নিষ্ঠুর দাস বাণিজ্য বন্ধে লড়াই করেন এই নারী

নিষ্ঠুর দাস বাণিজ্য বন্ধে লড়াই করেন এই নারী

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪৮ ৮ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৫:০৫ ৮ এপ্রিল ২০২০

ছবি: নেজিংগা ছবির দৃশ্য

ছবি: নেজিংগা ছবির দৃশ্য

নিজ কর্ম দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক নারীই জায়গা করে নিয়েছেন। এদের মধ্যে কেউবা নায়িকা কেউবা রয়েছেন খলনায়িকা। আজ ডেইলি বাংলাদেশের সাতরংয়ের আয়োজন সাজানো হয়েছে ইতিহাসের বিখ্যাত এক নারী শাসককে নিয়ে। যিনি একটি জাতিকে রক্ষা করেছিলেন দাস বাণিজ্য প্রথা থেকে।

সময়টা ছিল খ্রিস্টীয় ১৬ ও ১৭ শতক। সেসময় এনডোঙ্গো ও মাতম্বা রাজ্যের (যা আজ আফ্রিকার দক্ষিণে অ্যাঙ্গোলা নামে পরিচিত) রানি ছিলেন রানি আনা নেজিংগা। তিনি আনা দে সওসা নেজিংগা মম্বদে নামেও পরিচিত। নেজিংগার পিতা এনগোলা কিলুয়ানজি কিয়া সাম্বা ছিলেন এনডোঙ্গো জনগণের শাসক। যা অ্যাঙ্গোলার বিভক্ত জাতির অর্ধেক অংশ। 

নেজিংগা ছোট থেকেই বাবাকে অনুসরণ করতেন। তার বাবা কীভাবে রাজ্য শাসন করেন সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতেন তিনি। তবে তা গোপনে। কারণ সেসময় মেয়েদের প্রশাসনিক সব কাজের বাইরে রাখা হত। নেজিংগার জন্ম ১৫৮৩ সালে। জন্মের সময় তার গলায় নাড়ি পেচিয়ে ছিল। অনেক লড়াই করে বেঁচে যায় নেজিংগা। সেসময় অনেক গ্রামবাসীর বিশ্বাস ছিল যে এই পদ্ধতিতে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিরা শক্তিশালী এবং বিখ্যাত ব্যক্তি হয়ে উঠবে। আরো জানা যায়, গ্রামের এক নারী নাকি নেজিংগার মাকে বলেছিলেন যে তার মেয়ে বড় হয়ে রানি হবে। এ ভবিষ্যৎবাণী কাকতালীয়ভাবেই মিলে যায়। 

নেজিংগাএকসময় এনডোঙ্গো ও মাতম্বা রাজ্যে পর্তুগিজদের শাসন বেড়ে যায়। তারা দাস ব্যবসার প্রসার ঘটায়। এছাড়াও এ অঞ্চলে রূপার খনি থাকায় পর্তুগিজদের নজরে আসে। ধারণা করা হয়, এখান থেকেই পুরো ইউরোপে দাস শ্রমিকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করা হত। তখন রাজা এনগোলা পুরো আফ্রিকাকে বাঁচাতে পর্তুগিজদের সঙ্গে দাস ব্যবসার চুক্তি করে। পর্তুগিজরা রাজার কথা মেনে তাকে রাজ্য শাসনের ভার দেয় এবং তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। তবে রাজার মৃত্যুর পর রাজার পুত্রদের কারাগারে নিক্ষেপ করে তারা রাজ্য দখল করে নেয়। 

রাজ্যে পর্তুগিজরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার চালাতে থাকে। এসব মানতে পারছিল না নেজিংগা। পর্তুগিজদের ক্ষমতায় থাকা নিয়েও তিনি ছিলেন অসন্তুষ্ট। নেজিংগা একদিন তার ভাইকে নিরাপদে মুক্তি এবং অ্যাঙ্গোলার লোকদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়ার দাবিতে সরাসরি পর্তুগিজ গভর্নরের অফিসে গিয়ে হাজির হয়। গভর্নর নেজিংগাকে বসার জন্য কোনো চেয়ার দেয়নি। নেজিংগার সঙ্গে ছিল তার ৫০ জন চাকর। এমন সময় একজন চাকরের পিঠে বসে নেজিংগা তার আলোচনা শুরু করে।

আলোচনা শেষ হওয়ার পর নেজিংগা চাকরকে দাঁড়াতে বললেন। এরপর পর্তুগিজের গভর্নরের সামনেই তার গলা কেটে ফেলেন। এতে তিনি পর্তুগিজদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। নেজিংগার এমন আচরণে কিছুটা ঘাবড়ে যান পর্তুগিজের গভর্নর। এরপর তারা নেজিংগার ভাইকে মুক্ত করে দেয়। কিছুদিন পর নেজিংগার ভাই এবং ভাইয়ের ছেলে মারা যায়। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, নেজিংগা নিজেই তার ভাই আর ভায়ের ছেলেকে হত্যা করেছিল। যাতে সে নিজে সিংহাসনে আরোহণ করতে পারেন। অন্যান্য ঐতিহাসিক বিবরণীতে পাওয়া যায় নেজিংগার ভাই রাজ্য চালাতে নিজের অক্ষমতা উপলব্ধি করে আত্মহত্যা করেছিলেন। 

দাস বাণিজ্যযাই হোক না কেন ১৬২৪ সালে নেজিংগা সিংহাসনে বসেন। হয়ে ওঠেন এনডোঙ্গোর রানি। তবে রানি হওয়া নেজিংগার জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে তার নিজের বোন। পর্তুগিজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নেজিংগাকে সরানোর নানা ফন্দি করতে থাকে তার বোন। রানির প্রাসাদে পর্তুগিজদের অনেক গুপ্তচর ছিল। পর্তুগিজদের সামরিকভাবে পরাস্ত করতে না পেরে, নাজিংগা এবং তার লোকেরা পশ্চিম দিকে পালাতে বাধ্য হয়। ১৬২৯ সালে রানি এনডোঙ্গো থেকে মাতম্বা অঞ্চলে চলে আসেন। আর সেখানে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকেই তিনি তার রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। আর সেইসঙ্গে পর্তুগিজদের থেকে তার রাজ্যকে মুক্ত করার লড়াই চালাতে থাকেন।

নেজিংগা তার রাজ্য থেকে দাস ব্যবসা এবং পর্তুগিজদের তাড়াতে লড়াই চালাতে থাকেন। মাতম্বা থেকে নেজিংগা তিন দশক স্থায়ী যুদ্ধে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। এসময় রানি তার রাজ্যে পালিয়ে আসা দাস এবং পর্তুগিজ প্রশিক্ষিত আফ্রিকান সৈন্যদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। এতে এনডোঙ্গোর মধ্যেও অশান্তি সৃষ্টি হয়ে যায়। তখন এনডোঙ্গো পুরোপুরি পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে। নেজিংগা পর্তুগিজদের প্রতিদ্বন্দ্বী করতে ডাচদের সঙ্গে হাত মেলান।

পর্তুগিজরা ১৬৪১ সালে ডাচ এবং মাতম্বার সম্মিলিত বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়ে লুয়ান্ডা থেকে চলে যায়। পরের বছর পর্তুগিজরা আবার ফিরে এসে লুয়ান্ডাকে নিজেদের বলে দাবি করে। সেসময়ের যুদ্ধে পর্তুগিজদের কাছে পরাজিত হয় নেজিংগা আর ডাচ সৈন্যরা। ডাচরা অ্যাঙ্গোলা থেকে পালিয়ে যায়। আর রানি মাতম্বায় ফিরে আসেন। তবে নেজিংগা হাল ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তিনি পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। 

নেজিংগার ভাস্কর্যএরই মধ্যে রানি তার রাজ্যকে আফ্রিকান উপকূলের ভেতর সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক স্থান হিসেবে তৈরি করেছিলেন। ১৬৫৬ সালে পর্তুগিজরা এনডোঙ্গো ছেড়ে যায়। তবে তাদের কর্তৃত্ব বহাল ছিল অনেকদিন পর্যন্ত। রানি নেজিংগা তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার রাজ্যের জন্য লড়াই করে গেছেন। তিনি তার রাজ্যকে একটি শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। যা পর্তুগিজদের সঙ্গে সমানভাবে পাল্লা দিয়ে বিশ্ব দরবারে জায়গা করে নিয়েছে। 

আফ্রিকাকে দাস বাণিজ্য থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এই রানি। ১৬৬৩ সালে মারা যান একটি জাতির মুক্তিদাতা রানি নেজিংগা। অবশেষে তার মৃত্যুর ৩১২ বছর পর ১৯৭৫ সালে আঙ্গোলা স্বাধীনতা অর্জন করে। যে লড়াই শুরু করেছিলেন নেজিংগা। এখনো পুরো আফ্রিকা জুড়ে সম্মানিত এক উগ্র এবং অবিচল নেতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি।

এবার তবে জেনে নিন দাস বাণিজ্য প্রথা কেমন ছিল?

দাস প্রথাকে মানব ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে বিবেচনা করা হয়। এখন দাস প্রথাকে যত অদ্ভুতই মনে হোক না কেন, এক সময় এটিই ছিল স্বাভাবিক। বিত্তশালীদের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল দাস। শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি শ্রেণির ঘরেও দাস থাকতো। এই দাস প্রথাকে উচ্ছেদ করতে গিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। সে যুদ্ধে আব্রাহাম লিংকন জিতেছিলেন এবং দাস প্রথা বন্ধ করেন।

দাস বাণিজ্যে ক্রয় বিক্রয় করা হত নারীদেরওবিত্তবানেরা অর্থ দিয়ে দাসদের কিনে ঘরে রাখত। তারা ছিল মুনিবের সম্পত্তি। আর তাই বিনা পারিশ্রমিকে সে দাসকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারতো। সে সময় অনেকেই ঋণের দায় থেকে বাঁচতে দাসত্বকে বরণ করে নিতেও বাধ্য হত। দাসের সন্তানও দাস বলে গণ্য হত। যুদ্ধে পরাজিত হয়েও অনেক সময় দাসত্ব বরণ করতে হত। অমানবিকভাবে সারা জীবন খেটে মরতে হত তাদের। এ চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না দাসদের। একমাত্র যদি তাদের মুনিব মুক্তি দিত তবেই তারা স্বাধীন জীবন পেত।

কোম্পানিশাসিত বাংলাসহ সারা বিশ্বেই দাস কেনা বেচার জন্য বাজার গড়ে উঠেছিল। এ বাজারে আফ্রিকান চাহিদাই বেশি ছিল। তাদের জোর করে ধরে আনা হত। আর বিক্রি করা হত ইউরোপের বাজারে। কৃষিকাজ এবং গৃহস্থলির কাজের জন্য দাসদের ব্যবহার করা হত। এছাড়া উচ্চবিত্ত শ্রেণির লালসা মেটানোর জন্যও দাসীদেরওব্যবহার করা হত। অতীতে দাস প্রথা অনেক মর্মান্তিক ঘাটনারও জন্ম দেয়। আটলান্টিকের এপার-ওপারে যখন দাস পরিবহন ব্যবসা জমজমাট, তখন দাসের মর্যাদা সাধারণ পণ্যের চেয়ে কিছু বেশি ছিল না। 

কখনো জাহাজে কোনো দাস অসুস্থ হয়ে পড়লে মহামারির ভয়ে দ্রুত তাকে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হত। ধারণা করা হয়, ৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন আফ্রিকান এই ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের বলি হয়েছিলেন। আরো অনেক মানুষ পথেই মারা পড়েছিলেন। জাহাজে গাদাগাদি করে হাত-পা শেকলে বেঁধে তাদের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হত। সেখানেই খাওয়া ঘুমাসহ সব কাজ সারতে হত তাদের। এমনকি প্রায় দু’মাসের এই সমুদ্রযাত্রায় সন্তান জন্মের ঘটনাও ঘটতো বন্দীদশায়।

সূত্র: অ্যানসাইন্টঅরিজিন, এটিআই

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস