Alexa ধুলা-দূষণের ‘রাজ্য’ গাজীপুর

ধুলা-দূষণের ‘রাজ্য’ গাজীপুর

শামসুল হক ভূঁইয়া, গাজীপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৩৭ ৮ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

রাজধানী ঢাকার ধুলা আর দূষণ অপ্রতিরোধ্য। তবে ধুলা ও দূষণের পরিমাণে রাজধানীকে ছাড়িয়ে গেছে গাজীপুর। তবুও থেমে নেই ধুলা ও ইটভাটার ধোঁয়ার পরিমাণ। তাই গাজীপুর নগরী এখন ধুলা ও দূষণের ‘রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। ফলে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। অনেকে নিচ্ছেন ছুটি। এছাড়া পথচারী ও স্থানীয়রা রয়েছেন ভোগান্তিতে। অন্যদিকে বিআরটি প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কথা না রাখার অভিযোগ রয়েছে। 

গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী থেকে চান্দনা-চৌরাস্তা ও চৌরাস্তা থেকে কোনাবাড়ি সড়কে প্রতিনিয়ত ধুলা উড়তে দেখা গেছে। অতিরিক্ত ধুলাবালি বাতাসে যোগ হয়ে মাঝেমধ্যে ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। এতে পথচারীদের অনেকেই হাঁচি-কাশিসহ ব্রঙ্কাইটিসের মতো নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মহানগরীর ধুলা আর ধোঁয়ার ঘনত্ব বাড়ছেই। ধুলোমাখা রাজপথে হাঁটার পরিবেশ নেই। শ্বাস-প্রশ্বাসে বিশুদ্ধ বাতাস নেয়ার সুযোগ নেই।  এমন পরিস্থিতে জেলায় চলছে ২৯০ টি ইটভাটা। এর মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী নগরীতে ইটভাটা থাকার কথা নয়, তবুও ইটভাটা রয়েছে। পাশাপাশি কল-কারখানা থেকে অবিরত কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। এখন গাজীপুরের বাতাস যেন বিষ আর বিষ। দূষণ এখন চরমে। বায়ুদূষণের মাত্রা এখন রাজধানীকে ছাড়িয়ে গেছে।

বাইমাইরলের বাসিন্দা মো. রাজীব সরকার জানান, গাজীপুর মহানগরীর কড্ডা, বাইমাইল, ইসলামপুর, বাসনসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কয়েকশ ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার অধিকাংশ মালিকরা নিয়মের তোয়াক্কা করছে না। ইচ্ছেমতো গাছ পোড়াচ্ছে, নির্দিষ্ট উচ্চতার চিমনি ব্যবহার করছে না। কিংবা নির্দিষ্ট উচ্চতার চিমনি ব্যবহার করলেও চিমনিতে কোনো ছাঁকনি ব্যবহার করা হচ্ছে না। এতে ইটভাটার কালো ধোঁয়া, কালো ছাই গিয়ে ইটভাটার আশপাশের এলাকা ছাড়াও কয়েক মাইল দূরে থাকা ঘরবাড়ি ও পাছপালার ওপর গিয়ে পড়ছে। এতে কেবল বায়ু নয়, পানি দূষণ হচ্ছে। তখন মনে হয় ধুলা ও দূষণের রাজ্যে বাস করছি। এমন পরিস্থিতিতে সহজেই নাগরিকদের মাঝে ব্রঙ্কাইটিসসহ ক্যান্সারের মত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া গাছপালায় ফল ও শস্যক্ষেতে ফলন কমে যাচ্ছে। 

গাজীপুর-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী এনা পরিবহনের চালক মো. আবুল হোসেন জানান, গাজীপুরের মতো এতো বায়ু দূষণ অন্য স্থানে দেখা যায় না। বিশেষ করে চান্দনা-চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত বাতাসে ধুলার পরিমাণ বেশি। ভোর-রাতে ধুলা ও কুয়াশা মিলে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। এতে সড়কের সামন পরিষ্কারভাবে দেখা যায় না। এ সময় বেশি বেগে ও অসাবধানতাবশত গাড়ি চালালে দুর্ঘটনায় পড়তে হবে। 

গাজীপুর মহানগরীর উত্তর ট্রাফিক পুলিশের সহকারী কমিশনার মাজহারুল ইসলাম জানান, মহানগরীর টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলছে। ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রচণ্ড ধুলা সৃষ্টি হচ্ছে। মহাসড়কের পাশে নির্মাণ কাজের জন্য মালামাল আনা-নেয়ার সময়, সড়কের পাশে আলগা পাথর রাখায় বেশি ধুলা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অবিরত ধুলা উড়তে দেখা গেছে। এর মধ্যে অনেক ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। অনেকে ফুসফুসের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন। এজন্য কয়েক দিন পরপর তাদের অনেকে ছুটিতে যেতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এসব ধুলা ও কুয়াশা একাকার হলে চালকরা সংকেত দেখতে পান না। এতে তাদের গাড়ি চালাতে সমস্যা হচ্ছে। মাঝে-মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে। 

তিনি আরো জানান, বিআরটি প্রকল্পের পক্ষ থেকে মহাসড়কের প্রতিদিন দুইবার পানি ছিটানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পানি দেয়া হয় না। মাঝেমধ্যে দুইবার পানি ছিটালেও বেশিরভাগ সময়ই একবার পানি দেয়া হয়। এতে কিছুক্ষণের মধ্যে পানি শুকিয়ে আবার ধুলা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া বিআরটি কর্তৃপক্ষকে সকালে পানি দিতে দিতে বলা হয়। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার সময় মানুষ অফিস বা গন্তব্যে ছুটতে থাকে। তখন সড়কে পানি ছিটালে তারা ভোগান্তিতে পড়েন। সচেতন পথচারীরা মহাসড়কের এ অংশ অতিক্রমের সময় নাকে-মুখে মাস্ক পড়েন। শুধু ধুলাবালি নয়, গাজীপুরের বিভিন্ন ইটভাটার ধোঁয়াও প্রতিনিয়ত গাজীপুরের বায়ুকে দূষিত করছে। 

গাজীপুর মহানগরীর দক্ষিণ ট্রাফিক পুলিশের সহকারী কমিশনার থোয়াই অং প্রু মারমা জানান, গাড়ি চলাচলের সময় দিন-রাত ধুলা উড়তে থাকে। এরইমধ্যে স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করছে ট্রাফিক পুলিশ। কিন্তু ধুলার আক্রমণে ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক মো. শাহাদত হোসেন ও সার্জন মো. হোসেনুজ্জামানসহ অনেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। 

গাজীপুর পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুস সালাম সরকার জানান, ইটভাটার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। 
গাজীপুর সিভিল সার্জন মো. খায়রুজ্জামান জানান, অতিরিক্ত ধুলা ও ধোঁয়ায় বায়ু দূষিত হয়। এ ধরণের দূষণ মানুষের ব্রঙ্কাইটিস, হাঁচি, কাঁশি ও নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন জটিল রোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে। গাজীপুরে এ ধরনের রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।  

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী (পানি) মো. নজরুল ইসলাম জানান, বিআরটি প্রকল্প তাদের আওতাভুক্ত নয়। তারপরও সহযোগিতা চাইলে প্রয়োজনে পানি সরবরাহ করা হবে। এখনো গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রকল্পের ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো হচ্ছে না। 

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, ধুলাবালি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক। আর যাতে দূষণ না বাড়ে এবং পরিবেশবান্ধব মহানগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে। 

তিনি আরো জানান, সড়ক-মহাসড়ক দিয়ে লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করে। এর মধ্যে রোগী থেকে শুরু করে ছোট বাচ্চারাও রয়েছে। সে হিসেবে সড়ক ও জনপদ বিভাগসহ যারা সড়কে কাজ করছে, তাদের লিখিতভাবে ও  মৌখিকভাবে পরিবেশবান্ধব কাজ সম্পাদন করতে বলা হয়েছে। এরপরও যদি কেউ পরিবেশবান্ধব কাজ না করে, তবে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। 

বিআরটি প্রকল্পের ব্যবস্থপক মো. মোমেনুল ইসলাম জানান, প্রকল্প এলাকায় প্রতিদিন কমপক্ষে দুইবার পানি ছিটানো হচ্ছে। তবে রোদের কারণে পানি শুকিয়ে যায়। তারপরও প্রয়োজনে কোনো কোনো এলাকায় দুইবারের বেশি পানি ছিটানো হয়। সড়কে গাড়ির অতিরিক্ত চাপ থাকায় পানি ছিটানোর কাজটি করতে বেশ বেগ পেতে হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ