Alexa ধীরগতি যানে বাড়ছে ঢাকার যানজট

ধীরগতি যানে বাড়ছে ঢাকার যানজট

প্রকাশিত: ১৫:৩৩ ৩০ জুলাই ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

ঢাকা আমার প্রিয়তম শহর। বছরের বেশকিছু সময় আমার কাটে এ শহরে। সপ্তাহ খানেক আগেও ঢাকাতেই ছিলাম। যতক্ষণ ঢাকায় থাকি আমি যানজটেই থাকি। এ শহরে থাকলে ‘যানজট’ শব্দটির নতুন সংজ্ঞা যে কেউ পেতে বাধ্য। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্যে দায়ী কারণের অন্যতম হচ্ছে রিকশা। দিন কয়েক আগে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ তিন সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করেছিল রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন।

অনেকেই বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ও যানজট কমাতে রিকশা চলাচল বন্ধের বিকল্প নেই। এদিকে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রিকশাচালকরা কয়েকদিন ধরেই আন্দোলন করলেন। তারপর তুলে নিলেন। প্রাথমিকভাবে গত ৩ জুলাই গাবতলী থেকে  আসাদগেট হয়ে আজিমপুর এবং সায়েন্স ল্যাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ছাড়া কুড়িল বিশ্বরোড থেকে রামপুরা হয়ে খিলগাঁও-সায়েদাবাদ পর্যন্ত রিকশাসহ অন্যান্য অবৈধ ও অননুমোদিত যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ঢাকার জনজটের জন্যে রিকশা কতটা দায়ী?   

১৯৯৬ এর তথ্য অনুযায়ী রাজধানী শহর ঢাকা ৩৪৭ বর্গ কিলোমিটার। ৮৬ লাখ অধিবাসী। ১ হাজার ৯৬৭ কিলোমিটার রাস্তা। বৈধ লাইসেন্সধারী, অবৈধ, লাইসেন্সবিহীন- সব মিলিয়ে রিকশার সংখ্যা প্রায় চার লাখ। ঢাকা সিটি করপোরেশনের হিসাব মতে লাইসেন্সধারী রিকশার সংখ্যা ৭৯ হাজার ৭ শত ৭টি। ১৯৮৭ সালের পর সিটি করপোরেশন কোন নতুন লাইসেন্স ইস্যু করেনি। কিন্তু তারপরে এই শহর আড়ে বহরে বেড়ে হয়েছে প্রায় দেড় গুণ। কিন্তু রিকশার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে তিন গুণ। ঢাকা শহরে ১৯৪১-এ রিকশার সংখ্যা ছিলো ৩৭টি যা ১৯৪৭-এ বেড়ে হয় ১৮১টি । রাজধানীতে এখন বৈধ রিকশা রয়েছে মাত্র ৮০ হাজার, আর অবৈধ ১২ লাখ। ঢাকার রাস্তায় প্রায় ১৯ ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের সঙ্গে একই রাস্তায় চলছে রিকশা, রিকশাভ্যান, ঠেলাগাড়ির মতো অযান্ত্রিক যানবাহন। মিশ্র পরিবহনে চলাচল করছে লেন, বিধি না মেনেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে রাজধানীতে অনিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। তবে সিটি করপোরেশনের নিবন্ধন না পাওয়া এসব রিকশা রাজধানীতে চলাচল করছে প্রায় ২৮টি চক্রের অধীনে। এসব চক্রের মাধ্যমে মালিকদের রাজধানীতে নতুন রিকশা নামাতে হচ্ছে। এসব চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রধানত বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ ও বাংলাদেশ রিকশা মালিক লীগ।

ঢাকা সম্পর্কে বয়স্কদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক বাক্যে বলবেন, ৭০ এর দশকে ঢাকা কলকাতা থেকে অনেক সুন্দর শহর ছিল। ঢাকা পুরাণ- এ মীজানুর রহমান ১৯৫০-এর দশকে গণপরিবহন কেমন ছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। ঢাকার প্রধান যানবাহন তখন ঘোড়ার গাড়ি আর রিকশা, বাস চলে দুই-একটি, আর ব্যক্তিগত গাড়ি প্রায় দেখাই যায় না। তার মতে ঢাকায় জনসংখ্যা তখন ৫-৬ লাখ। সাধারণ মানুষের জন্যে ছিল রিকশা আর স্কুল কলেজের মেয়েদের জন্যে ছিল ঘোড়ার গাড়ি । সন্ধ্যার পরে সুনসান হয়ে যেত রাস্তাঘাট। সে সময় বাস ভাড়া ছিল এক আনা, ঘোড়ার গাড়ীর ভাড়া জনপ্রতি দুই আনা, আর রিকশার চার আনা। সদরঘাট থেকে নবাবপুর রেলগেট পর্যন্তও পরিবহন ব্যবস্থা ছিল রিকশা ও ঘোড়ার গাড়ি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দ্রুত বেড়েছে এর সংখ্যা। স্বাধীনতার আগে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল চূড়ান্তভাবে অবহেলিত। ফলে গ্রামীণ মানুষের পরিযান ছিল শহরমুখী। পেশা পছন্দের উপায় বিশেষ না থাকায় তারা বাধ্য হয়েছিল রিকশাচালকের পেশা বেছে নিতে। এদের দিকে হাত বাড়িয়েছিল কিছু অর্থবান মানুষ এরাই হয়ে উঠেছিল গ্যারাজ ও রিকশা মালিক। এরা সময়ে সময়ে তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য পালটেছে এবং ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় ঢুকে তাদের ব্যবসা বাড়িয়েছে। এখন ঢাকায় চলাচল করা বহু রিকশার পেছনে “ঢাকা রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন’ এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ’ নামে আরেকটি মালিক সমিতির ক্রমিক নম্বর সম্বলিত নম্বরপ্লেট দেখা যায় যার কোনো বৈধতা বা স্বীকৃতি নেই। ঢাকার রিকশা নিয়ে কিছু কাজ করার সময় আমি গতবছর মিরপুরের ভাষানটেক আর দিয়াবাড়ির কয়েকজন গ্যারেজ মালিক ও রিকশা চালকের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের বক্তব্য তো চমকে দেয়ার মত। তাদের আয়ের অর্থের পিঠাভাগ বাঁদরকেও লজ্জায় ফেলে দেবে। এভাবেই ক্রমে ক্রমে গড়ে উঠছে এই অবৈধ ব্যবসা চক্র।

অথচ ঢাকা থেকে অযান্ত্রিক ধীরগতিসম্পন্ন যানবাহন তুলে দেয়ার কথা চিন্তা করা হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯৬৮ সাল। এক আমেরিকান বিশেষজ্ঞ একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রা ছিল, ১৯৯০ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে সকল অযান্ত্রিক যান তুলে দেয়া। কিন্তু, এ পরিকল্পনা আদৌ বাস্তবায়িত হয়নি। এর অনেক পরে ১৯৮৫ সালেও একবার ঢাকা থেকে রিকশা তুলে দেয়ার চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি রিকশা তুলে দেয়ার জন্য কিছু কৌশলও সুপারিশ করে। 

বিশেষজ্ঞ কমিটির এ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। কারণটা গত নির্বাচনের আগে প্রচারে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন জনাব ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছিলেন ‘ভোটের জন্য ঢাকায় রিকশা কমানো হচ্ছে না। কিন্তু তাতে মানুষের কষ্ট বাড়ছে। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হবে মানুষের শান্তির জন্য। বিশ্বের নিকৃষ্ট নগরীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ঢাকা—এটা ভাবতে কষ্ট হয়।’ সে সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে এই কষ্ট ভবিষ্যতে লাঘব করা হবে। হয়ত সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা তারই সূত্রপাত। 
বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহর নিয়ে ২০১৬ সালের এক জরিপে বলা হয়েছে, মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বার্ষিক প্রতিবেদনে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার স্থান মিলেছে ১৩৭তম। ঢাকা শুধু পেছনে ফেলতে পেরেছে নাইজেরিয়ার বৃহত্তম শহর লাগোস, লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি ও যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাসকে। ঢাকার অবকাঠামোকে যেকোনো শহরের চেয়ে খারাপ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে জরিপে। তার একটা বিরাট কারণ রিকশা ও অন্য কারণ অবৈধ পার্কিং। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের যান নিয়ন্ত্রণে গাফিলতি, চালকদের আইন না মানার প্রবণতা, রাস্তার অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণের উল্লেখ থাকলেও রিকশার সংখ্যা এর জন্যে যে মূলত দায়ী তা পরিষ্কার বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, রাজধানীর রাস্তায় সর্বোচ্চ দুই লাখ ১৬ হাজার গাড়ি চলতে পারে। সেখানে ঢাকায় চলছে শুধু ১২ লাখ রিকশা। তা ছাড়া অন্যান্য গাড়ি তো আছেই। কলকাতা নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি জরিপ গত বছরের জুনে প্রকাশ করেছিল ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের ২১টি সেরা শহরের মধ্যে কলকাতা বসবাসের জন্য শ্রেষ্ঠ শহর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখিত পত্রিকা গোষ্ঠী পরিষ্কার বলেছে যে কলকাতায় ট্রাফিক ব্যবস্থায় গতি আসার কারণে আজ এই শহরে বসবাস অত্যন্ত উন্নত হয়েছে। কলকাতায় শ্লথগতির ট্রাম, হাতে টানা রিকশা ধাপে ধাপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। সাইকেল রিকশার প্রবেশাধিকার কলকাতা কখনই দেয় নি তাদের মূল রাস্তায়। রাস্তাঘাট উন্নত করে গাড়ি ও অন্যান্য যান সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করায় কলকাতা শহরকে আজ উন্নত করা সম্ভব হয়েছে। যদি রিকশা প্রচলনের ইতিহাস দেখা যায় তবে কলকাতায় রিকশা এসেছে  ১৯০০ সালে। ১৯১৯ সালে রেঙ্গুন থেকে রিকশা আসে চট্টগ্রামে। আর ঢাকায় ? ১৯৩৬ কিংবা ’৩৭ সালে ঢাকার মৌলভী বাজারের দুজন লোক সর্বপ্রথম দুটি রিকশা আনিয়েছিলেন। আনানো হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ফরাসী উপনিবেশ চন্দননগর থেকে। কিন্তু ক্রমে ক্রমে ঢাকা হয়ে উঠেছে রিকশা নগরী। 

প্রশ্ন এবারে শুধু গাবতলী থেকে আসাদগেট হয়ে আজিমপুর এবং সায়েন্স ল্যাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত লাগু করলেই কি ঢাকার যানজট কমে যাবে? না, যাবে না। তবে এই সিদ্ধান্ত ঢাকাকে গতিশীল করার প্রথম পদক্ষেপ। ক্রমে ক্রমে বেআইনি রিকশার বিলোপের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ সরকার। এই সহজ সত্যটা না বোঝার মত বোকা কেউ নন। তাই এই আন্দোলনের উদ্যোগ। ঢাকার রিকশা চালকের সংখ্যা প্রায় পনের লক্ষ। তাদের মধ্যে আশি থেকে পঁচাশি শতাংশ ঢাকার বাইরে থেকে এসে সাময়িক আস্তানায় থেকে রিকশা চালায়। তাই ঈদ ও পহেলা বৈশাখের আগে ঢাকার রাজপথে রিকশা ও  রিকশাশ্রমিকের সংখ্যা বেশ বেড়ে যায়। আর গ্রামে ফসল কাটা ও শস্য বোনার মৌসুমে এ সংখ্যা কমে যায়। এদের ক্ষমতা বা নেতৃত্বগুণ সেই স্তরের নেই যে তারা আন্দোলন করে শহর অচল করতে পারে। অতএব যে আন্দোলন চলছে তার পিছনে অবধারিতভাবে গ্যারাজ মালিক ও রিকশা মালিকরা আছেন যাদের একটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা অবশ্যই আছে। আজ সেই কায়েমী স্বার্থে সামান্য টোকা দিয়েছে দুই সিটি কর্পোরেশন। এখন প্রয়োজন উপরমহলের একটি ধমক। কারণ এ লড়াইয়ে যদি প্রশাসনকে নতি স্বীকার করতে হয় তাহলে হেরে যাবে ঢাকা শহর, হেরে যাবে উন্নয়ন, হেরে যাবে প্রগতি, হেরে যাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি। কাজেই এই ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পক্ষে দাড়াতে হবে ঢাকা শহরকে। তাহলেই ঢাকা শহর ফিরে পারে তার হারানো রূপ ও গরিমা। আমরা সাধারণ মানুষ সেইদিকেই তাকিয়ে আছি।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics
Best Electronics