Alexa নাসা কেন চাঁদে মানুষ পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে?

নাসা কেন চাঁদে মানুষ পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে?

মেহেদী হাসান শান্ত ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১৮ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

১৯৬৯ সালের জুলাই মাস। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তিন মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চাঁদে পৌছলেন। সবার আগে চাঁদে পা দেয়া নীল আর্মস্ট্রং রাতারাতি একজন আমেরিকান মহানায়কে পরিণত হন।

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ হওয়ায় মহাকাশ গবেষণার শুরু থেকেই মানুষের মনে গোপন বাসনা ছিল, ঠিক কবে তারা চন্দ্র বিজয় করতে পারবে। মানুষের সেই অভিলাষকে বাস্তবে পরিণত করেছিল অ্যাপোলো ১১ মিশন। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন উঁকি দেয়, যে চাঁদকে বিজয় করার জন্য এত মহাযজ্ঞ, সেই চাঁদের ১৯৭২ সালের পর থেকে নাসা আর কোনো মহাকাশযান কেন পাঠায়নি? আজ আমরা সেই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

প্রথমে একটু পেছন ফিরে তাকানো যাক। আমরা কি জানি নাসা কেন সবার আগে চাঁদে যাওয়ার জন্য উঠে পরে লেগেছিল? কোনো সন্দেহ নেই মানুষের চন্দ্র বিজয় মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি অর্জন। কিন্তু ষাটের দশকের ওই সময়টাতেই কেন আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা চাঁদে যাওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করছিল?

সত্যি কথা বলতে নাসার সবার আগে চাঁদে পৌঁছানোর প্রচেষ্টার পেছনে ছিল শীতল যুদ্ধের অবদান। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছুকাল পর থেকে শুরু হওয়া শীতল যুদ্ধ দুটি দেশকে প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে প্রেরণা যুগিয়েছিল। অস্ত্র নির্মাণ প্রতিযোগিতা ও মহাকাশ প্রতিযোগিতায় চলছিল দুটি দেশের অঘোষিত লড়াই। একের পর এক অতি শক্তিশালী পারমানবিক বোমা তৈরি করা হচ্ছিল; যদিও পৃথিবীবাসীর সৌভাগ্য যে সেই বোমাগুলো কখনো ব্যবহার করা হয়নি। তবে দুই পক্ষই পারমাণবিক আক্রমণের জন্য রকেটগুলো ব্যবহার না করলেও মহাকাশ পাড়ি দিতে ঠিকই সেগুলো ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল।

মহাকাশ প্রতিযোগিতার শুরুর দিকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে যায়। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে ইতিহাসের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। সেটির নাম ছিল স্পুটনিক। একই বছরে তারা মহাকাশে প্রথম জীবন্ত প্রাণী প্রেরণ করে, স্পুটনিক ২ মহাকাশযানের সেই যাত্রীটি ছিল লাইকা নামের একটি কুকুর। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমবারের মতো চাঁদে তাদের একটি শিল্পকর্ম পৌঁছে দেয়।

১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিনকে মহাকাশে পাঠিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমবারের মতো মহাকাশের বুকে কোনো মানুষের জায়গা করে দেয়। তার দুই বছর পর মহাকাশে প্রথম নারী হিসেবে পাড়ি জমান সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভা। এখানে একটি তথ্য দিয়ে রাখি, সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় বিশ বছর পরে ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রথম কোনো নারীকে মহাকাশে পাঠিয়েছিল। তিনি ছিলেন স্যালি ব্রাইড।

সোভিয়েত যতদিনে স্পুটনিক ১ ও স্পুটনিক ২ নামে দুইটি মহাকাশযান মহাকাশে পাঠিয়ে দিয়েছে, ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রে কোন স্পেস প্রোগ্রাম চালুই হয়নি! মূলত শীতল যুদ্ধে টিকে থাকার স্বার্থেই ১৯৫৮ সালে নাসার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ততদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশ গবেষণা ও মহাকাশ বিজয়ে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ছিল একটাই চ্যালেঞ্জ, এমন কিছু করা যা সোভিয়েতদের সব অর্জনকে ছাপিয়ে যায়!

তবে শুরুতেই কিন্তু চন্দ্র বিজয়ের কথা নাসার মাথায় আসেনি। প্রথমে তারা প্রজেক্ট এ-১১৯ নামে একটি ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। নাসার ইচ্ছা ছিল চাঁদে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের একটি সফল পরীক্ষা চালানো এবং সেই কাজের উপযোগী করে একটি বিশেষ ডিজাইনের রকেট তৈরি করা। কিন্তু আকাশে পারমাণবিক বিস্ফোরণের এই পরীক্ষায় দেশের সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট হতে পারে ভেবে পরবর্তীতে নাসা এই পরিকল্পনা বাদ দিয়ে চাঁদে মানুষ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

চাঁদে মানুষ পাঠানোর এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ছিল খুবই বদ্ধপরিকর। অ্যাপোলো প্রোগ্রামের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রচুর পরিমাণে অর্থ বরাদ্ধ করেছিল। ১৯৬৬ সালে আমেরিকান সরকারের বার্ষিক বাজেটের ৪.৫ শতাংশই পেয়েছিল নাসা! তখনকার দিনে এ বাজেটের মূল্য ছিল ৫.৯ বিলিয়ন ডলার, বর্তমানের হিসাবে প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার! হ্যাঁ, এতটা অসম্ভব পরিমাণ অর্থই বরাদ্দ পেয়েছিল নাসা।

ষাটের দশকের ওই সময়টাতে আমেরিকান সরকার মহাকাশ গবেষণা যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পেছনে ফেলতে কতটা একরোখা ছিল তার প্রমাণ মেলে একটি পরিসংখ্যানে। ২০১৯ সালে আমেরিকান সরকারের বাজেট থেকে নাসা পায় মাত্র ০.৫ শতাংশ, ডলারের হিসেবে তা ২১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষতার দিনেও নাসা এত বাজেট পাচ্ছে না যতটা পেয়েছিল শীতল যুদ্ধের ওই সময়টায়। তখনকার দিনের তুলনায় নাসার বাজেট এখন অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে, ভাবা যায়!

সত্যিকার অর্থে তখনকার দিনে নাসার পেছনে এতো অর্থ খরচ করা অনেকের চোখেই হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমেরিকার অনেক জনগণই এ কর্মকাণ্ডকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের 'পাবলিসিটি স্টান্ট' হিসেবে দেখতেন। তাই অ্যাপোলো ১১ অভিযান সফল হবার পর আমেরিকান সরকার স্পেস ট্রাভেলিংয়ের এত ব্যয় সংকুলান করতে ধীরে ধীরে অনীহা প্রকাশ করে। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশন দিয়ে অ্যাপোলো স্পেস প্রোগ্রামের সমাপ্তি ঘটে। এই প্রোগ্রামের পেছনে আমেরিকার সরকারের সর্বমোট খরচ ছিল আজকের দিনের হিসাবে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! মূলত ১৯৬৯ সালে আমেরিকার চন্দ্রবিজয়ের মাধ্যমেই মহাকাশ প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ঘটে যায়। কিন্তু শীতল যুদ্ধ তখনও চলছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নজর চলে যায় এই যুদ্ধের অন্যসব ক্রীড়নকের ওপরে। চাঁদের বুকে ফের অভিযানের জন্য পরবর্তীতে নাসার আগ্রহ থাকলেও স্টেট ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি।

তবে নাসা চাঁদে মানুষ পাঠানোর বন্ধ করে দিলেও চাঁদ নিয়ে গবেষণা কিন্তু সারা বিশ্ব জুড়েই চলছে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় সবগুলো কার্যকরী চন্দ্র মিশনের নেতৃত্ব ছিল হয় যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। কিন্তু এরপরই এ ক্ষেত্রে মাথাচাড়া দেয় জাপান। জাপানে আইএসএএস ছিল তখনকার সময়ে চলমান মহাকাশ প্রোগ্রাম। তারা হাইটেন নামক এক মহাকাশযান উৎক্ষেপণের মাধ্যমে চন্দ্র বিজয়ে অংশ নেয়। এরপর জাপান ছাড়া অন্যান্য অনেক দেশের মধ্যে চাঁদ নিয়ে গবেষণার হিড়িক পড়ে যায়। জাক্সা নামে বর্তমানে জাপানের যে মহাকাশ প্রোগ্রাম চালু আছে, তারা চাঁদ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ও ভারতের আইএসআরও সংস্থাটিও এগিয়ে যাচ্ছে।

সুতরাং চাঁদে মানুষ পাঠানোর না হলেও চাঁদ নিয়ে গবেষণা কিন্তু ঠিকই চলছে। বিভিন্ন রোভার ও প্রোব প্রায় নিয়মিতই চাঁদের বুকে জায়গা করে নিচ্ছে। কারণ এগুলোর খরচ অনেক কম এবং চাঁদের বুকে মানুষ পাঠানোর তুলনায় অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ। এসব রোবটের কোনো খাবার পানি কিংবা অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না; রোগবালাই, আঘাত কিংবা মৃত্যুর সম্ভাবনাও নেই।  

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ