Alexa নামের সঙ্গে মিথ্যা উপাধি ব্যবহারকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি (পর্ব-১)

নামের সঙ্গে মিথ্যা উপাধি ব্যবহারকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি (পর্ব-১)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৪০ ১৯ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৯:৪৩ ১৯ আগস্ট ২০১৯

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত আছে জনাবে রাসূল (সা.) এরশাদ করেন যে, যে ব্যক্তি সুসজ্জিত হয় এমন জিনিসের দ্বারা, যা তাকে দেয়া হয়নি। তাহলে সে মিথ্যার দুই কাপড় পরিধানকারীর মতো।

উদ্দ্যেশ্য এই যে, যদি কোনো ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে লোকদের সামনে কোনো এমন সিফাত বা গুণ প্রকাশ করে, যা বাস্তবে তার মধ্যে বিদ্যমান নাই, তাহলে সে যেন নিজের সমস্ত শরীরের ওপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত মিথ্যা জড়িয়ে রেখেছে এবং যেভাবে পোশাক সমস্ত শরীরকে ঢেকে রাখে, সেভাবে সে মিথ্যার দ্বারা নিজেকে ঢেকে রেখেছে। এটাও মিথ্যা এবং ধোঁকা। 

আরো পড়ুন>>> মিশরে কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ফজলে রাব্বি

ওই হাদিসের উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ অন্যকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে নিজের জন্য কোনো এমন সিফাত ব গুণাবলী প্রকাশ করে, যা বাস্তবে তার মধ্যে নেই। যেমন: একজন ব্যক্তি যে আলেম নয়, কিন্তু নিজেই নিজেকে আলেম বলে সমাজে প্রচার করে। অথবা একজন ব্যক্তি যে কোনো বিশেষ মর্যাদার পদে অধিষ্ঠিত নেই, কিন্তু সে নিজেই নিজেকে ওই বিশেষ পদাধিকারী বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। অথবা এক ব্যক্তি বিশেষ কোনো উচ্চ বংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় কিন্তু সে নিজেকে ওই বংশের সন্তান হিসেবে সমাজে পরিচয় করিয়ে দেয় তাদের ব্যাপারে বলেছেন যে, মিথ্যার কাপড় পরিধাানকারীর মত। তেমনিভাবে এক ব্যক্তি যে সম্পদশালী নয়, কিন্তু নিজেই নিজেকে সম্পদশালী বলে প্রকাশ করে।

যাই হোক, যে গুণাবলী কারো ভতরে বিদ্যমান নেই কিন্তু বানোয়াটভাবে ওই গুণাবলীকে নিজের জন্য সাব্যস্ত করার অপচেষ্টা চালায়। এই হাদিসের মধ্যে উক্ত ঘৃণিত কাজের সমালোচনা করে শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে।

নিজের নামের সঙ্গে صديقي (সিদ্দিকি) বা فاروقي (ফারুকি) লেখা যেমন- আমাদের সমাজে এমন দেখা যায় যে, কেউ নিজেকে এরকম বংশ ও গোত্রের সঙ্গে সম্বন্ধ যুক্ত করে দেয়, যার সঙ্গে বাস্তবে তার কোনো সর্ম্পক নেই। যেমন কোনো ব্যক্তি صديقى নয়, কিন্তু নিজের নামের সঙ্গে صديقى লেখে, অথবা কেউ فاروقى নয় কিন্তু নিজেকে فاروقى লিখে। অথবা কেউ أنصارى নয় কিন্তু নিজেই নিজেকে أنصارى লিখে। এমনিভাবে নিজে নিজেকে অন্য বংশের দিকে সম্পর্ক যুক্ত করার অপচেষ্টা করা যার সঙ্গে তার কোনো সর্ম্পক নেই। এটা বড়ই কঠিন গুনাহ। তার ব্যাপারে এই হাদিসের মধ্যে বলা হয়েছে যে, সে যে মাথা থেকে নিয়ে পা পর্যন্ত মিথ্যার পোশাক পরিহিত রয়ছে।

কাপড়ের সঙ্গে সাদৃশ্যতা কেন?
ওই গুনাহকে মিথ্যার কাপড় পরিধানকারীর সঙ্গে এই জন্য সাদৃশ্য দেয়া হয়েছে, কেননা গুনাহ এমন যার মধ্যে মানুষ অল্প সময় লিপ্ত থাকে। এরপর সে গুনাহ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যেই ব্যক্তি ভুয়া উপাধি গ্রহণ করে এবং সমাজে নিজের বিশেষ মর্যাদা প্রকাশ করে যা বাস্তবে তার মধ্যে নেই। তাহলে সেটা লেগে আছে। যেভাবে পোশাক মানুষের সঙ্গে সবসময় নিঃশব্দে লেগে থাকে, তেমনিভাবে এই গুনাহও সবসময় মানুষের সঙ্গে লেগে রয়েছে। 

নিম্নমানের লোকদের أنصارى (আনসারি) ও কসাইদের قريشى (কোরাইশি) খেতাব দেয়া:
মুফতি মুহাম্মদ শফীর (রহ.) ওই বিষয়াবলীর ওপর একটি ভিন্ন পুস্তিকা রচনা করেছিলেন যার নাম غايات النسب তখন কিছু গোত্র নিজের নামের সঙ্গে ভুয়া সম্বন্ধ ব্যবহার করছিল। হিন্দুস্তানে এই বিষয়টি এত ব্যাপক ছিল যে, কাপড় বহনকারী যাদেরকে তাঁতী বা জোলা বলা হত। সে নিজের নামের সঙ্গে أنصارى লেখত। এবং গোশত বিক্রয়কারী কসাই নিজের নামের সঙ্গে قريشى লিখত। এর জন্য হজরত শফি (রহ.) এই গ্রন্থ লিখেছেন। এবং তার মধ্যে এ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, বংশের ব্যাপারে মিথ্যা দাবী করা কঠিন গুনাহ। এ ব্যাপারে কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে যার মধ্যে ভুয়া সম্বন্ধ করা থেকে রাসূল (সা.) নিষেধ করেছেন। এই গ্রন্থ লেখার কারণে তারা হজরত (রহ.) এর বিরুদ্বে সমস্ত হিন্দুস্তান জুড়ে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ল যে, তিনি আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষায় লিখেছেন কিন্তু বাস্তব সেটাই যা নবী কারিম (সা.) বর্ণনা করেছেন।

নসব এবং বংশ ফজিলতের জিনিস নয়:
আসল কথা এই যে, নসব এবং বংশের বিষয়টি এমন যে, ইসলামে এর তেমন কোনো ফজিলত নেই। কোনো ব্যক্তি যে কোনো বংশের সন্তান হোক না কেন যদি আল্লাহ তায়ালা তাকে তাকওয়া দান করে থাকেন তাহলে অভিজাত বংশের সন্তানের চেয়েও সে উত্তম। কোরআনে কারীমে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন,

يآأيها الناس إنا خلقناكم من ذكر و أنثى و جعلناكم شعوبا وقبائل لتعارفوا إن أكرمكم عند الله أتقاكم

‘হে লোকসকল! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। পুরুষ হলো আদম (আ.) আর নারী হলো হজরত হাওয়া (আ.)। এই জন্য যত মানুষ দুনিয়ার মধ্যে এসেছে সবাই এক পিতা-মাতার সন্তান। অবশ্য আমি এই যে বিভিন্ন বংশ বানিয়েছে এর কারণ হলো কারো সম্পর্ক এক গোত্রের সঙ্গে। আবার কারো সম্পর্ক অন্য কোনো বংশের সঙ্গে। এই বংশ এবং বিভক্ত করার আসল কারণ হলো যাতে করে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। যদি সকল মানুষ একই গোত্রের হত তাহলে একে অপরকে চিনতে কঠিন হত। 

এখন এভাবে বলে দেয়া সহজ যে, এই ব্যক্তি অমুক বংশের। এই কারণে শুধু পরিচিতি হওয়ার সুবিধার জন্য তোমাদের বংশগুলো বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত করেছি। কিন্তু কোনো গোত্রের অন্য গোত্রের ওপর ফজিলত নেই বরং তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উঁচু মর্যাদাবান এবং সম্মানিত সে যার মধ্যে تقوى (তাকওয়া) বেশি আছে। এই কারণে যদি কোনো ব্যক্তি এমন বংশ এবং গোত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় যাকে লোকেরা উঁচু বংশ মনে করে না। তবুও কোনো হীনমন্যতার কারণ নেই। আসল কাজ হলো আমল ও আখলাক সুন্দর ও উত্তম বানানো। উত্তম কার্যাবলী দ্বারা জীবনকে সুসজ্জিত ও মহিমাম্বিত করে গড়ে তোলা। যে এমনটি করতে পারবে সে অভিজাত বংশের অধিকারীর থেকে অগ্রগামী হয়ে যেতে পারবে। অতএব কেন অনর্থক নিজেকে অভিজাত বংশের সদস্য হওয়ার ভুয়া দাবী করে নিজেকে গুনাহগার বানাচ্ছ। অতএব, সকলে প্রকৃত বংশের পরিচয়েই সমাজে পরিচিত হতে সচেষ্ট হও। আর তা ছাড়া বংশ পরিচয়কে এত বড় গলায় বলে বেড়ানোরই বা প্রয়োজন কী। না বললেই বা কি ক্ষতি? অবশ্য যদি কখনো একান্ত বলতেই হয় তাহলে প্রকৃত বংশই বলতে হবে। অনর্থক অন্য বংশের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে মানুষকে ভুল বুঝানো জায়েয নেই। এ ব্যপারে কঠোর হুঁশিয়ারী বর্ণিত হয়েছে।
 
পালক পুত্রকে মূল পিতার সঙ্গে সম্পৃকত করা: 
এখানে আরেকটি আলোচ্য বিষয় রয়েছে। যে ব্যপারে পবিত্র কোরআনে অর্ধেক রুকু অবতীর্ণ হয়েছে। তা হলো কখনো মানুষ অন্যের সন্তানকে পালক হিসেবে গ্রহণ করে। যেমন কারো সন্তান হয় না। সে অন্যের সন্তানকে পালক নিয়ে আপন সন্তানের ন্যায় লালন পালন করতে থাকে। শরয়ী দৃষ্টিতে অন্যের সন্তানকে পালক নিয়ে লালন পালন করা তো জায়েয আছে, কিন্তু পালকপুত্র কোনো অবস্থাতেই পালনকারীর প্রকৃত ও আপন পুত্র হতে পারবে না। সুতরাং যখন উক্ত সন্তানকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন হয় তখন তাকে তার প্রকৃত পিতার দিকেই সম্পৃক্ত করে বলতে হবে যে, সে অমুকের পুত্র। পালনকারীর দিকে সম্পৃক্ত করা বৈধ হবে না। এমনিভাবে আত্মীয়তার যতো বিধিবিধান রয়েছে সব প্রকৃত পিতার দিকেই সম্পৃক্ত হবে। এমনকি যে ব্যক্তি তাকে পুত্র ডেকে শুধু মুখে ডাকা পিতা হয়েছে (প্রকৃত পিতা নয়) এবং তার স্ত্রী মৌখিক মা হয়েছে ছেলে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর মুখে ডাকা মায়ের সঙ্গে তার পর্দা করা ফরজ হবে। যদি তিনি মাহরাম না হয়ে থাকেন। 
চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে