নিশ্চিত হোক গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং পেশাগত সুরক্ষা  

নিশ্চিত হোক গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং পেশাগত সুরক্ষা  

প্রকাশিত: ১৬:৩৩ ১৪ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৭ ২১ এপ্রিল ২০২০

কবি ও সাংবাদিক মাহতাব শফি। করেন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজও। পাশাপাশি সম্পাদনা করেন তরুণ প্রজন্মের ম্যাগাজিন তারুণ্যলোক। বহুগুণের অধিকারী এই তরুণ সাংবাদিক বর্তমানে কর্মরত গ্লোবাল টেলিভিশনে। 

স্বাগত, নতুন বঙ্গাব্দ ১৪২৭। যদিও এবার জৌলুসহীন পহেলা বৈশাখ। প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস মানুষকে ঘরবন্দী করার পাশাপাশি আনন্দহীন করে তুলেছে। 

এই পর্যন্ত করোনাভাইরাসে দেশে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬ জনে এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১০১২। এর মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত সাতজন। তবু এ মহামারিকালে গণমাধ্যমকর্মীরা সচেতনতা, সঠিক ও জরুরি তথ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

তবে আজ বছরের প্রথম দিন হলেও দুঃখের বিষয় এমনও অনেক গণমাধ্যমকর্মী রয়েছেন যাদের ঘরে হয়তো বাচ্চার দুধ কেনার টাকা নেই। অনেকে পাননা নিয়মিত বেতন-ভাতাও। এবং মালিকপক্ষের অনেকেই বেশ সুকৌশলে দীর্ঘদিন সংবাদকর্মীদের বঞ্চিত করে এসেছেন। কোনো কোনো চ্যানেলে এখনো নিয়মিত বেতন দেয়া হয় না অথবা বেতন কাঠামো খুবই নগণ্য। 

তবু আজ বাঙালির পহেলা বৈশাখ। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। বাঙালি আজ বাংলা নতুন বছরের সূর্যোদয় দেখছে। এ সূর্য দুঃসময়কে জয় করার শক্তি। আমাদের প্রত্যাশা খুব শিগগিরই বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী ভাইরাসের পরাজয় হবে।  

সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সামনের কাতারে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে জড়িত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মিডিয়াকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দেশবাসীর পক্ষ থেকে ‘ধন্যবাদ ও অভিনন্দন’ জানিয়েছেন। যেসব সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যক্ষভাবে করোনাভাইরাস রোগীদের নিয়ে কাজ করছেন ইতোমধ্যেই তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের বিশেষ সম্মানী দেয়া হবে। এ জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবি সদস্য এবং প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য কর্মচারীর জন্য বীমার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনকালে যদি কেউ আক্রান্ত হন, তাহলে পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য থাকছে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবীমা এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ৫ গুণ বৃদ্ধি পাবে। স্বাস্থ্যবীমা ও জীবনবীমা বাবদ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৭৫০ কোটি টাকা। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য ও জীবনবীমা বাবদ কোনো বরাদ্দ নেই।

অথচ নানা নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন দেশের সাংবাদিকরা। প্রশাসন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। আরো আছে মামলার ভয়। সবসময় পাশে থাকে না প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো। পোশাক শ্রমিক থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের, সব পেশার মানুষদের প্রতি বৈষম্য হলে সংবাদ প্রকাশ করেন সাংবাদিকরা। কিন্তু সেই সাংবাদিকরা যখন নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন, তাদের দাবি আদায়ের রাস্তা খুবই সংকীর্ণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাংবাদিকরা মাসিক বেতনের বাইরে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি বা স্বাস্থ্যবিমার মতো সুবিধা পান না। 

খ্যাতনামা কলামিস্ট সুসি বোনিফেস ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য মিরর-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেন, ‘সাংবাদিকতা না থাকলে করোনায় প্রাণহানি আরো অনেক বেশি হতো।’ওই নিবন্ধে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব, সরকারের এ সংক্রান্ত নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লকডাউন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনাসহ নানা বিষয় জনসাধারণের কাছে তুলে ধরতে সাংবাদিকদের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

অথচ চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীরা মৃত্যুঝুঁকি উপেক্ষা করে একেবারে সামনের কাতারে থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এই ক্রান্তিকালে গণমাধ্যমকর্মীদের কী হবে? কেবল ‘ধন্যবাদ ও অভিনন্দন’ দিয়েই কি জীবিকা নির্বাহ হবে? তাদের জন্য কি কোনো বীমার ব্যবস্থা করা হবে না? দায়িত্ব পালনকালে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের দিকে কি তাকাবে কেউ? 
নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে চরম ঝুঁকি নিয়েই নিরলস কাজ করছেন সংবাদকর্মীরা। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে এটা খুবই হতাশার যে, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট প্রেক্ষাপটে ‘ধন্যবাদ’ ছাড়া আশাব্যঞ্জনীয় কোনো মূল্যায়ন হয়নি সংবাদকর্মীদের। তাদের জন্য নেই কোনো প্রণোদনা। নেই উৎসাহব্যঞ্জক অন্য কোনো কিছুও। আমাদের প্রত্যাশা এ দুর্যোগে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও পেশাগত সুরক্ষা এবং নিয়মিত বেতন-ভাতার পাশাপাশি আপৎকালীন প্রণোদনা নিশ্চিত করা হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর