নিঃশব্দে হিমু হতে চেয়েছিলাম

নিঃশব্দে হিমু হতে চেয়েছিলাম

প্রকাশিত: ১৯:১৩ ১৩ নভেম্বর ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ একটি অধ্যায়ের নাম। তিনি বাংলা ভাষার জনপ্রিয়তম কথাসাহিত্যিক, সন্দেহ নেই। তবে আমি তাকে বিচিত্র জীবনের সফল রূপকার হিসেবে বিবেচনা করতে চাই।

কেননা, তার উপন্যাস পাঠের ভেতর দিয়ে প্রকারান্তরে সে-পথেই নিজেকে চালনায় অনুপ্রাণিত হই, যা মূলত লেখকের অভীপ্সা। অনেক পরে হলেও বুঝতে পারি, পাঠককে তিনি খেলিয়ে খেলিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। নিবিড়ভাবে স্পর্শ করতে চেষ্টা করছেন পাঠকের সক্ষ্মবোধের অতলান্ত। হয়তো বোর হয়ে যাওয়া সাহিত্যের পাঠককে পুনরায় পাঠমুখী করতেই, তিনি অবলম্বন করেছেন এই কৌশল! কিংবা হতে পারে, ভিন্নতর কোনো নিরীক্ষা। যেখানে ব্যাপকার্থে নিহিত রয়েছে জীবন ও সমাজদর্শন।

তবে ‘নন্দিত নরকে’ যখন পাঠ করি, তখন সদ্য যৌবনে পা-রাখা টগবগে যুবক আমি। আবার হিমু, লীলাবতী, শঙ্খনীল কারাগার, দূরে কোথাও কিংবা হিমু’র ভেতর ডুব দিয়েছি, তখন অন্য এক আমাকে চিনতে পারি। ততদিনে নিজেও বেশ পরিণত। টিভিতে তার নাটক দেখছি, সিনেমা এলে প্রেক্ষাগৃহে হুমড়ি খেয়ে পড়ছি। একাকী পথে কিংবা দলগত আড্ডায় অবলীলায় কণ্ঠে তুলে নিচ্ছি- ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, বন্ধুয়া গো করো তোমার মনে যাহা লয়’। এসব অবচেতনে নয়, করছি বুঝে-শুনে। পরিবর্তনও আসছে চলাফেরায়, পাঠে কিংবা আয়োজনে। পরিবর্তন টের পাচ্ছি নিজের অনুভবের জায়গাটিতে। হয়তো, মানসিক বিবিধ পরিবর্তনের অর্থ দাঁড়ায়, হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অলিখিত দর্শন। যা চেতনে-অবচেতনে প্রভাবিত করে, উৎসাহিত করে। উদাসীন হাওয়ায় ভেসে ভেসে জীবনকে সর্বৈব উপলব্ধি করার মন্ত্রণা জোগায়। 

আসলে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে কোনো উপলব্ধিই চূড়ান্ত রূপ পায় না। এর পেছনে অকাঠ্য যুক্তি হলো, ব্যক্তি হুমায়ূন যেমন সাধারণের কাছে রহস্যময়, তেমনি তার সাহিত্যকর্মও গভীর রহস্যের আকর। তাকে আবিষ্কার করাটা, তার উপন্যাসের সরল বাক্যের মতো সহজতর ব্যাপার নয় মোটেও। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস পড়ে, সৃষ্ট চরিত্র অনুসরণ করে দলবেঁধে কিংবা একা একা পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানো নিছক জাদুবাস্তবতা ছাড়া অন্যকিছু নয়।  তবে কি তিনি হ্যামেলিয়নের বংশীওয়ালা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন? হয়তো, না-হলে তিনি সহজ কথার জাদুতে কিভাবে পাঠককে এক আশ্চর্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি নিয়ে যেতেন! যেখানে দাঁড়িয়ে জীবনের সঙ্কট, অনুভূতি, বেদনা তলিয়ে যায়; যে বেদনার পরিচর্যা করলে মানুষ আরো বেশি মানুষ হয়ে ওঠে। তিনি নানাভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন এমন এক সম্মোহনের জীবন, যেখানে নানাভাবে ফুটে আছে বহুরঙের জীবন। তাই তিনি বলতে পারেন- ‘জীবনটা আসলেই অনেক সুন্দর! এতো বেশি সুন্দর যে, মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে।’ প্রকৃত প্রস্তাবে, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সুখ-দুঃখ একই সুতোই বেঁধে মূলত জীবনেরই জয়গান গেয়েছেন। যে জীবানুভ‚তির ছোট্ট এক টুকরো ‘শ্যামলছায়া’ আমি। শরৎ কিংবা হেমন্তের ধবল জ্যোৎস্নায় স্নান সেরে নিঃশব্দে হিমু হতে চেয়েছি বহুবার। এই পরিণত জীবনে এসেও হিমু হওয়ার প্রবল বাসনায় ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ পেরিয়ে ভেসে যাই অলক্ষে, জলশ্রীতে। সাক্ষী রেখে নিঃসঙ্গ বটগাছ কিংবা ভাবনার পোতাশ্রয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর