছিল করল। স্বাধীন বাংলার মাটিতে ওরা একজন ধর্ষকের জন্য মিছিল করল বিনা বাধায়, বিনা প্রতিবাদে। এত সাহস ওরা পায় কোথায়, কে জোগায় এই সাহস?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নুসরাতকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠাতে চেয়েছিলেন। নুসরাত বিবেচক মেয়ে । রাষ্ট্রের টাকা খরচ না করেই চলে গেল। চিকিৎসাধীন নুসরাতের  শেষ কথা ছিলো, ‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করে যাবো।’ ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে মারা গেলো নুসরাত। সারাটা দেশ প্রচণ্ড নাড়া খেল। আর অতি আশ্চর্য এই অবস্থাতেও কিছু মানুষ নুসরাতের বিপক্ষে বলতে লাগল। সে নাকি ভালো ছিল না। যতো দোষ নাকি তার ইরানি বোরখার। ইরানি বোরখা পরা দেখলে নাকি পুরুষের শরীরের কামভাব জাগে! মরেও নিস্তার পেলো না নুসরাত।
একদল প্যানেল আইনজীবী নুসরাতের মামলা লড়তে ফেনী গেল। ইজ্জত কিছুটা রক্ষা হলো। 

এদেশে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে। রায় কার্যকর হয়েছে। জাতির জনক হত্যার রায় কিছুটা কার্যকর হয়েছ। কিছুটা কার্যকরের প্রক্রিয়ায় আছে।  নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিচার, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে।  সরকারের সদিচ্ছা থাকলে আর বিচার বিভাগ সক্রিয় থাকলে দ্রুততম সময়েই বিচার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।  সম্ভব যে তার প্রমাণ আমরা এরইমধ্যে পেয়েছি।

একথা ঠিক যে, বর্তমানে দল মতের উর্দ্ধে উঠে একের পর এক দুর্নীতিবাজআর সন্ত্রাসীদের সনাক্ত করে গ্রেফতার করছে সরকার। ফলে পেশীশক্তি আর ক্ষতার দাপটে যা নয় তাই করার প্রবণতা কিছুটা সময়ের জন্য হলেও কমেছে। এটি শুভলক্ষণ। 

খুনিদের ১৬ জনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ হয়েছে । খুনিদের মধ্যে একজনের কোলে সদ্যজাত শিশু। শিশু কোলে নিয়ে সে মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনেছে। ঘটনাটি বার বার সোসাল মিডিয়ায় আসছে। খবরের কাগজে প্রকাশিত হচ্ছে। এতে শিশু সন্তানের কি হবে ভেবে অনেকে তার প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে উঠছে। কিন্তু এই অতি প্রচার সঠিক নয়। কারণ ওই মহিলা  সন্তান পেটে নিয়েই নুসরাতকে পুড়িয়ে মারতে গিয়েছিল। নৃসংশ হয়ে উঠেছিল। তখন সে একবারও ভাবেনি অন্ত:সত্তা অবস্থায় এতবড় অপরাধ করা অনুচিত। এই অন্যায়ের প্রভাব তার গর্ভস্থ সন্তানের ওপর পড়তে পারে। 

অপরাধী অপরাধীই। কোনো কারণে তার অপরাধকে লুঘ করে  দেখা উচিত নয়। ছাড় দেয়া উচিত নয়। একটা দুটো  ছাড় দেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন হলেই অপরাধীরা ওই দৃষ্টান্তকেই নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হবে। ‘দুর্জনের ছলের অভাব নেই’ কথাটা আমাদের মনে রাখতে হবে। এ কথাও মনে রাখতে হবে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে কিছুটা শক্ত আর কঠোর হতে হয়। দেশকে অপরাধীমুক্ত করতে হলে সেটা প্রয়োজন। আমরা চাই নুসরাত হত্যার মতো আবরারসহ অন্যান্য হত্যার রায় দ্রুততম সময়ে কার্যকর হোক।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর