Alexa নামাজের মাধ্যমে যে দশ শিক্ষা দেয়া হয়েছে 

নামাজের মাধ্যমে যে দশ শিক্ষা দেয়া হয়েছে 

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৪৩ ৬ অক্টোবর ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় রোকন। কালেমার পরে নামাজের স্থান। নামাজ কায়েম করার জন্য কোরআন ও হাদিস শরিফে বিশেষ তাগিদের সঙ্গে বারবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো না।’ (কোরআন) 

রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ইসলাম একখানি ঘরস্বরূপ এবং নামাজ তার স্তম্ভ স্বরূপ। যে নামাজ কায়েম করল সে যেন ইসলামগৃহকে কায়েম করল আর যে নামাজ তরক করলো সে যেন ইসলামগৃহকে ভেঙে ফেলল।’ 

নামাজ শুধু ইবাদতই নয়, নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের অনেকগুলো শিক্ষাও দিয়েছেন। এ আলোচনায় নামাজের দশটি শিক্ষা তুলে ধরা হলো-

যেহেতু নামাজের মাধ্যমে আমাদেরকে দৈনিক পাঁচবার করে ইসলামি জীবন যাপনের তালিম দেয়া হয়েছে এজন্যই ইসলামে নামাজের প্রতি এতোখানি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এখন নামাজের মাধ্যমে কীভাবে আমাদেরকে ইসলামি জীবনের তালিম দেয়া হয়েছে এ সম্পর্কে সামান্য কিছু আলোচনা করা হচ্ছে। নামাজে আমরা কী করি? 

(১) মুয়াজ্জিন আজান দিয়ে নামাজের দিকে সকলকে আহ্বান করেন এবং প্রত্যেক মুসলমান তার অধীনস্থ ও অনুবর্তীগণকে নামাজের জন্য আদেশ প্রদান করেন। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা আমাদের অধীনস্থ ও অনুবর্তীগণকে নামাজের জন্য আদেশ দাও।’

হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানগণ সাত বছরে পৌঁছলেই তাদের নামাজ পড়তে আদেশ করো এবং ১০ বছরে উপনীত হলে দরকার মতো নামাজের জন্য প্রহার করো।’

একটু চিন্তা করুন, এই ব্যবস্থার দ্বারা কী আমাদের তালিমে দ্বীন ও তাবলিগে দ্বীন এর সবক দেয়া হয়নি?

(২) নামাজে দাঁড়িয়ে ইন্নি ওয়াজ্জাহতু পাঠ করতে হয়। তাতে বলা হয় যে, আমি সব দিক থেকে আমার মুখ ফিরিয়ে আনলাম এবং একমাত্র আল্লাহ তায়ালার দিকে আমি রুজু হলাম। নামাজের নিয়ত বাঁধতে আমাদের মনে করতে হয় যে, আমি একমাত্র আল্লাহ তায়ালার রিজামন্দি হাসিলের নিয়তে নামাজ পড়ছি। নামাজের এই ব্যবস্থার দ্বারা আমাদের তালিম দেয়া হয়েছে যে, আমাদের জিন্দেগির প্র্রত্যেকটি কাজ হবে আল্লাহকে কেন্দ্র করে এবং প্রত্যেকটি কাজের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি হাসিল করা।

(৩) নামাজের মধ্যে আমাদের বারবার আল্লাহর জিকির করতে হয় এবং তসবিহ পাঠ করতে হয়। আল্লাহর তাঁজিম এর উদ্দেশ্যে বারবার রুকু সিজদা করতে হয়। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ‘রব্বানা লাকাল হামদ’ প্রভৃতি পাঠ করে বারবার আল্লাহর প্রশংসা করা হয় এবং তাঁর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। ‘ইয়্যা কানা বুদু’ পাঠ করে বার বার তার বন্দেগির একরার করা হয়। ‘ইয়্যাকানাস্তাইন’ পাঠ করে বার বার তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা হয়। নামাজের শেষে দোয়ায়ে মাসুরা প্রভৃতিতে নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য আল্লাহ তায়ালার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। এতদ্ব্যতীত নামাজে আল্লাহ রাসূল (সা.) প্রভৃতির ওপর ঈমান আনার কথা বারবার ঘোষণা করা হয়। এই ব্যবস্থার দ্বারা আমাদেরকে পরিষ্কারভাবে ঈমান ও ইবাদতের তালিম দেয়া হয় নাই?

(৪) আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আমার জিকিরের জন্য নামাজ কায়েম করো।’ কিন্তু কেউ যদি নিজের মর্জি মোতাবেক আল্লাহর জিকির করে যথা তসবিহ এর স্থলে কিরাত অথবা কিরাতের স্থলে তসবিহ পাঠ করে বা রুকুর স্থলে সিজদা অথবা সিজদার স্থলে রুকু করে তাতে নামাজ কায়েম করা হবে না। এই ব্যবস্থার দ্বারা এটাই শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, ইসলামের হুকুম আহকাম বিনা আপত্তিতে প্রতিপালন করতে হবে। চাই তা নামাজের মধ্যে আমাদের বুঝে আসুক আর নাই আসুক।

(৫) নামাজের মধ্যে সূরা ফাতিহা ও অন্য যে কোনো সূরা বিশুদ্ধভাবে পাঠ করতে হয় এবং নামাজের মাসয়ালা মাসায়েল অবগত হয়ে নামাজ আদায় করতে হয়। এই ব্যবস্থা দ্বারা আমাদেরকে তাহসিন ইলমে দ্বীনের সবক দেয়া হয়েছে।

(৬) নামাজে লজ্জাস্থান ঢাকা ফরজ। কিন্তু হারাম মাল দ্বারা ক্রয় করা কাপড় পরিধান করে নামাজ পড়লে সেই নামাজ আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এই ব্যবস্থা দ্বারা আমাদের হালাল উপার্জন করতে উৎসাহ দান করা হয়েছে এবং হারাম মাল থেকে নিবৃত্ত থাকতে তাগিদ দেয়া হয়েছে।

(৭) নামাজের জামাত ওয়াজিব। বিনা ওজরে জামায়াত তরককারীকে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিক বলে অভিহিত করেছেন। এই ব্যবস্থার দ্বারা ‘এহতিসাম ফি হাবলিল্লা’র তালিম দেয়া হয়েছে।

(৮) নামাজের জামাত কায়েম করতে একজন ইমাম নিযুক্ত করতে হয় এবং অন্যান্য সকলকে তার তাবেদারি করতে হয়। এই ব্যবস্থা দ্বারা উলিল আমরের আনুগত্যের সবক দেয়া হয়েছে।

(৯) নামাজে ধনী-নির্ধন, আমির-ফকির, নির্বিশেষে সকল মুসলমানের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে হয়। নিজেদের মধ্য থেকে সবচেয়ে যোগ্য ও পরহেজগার ব্যক্তিকে ইমাম নিযুক্ত করতে হয়। ইমাম যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের বিধান অনুযায়ী নামাজ আদায় করেন ততক্ষণ পর্যন্ত তার তাবেদারি করতে হয়। ভুল করলে লোকমা দিয়ে তাকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হয়। ইমাম লোকমা গ্রহণ না করলে এবং নামাজ ফাসিদ হলে একতেদা ছেড়ে দিতে হয়। এসব ব্যবস্থা দ্বারা ইসলামি মুয়াশয়ারাত অর্থাৎ ইসলামি সমাজ নীতি ও রাজনীতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

(১০) নামাজ নির্ধারিত সময়ে পাঠ করতে হয়। শীত, গ্রীষ্ম এর পরোয়া না করে যথা সময়ে নামাজ আদায় করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আল্লাহভীরু ছাড়া অন্যান্যদের জন্য নামাজ অত্যন্ত ভারী জিনিস।’ সুতরাং নামাজের দায়িত্বভার বহন করবার জন্য নানা প্রকার শারীরিক ও মানসিক কষ্ট স্বীকার করতে হয়। এই সকল ব্যবস্থা দ্বারা আমাদের নিয়মানুবর্তিতা ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ’র তালিম দেয়া হয়েছে।

মোটকথা, নামাজের মাধ্যমে আমাদের দৈনিক পাঁচবার করে ইসলামি জিন্দেগির বাস্তব তালিম দেয়া ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদি কেউ দৈনিক পাঁচবার করে কোনো আদর্শের বাস্তব ট্রেনিং লাভ করে, সে কি কখনো সেই আদর্শের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে? কখনই নয়। কাজেই যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে নামাজ কায়েম করে, তার সম্পূর্ণ জীবন ইসলামি জীবনে রূপান্তরিত হতে বাধ্য। সে জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই ইসলামি জিন্দেগির বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না।

এজন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,  ‘নিশ্চয়ই নামাজ যাবতীয় অশ্লীল ও অবৈধ কাজ থেকে বারণ করে।’

রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দৈনিক পাঁচবার করে গোসল করলে যেমন শরীরে কোনো প্রকার ময়লা জমতে পারে না, তদ্রুপ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কায়েমকারীকে কোনো পাপ স্পর্শ করতে পারে না।’

এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, কোনো কোনো নামাজি নামাজ পড়ে কিন্তু নামাজ তাকে অশ্লীল ও অবৈধ কাজ থেকে ফিরায় না। এর কারণ কী? এই প্রশ্নের জবাব এই যে, আল্লাহ পাক আমাদের নামাজ কায়েম করতে নির্দেশ দিয়েছেন। নামাজ কায়েম করার অর্থ এই যে, নামাজ যেভাবে আদায় করতে হয় সেভাবে পূর্ণ তাহকিকের সঙ্গে নামাজ আদায় করা। যাদেরকে নামাজ অশ্লীল ও অবৈধ কাজ থেকে ফিরায় না, বলতে হবে যে, তারা নামাজ পড়ে সত্য কিন্তু নামাজ কায়েম করে না। নামাজ কায়েম করতে হলে আমাদের নিম্নলিখিত নিয়ম পদ্ধতি অনুযায়ী নামাজ আদায় করতে হবে।

> অজু, গোসল, পাক, নাপাকের মাসয়ালা-মাসায়েল ভালরূপে অবগত হয়ে জাহেরি ও বাতেনি উভয় প্রকার পবিত্রতা অর্জন করে তো নামাজ পড়তে হবে।

> নামাজের প্রত্যেকটি ফরজ ওয়াজিব সুন্নত ও মুস্তাহাব সম্পর্কে এলেম অর্জন করতে হবে এবং যথাযথভাবে তা আদায় করতে হবে।

> নামাজে যে সকল সূরা কেরাত ও দোয়া পাঠ করতে হয় তা বিশুদ্ধভাবে পাঠ করতে হবে।

> পাঠরত সূরা-কেরাত এর অর্থ জানা থাকলে পাঠকালীন অর্থের দিকে খেয়াল করতে হবে । আর জানা না থাকলে অন্তত এতটুকু খেয়াল করবে যে, সূরা-কেরাত এর মাধ্যমে মাবুদের সঙ্গে আমার কথোপকথন হচ্ছে। অতএব খুব আদব রক্ষা করা দরকার।

> রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তুমি ইবাদতের সময় এইরূপ ধারণা করো যে, তুমি আল্লাহ তায়ালাকে দেখছ। যদি একান্তই এইরূপ ধারণা করতে না পারো তাহলে অন্তত এরূপ ধারণা করে যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে দেখছেন। এই প্রকার আন্তরিক অবস্থা শেয়ার করার জন্য কোনো হক্কানি আল্লাহ ওয়ালা বুজুর্গ লোকের সোহবত এখতেয়ার করা এবং তার তালিম মোতাবিক ইলমে তাসাওওফ হাসিল করে নফসের ইসলাহ করতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে