Alexa নারীর শরীরে দুই টুকরো কাপড়, ৩৫০০ বছরের পুরনো ফ্যাশন

নারীর শরীরে দুই টুকরো কাপড়, ৩৫০০ বছরের পুরনো ফ্যাশন

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:১৭ ১৬ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৪:২৭ ১৬ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

একটি সুইমিং পুলের ধারে আয়োজন করা হয় ফ্যাশন শো। আর সেখানেই সাঁতারের পোশাক হিসেবে আবির্ভাব ঘটে দুই টুকরো কাপড়ের। এমন সাহসী পোশাকটি পরে ফ্যাশন শো’য়ে উপস্থিত হন মিশেলিন বার্নার্ডিনী। যিনি ক্যাসিনো ডি প্যারিসের একজন জনপ্রিয় ড্যান্সার ছিলেন। তাকে দেখে আশ্চর্য বনে যান উপস্থিত ব্যক্তিবর্গরা। 

প্যারিসে অনুষ্ঠিত সেদিনের ওই ফ্যাশন শো’তে আত্মপ্রকাশ করে দুই টুকরো কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাকটি। ঘটনাটি ১৯৪৭ সালের ৫ জুলাই। ওই বছরের ১ জুলাই প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার দিন ধার্য করা হয়। এজন্য মহাসাগর এলাকার যে স্থানটি নির্ধারণ করা হয় সেখানকার নাম ছিল বিকিনি অ্যাটল। এজন্য ডিজাইনার লুইস রিয়ার্ড পোশাকটির নাম রাখেন বিকিনি।

ডিজাইনার লুইস ও মডেল মিশেলিনসেই তখন থেকে বর্তমান পর্যন্ত ফ্যাশনে বিকিনির আভিজাত্য সম্পর্কে সবারই কমবেশি ধারণা আছে। হলিউড বা বলিউডের নায়িকাদের পরনে সবাই কমবেশি বিকিনি দেখেছেন! সেলিব্রিটিরাও বিকিনি পরিহিত অবস্থায় ক্যামেরায় ধরা পড়লেই তা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। ইতিহাস অনুযায়ী, প্রথমে বিকিনি পরতে নারীরা অস্বস্তি বোধ করতেন। তবে পর্যায়ক্রমে রিভেরায়, তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং পরবর্তীতে বিচকেন্দ্রিক পোশাক হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায় বিকিনি।

বিকিনির ইতিহাস

১৯৪৭ সাল থেকে বিকিনিচর্চা তুঙ্গে আরোহণ করলেও এটি আরো পুরনো পোশাক হিসেবে বিবেচিত। ১৯১৩ সালের দিকে অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী নারীরা সাঁতারের পোশাক হিসেবে বিকিনি ধাঁচের পোশাক পরত। কার্ল জ্যান্টজ্যান নামক এক সুইমওয়্যার ব্র্যান্ড এই ঘরানার পোশাক তৈরি করেছিল। যদিও সেগুলো টি-শার্টের মতো ছিল। তবে শরীরের সঙ্গে মিশে থাকায় পোশাকটি নিয়ে বেশ স্ক্যান্ডাল ছিল। ১৯৩০ থেকে ৪০ সালের দিকে ইউরোপীয় নারীদের শরীরে শোভা পেত বিকিনি ধাঁচের পোশাক। 

বামে ১৯১৩ সালের ছবি ও ডানে ১৯৩০ সালে বিকিনি পরিহিতরাতারা শুধু গোসলের সময়ই পোশাকটি পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই ঘরানার পোশাকগুলো রেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট এই পোশাকটি ১৯৪৬ সালে ডিজাইন করেন ফরাসি ডিজাইনার জ্যাকুইস হেইম। তিনি পেশায় একজন পরমাণুবিদ ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ফরাসি ইঞ্জিনিয়ার লুইস রিয়ার্ড বিকিনির ডিজাইনে পরিবর্তন আনেন। যেটা মাত্র ৩০ ইঞ্চির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। বিকিনি ক্রমশ আভিজাত্যে রুপ নিতে শুরু করে। 

পাশ্চাত্য ফ্যাশনে জায়গা করে নেয় মাত্র ৩০ ইঞ্জির পোশাকটি। ১৯৫০ সালের দিকে ইউরোপের সমুদ্র-সৈকতে বিকিনি পরে যাওয়া বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কারণ মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় এই পোশাকটি অংশগ্রহণকারীদের পরানো হত। এতে খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীরা ক্ষেপে যান এবং বিকিনি ব্যান করার ঘোষণা দেন। এরপর লুইস রিয়ার্ড ৫০ হাজার ভক্তের চিঠি পান। যারা প্রত্যেকেই বিকিনি চালু করার দাবি জানান। 

১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালের বিকিনি ফটোশ্যুট১৯৫৭ সালে হলিউড অভিনেত্রী ও শিল্পী ব্রিজিট বারদোটের শরীরে চেপে ফের আলোচনায় আসে বিকিনি। তিনি ওই বছর কান’স ফিল্ম ফেস্টিভেলে বিকিনি পরিহিত অবস্থায় দক্ষিণ ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে ফটোশ্যুট করেন। যা পরবর্তীতে বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিল। যদিও এর আগে হলিউড তারকা মারলিন মনরো এবং এসথের উইলিয়ামসও বিকিনি পরে সবার নজর কাড়েন। তবে ব্রিজিট বারদোটের বিকিনি পরা ছবি নিয়ে মডার্ন গার্ল ম্যাগাজিন লিখেছিল, ‘ভদ্র ও শালীন নারীর ভূষণে বিকিনি শোভা পায় না। এমন কথাগুলো শুধুই যেন শব্দের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।’

১৯৬০ সালে, সঙ্গীত শিল্পী ব্রায়ান হাইল্যান্ড ‘ইটস বিটসি টেনি ওয়েইনি ইয়ালো পোলকা ডট বিকিনি’ নামক একটি গান প্রকাশ করেন। এর দুই বছর পর, উন্সুলা অ্যান্ড্রেস সাদা বিকিনি পরে সমুদ্র স্নান করে উঠে আসার চিত্রটি প্রকাশ পায় জেমস বন্ডের ‘ড.নং’ সিনেমায়। সে বছরই প্লেবয় ম্যাগাজিনের কভারে উঠে আসে এই বিকিনি কন্যার ছবি। এরপর থেকেই সিনেমায় জায়গা করে নেয় বিকিনি পোশাকটি। বিভিন্ন মিউজিক ভিডিও, ফটোশ্যুট এমনকি সুন্দরী প্রতিযোগিতাতেও বিকিনির ব্যবহার ঘটে চোখে পড়ার মতো। 

১৯৫০ ও ১৯৫৭ সালে বিকিনি পরে সৈকতে যাওয়ার ট্রেন্ড চালু হয়এ তো গেল বিকিনির ১০৭ বছরের ইতিহাস। তবে জানেন কি দুই টুকরো কাপড়ের ইতিহাস আরো পুরনো? ১৯৫০ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদরা সিসিলির পিয়াজ্জা আর্মেনিয়া অঞ্চলে বিকিনি পরিহিত দেয়ালচিত্রের সন্ধান পান। একটি প্রাচীন রোমান দুর্গে তারা কাজ করার সময় দেখেন দুর্গটির কুঠুরির দেয়ালে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বের একটি দেয়াল ভাস্কর্য।

সেটি দেখে তো প্রত্নতত্ত্ববিদরা অবাক হয়ে যান রীতিমতো। লাইন ধরে দাড়িয়ে আছেন বিকিনি পরিহিত রোমান নারীরা, এমনই ভাস্কর্য ছিল সেটি। ‘করোনেশন অব উইনার’ নামক এই ভাস্কর্যটিতে দশ বিকিনি পরিহিত রোমান নারীর ছবি রয়েছে।যে দুর্গে এই ভাস্কর্যটি পাওয়া যায় তার নাম ‘রোমানা ডেল ক্যাসেল’। এটি ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’-এর তালিকাভুক্ত। ১৯৬০ সালে জেমস বন্ডের ছবিতে বিকিনিতে দেখা যায় উন্সুলাকে, পরের ছবিটি অভিনেত্রী ডেমি মোরের ২০০৩ সালের।আর সেখানে পাওয়া ভাস্কর্যটি এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত সেরা ভাস্কর্য বলে মত প্রত্নতত্ত্ববিদদের। বিকিনির পূর্ব ইতিহাসের প্রমাণ মেলে তাম্র যুগে। সে সময় দক্ষিণ আনাতোলিয়ার এক অংশে ‘কাতাল হোইউক’ নামের এক দেবীর পোশাক ছিল বিকিনির ন্যায়। এছাড়াও, পম্পেইয়ে রোমান দেবী ভেনাসের বিকিনি পরিহিত থাকার প্রমাণও খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। বর্তমান সমাজের পোশাক বলে বিকিনিকে চিহ্নিত করা হলেও এর ইতিহাস অনেক পুরনো।

আদি যুগের বিকিনির চল এখনো রয়েছে। তবে তখন আর এখনকার নারীদের বিকিনি পরার কারণে সম্ভবত পরিবর্তন এসেছে। সেইসঙ্গে বিকিনি নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টেছে। অনেকেই বলে থাকেন, বেঁচে থাকো বিকিনির মতো করে। অর্থাৎ বিকিনি যেমন খোলামেলা একটি পোশাক হিসেবে বেঁচে রয়েছে যুগের পর যুগ ঠিক তেমনি খোলামেলাভাবেই বেঁচে থাকা উচিত প্রত্যেকের। 

সূত্র: এলেডটকম, স্লেটডটকম ও হিস্টোরিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস