নজরকাড়া দেশের বৃহত্তম বাঁশের সেতু

নজরকাড়া দেশের বৃহত্তম বাঁশের সেতু

বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৫৭ ৭ জুলাই ২০২০  

এক হাজার ৩৩ ফুটের বাঁশের সেতু

এক হাজার ৩৩ ফুটের বাঁশের সেতু

রানিপুরা গ্রাম। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সদর ইউপির এ গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যমুনার শাখা নদী। শুকনো মৌসুমে এ নদী দিয়ে হেঁটেই পার হওয়া যায়। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায় দুই পাড়ে। এছাড়া বর্ষা এলে দুর্ভোগের সীমা থাকে না। আর এ দুর্দশা লাঘবে একটি বাঁশের সেতু তৈরি করে গ্রামবাসী। যার দৈর্ঘ্য এক হাজার ৩৩ ফুট। সেতুটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘতম বলে দাবি স্থানীয়দের।

বর্ষা এলেই এ উপজেলার রানিপুরা, মনতলারচর, চর আগুরিয়া, মুলকান্দি, বেলির চরসহ অন্তত ১০টি গ্রাম ডুবে যায়। যমুনা নদী ঘেঁষা এসব গ্রামের অধিকাংশ জায়গা পানতি ডুবে গেলে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক জীবন-যাত্রা। এছাড়া বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানিবন্দী মানুষদের তখন যোগাযোগের একমাত্র ভরসা কলাগাছের ভেলা আর গুটিকয়েক নৌকা।

এ সময় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। কেউ গামছা পরে আবার কেউ মাথায় বইপুস্তক নিয়ে গলা পানিতে হেঁটে হেঁটে, কোথাও কোথাও সাঁতরে স্কুল-কলেজে যেতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের ভোগান্তি তো আছেই। এ দৃশ্য ভাবিয়ে তোলে করোনার কারণে বাড়িতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আনিসুর রহমানকে। তার এ ভাবনাকে সমর্থন জানিয়ে এগিয়ে আসে গ্রামের উদ্যমী যুবক নূর আলম শেখ, বাবুরাজ, শহিদুল ইসলাম, আব্দুল লতিফ ও আব্দুল শেখ। তাদের এ উদ্যোগের সঙ্গে একমত পোষণ করে পুরো গ্রামবাসী।

গ্রামবাসীর মতামত নিয়ে চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতেই কাজ শুরু করা হয়। ছিন্নমূল আর অভাবি চরাঞ্চলের এ গ্রামগুলো থেকে বেছে বেছে সচ্ছল পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা হয়। ৭০টি পরিবারের কাছ থেকে নেয়া হয় ৩০০ টাকা করে চাঁদা। স্থানীয় এক ইউপি সদস্য দুই হাজার টাকা দেন। বাকি টাকা আর দীর্ঘ পরিশ্রম করেছেন উদ্যমী ছয় যুবক আর গ্রামবাসী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আনিসুর রহমান বলেন, অভাব আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছি। চরাঞ্চলের শ্রমজীবী অভাবি মানুষ আর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগের কথা চিন্তা করেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়। গ্রামবাসী সহায়তা না করলে দীর্ঘ এ সেতুটি নির্মাণ করা সম্ভব হতো না।

তিনি বলেন, সেতুটি নির্মাণ করতে বাঁশসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় সোয়া তিন লাখ টাকা। গ্রামের পাঁচ যুবক আর গ্রামবাসী দিয়েছেন স্বেচ্ছাশ্রম। তারই ফসল এ দীর্ঘ সেতু।

গ্রামের নূর আলম শেখ বলেন, এক সময় এ অঞ্চলে প্রবাহিত যমুনা নদী ছিল প্রমত্তা। ১৯৮৮ সালের পর যমুনা নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় জেগে ওঠে দীর্ঘ চর। তবে মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত যমুনার শাখা নদী এখনো বয়ে চলেছে। বর্ষা মৌসুমের চার মাস এ অঞ্চল পানিতে ডুবে থাকায় অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। গ্রামবাসীদের দুর্দশা লাঘবে এ প্রচেষ্টা।

আব্দুল লতিফ জানান, সেতুটি নির্মাণের ফলে এ অঞ্চলের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ সুবিধা পাচ্ছে। যদিও চরাঞ্চলের এসব গ্রামের অনেক বাড়িতেই পানি ঢুকেছে। তবু এ সেতু দিয়ে চলাচলের কারণে এখন আর তাদের বুক পানি সাঁতরে পাকা সড়কে উঠতে হচ্ছে না।

গ্রামের গুটিকয়েক মানুষের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বেলকুচির ইউএনও (ভারপ্রাপ্ত) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রানিপুরা গ্রামবাসীর এ উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটা মডেল হতে পারে। এটিই সত্যিই প্রশংসনীয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর