Alexa নগর সৌন্দর্য্যে ছাদবাগান

নি য় মি ত ক লা ম

নগর সৌন্দর্য্যে ছাদবাগান

প্রকাশিত: ১৫:৩২ ১১ জুলাই ২০১৯  

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

ক্রমেই রাজধানী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ। কারণ আমাদের দেশে যে কোনো উন্নয়নের নামে প্রথম আঘাতটা হানা হচ্ছে সবুজের ওপর। আর সব চুকেবুকে গেলে সেই সবুজকে ফেরানো হচ্ছে না। লাগানো হচ্ছে না পর্যাপ্ত গাছ। 

এছাড়া কোনো কারণ ছাড়াই গাছ কাটার সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ফলে ঢাকা পরিণত হচ্ছে ইট-কাঠ-পাথরের রাজধানী নগরীতে। সবুজ বিনষ্টের মতো আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড আসলে নগরবাসীর জন্য নানা দিক থেকেই আতঙ্কের আর আশঙ্কার কারণ হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিটি মানুষের জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট অথচ জনসংখ্যায় ভরপুর এই শহরে কতটা সবুজ রয়েছে তা আমাদের চারপাশে চোখ বোলালেই বেশ আন্দাজ করা যাবে। যা কিছু সামান্য সবুজ রয়েছে তাও নানা কারণে দিন দিন কমছে। নগরায়ণের ব্যাপক প্রসারে তাই ক্রমেই বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য। দু:খের বিষয় আমাদের কারণে আমাদের পারিপার্শ্বিক সব কিছুতেই আসছে পরিবর্তন। আমরা নিদারুণ ভাবে গাছপালা কেটে উজাড় করে অট্টালিকা তৈরি করছি। অথচ দিনদিন জনসংখ্যা বাড়লেও সবুজের সংখ্যা বাড়ছে না। বরং কমছে। এতে ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে আমাদের প্রিয় শহর। কারণ প্রতিদিন যে পরিমাণ বৃক্ষ রোপন করা উচিত তা কেউ করছে না। বরং বৃক্ষ নিধনে প্রতিনিয়ত ব্যতিব্যস্ত আমরা। এটাই সবুজ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। 

এমন একটা সময় ছিল যখন সবাই নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় গাছ লাগাতো, মনের মতো বাগান করতো। ফুলে ফলে ভরে উঠতে বাড়ির চারপাশ। কিন্তু সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। কর্পোরেট এই যুগে রাজধানীবাসী নিজের শখের বাগান করার জন্য সামান্য পরিমাণ নিদিষ্ট জায়গা না রেখে গড়ে তুলছেন মহাআট্টালিকা। সেই অট্টালিকায় আলো-বাতাসহীন অ্যাপার্টমেন্টে মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে। অথচ সবার মনের মধ্যে বাস করছে অরণ্য আর সবুজ। কিন্তু সবুজের আর দেখা মেলে না। কারণ, বাড়ির চারপাশে একটি বৃক্ষ লাগানোর জায়গাও অবশিষ্ট রাখা হয় না। তাই বাগান করার জায়গাও মেলে না। মনের মধ্যে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও। এখানে অর্থনৈতিক চিন্তাটাই বেশি কাজ করে। সবুজের চিন্তা তখন মাথায় থাকে না।

তবে আমাদের চারপাশে আশা জাগাচ্ছে কিছু সবুজপ্রিয় মানুষ। অরণ্যের উদাত্ত আহ্বানে কান পেতে তারা অন্তত এক চিলতে সুবজ নগরকে উপহার দিতে পারছে। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ সে নয়। তাতে কি। সবুজ তো বটে। আর এই ইচ্ছে পূরণের নিমিত্তে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে নিজের বাড়ির ছাদ। তৈরি করছে ছাদবাগান। যেখানে নিজেরা তৈরি করছেন বাগান। বাসার ছাদে, বারান্দার গ্রিলে, জানালার গ্রিলে টব বেঁধে ফুল, ফল, শাক-সবজির স্থান করে দিচ্ছে। এতে যেমন একদিকে সবুজায়ন হচ্ছে আবার অন্যদিকে প্রকৃতি কিছুটা হলেও পাচ্ছে তার আসল রূপ। পাশাপাশি বাড়ির ছাদের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন পরিস্থিতি এমন যে কোনো বাসার ছাদে যদি একটু বাগান থাকে, তাহলে সেই বাড়ির প্রতি সবার নজর থাকে আলাদাভাবে। সেই বাড়ির দিকে দৃষ্টি দিলে যেন চোখ জুড়িয়ে যায়।

একটি পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা শহরে কমপক্ষে প্রায় পাঁচ লাখ বিল্ডিংয়ের ছাদ রয়েছে। জমির পরিমাণ হিসেবে যা হয় প্রায় কয়েক হাজার হেক্টরের মতো। এখন এই পরিমাণ জায়গাকে কিন্তু ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। যদি আমরা একটু কল্পনা করি, ঢাকা শহরের প্রতিটি বাড়ির ছাদে ছোট বড় বাগানের কথা তখন উপর থেকে শুধুই সবুজের সমারোহ দৃষ্টি কাড়বে। সব বাড়ির ছাদে হয়তো বাগান করা সম্ভব হবে না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ যদি এ পথে হাঁটেন তবে তা হবে একথায় দুর্দান্ত। তবে ইতিবাচক দিক হলো সাম্প্রতিক সময়ে ছাদবাগানের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।

আগ্রহ বাড়ার অনেকগুলো কারণে মধ্যে অন্যতম কারণ হলো শখ। তবে শখের পাশাপাশি এখন ছাদবাগান মানুষকে বাণিজ্যিকভাবেও লাভবান করছে। কোনো সন্দেহ নেই পরিকল্পিতভাবে ছাদবাগান শহরের শোভাবর্ধন, পরিবেশ ঠিক রাখার পাশাপাশি বিশুদ্ধ ফল ও সবজির যোগান নিশ্চিত করবে। আর পুরোটা না হলেও অনেকাংশে সম্ভব নিজ পরিবারের সবজি ও ফলমূলের চাহিদা পূরণে। এছাড়া যাদের ছাদ আকারে বড় তারা বৃহৎ পরিসরে ছাদ বাগান করে উৎপাদন বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হতে পারেন। এক্ষেত্রে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি এবং কৃষিপদ্ধতির সাহায্য নেয়া যেতে পারে। 

ছাদবাগানে আম, পেয়ারা, আপেল কুল, জাম্বুরা, করমচা, ডালিম, আঙ্গুর, বেদানা, লেবুসহ নানা প্রজাতির ফল ও ওষুধি গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এসব বৃক্ষের জন্য তেমন বৃহৎ জায়গার প্রয়োজন হয় না। অল্প জায়গায় এসব বৃক্ষ রোপন করা সম্ভব। তাই বেছে নেয়া যায় বাড়ির ছাদ। শুধু তাই নয়, নিজের ছাদে এসব ফল-মূল এবং সবজি উৎপাদন করতে পারলে রাসায়নিকমুক্ত সুস্বাদু ফল-মূল ও সবজি মিলবে সহজে। আর এই উদ্যোগ কেবল ঢাকার জন্য নয়, বরং যে কোনো শহর আর গ্রামে যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানেই তা করা যাবে। আনন্দের খবর ঢাকার বাইরেও অনেকে নিজের বাড়িতে ছাদবাগানের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। ছাদবাগানের কারণে সবুজের পাশাপাশি ফল-মূল পেয়ে যেমন বাড়ির মালিক লাভবান হবেন তেমনি উপকার আছে আরো একটি বিষয়ে। যে বাড়ির ছাদে ছাদবাগান করা হবে সেই বাড়িতে গরমের সময়ে বিল্ডিংয়ে অনেকটা গরম কম লাগবে। কারণ ছাদবাগানের জন্য ছাদে রোদের তাপ সেভাবে লাগবে না। রোদের তাপ সরাসরি গিয়ে লাগবে গাছের উপর। পাশাপাশি মাটি থাকায় ছাদও থাকবে ঠান্ডা। তবে এর জন্য যথাযথ নিয়ম মেনে ছাদবাগান করতে হবে। 

একটু উদ্যোগ, সবুজের প্রতি অনুরাগ এই ছাদবাগান করায় অনুঘটক হবে। কেবল নিজে নয়, বাড়ির প্রতিটি সদস্যকে আগ্রহী করা তোলা গেলে তা হবে অসাধারণ উদ্যোগ। কারণ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী তো প্রয়োজন। তাই তাদের আগ্রহ এক্ষেত্রে অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখবে ভবিষ্যতের জন্য। সবুজ ঢাকা গড়ে তোলার জন্য তো বটেই যে কোনো শহরকে সবুজ শহরে বদলে দিতে ছাদবাগান হোক সময়োপযোগী উদ্যোগ। পাশাপাশি পৃথিবীর অনেকের জন্য আমরা হতে পারি এক্ষেত্রে উদাহরণ। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর