Alexa নবাবদের বিরিয়ানি যেভাবে সাধারণের পাতে

ঢাকাই খাবার-১

নবাবদের বিরিয়ানি যেভাবে সাধারণের পাতে

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১১:৩৬ ৯ জুন ২০১৯   আপডেট: ১২:০৮ ৯ জুন ২০১৯

হাজী বিরিয়ানি

হাজী বিরিয়ানি

বিরিয়ানি, ব্যস এটুকুতেই যথেষ্ট! আলাদা করে অন্য কোনো উপমার প্রয়োজন নেই। প্রায় ৮০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই খাবারের আবেদন যে এখনো অটুট আছে, তা এর জনপ্রিয়তা দেখলেই বোঝা যায়। আপনি যদি অন্যান্যদের মতো জিভে জল আনা বিরিয়ানির একজন ভক্ত হয়ে থাকেন তাহলে এই গল্পটি আপনার জন্যই।

ঢাকা শহরের (বিশেষ করে পুরান ঢাকা) অলি-গলি কিংবা রাস্তায় হাঁটলেই মশলাদার বিরিয়ানির ঘ্রাণ নাকে আসবেই। শহরে এতটাই জনপ্রিয়, মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে জিভে জল আনা বিরিয়ানির দোকান। আর দাম? এখন ৩৫ টাকায়ও বিরিয়ানি মেলে। তবে একটু আয়েশিভাবে খেতে গেলে তিনশ’ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়। বিরিয়ানির প্লেট হাতে আপনার মনে হতে প্রশ্ন জাগতে পারে, ঢাকায় বিরিয়ানি এল কীভাবে? কিংবা নবাবদের খাবার টেবিল থেকে সাধারণের পাতে কীভাবে আসলো এই বিরিয়ানি?

চলুন ফিরে যাই মোগল আমলে! মুঘলদের হাত ধরে যেসব মোগলাই খাবার ঢাকা শহরে এসেছে, তার মাঝে বিরিয়ানিই যে সেরা তা কিন্তু বলাই যায়। সপ্তদশ শতাব্দিতে মোগল শাসকরা ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী ঘোষণা করার পর এখানে সুবেদার ও তাদের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। আবার অনেকেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন বুড়িগঙ্গার তীরে। তারা তাদের খাবার রান্নার জন্য লখনৌ থেকে সঙ্গে নিয়ে আসেন প্রায় অর্ধশত বাবুর্চি। মূলত এরাই বাংলা মুল্লুকে বিরিয়ানির প্রচলন ঘটান। তাদের কারণেই বাংলার অলি-গলিতে শত শত বিরিয়ানির দোকান।

তেহারি

পরবর্তীতে প্রশাসনিক স্থল বদলের ফলে ঢাকা ছেড়ে সুবেদাররা চলেও যান। কিন্তু ফেরেননি কয়েকজন বাবুর্চি ও তাদের সহযোগী। তারা ঢাকায় বিরিয়ানির দোকান খুলে মোগল খাবারের ধারা অব্যাহত রাখেন। একটা সময়ে এতে ঢাকার স্থানীয় রন্ধনপ্রণালি ঢুকে একটা নিজস্ব আদল লাভ করে। এবং স্বাদের গুণে কালক্রমে নবাবদের খাবার টেবিল থেকে বিরিয়ানি সাধারণ মানুষের অন্দরে স্থান করে নেয়।

ঢাকায় বিরিয়ানির কথা বললেই যে নামটি সবার আগে আসে তা হলো ‘হাজীর বিরিয়ানি’। ১৯৩৯  সালে হাজী গোলাম হোসেন সাহেবের হাত ধরেই শুরু হয় এ বিরিয়ানির পথচলা, যার কদর এখনো আছে। তবে অন্যান্য বিরিয়ানির ভিড়ে খানিকটা কমেছে! হাজির বিরিয়ানির বিশেষত্ব হলো তেল বা ঘি নয়, সম্পূর্ণটাই সরিষার তেলে রান্না হয়। এতে দেয়া হয় খাসির মাংস। আর এই খাসি অযু করার পর জবাই করা হয়।

ধীরে ধীরে ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি, চানখারপুলের হাজী নান্নার বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনুর বিরিয়ানি, হানিফের বিরিয়ানি ও শমসের আলীর ভূনা খিচুড়ি হয়ে উঠেছে সেই শিল্পেরই অংশ। এরমধ্যে ঝুনুর বিরিয়ানির জন্ম ১৯৭০ সালে নুর মোহাম্মদের হাত ধরে। ওই বছর থেকে নারিন্দায় স্বল্প পরিসরে তিনি মোরগ পোলাও বিক্রি করতে শুরু করেন। তার মেয়ে ঝুনুর নামেই তিনি দোকানের নাম রাখেন। ১৯৮৮ সালে নূর মোহাম্মদ মারা গেলে তার ভাই এটির দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তার ভাইয়ের ছেলে দোকানটি পরিচালনা করছে।

ঢাকার মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে বিরিয়ানির দোকান

অনেকের কাছে বেচারাম দেউরীর ‘নান্না বিরিয়ানি’ এর মোরগ-পোলাও অমৃত মনে হয়। ১৯৬২ সালের দিকে পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে বাবুর্চি নান্না মিয়া বিরিয়ানির দোকান দিয়ে আলোচনায় আসেন। এখানে খাসির কাচ্চির পাশাপাশি মোরগ-পোলাও, খাসির বিরিয়ানি, খাসির রেজালা, ফিন্নি টিকিয়া ও বোরহানি পাওয়া যায়। তবে নান্না মূলত দেশ বিখ্যাত তাদের মোরগ-পোলাও এর জন্যই। বিরিয়ানি প্রেমীদের পছন্দের তালিকায় থাকা ‘হানিফ বিরিয়ানি’র যাত্রা শুরু ১৯৭৫ সালে। পুরান ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা হাজী মোহাম্মদ হানিফ এর প্রতিষ্ঠাতা। ২০০৫ সালে হাজী হানিফের মৃত্যুর পর তার ছেলে হাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম রনি ব্যবসার হাল ধরেন। 

এখন কেবল নতুন ও পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকাই বিরিয়ানির জৌলুস এখন ছড়িয়েছে সুদূর প্রবাসেও। সম্প্রতি জনপ্রিয় ইউটিউবার ও ফুড ভিডিও ব্লগার ট্রেভর জেমস বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি পুরান ঢাকার হাজির বিরিয়ানি এবং নান্না বিরিয়ানি খেয়ে এর সুস্বাদের প্রশংসা করেছেন।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিরিয়ানি এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে, আনন্দ-বেদনায়, উৎসবে-পার্বণে এবং অনেক জাতীয় অর্জন ও শঙ্কটের নীরব সাক্ষী এক প্লেট বিরিয়নি। তাই নিছক পেট ভরানো কিংবা মুখোরোচকতার সীমা পেরিয়ে বিরিয়ানি যেন মিশে গেছে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের সঙ্গে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে