দূরবীনপ্রথম প্রহর

নি য় মি ত ক লা ম

নির্বাচনের মেরুকরণ ও রাজনীতিকদের মুখোশ

ফকির ইলিয়াস
ফকির ইলিয়াস- কবি, প্রাবন্ধিক। স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন নিউইয়র্কে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা - ১৮। 'কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস','একাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস',' দ্যা এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল', 'আমেরিকান ইমেজ প্রেস'- এর সদস্য।

একটি নির্বাচনের জন্য 'মনোনয়ন' খুব দরকারি বিষয়।'শুদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশ'-বলে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে জল্পনা চলে বছরের পর বছর। ডেমোক্রেটিক কিংবা রিপাবলিকান ধারায় যুক্তরাষ্ট্রে যেসব রাজনীতিক নিজেদের তৈরি করেন, তাদেরও পেরিয়ে সতে হয় অনেক ধকল। এর মাঝে অন্যতম সিঁড়িটি হচ্ছে প্রাইমারি ইলেকশন।

একজন রাজনীতিক রাতারাতি দাঁড়িয়েই বলতে পারেন না, আমি এমপি হতে চাই। কিংবা ইলেকশনের আগে দলে যোগ দিয়েই বলতে পারেন না- এই সিট'টি আমার। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়, হচ্ছে। নির্বাচন এলেই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসেন দলে দলে প্রার্থী। তারা বলেন, আমিও ইলেকশন করছি। এজন্য তারা দলবদল করেন। দলে যোগদান করেন।

কিন্তু বিশ্বরাজনীতির ধারাবাহিক খতিয়ান কি সেই সাক্ষ্য দেয়? না দেয় না। একটি উদাহরণ দিই। একটি খবর আমেরিকায় ভেসে বেড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী মাঠে নামতে পারেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী তুলসি গব্বার্ড। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে হাওয়াই থেকে চারবারের ডেমোক্র্যাট সদস্য এই হিন্দু ধর্মাবলম্বি এই নারীর এমন সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছেন তার অনুসারীরা।

মার্কিন কংগ্রেসে গব্বার্ডই প্রথম হিন্দু নারী আইনপ্রণেতা। ২০২০ সালের নির্বাচনে তার দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাও আছে বলে মনে করা হচ্ছে। সত্যিই তা হলে তৈরি হবে নতুন ইতিহাস। যদিও তুলসি এখনো নিজে তার প্রার্থী হওয়ার কথা স্বীকার করেননি। আবার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনার কথা উড়িয়েও দেননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়া নিয়ে বর্তমানে জল্পনা তুঙ্গে। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলে সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এবং হিন্দু প্রার্থী হওয়ার নজির গড়বেন গব্বার্ড। আর নির্বাচনে জিতলে যুক্তরাষ্ট্র পাবে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি লস এঞ্জেলেসে একটি সভাকে ঘিরে গব্বার্ডকে নিয়ে জল্পনা জোরদার হয়েছে। সভায় মার্কিন প্রবাসী এক ভারতীয় চিকিৎসক সম্পত শিবাঙ্গি, গব্বার্ডকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘৩৭ বছর বয়সী এ তুলসিই হতে পারেন ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।’

ভারতীয় মার্কিনি তো বটেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইমিগ্র্যান্টদের মাঝে গব্বার্ড বিপুলভাবে জনপ্রিয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা ওবামা'র যে কোনো অন্যায্য কথার প্রতিবাদ করেছেন গব্বার্ড সব সময়।

একজন রাজনীতিক রাতারাতি দাঁড়িয়েই বলতে পারেন না, আমি এমপি হতে চাই। কিংবা ইলেকশনের আগে দলে যোগ দিয়েই বলতে পারেন না- এই সিট'টি আমার। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়, হচ্ছে। নির্বাচন এলেই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসেন দলে দলে প্রার্থী।

বলছি- একজন রাজনীতিক এভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেন। 'অভারনাইট' এসেই বলেন না- আমি এমপি হতে চাই।

বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপর্ব দাখিল শেষ হয়েছে। এখন প্রত্যাহারপর্ব শেষ হলেই জানা যাবে- কে কোন দল-জোটের ছায়াতলে

নির্বাচন করছেন। এবারের নির্বাচন এমন একটি সময়ে হচ্ছে, যখন একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান আইনী সাজা পেয়ে কারাগারে আছেন।বেগম খালেদা জিয়ার দলের নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। তা তারা ভালো করেই জানতেন। আর জানতেন বলেই তারা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রাক্তন আওয়ামী লীগার ড. কামাল হোসেনকেই ইমাম মেনে কাতারে দাঁড়িয়েছেন।

কিন্তু কথা হচ্ছে, বিএনপি কি তাদের ২০০১ সালের জঙ্গি তোষামোদি চরিত্র থেকে সরে আসতে পেরেছে? না পারেনি। আর পারেনি বলেই তারা পলাতক যুদ্ধাপরাধীকেও মনোনয়ন দিয়েছে।একাদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া-আদমদীঘি) আসনে আবার বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন যুদ্ধাপরাধ মামলার পলাতক আসামি আব্দুল মোমিম তালুকদার খোকা।

এই আসনের দুইবারের এমপি খোকা যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে আছেন।

খোকার মেয়ে নাছিমা আক্তার লাকি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর মিডিয়াকে বলেন, ‘বাবা মিথ্যা মামলায় বিদেশে পলাতক রয়েছেন; কিন্ত দল তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। বাবার পক্ষে আমি তার মনোনয়নপত্র দাখিল করলাম।’

আদমদীঘি উপজেলার কায়েত পাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ সুবেদ আলী ২০১১ সালের মার্চে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজেস্ট্রেট আদালতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এই বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা করলে পরে তা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর আদমদীঘি বাজারে পশ্চিমে খারির ব্রিজের উত্তর শ্মশান ঘাটে আব্দুল মোমিন তালুকদার গুলি করে মুক্তিযোদ্ধা মনসুরুল হক তালুকদার টুলু, আব্দুস ছাত্তার, আব্দুল জলিল, আলতাফ হোসেনসহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেন।

মোমিনের বাবা প্রয়াত আব্দুল মজিদ তালুকদার মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বাবা-ছেলে দুজনেই সেসময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

চট্টগ্রামে আরেকজন আইনজীবীকে মনোনোয়ন দিয়েছে বিএনপি। তার বিরুদ্ধে

জঙ্গি কানেকশনের বিষয়ে মামলাও হয়েছিল। এছাড়াও মওদুদিপন্থী রাজনৈতিক দল

জামায়াতের ২৫ জন কে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সমর্থ দিয়েছে বিএনপি। যে বিষয়টি স্পষ্ট- তা হলো বিএনপি তাদের মৌলবাদ তোষণ নীতি থেকে একটুও সরে আসেনি। বরং মৌলবাদ-জঙ্গীবাদের হাত ধরেই রাষ্ট্রক্ষমতা চায়। যেমনটি শাহ আজিজ, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, খান এ সবুর, আলীম আল রাজী, আব্দুল আলীম- প্রমুখ চিহ্নিত রাজাকারদের মন্ত্রী বানিয়ে এর আগেও রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি। তাদের স্পর্ধা এক সময় এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল যে- তারা দু’জন চিহ্নিত আলবদরকে মন্ত্রী পর্যন্ত বানিয়েছিল। কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আজমকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে 'সম্মানিত' করেছিল।

বাংলাদেশে এসব নিয়েই এখন চলছে রাজনৈতিক মেরুকরণ।বেরিয়ে আসছে রাজনীতিকদের মুখোশ। রাজনীতির মাঠে অনেকেরই খোলস খসে পড়েছে। শাহ এম এস কিবরিয়ার সন্তান রেজা কিবরিয়া বলেছেন, তিনি আওয়ামী লীগ করতেন না। তার পিতা করতেন। তিনি বিএনপি-জামায়াতের খুনিদের হাতে জনসভায় খুন হয়েছিলেন। শাহ কিবরিয়াকে এখনও মানুষ স্মরণ করে। সেই রেজা 'ধানের শীষ' নিয়ে নির্বাচন করবেন।

হটাবেন আওয়ামী লীগ!নিজ নিজ পথে ফিরেছেন মান্না-সুলতান-মন্টু-কাদের সিদ্দিকী। এটাই তাদের আসল চেহারা। নৌকা ঠেকাও!

ড. কামাল নিজেই জানেন না, ঐক্যফ্রন্ট পাশ করলে প্রধানমন্ত্রী কে! দেশের মানুষ তা জানেন। পতিত আওয়ামী লীগারদের কাঁধে বন্দুক রেখেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন করেছিল খুনী ডালিম-ফারুকরা। এই খুনিদল এখনও সক্রিয়। ২১ আগস্ট তারা চেষ্টা করেছে। এখন এসেছে আওয়ামী প্রাক্তনদের সাথে নিয়ে। লক্ষ্য একটাই শেখ হাসিনাকে শেষ করে দেয়া। এই খোলস ছেড়ে আরো অনেকে আসবে। এরা ঘাপটি মেরে ছিল। এখন বেরোবে। যারা এই দেশে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ- সাম্প্রদায়িকতা চায় মূল খেলোয়াড় তারাই। কামাল'রা ঢাল মাত্র। এই বিষয়টি বাংলাদেশের ৭১ প্রিয় মানুষদের বুঝতে হবে। এসব জটিলতা কিছু সাধারণ মানুষকে বেশ বিপদে ফেলেছে। একটি আসনের কথা বলা যায়। মৌলভীবাজার-২(কুলাউড়া) আসন। এই আসনে এখন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী সুলতান মনসুর। তিনি প্রাক্তন আওয়ামী লীগার। এখন তার মার্কা 'ধানের শীষ'। অন্যদিকে বিকল্পধারার ব্যানারে আওয়ামী মহাজোটের হয়ে নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করতে চাইছেন এম এম শাহীন। যিনি বরাবরই বিএনপির রাজনৈতিক চেতনা লালন করে আসছিলেন। বিএনপি তাকে যথার্থ সম্মান দেয়নি। তাই এখন দলবদল করেছেন। কিন্তু আদর্শ বদল করেছেন কি ? এই প্রশ্ন সামনে রেখেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ হয়তো নৌকা মার্কাকেই সমর্থন দিয়ে শেখ হাসিনার ডাক মানবে।

না- ক্ষমতা নীতিবান রাজনীতিকের কাছে বড় হতে পারে না। হওয়া উচিতও নয়। কিন্তু বাংলাদেশে তাই হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন আওয়ামী লীগ দুর্নীতিবানদের পিতা কিংবা স্ত্রী'কে মনোনয়ন দিয়েছে। এটা তারা না দিলেও পারতেন। প্রশ্ন হচ্ছে- এসব পরিবার কি তবে সাধারণ মানুষের চাওয়ার বলয়েরও বেশি উর্ধ্বে ? তা হয়তো ফলাফলই প্রমাণ করবে।

একটি বিষয় খুবই স্পষ্ট, মূলত তারেক রহমানই লন্ডনে বসে ঐক্যফ্রন্ট চালাচ্ছেন। এই সেই তারেক রহমান, যিনি মুজাহিদ-নিজামী'র মতো আলবদরদের গাড়ীতে মন্ত্রীর পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। তিনি লুৎফুজ্জামান বাবরকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছিলেন।'হাওয়া ভবন' ছিল দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

একটি কথা সবিনয়ে জানাই। সেই সময়ে বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কে ছিলেন? একটি এত বড় জনবহুল দেশ 'স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী' কি করে চালাচ্ছিলেন ? না- এর নেপথ্যে আরেকজন ছিলেন। যিনি ছিলেন মূল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। তিনিই তারেক রহমান। সব ক্ষমতা ছিল তার হাতেই। তিনি স্বরূপে বেরিয়ে এসেছেন। তিনি আবার ক্ষমতা চান। ড. কামাল-রেজা কিবরিয়া=আসম রব-কাদের সিদ্দিকী-কর্ণেল অলি-'রা ঢাল মাত্র। তারেক আবারও জঙ্গীবাদী সকল সংগঠনগুলোর সঙ্গে আঁতাত করেছেন। ওদের নিয়েই তৎপর তিনি। তিনিই সাক্ষাতকার নিচ্ছেন।দলের এমপি মনোনয়ন দিচ্ছেন। তার মতো করে সাজাতে চাচ্ছেন ছক!

কঠিন সময় এখন। সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এই বাংলাদেশকে কি আবারও জঙ্গীবাদীদের হাতে তুলে দেয়া হবে?

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

daily-bd-hrch_cat_news-23-10