Alexa গর্ভধারণ বন্ধ করতে পুড়িয়ে দেয়া হতো নারীর যৌনাঙ্গ

নরকখ্যাত ক্যাম্প ২২ (শেষ পর্ব)

গর্ভধারণ বন্ধ করতে পুড়িয়ে দেয়া হতো নারীর যৌনাঙ্গ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:০২ ৪ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২২:০৯ ৪ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

এক নরক। সেখানে নরখাদকদের হাতে বন্দী হাজার হাজার নারী পুরুষ। যেখানে কেউ একবার প্রবেশ করলে আর বের হতে পারে না। এই নরকেই মানুষকে মানুষের চোখে দেখা হতো না। মানুষকে ব্যবহার করে ভয়াবহ সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করানো হতো। প্রসূতি নারীদের সরাসরি পেট কেটে ভ্রূণ বের করে ফেলা হতো, কখনো বা বড় তক্তা দিয়ে পিষে পিষে গর্ভপাত করানো হতো ৮ থেকে ৯ মাসের প্রসূতিকে! ‘প্রসূতি নারীদের বড় তক্তা দিয়ে পিষে গর্ভপাত করানো হতো’ শিরোনামের প্রথম পর্বে আপনারা এই নরক সম্পর্কে জেনেছেন। আজ রইল শেষ পর্ব।

ম্যাং চল যখন প্রহরী হিসেবে ক্যাম্পে আসেন, তখন তিনি দেখতে পান জীবন্ত সব কঙ্কাল ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারো অক্ষিকোটরে একটি চোখ নেই, তো কারো সারা শরীর আগুনে পুড়ে গেছে, কারো বা ২টি পা নেই কিংবা কোনো না কোনো অঙ্গ বিকৃত কিংবা কারো হাতের হাড় ভেঙ্গে বের হয়ে এসেছে। কারো আবার গালে এক পাটি দাঁত নেই। বন্দীদের দশা এতটাই করুণ! তিনি বলেন ৩০ ভাগেরও বেশি বন্দী শারিরিকভাবে কাজে অক্ষম। কারণ তাদের এমন নির্যাতন করা হয় যে তিন মাসের মাঝেই মৃত্যু নিশ্চিত। 

গর্ভবতী নারীদের দিয়ে পাথর টানানো হতসবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটি ঘটে নারীরা যখন গর্ভবতী হতো। ক্যাম্পে নারী বন্দীদের গর্ভবতী হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ এতে ক্যাম্পের জনসংখা বৃদ্ধি পাবে। কোনো নারী যদি সন্তান প্রসব করেও ফেলে তবে সদ্যজাত শিশুটিকে দেয়ালে আছড়ে মারা হয় কিংবা মাকে বাধ্য করা হয় নিজের সন্তানকে হত্যা করতে। গর্ভবতী নারীদের জোরপূর্বক পেট কেটে গর্ভপাত করানো হতো। কখনো বা ভারিপাথর হাতে নিয়ে দৌড় দিতে বলা হতো কিংবা গর্ভবতীর পেটের উপর বড় তক্তা বসিয়ে ২ পাশ থেকে ২ জন চাপ দিত। গর্ভপাতের বিষয়টি এতটাই ভয়াবহ যে অনেকসময় বন্দিনী মারাও যেত। কোনো নারী বন্দী যেন দ্বিতীয়বার গর্ভ ধারণ না করতে পারে তাই আগুন দিয়ে যোনী জ্বালিয়ে দেয়া হতো।

নতুন নতুন বন্দীদের জায়গা দিতে হয় বলে মানুষকে পিঁপড়ার মতো করে পিষে মেরে ফেলা হয়। কখনোবা বন্দীদের থাকার যায়গায় ইচ্ছাকৃত আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। শত শত বন্দী নির্বিচারে মারা যায়, কেউবা ঝলসানো শরীর নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করে যায়। বন্দীদের মৃতদেহের সৎকার তো দূরেই থাক বরং যে বর্বরতার সহিত সেই লাশগুলোর একটা ‘গতি’ করা হয় তা শুনলে আপনার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। চংজিন পাওয়ার প্ল্যান্ট, চংজিন স্টিল মিল এবং কিমচেক স্টিল মিলের কয়লার সাপ্লাই দেয়া হয় ক্যাম্প ২২ থেকে। 

আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হতো নারীপাঠক কি কিছু আন্দাজ করতে পারছেন কি হয় সেই হতভাগা বন্দীদের লাশের? অধিকাংশ লাশ ট্রাকে করে পাঠানো হতো কয়লা বানানোর জন্য। কয়লা মিশিয়ে লাশগুলোকে বড় বড় চুল্লিতে পুড়িয়ে কয়লা বানানো হতো। আর যে ছাই পাওয়া যেত তা জমিতে ব্যবহার করা হতো উর্বরতার জন্য। তিনি আরো বলেন- ক্যাম্পে সয়া সস, বিস্কুট এবং বিনপেস্টের একটি কারখানা রয়েছে যেখানে শুধুমাত্র ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী সুন্দরী নারীরা কাজ করে। আর তাদের পরনে থাকে পাতলা সাদা কাপড়। কর্তব্যরত অফিসার এবং গার্ডরা তাদের যখন ইচ্ছা ধর্ষণ করে। যদি কোনো নারী বাধা প্রদান করে, তাকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয় কিংবা গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। এমনকি কিছু কিছু ক্যাম্পে নিয়ম করে নারীদের ধর্ষণ করা হয়।        

বন্দীরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় এই নির্যাতন প্রক্রিয়াকে। বন্দীদের হাত মোটামুটি ৬০ সেন্টিমিটার উপরে একটি গরম পানির পাইপের সঙ্গে বাঁধা হয়। এ অবস্থায় না পারা যায় বসতে, না পারা যায় দাঁড়াতে। তখন গার্ড ইচ্ছামত মোটা মুগুর সদৃশ লাঠি দিয়ে পিটায়, লাথি দেয় কিংবা ঘুষি মারে। এভাবে টানা কয়েকদিন চলতে থাকলে এক সময় শরীর প্যারালাইজড হয়ে যায় এবং বুকের সঙ্গে হাতের সন্ধি খুলে আসে।

গর্ভবতী নারী পেটের উপর বড় তক্তা দিয়ে পিষে ফেলা হচ্ছেKneeling Torture বলে এক ধরণের নির্যাতনে বন্দীর পায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং কিছুদিন পর প্যারালাইজড হয়ে বন্দীর মৃত্যু ঘটতে বাধ্য। প্রথমে বন্দীকে হাঁটু গেড়ে বসানো হয়। তারপর হাঁটুর দুই হাড়ের সংযোগস্থলে একটি চ্যালা কাঠ বসিয়ে দেয়া হয় যাতে পায়ে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়। জোরপূর্বক পানি খাওয়ানোর নির্যাতনে প্রথমে অপরাধীকে একটি টেবিলের উপর শক্ত করে বাঁধা হয় এবং জোরপূর্বক ঠেসে ঠেসে পানি গেলানো হয়। তারপর একটি তক্তা পেটের উপর বিছিয়ে নির্যাতনকারী তার উপর শুয়ে পড়ে। এতে পাকস্থলি থেকে পানি সব বের হয়ে পড়ে।

পানিতে নিমজ্জন বলে আরেক ধরণের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। বন্দীর মাথা একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে পুরে ফেলে পা উল্টিয়ে মাথা পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই শাস্তি দেয়া হলে বন্দী মারা যায়। পানিতে আরেক ধরণের নির্যাতন করা হয়। একটি পানি ভর্তি ট্যাঙ্কিতে বন্দীকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ট্যাঙ্কে পানির উচ্চতা থাকে বন্দীর নাকের উচ্চতার খানিক বেশি। তাই বন্দীকে সর্বদাই পায়ের আঙ্গুলের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, এসময় হাত পেছন থেকে বাঁধা থাকে। মাঝে মাঝে অফিসারগণ তাদের মনের সুখ মেটাতে উল্টো করে ঝুলিয়ে মুগুর সদৃশ লাঠি দিয়ে এমন বর্বরতার সহিত বন্দীকে প্রহার করে যে হাড় ভেঙ্গে শরীর থেকে বের হয়ে চলে আসতো। বিষয়টা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতো যখন অফিসারের মেজাজ চরমে থাকতো।

প্রাণে বাঁচতে নিজের আত্মীয়কেই মেরে ফেলতো বন্দীরাজ্ঞান বিজ্ঞানের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষায় এই বন্দীদের ব্যবহার করা হতো। গ্যাস চেম্বারে বিভিন্ন গ্যাসের পরীক্ষা নিরীক্ষায় এবং নতুন কোনো ঔষধের পরীক্ষা করতে এদের ব্যবহার করা হতো। সবচেয়ে পৈশাচিক ব্যাপার হলো- অস্ত্রোপচারের সময় কোনো চেতনানাশক বা অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবহার করা হতো না। হাতভাগা বন্দীদের আর্তচিৎকার পরীক্ষারত ডাক্তার ও বিজ্ঞানীদের পাশবিক আনন্দ দিত। Kwon Hyok নামক এক নিরাপত্তা প্রধান বলেন- একবার তাকে বলা হয়েছিল ৩ থেকে ৪ জন বন্দীকে ধরে নিয়ে আসতে। 

একটি দম বন্ধ হয়ে আসে এমন গ্যাসের পরীক্ষার জন্য তাদের ব্যবহার করা হবে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি একটি পরিবারকে নিয়ে আসেন। একটি কাচের তৈরি চেম্বারে তাদের ঢুকিয়ে গ্যাসটি ছেড়ে দেয়া হল, পুরো পরিবারটি যখন বেঁচে থাকার জন্য প্রচন্ড আকুলিবিকুলি করছিলো, তখন মা এবং বাবা বাচ্চা দুটির গালে মুখ দিয়ে তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছিলো, কিন্তু বিধি বাম। পুরো পরিবারটিকেই গ্যাসে অবরুদ্ধ হয়ে মারা যেতে হয়েছিল। এ তো গেল একটি ঘটনা মাত্র। প্রতিনিয়ত ভয়াবহ সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হতো এই হতভাগা মানুষগুলোর উপর।

বন্দীরা না পারত উঠতে বসতে কিংবা শুতেক্যাম্প ২২ বর্তমানে বন্ধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ক্যাম্প ২২ বন্ধ হলেও মুক্তি পায়নি তার বন্দীরা। ২০ হাজার বন্দীর মাঝে মোটামুটি ৮ হাজার বন্দীকে ক্যাম্প ২৫ এ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাকিদের কোনো হদিস নেই। ধারণা করা হয়, ২০০৯ সালের মুদ্রা মুল্যহ্রাসের ফলে ক্যাম্প অথোরিটি পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার কিনতে না পারায় এবং সেই বছর ক্যাম্পের নিজস্ব ফলন অনেক কম হওয়ায় অনেক বন্দী অনাহারে মারা যায়। ২০১২ সালে স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে দেখা যায় গার্ড হাউজগুলো ভেঙ্গে গেছে, কিছু স্থাপনা ভেঙ্গে যাবার পথে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসআই