স্ত্রী’র অবাধ্যতায় স্বামীর করণীয়

স্ত্রী’র অবাধ্যতায় স্বামীর করণীয়

নিলুফার ইয়াসমিন জান্নাত ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:০৭ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

নেককার স্ত্রীরা হয় অনুগতা- ফাইল ফটো

নেককার স্ত্রীরা হয় অনুগতা- ফাইল ফটো

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاء بِمَا فَضَّلَ اللّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُواْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللّهُ وَاللاَّتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلاَ تَبْغُواْ عَلَيْهِنَّ سَبِيلاً إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا

‘পুরুষেরা নারীদের ওপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের ওপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীরা হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাজতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাজত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার ওপর শ্রেষ্ঠ।’ (সূরা: নিসা , আয়াত: ৩৪)।

হজরত ওয়াহিদী (রহ.) বলেছেন, আয়াতে বর্ণিত-‘নূশুয’ শব্দের অর্থ হলো স্বামীর অবাধ্য হওয়া এবং তার কথা না মানা। হজরত আতা (রহ.) বলেন, এর অর্থ হলো স্বামীর সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকা, তাকে যৌন মিলনে বাধা দেয়া এবং তার প্রতি যে আনুগত্য প্রদর্শন করতো তা না করা। তাদরেকে পবিত্র কোরআনের বানী শুনিয়ে এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ জানিয়ে উপদেশ দেয়া এবং কর্তব্য সচেতন করে তোলা।

তাদরে শয্যা বর্জন করার ব্যাখ্যায় হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তাদের দিকে পিঠ রেখে শয়ন করবে, তাদের সঙ্গে কোনো কথাবার্তা বলবে না। শারী (রহ.) এবং মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন, এর অর্থ হলো তাদেরকে এক বিছানায় শয়ন করতে দিও না। তাদেরকে এমনভাবে প্রহার করো যাতে কোনো প্রকার জখম না হয়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তাদেরকে এমনভাবে প্রহার করতে হবে যেমনটি আদব শিখাবার জন্য করা হয়ে থাকে। যেমন কি দ্বারা প্রহার করা। এ আয়াতে স্বামীকে তার স্ত্রীর অবাধ্যতা শুধরাবার জন্য হালকাভাবে প্রহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং স্ত্রীকে সঠিক পথে পরিচালিত করা স্বামীর দায়িত্বও বটে। যদি তারা ঠিক হয়ে যায় এবং তোমাদের আনুগত্য করতে থাকে তাহলে তাদের ওপর অত্যাচার বা বাড়াবাড়ি করো না।

বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, রাসূলূল্লাহ (সা.) বলেছেন, স্বামী যদি তার স্ত্রীকে শয়নের জন্য ডাকে এবং স্ত্রী যদি তার কাছে না যায় তবে ফেরেশতারা তাকে ভোর পর্যন্ত অভিশাপ দিতে থাকেন। অন্য রেওয়ায়াতে আছে, স্বামী যদি তার কাছে না যাওয়ার জন্য অসন্তুষ্ট থাকে তবে ভোর হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতারা ওই স্ত্রীকে অভিশাপ দিতে থাকেন। বুখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত অপর এক হাদিসে আছে, স্ত্রী যদি স্বামীর বিছানায় না শুয়ে অন্যত্র রাত কাটায় এবং স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকে তবে স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ ও ফেরেশতারা তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না।

হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ আল্লাহ তায়ালা কবুল করবেন না এবং তাদের নেক আমল আসমানে তোলা হয় না। যথা: ওই গোলাম, যে তার মালিকের নিকট থেকে পালিয়ে গেছে যতক্ষণ না সে মালিকের কাছে ফিরে আসে এবং তার মালিকের কাছে আত্নসমর্পণ না করে। ওই নারী যার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে যতক্ষণ না সে তার প্রতি সন্তুষ্ট হয় এবং যে মদাসক্ত ব্যক্তি মদপান করে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে- যতক্ষণ না সে সংশোধন হয়।

হজরত হাসান (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে শুনেছেন এমন একলোক বলেছেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন নারীদেরকে সর্বপ্রথম যে প্রশ্ন করা হবে তা হলো তার নামাজ এবং তার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কিত।’ (কানযুল উম্মাল)।

হাদিস শরিফে আছে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে নারী আল্লাহ এবং পরকালের ওপর ঈমান রাখে তার জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখা জায়েয় নয় এবং স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেয়াও বৈধ নয়। (বোখারি)।

রোজা রাখা জায়েয না হওয়ার কারণ হলো স্বামীর হক আদায় করা এবং তার অনুগত থাকা হলো ফরজ আর রোজা হলো নফল। নবী করিম (সা.) আরো বলেছেন, ‘আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করার আদেশ দিতে পারতাম তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।’ (তিরমিযী)।

হুসাইন ইবনে মুহসিনের ফুফু বলেন, তিনি রাসূলূল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে তার স্বামী সম্পর্কে আলোচনা করলে তিনি বলেন, ‘দেখ তোমার স্থান কোথায় এবং তোমার স্বামীর স্থান কোথায়? সে তোমার জন্য জান্নাত এবং জাহান্নাম।’ (নাসাঈ)।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞ নারীর প্রতি আল্লাহ তায়ালা দৃষ্টিপাত করবেন না, অথচ সে তার স্বামীর মুখাপেক্ষী।’

হজরত ইবনে উমর (রা.) আরো বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো নারী তার স্বামীর ঘর থেকে অনুমতি ছাড়া বের হয়ে যায় সে ফিরে না আসা পর্যন্ত অথবা তওবা না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তার ওপর অভিশাপ বর্ষণ করতে থাকে। (নাসাঈ)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘যে নারীর স্বামী তার ওপর থাকা অবস্থায় ইন্তেকাল করবে সে জান্নাতে যাবে।’ (ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)।

অতএব, স্বামীর সন্তুষ্টি বিধান, সে যেন রাগান্বিত বা অসন্তুষ্ট না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখা এবং যখন সে তাকে পেতে চাইবে তখন তার কাছে যাওয়া নারীদের ওপর ওয়াজিব। কেননা নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘কোনো নারী যদি রান্না-বান্নার কাজে ব্যস্ত থাকে এবং এমতাবস্থায় তার স্বামী যদি তাকে তার সঙ্গে শয়ন করার জন্য ডাকে তবে তখনো তাকে তার ডাকে সাড়া দিতে হবে।’

উলামায়ে কিরাম বলেছেন, হায়েয, নিফাস ইত্যাদির মতো অসুবিধা থাকে তবে স্বামীর ডাকে সাড়া না দেয়া ওয়াজিব। এমতাবস্থায় স্বামীর জন্য স্ত্রীকে ডাকাও হালাল নয়। যে পর্যন্ত না গোসল করে পবিত্র হবে সে পর্যন্ত তার সঙ্গে সঙ্গম করা জায়েয হবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘স্ত্রীরা হায়েয (মাসিক ঋতু) হতে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের সঙ্গে সঙ্গম করবে না।

ইবনে কুতায়বা (রা.) বলেন, (পবিত্র হওয়ার) মানে হলো হায়েযের রক্ত বন্ধ হওয়া এবং পানি দ্বারা গোসল সেরে নেয়া।

নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঋতু অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গম করলো অথবা স্ত্রীর গুহ্যদ্বারা সঙ্গম করলো, সে মুহাম্মাদ (সা.) এর ওপর যা নাজিল হয়েছে তার (কোরআন মাজিদের) সঙ্গে কুফরি করলো।’

অপর এক হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করবে অথবা তার গুহ্যদ্বারে সঙ্গম করবে সে অভিশপ্ত। নিফাসের জন্য একই হুকুম। তবে নিফাসের সর্বোচ্চ সময় হলো চল্লিশ দিন এবং হায়েযের সর্বাচ্চ সময় হলো দশ দিন। স্বামী যদি হায়েয অথবা নিফাস অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে চায় তবে তার কথা মানা স্ত্রীর জন্য ওয়াজিব নয়।

স্ত্রীকে স্বরণ রাখতে হবে যে, সে তার স্বামীর কৃর্তৃত্বাধীন। স্বামীর অনুমতি ব্যতীত নিজেকে যথেচ্ছা ব্যবহার করা ও তার অর্থ-সম্পদে হস্তক্ষেপ করা সমীচীন নয় এবং সে নিজের ওপর স্বামী গুরুত্ব দেবে। তার আরো স্বরণ রাখতে হবে যে, তার স্বামীর আত্নীয়-স্বজনের অধিকার তার নিজের আত্নীয়-স্বজনের ঊধ্বে। স্বামীকে সার্বিকভাবে পরিতৃপ্ত করার জন্য তাকে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে থাকতে হবে। নিজের সৌন্দর্যের জন্য স্বামীর সঙ্গে গর্ব বা অহংকার করবে না এবং স্বামীর কোনো ক্রটি থাকলে সেজন্য তাকে ঘৃণা করবে না।

হজরত আসমাঈ (রহ.) বলেন, একবার আমি এক গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে এক সুন্দরী নারীর অত্যন্ত কুৎসিত এক স্বামীকে দেখে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কিভাবে এ কুৎসিত স্বামীর ঘর করছো? নারী বললো, ওহে শোন! হয়তো তার সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে তার যে সম্পর্ক তা অত্যন্ত সুন্দর। তাই তার প্রতিদানে আল্লাহ আমাকে তার জীবন সাথী করেছেন অথবা আমি হয়তো কোনো অপরাধ বা গুনাহের কাজ করেছি, যার শাস্তিস্বরুপ তাকে আমার স্বামী করেছেন। (তিরমিযী,ইবনে মাজাহ)।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘ওহে নারী সমাজ! তোমাদের ওপর তোমাদের স্বামীদের যে অধিকার রয়েছে তা যদি জানতে তাহলে নিজ গন্ডদেশ দ্বারা নিজ নিজ স্বামীর পায়ের ধুলো-বালি মুছে দিতে।’

নবী করিম (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে ওই সব নারী জান্নাতবাসী যাদেরকে কষ্ট দিলেও স্বামীকে ভালোবাসে এবং তার হাতে হাত রেখে বলে-আমি সন্তুষ্টচিত্তে আছি, আমাকে যতই চাপ দেবে ততই আমার কাছে ভালো লাগবে।’ (তারগীব)।

স্বামীর সামনে সর্বদা লজ্জাবোধ করা, দৃষ্টি অবনিমতি রাখা, তার আদেশ পালন করা, আর তার কথা বলার সময় চুপ থাকা, তার আগমনে উঠে দাঁড়ানো, বাইরে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে কিছু দূর গিয়ে বিদায় অভ্যর্থনা জানানো, তার শয়নকালে নিজেকে তার কাছে সমর্পণ করা, তার অনুপস্থিতিতে তার বিছানায়, অর্থ-সম্পদে এবং ঘরের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা না করা, সুগন্ধী ব্যবহার করা, নিয়মিত মেসওয়াকের মাধ্যমে দাঁত মাজা এবং পরিপাটিভাবে থাকা, তার সঙ্গে সৌন্দর্য চর্চা করা, তার অনুপস্থিতিতে সাজ-গোজ পরিহার করা, তার পরিবারের লোকজন ও আত্নীয়-স্বজনদের সম্মান ও আদর-যত্ন করা এবং তার নিকট হতে সব পাওয়াকে বড় করে দেখা প্রত্যেক নারীর জন্য ওয়াজিব।

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে