‘ধান্য’ নিয়ে কথকতা

‘ধান্য’ নিয়ে কথকতা

প্রকাশিত: ১৬:৫২ ১১ জুন ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য অসামান্য। দেশের বিজ্ঞানীরা নানান জাতের উচ্চ ফলনশীল এবং পরিবর্তিত জলবায়ু সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলেছেন। এতে ধান উৎপাদন বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে দেশের সমৃদ্ধি। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি আমরা। আবার এটাও ঠিক যে, উচ্চফলনশীল ধানের আবাদ করতে গিয়ে দেশি প্রজাতির ধান হারিয়ে গেছে।

ডক্টর হেক্টর-এর এক গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বিভিন্ন মৌসুমে ১৮,০০০ জাতের ধান আবাদ হতো। এ সমস্ত জাতের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টের জন্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে বৈচিত্রিক জাতের ধানের কেন্দ্র বলেও আখ্যায়িত করেছেন। গত শতাব্দীর আশি দশকের শুরুতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সারাদেশে আবাদকৃত প্রায় ১২,৫০০ জাতের নাম সংগ্রহ করেছিল। বর্তমানে হয়তো এসব ধানের ৫ ভাগও আবাদ হয় না। উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ করতে গিয়ে বীজের বাজার চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। উচ্চফলনশীল জাতের ধানের বীজ তৈরি অত্যন্ত কঠিন বলে সাধারণ চাষীরা তাদের ক্ষেতের ধান থেকে বীজ উৎপাদন করতে পারছেন না। ফলে বেশি দামে বীজ, সার, কীটনাশক সর্বোপরি শ্রমের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ধানের উৎপাদনব্যয়ও বাড়ছে। অন্যদিকে উৎপাদিত ধানের বাজার এতটাই কম চাষীরা উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। ক্ষোভে-দুঃখে ক্ষেতের ধানে আগুন দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে এবারের বোরো মৌসুমে। সাম্প্রতিক এ বিষয়টি গভীর বিবেচনার দাবি রাখে বৈকি।  

দেশীয় জাতের ধানের চাল কোনোটা মিষ্টি, কোনোটা থেকে হতো সুস্বাদু চিড়া, মচমচে মুড়ি, কোনোটা থেকে তৈরি করা হতো পিঠার জন্য গুড়া, আবার কোনোটার চাল থেকে রান্না হতো শুধু পায়েস। দুধ ও কলা দিয়ে ভাত খাওয়ার জন্য আবাদ করা হতো বিশেষ জাতের। এ সমস্ত জাতের নামও ছিল বিচিত্র। যেমন মাছরাঙ্গা, ঘিকাঞ্চন, গৌরকাজল, সূর্য্যমনী, কলমীলতা, বনফুল, ভাটিয়াল, মেঘলাল, সাগরদীঘি ইত্যাদি। দেশী জাতের ধান গাছ লম্বায় ছিল ৩ থেকে ১৫ ফুট। এর পাতা হতো পুরু ও লম্বা। ফলে ধান ক্ষেতে আশ্রয় নিতে পারত অনেক জাতের উপকারি প্রাণী। পানিতে ডুবে গেলে ধানের ক্ষেত হতো মাছের, ব্যাঙের, কাঁকড়ার আবাসস্থল।

গাছের কাণ্ডে আর পাতায় জমে থাকা শেওলা হতো মাছের প্রিয় খাদ্য। ধান পেকে গেলে ক্ষেত ভরে যেত নানা জাতের পাখিতে। ধানের খড় ছিল গরুছাগলের পুষ্টিকর খাদ্য। পুরু ও নরম ভূষি ছিল হাঁসমুরগী আর মাছের খাবার। দেশী জাতের ফলন কম হতো কিন্তু ধানের ক্ষেতে আর বিলে ছিল প্রচুর নানা জাতের মাছ, ঘরে ঘরে ছিল গরুছাগল আর হাঁস মুরগী। ফলে মাছ, মাংস, ডিম কেনার প্রয়োজন হতো না। এখন নতুন জাতের আবাদি এলাকা বিস্তারের ফলে এবং বিস্তর রাসায়নিক সার আর কীটনাশক প্রয়োগ করায় ধানের ক্ষেতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বসবাস বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। নতুন জাতের গাছের দৈর্ঘ্য কম, মোটা খড়, ভ‚ষি হয় পাতলা ও শক্ত; গরুছাগল, হাঁসমুরগীর তা পছন্দ নয়। বিদেশ থেকে খাবার আমদানী করে আলাদা খামারে এখন মাছের চাষ আর গরুছাগল ও হাঁসমুরগী পালন করতে হচ্ছে। নতুন জাতের ধানের চাল ঘষে-মেজে সরু লম্বা করে দেশি চালের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। বিষয়টি কি সংশ্লিষ্টরা একবারও ভেবে দেখেছেন!

বাংলাদেশে কৃষির পরিচয় মূলত ধান উৎপাদনের মধ্যে। কথাটি শতভাগ সত্য। কেননা, সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশে ধানের জাতের সংখ্যা ১২ হাজারেরও বেশি ছিল। তখন কোন সময়ে কোন জমিতে কী ধান বোনা হচ্ছে, জাত অনুযায়ী জমির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন জড়িত থাকত। বলা যায়, ধান চাষকেন্দ্রিক একটি বাস্তুসংস্থান পদ্ধতি বা ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছিল। সেসবের কিছুই আধুনিক চাষাবাদের ফলে আর নেই। এখন দেশে কোন বছর কত ধান উৎপাদন হচ্ছে, তা দিয়ে কৃষির সার্বিক ভালো-মন্দ বিচার হয়ে থাকে। কিন্তু ধানের জাত কতটা হারিয়েছি, ধান চাষ করতে গিয়ে ডাল, তেলবীজ ও অন্যান্য ফসল কত হারিয়েছি, তার কোনো খবর কেউ রাখি নি। গবাদিপশু, মাছ, জলজ প্রাণী কীটপতঙ্গ পাখপাখালি কী পরিমাণ ধ্বংস করা হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান সরকারি খাতায় নেই। অথচ কৃষি মানে শুধু ধান উৎপাদন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শাকসবজি, ডাল, তেল, মসলা, মাছ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল-ভেড়াসহ অনেক কিছু। সবকিছু ছাপিয়ে ধানের উৎপাদনেই মনোযোগ দেয়া হচ্ছে সরকারিভাবে এবং খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ৭৫ শতাংশ আবাদি জমি (এক কোটি হেক্টর জমি) এবং ৮০ শতাংশ সেচকৃত জমি ধান উৎপাদনেই ব্যবহার হচ্ছে। 

ধান একটি শস্যদায়িনী ঘাস। ধানের আরেক নাম শাইল বা শালি। বাংলাদেশ-আসাম অঞ্চল থেকে শুরু করে পাঞ্জাব পর্যন্ত শালি ধান বলতে হেমন্তের ধান বা আমন ধান বোঝায়। ইংরেজিতে ধানকে চধফফু বা জরপব বলা হয়। ধান গণের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Oryza। তা থেকেই ফরাসি ভাষায় ‘রিজ’ এবং ইংরেজিতে রাইস হয়ে যায়। রাইজা থেকে অনেকগুলো উপজাতের সৃষ্টি হয়, এর মধ্যে রয়েছে ওরাইজা সেটাইভা এবং ওরাইজা গ্লাবেরিমা। এশিয়ায় ধানের যে উপজাত প্রধানত উৎপাদন হয়, তা ওরাইজা সেটাইভা এবং ওরাইজা গ্লাবেরিমা আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এশিয়ার দেশগুলোতেই প্রধানত ধান হয় এবং এই ধান থেকেই মহাদেশের কোটি কোটি মানুষের সকাল-দুপুর-রাতের প্রধান খাবার হয়। যাকে বলে তিনবেলার খাবার। ভাত না হলে বাঙালির খাওয়া সম্পূর্ণ হয় না।

দেশে প্রধান দুটি ধানের মৌসুম ছিল আউশ ও আমন। কিন্তু এখন সেটা হয়েছে আমন ও বোরো ধান। ক্রমে আউশের আবাদ কমে গেছে। ফলন বেশি হওয়ার কারণে বোরো ধানের প্রতি বেশি মনোযোগ দেয়ায় অন্যান্য ফসল, বিশেষ করে তামাক চাষের কারণে আউশ ধানের বপন করার সময় মাঠ খালি পাওয়া যায় না। কারণ এই সময়ে বোরো ধান মাঠে থাকে, তামাক পাতা তোলা হলেও গাছটি জমিতে থেকে যায়। আউশ ধানের অনেক স্থানীয় জাত আছে, যা বিভিন্ন এলাকার কৃষকের কাছে খুব জনপ্রিয় এবং খেতেও সুস্বাদু। এর মধ্যে অনেক জাত চাষ না করার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কয়েকটি জাত কৃষকরা ধরে রেখেছেন এবং চাষ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে কালাবকরী, ভাতুরি, শঙ্খপটি, কালামানিক, ষাইটা, ভয়রা ইত্যাদি। কয়েকবছর ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ‘হরি ধান’ নামের একটি বিশেষ জাতের ধানের চাষ হয়ে আসছে। তবে আধুনিক কৃষির প্রবর্তনের জন্য দেশে কয়েকটি জিন ব্যাংক তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে এবং উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধানের জাত তৈরি করে কৃষকের মাধ্যমে চাষ করানো হচ্ছে। ব্রির আধুনিক জাতের ধান বর্তমানে ধান চাষের ৮০ শতাংশ জমিতে হচ্ছে, মোট ধানের ৯১ শতাংশ উৎপাদন করছে। কিন্তু এই আধুনিক জাতের ধান উৎপাদনে ব্যাপক পরিমাণ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে ধানের ক্ষেতে যে মাছ ও উপকারি পোকা-মাকড় পাওয়া যেত; সেসব এখন আর নেই। অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, ধানের উৎপাদনে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও গভীর নলক‚পের পানি ব্যবহারের ক্ষতিগুলো এখন স্পষ্ট। দেশে নিত্যনতুন রোগের প্রাদুর্ভাব বিশেষ করে অসংক্রামক রোগ (হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি বিকল হওয়া ইত্যাদি) বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উৎকণ্ঠাও আছে। খাদ্য ঘাটতি মেটাতে গিয়ে মানুষের শরীরে কেন বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে! নীতিনির্ধারকরা কি এ বিষয়টি আদৌ ভাবছেন?

ধান নিঃসন্দেহে আমাদের অনেক বড় সম্পদ। সুতরাং ধানের প্রতি যত্নশীল হওয়া কর্তব্য। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ধান চাষের পাশাপাশি দেশিয় জাতের ধানের চাষ ধরে রাখতে হবে। কেননা, দেশীয় জাতের ধান বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্য বহন করছে। বহুজাতিক কোম্পানির ওপর কৃষির নির্ভরশীলতা কমাতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের বিজ্ঞানীরা নিজ দেশের প্রয়োজন বিবেচনা করে দেশের ভৌগোলিক পরিবেশ অনুযায়ী স্থানীয় জাতের ধানের গবেষণা ও চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। একই সঙ্গে কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকেই।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর