নবীদের দ্বীনি দাওয়াতের পদ্ধতি এবং বর্তমান দাওয়াত ও তাবলিগ

নবীদের দ্বীনি দাওয়াতের পদ্ধতি এবং বর্তমান দাওয়াত ও তাবলিগ

মাওলানা সুলাইমান নদবী (রাহ.) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:২২ ৪ জানুয়ারি ২০২০  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সুলাইমান নদবী (রাহ.) ভারতের প্রখ্যাত আলেম, গবেষক ও রাজনীতিবীদ। নিম্নের অনুবাদকৃত লেখাটি তার। 

সুলাইমান নদবী (রাহ.) লিখেছেন আজ থেকে প্রায় তিরানব্বই বছর আগে। লেখায় তিনি নবীদের দাওয়াতের মৌলিক নীতিমালা ও ইলিয়াস (রাহ.) এর দাওয়াতের মেহনতের মাঝে তুলনামূলক একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। 

তিনি দেখিয়েছেন বর্তমান দাওয়াত ও তাবলিগ এবং নবীদের মেহনতের মাঝে পুরোপুরি মিল রয়েছে। বর্তমানে যারা এ ময়দানে কাজ করবেন, তাদের উপকারের চিন্তায় লেখার অনুবাদ তুলে ধরছি।

নবীদেরর দাওয়াতের মূলনীতি ছিলো-

(এক) দাওয়াতের বিনিময় আল্লাহর কাছ থেকেই আশা করা: নবীদেরর দাওয়াতের বুনিয়াদি নীতি হচ্ছে, তারা নিজেদের দাওয়াতি কাজের জন্য কারো কাছ থেকে কোনো বিনিময় চাইতেন না। আল কোরআনে নবীদেরর দাওয়াত প্রসঙ্গে এই কথা এসেছে, ‘আর আমি তোমাদের থেকে (দ্বীনের তাবলিগের বিনিময়ে) কোনো ধরনের পারিশ্রমিক চাই না। পারিশ্রমিক তো মহান আল্লাহ তায়ালার কাছেই।’ এই নীতি কয়েকজন নবীর ছিলো এমন নয় বরং সকল নবীগণই এই নীতির ওপর আমল করেছেন। এই জন্য তারা দাওয়াতের বিনিময়ে কারো কাছ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনও আশা করতেন না। তাদের এই নীতির দু’টি ফল ছিলো। প্রথম হচ্ছে, মানুষের কাছ থেকে কোনো কিছু পাওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষি হয়ে আল্লাহর দিকে মনোযোগ দেয়া। দ্বিতীয় ফল ছিলো, ব্যক্তিগত জীবন সম্পূর্ণ পাক পবিত্র হওয়া। 

সূরা ইয়াসিনে কয়েকজন দ্বীনের দাওয়াতে রত ব্যক্তির আলোচনা এসেছে। সেখানে শহরের অদূরবর্তী এলাকা থেকে এসে এক লোক দাওয়াত দিচ্ছিলো এই বলে যে, ‘তোমরা প্রেরীতদের অনুস্বরণ কর। তোমরা অনুস্বরণ কর এমন লোকদের যারা দাওয়াতের বিনিময়ে তোমাদের থেকে কোনো কিছু প্রত্যাশা করে না এবং নিজেরাও হেদায়াত প্রাপ্ত। (সূরা: ইয়াসিন, আয়াত: ২০)। এই আয়াত থেকেও বুঝা যায়, যারা দ্বীনের দাওয়াত দেবে তাদের ভেতর ইখলাসপূর্ণ ও পবিত্র থাকা এবং মাখলুক থেকে কোনো কিছু প্রত্যাশা না করা।

(দুই) কোনো মানুষের প্রতিই বিদ্বেষ পোষণ নয় বরং দয়া ও কল্যাণকামিতা থেকে দাওয়াত দেয়া: নবীদেরর দাওয়াতের দ্বিতীয় উপাদান ছিলো মানুষের প্রতি দয়া, সমবেদনা ও কল্যাণকামিতা থেকে দ্বীনের পথে ডাকা, দাওয়াত দেয়া। মানুষের সূচনীয় অবস্থা দেখে নবীদের মন সর্বদা অস্থির থাকতো। তারা কল্যাণকামী হিসেবেই চাইতেন মানুষের এই সূচনীয় অবস্থার পরিবর্তন দরকার। পিতামাতা, সন্তানকে কোনো কিছুর নির্দেশনা দিলে যেমন তারা সন্তানের কল্যাণকামিতা থেকেই দিয়ে থাকেন, তেমনি নবীরাও উম্মতকে দাওয়াত দিতেন তাদের কল্যাণকামিতা থেকেই। তাদের মাঝে কোনো লৌকিকতা বা বিদ্বেষ কাজ করতো না। 

হজরত হুদ (আ.) নিজের উম্মতকে বলেছিলেন, ‘হে আমার জাতি! আমি নির্বোধ নই। আমি কেবল মহান সৃষ্টিকর্তার পক্ষ্য থেকে প্রেরীত একজন রাসূল। আমি তোমাদের নিকট আমার রবের বার্তা সমূহ পৌঁছে দিচ্ছি। আমি তোমাদের কল্যাণকামী এবং যা পৌঁছে দিচ্ছি সে ব্যাপারে বিশ্বস্ত।’ অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার জাতি আমি তোমাদের কাছে আমার রবের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি। তোমাদের কল্যাণ কামণা করছি। কিন্তু তোমরা কল্যাণকামীদেরতে পছন্দ কর না।’ হজরত নূহ (আ.)-ও স্বজাতিকে উদ্দেশ করে একই কথা বলেছিলেন। 
মানুষের নৈতিক ও দ্বীনি অবনতি দেখে নবীরা অস্থিরতায় ভুগতেন। তাদের দিলে একটাই ফিকির ছিলো, কীভাবে তাদেরকে পরিবর্তন করা যায়। সে বিবরণও কোরআনে এসেছে। ‘আর আপনি কি নিজের জীবন শেষ করে দেবেন এ জন্য যে, তারা ইমান আনছে না।’ সূরা কাহাফে এসেছে, ‘আপনি মনে হয় নিজের জীবন তাদের পেছনে শেষ করে দেবেন, এ কারণে যে তারা ঈমান আনে না।’ এ রকমই ছিলো উম্মতের অবনতির ওপর নবীদের চেষ্টা।

(তিন) প্রজ্ঞা, হেকমত, নম্রতা ও কৌশলের সঙ্গে দাওয়াত উপস্থাপন করা: নবীগণের দাওয়াতে তৃতীয় মূলনীতি হচ্ছে, তারা সহজভাবে, হেকমতের সঙ্গে প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষায় উম্মতের সামনে দাওয়াত উপস্থাপন করতেন। কথা বলার ভঙ্গিতেই বুঝা যেতো, তাদের মাঝে উম্মতের প্রতি দরদ, দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত কতো বেশি আছে। যখন দরদ, মহব্বত ও ইখলাসের সঙ্গে কথা বলতো, সাধারণ কথাও উম্মতের মনে গেঁথে যেতো। ফেরাউন সে নিজে খোদা হওয়ার দাবি করেছিলো। তারপরও যখন হজরত মূসা (আ.)-কে তার কাছে দাওয়াত দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা পাঠালেন, নির্দেশ দিলেন ‘তোমরা তার সাথে নম্রতার সঙ্গে কথা বলবে।’ 

মুনাফিকরাই ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। তারা সদা সচেষ্ট থেকেছে কীভাবে ইসলামের দাওয়াতকে ব্যর্থ করে দেয়া যায়। তারপরও আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে দাওয়াতের বেলায় নির্দেশ জারি করেছেন ‘আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং তাদের কল্যাণ কামণা করেন আর তাদের ব্যাপারে এমন কথাই বলেন, যা তাদের মনের ভেতর রেখাপাত করে।’

ফেরাউনের মতো কাফের এবং মুনাফিকদের মতো ইসলাম বিদ্বেষীদেরকে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে যদি নম্র ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ থাকে তাহলে মুসলমান কিন্তু দ্বীন থেকে দূরে তাদেরকে দ্বীনের দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে কেমন নরম ভাষা ব্যবহার করা দরকার? আল্লাহ তায়ালা এই বিষযটিই অন্য একটি আয়াতে বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপিন রবের পথে দাওয়াত দেন প্রজ্ঞা ও ভালো ভালো নসিহতের দ্বারা। (কোন কারণে যদি বিতর্ক করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েই যায়) তাহলে তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করুন।’ যেন তোমাদের বিতর্ক তাদেরকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। বরং উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্কের মাকসাদ হবে এটা যেন তাদের হেদায়েতের ওসিলা হয়। 

রাসূল (সা.) দু’জন সাহাবিকে দাওয়াতের জন্য পাঠানোর সময় তাদেরকে উপদেশ করলেন, ‘তোমরা লোকদের জন্য সহজ পন্থা অবলম্বণ করবে; কঠিন করবে না। সুসংবাদ শুনাবে; হতাশ হয়ে দূরে চলে যায় এমন কথা শুনাবে না।’ রাসূল (সা.) এর এই হাদিসটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু দাওয়াতের অনেক মৌলিক বিষয় এখানে বাতলে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে, যে কারো সামনে দাওয়াত দেয়ার সময়  সহজতরভাবে দ্বীনের বিষয়কে পেশ করা। শুরুতেই কঠোরতা শুরু না করা। দ্বীন পালনের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হয় এমন ওয়াজ নসিহত করা। এর দ্বারা দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে শীতিলতা করা উদ্দেশ নয়। বরং উপস্থাপন যেন সহজভাবে হয় এবং দ্বীনের কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; যেগুলোর দ্বারা ফেতনা সৃষ্টি হয় সেগুলোতে ছাড় দেয়া উদ্দেশ্য।

(চার) তৃতীয় মূলনীতি থেকেই এই মূলনীতিটা বের হয় যে, দ্বীনের দাওয়াত পেশ করার ক্ষেত্রে প্রথমে অধিক গুরুত্বপূর্ণটা পেশ করা। তারপর ধারাবাহিকভাবে তুলনামূলন কম গুরুত্বপূণটা। রাসূল (সা.) তাবলিগ শুরু করেছিলেন, তাওহীদ বা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ ও নবুওয়াতের ওপর ইমানের দাওয়াত দ্বারা। কুরইশরা রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করতো, তুমি আমাদের থেকে কী চাও? রাসূল (সা.) বলতেন, শুধু একটি কালিমাকে যদি তোমরা মেনে নাও তাহলে আরব ও অনারব সকলে তোমাদের গোলামে পরিণত হবে। কালিমার সারমর্ম হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ ও রাসূলের নবুওয়াত। রাসুল (সা.) এর দাওয়াত দু’বিষয়ে হলেও মূলত এই দু’টির মাঝে সমস্ত ইসলামকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

(পাঁচ) রাসূল (সা.) এর সিরাত থেকে দাওয়াতের মূলনীতি হিসেবে এই বিষয়টিও স্পষ্ট হয় যে, রাসূল (সা.) এই অপেক্ষায় থাকতেন না যে, মানুষেরা তার দরবারে এসে দ্বীনের কথা শুনবে। বরং রাসূল (সা.) নিজেই মানুষের কাছে গিয়ে দাওয়াত দিতেন। মক্কা থেকে তিনি তায়েফ গেলেন এবং সেখানেও লোকদের ঘরে ঘরে গিয়ে দাওয়াত দিলেন। হজের সময় আরবের বিভিন্ন গোত্র থেকে হজ করতে লোকেরা আসতো। রাসূল (সা.) তাদের সঙ্গে গিয়ে সাক্ষাত করতেন এবং দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। লোকদের কাছে যাওয়ার সময় তিনি এই চিন্তা করতেন না যে, তারা আমার দাওয়াত কবুল করবে না বরং আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করতে পারে। এভাবে দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়েই এক সময় রাসূল (সা.) মদিনার একটি দলের সঙ্গে সাক্ষাত করলেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তাদের দ্বারা মদিনায় ইসলামের হাওয়া চালু হয়ে গেলো অবশেষে মদিনা ইসলামের ঘাটি হিসেবে পরিচিত হলো। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর রাসূল (সা.) বিভিন্ন দেশে দাওয়াতের লোক পাঠিয়েছিলেন।

(ছয়) পূর্বের মূলনীতির সঙ্গেই এর সংশ্লিষ্টতা। এই নীতির মূলকথা হচ্ছে, দ্বীনের দাওয়াতের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া। দ্বীনের তাবলিগ ও তালিমের জন্য এমন স্থানে যাওয়া, যেখানে গেলে এই মাকসাদ হাসিল হবে।

(সাত) রাসূল (সা.) এর যমানায় মসজিদে নববীর সঙ্গে আসহাবে সুফফাদের জন্য ব্যবস্থা ছিলো। দিনের বেলায় তারা বিভিন্ন জরুরতে বের হয়ে যেতো এবং রাতে তারা ফিরে এসে রাসূল (সা.) এর কাছ থেকে তালিম তরবিয়ত গ্রহণ করতো। দ্বীনের বিভিন্ন প্রয়োজনে দরবারে নববীর পক্ষ থেকে তাদেরকে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। তাছাড়া তাদের এভাবে থাকার উদ্দেশ্য ছিলো রাসূল (সা.) এর দরবার থেকে বরকত হাসিল করা। এর দ্বারা বুঝানো উদ্দেশ্য, দ্বীনের মধ্যে স্বতন্ত্রভাবে একটা দল থাকা দরকার, যারা অবসর সময়ে নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতিতে ব্যস্ত থাকবে এবং প্রয়োজনে দ্বীনের বিভিন্ন কাজে তাদের পাঠানো যাবে।

পূর্বে নবীদের দাওয়াতের যে সব মূলনীতিগুলো আলোচনা হলো, বর্তমানে ইলিয়াস (রাহ.) প্রতিষ্ঠিত দাওয়াত ও তাবলিগের পদ্ধতিতে সবগুলো পাওয়া যায়। এখানে দাওয়াতের বিনিময় চাওয়া হয় না। উম্মতের প্রতি দরদ ও মহব্বতের সঙ্গেই এখানে দাওয়াত দেয়া হয়। দাওয়াতের ভাষা হবে নম্র। দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলোর দাওয়াত দেয়া হয়। দাওয়াতের জন্য বসে না থেকে, বিভিন্ন এলাকায় সফর করে দাওয়াত দেয়া হয়। বাকিগুলোও এখানে বিদ্যমান। দ্বীনের দাওয়াতের জন্য বের হওয়া, একটা জামাত সর্বদা প্রস্তুত থাকার নববী পদ্ধতিও এখানে মজুদ।

অনুবাদ : শহীদুল ইসলাম

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে