Alexa দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জনদুর্ভোগ

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও জনদুর্ভোগ

প্রকাশিত: ১৬:১৪ ৪ জুলাই ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

বাজেট নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয়েই থাকে। এবারও হচ্ছে। সরকার বলে, ‘উন্নয়নের বাজেট’, বিরোধীদল বলে, ‘গরিব মারার বাজেট’। এ দুটি শব্দ শুনতে শুনতে আমরা এতই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, এখন আর আমাদের বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া হয় না। কিন্তু বাজেটে যখন এদেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, দরিদ্র শ্রেণি সরাসরি আক্রান্ত  হয় তখন টনক নড়ে  বৈকি! আমিও তো ওই শ্রেণিরই একজন। 

বাজেট পাশ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি করে যে কয়েকটি জিনিস চোখে পড়ছে তা হলো- গ্যামের দাম বৃদ্ধি, চিনি, গুড়োদুধ, স্যানিটারি ন্যাপকনি, সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর কর্তন দ্বিগুণ করা। ব্যক্তিপর্যায়ে দ্বিমুখী চুলার মাসিক রেট বাড়িয়ে ৮০০ টাকা থেকে ৯৭৫ টাকা আর একমুখী চুলার রেট বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা থেকে ৯২৫ টাকা করা হয়েছে। যেখানে  দেশজুড়ে অসংখ্য অবৈধ সংযোগ রয়েছে, বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান চোরা লাইন নিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে সেখানে এ বিষয়গুলির প্রতিকার না করে বাজেটে বাড়ানো হলো গৃহস্থালী ব্যবহারের চুলার দাম। শুধু তাইই নয়, একই সঙ্গে সিএনজির দামও বাড়ানো হয়েছে। গড়ে গ্যাসের দাম বেড়েছে ৩২ ভাগের উপরে। গ্যাসের দাম বাড়ার ফলে বাড়বে যাতায়াত খরচ, পণ্যের দাম, শিল্প সামগ্রির দাম। যেখানে বাজেট হওয়া উচিত মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমুখী সেখানে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি তাদেরকে হতাশার গভীরে নিপতিত করারই সামিল। 

দেশে এখন সহজ শর্তে, সহজ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ঋণ পাবার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক মধ্যবিত্ত কষ্ট করে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনে ফেলেছেন। তার নিজের অফিস বা ব্যবসা আছে, ছেলে মেয়ের স্কুল কলেজ আছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে অভিভাবকদের এখন সন্তানদের সঙ্গে ছুটাছুটি করতে হয়।  গাড়ি থাকলে ছেলে মেয়েদের সাথে না গেলেও চলে। জানাশুনা বিশ্বস্ত একজন ড্রাইভার পেলে তার ওপর ছেলে মেয়ের দায়িত্ব দিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। অর্থেরও কিছুটা সাশ্রয় হয়। কিন্তু মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। গত কয়েক বছরে একাধিকবার সিএনজির দাম বাড়ানো হয়েছে। একে প্রচণ্ড গরম, এসি ছাড়া গাড়ি চালানো যায় না, তাতে অসহনীয় যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকতে হয়। গরমের কারণে গাড়ি বন্ধও করা যায় না। ফলে গ্যাসের খরচও দ্বিগুণ পড়ে। তাতে যদি দাম বৃদ্ধি করা হয়, মধ্যবিত্ত বাঁচবে কি করে! গোনা টাকার গাড়ি কেনা মধ্যবিত্তের একদিকে এই অবস্থা অন্যদিকে দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রতিক্রিয়া পড়বে গরিব মানুষের ওপর। যাদের গাড়ি নেই, বাস টেম্পুতে চলাচল করে। তাদেরও গুনতে হবে বাড়তি ভাড়া। 

দাম বেড়েছে নিত্য ব্যবহার্য চিনি আর গুঁড়া মুধের। চিনি, গুঁড়াদুধ বিলাস দ্রব্য নয় যে, দাম বাড়লে মানুষ খাওয়া ছেড়ে দেবে। এগুলি যেমন নিত্য প্রয়োজনীয়, তেমন শিশুখাদ্যও বটে। যে দেশে শিশু খাদ্যের দাম বাড়ে বা শিশু খাদ্যের ওপর বাড়তি কর আরোপ করা হয় সেদেশ সবল শিশু পাবে কী করে! আর আমরা সবাই জানি, খাদ্যই পুষ্টি, খাদ্যই মেধা। শিশু যদি ঠিকমতো পুষ্টিকর খাবার না পায় কোথা থেকে আসবে তার মেধা। 

দাম বেড়েছে স্যানিটারি ন্যাপকিনের। স্যানিটারি ন্যাপকিন নারী স্বাস্থ্যের জন্য একটি অতি আবশ্যকীয় পণ্য। এদেশের গ্র্রাম-গঞ্জের অসংখ্য নারী এখনো স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন না। এক শ্রেণি করেন না অজ্ঞতায়, আরেক শ্রেণি করেন না অর্থাভাবে। ব্যবহারযোগ্য এক প্যাকেট ন্যাপকিনের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। তাতে থাকে মাত্র ১৫ পিস ন্যাপকিন। পরিবারে যদি তিন চারজন নারী থাকেন তাহলে খরচ ৫০০ তে গিয়ে ঠেকে। মাসে এই টাকা খরচ করা অনেক পরিবারের পক্ষেই সম্ভব না। তাছাড়া ন্যাপকিন ব্যবহারের জন্য যেভাবে সচেতনতা বাড়ানোর ক্যামপেইন করা প্রয়োজন ছিল সেটাও করা হয়নি। ফলে বহু নারী এখনো ন্যাকড়া ব্যবহার করেন। কেউ কেউ এক ন্যাকড়া বার বার ধুয়ে ব্যবহার করেন। কারণ গরিব মানুষের বাড়িতে পর্যাপ্ত ন্যাকড়াও থাকে না। অনেকেরই ন্যাকড়া ঠিকমতো পরিষ্কার করার মতো সাবানও থাকে না। ফলে নোংরা ন্যাকড়াই তারা ব্যবহার করেন। আর এই অপরিচ্ছন্ন অনিরাপদ ন্যাকড়া ব্যবহারে নারীরা চলে যায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। তাদের ইউরিন ইনফেকশন হয়, ভ্যাজাইনায় ঘা হয়, নানারকম গাইনি সংক্রান্ত  রোগে আক্রান্ত হন তারা। ফলে নিরাপদ যৌন জীবন এবং সুস্থ সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি হয়। এই যখন অবস্থা তখন ন্যাপকিনের দাম বড়ানো হলো কোন বিবেচনায়? পাশের দেশ ভারতে মমতা ব্যানার্জী ‘সাথী’ প্রজেক্টের মাধ্যমে ছয় টাকায় ছয়খানা ন্যাপকিন মেয়েদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাছাড়া ভারতে ২৫-৩০ টাকায় এক প্যাকেট ন্যাপকিন পাওয়া যায়। সেখানে আমার দেশ কেন ন্যাপকিনের দাম না কমিয়ে বাড়ায়?  কোন কোন নারীর তো ঋতুস্রাবকালে দুতিন প্যাকেট ন্যাপকিনও লাগে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতি ছয়ঘণ্টা পর পর ন্যাপকিন বদলানো উচিত। তাহলে যেখান ন্যাপকিনের দাম কমিয়ে গ্রাম-গঞ্জের অব্যবহারকারীদের হাতে ন্যাপকিন তুলে দেয়া দরকার সেখানে সরকার দাম বাড়ালেন কোন বিবেচনায়? আর এ বিষয়ে আমাদের নারী সংগঠনগুলো কেন উচ্চকিত নয়। এটাও কি এক ধরনের ট্যাবু? এমনিতেই ঋতুস্রাবের বিষয়টিকে অনেক মেয়ে আজও স্বাভাবিক হিসেবে  মেনে নিতে পারেনি। লজ্জা পায়। এক জরিপে দেখা গেছে, এখনও পিরিয়ডের সময় গড়ে মেয়েরা তিনদিন স্কুল কামাই করে। কামাই করে পেটের ব্যথায়, অস্বস্তিতে, কাপড়ে দাগ লেগে যাবার ভয়ে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যাপকিন পাল্টানোর পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায়, ন্যাপকিন ফেলার ব্যবস্থা না থাকায়।  নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি না করে এরই মধ্যে ন্যাপকিনের দাম বৃদ্ধি! মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। 

আর একটি বড় আঘাত সঞ্চয়পত্রের উৎসে করকর্তন ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা। প্রস্তাবটি উত্থাপিত হবার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু তারপরও বিষয়টি বিবেচেনা করা হয়নি। এদেশের অবসরভোগীদের এক বিরাট অংশ বেঁচে থাকে এই সঞ্চয়পত্রের টাকায়। তারা মাস গেলে সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে সুদ তুলে সেই টাকা দিয়ে ওষুধপত্র কেনে, চাল-ডাল কেনে, জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। সঞ্চয়পত্রের সুদ যদি কমিয়ে দিতো সেটার একটা ব্যাখ্যা দেয়া যেত। যার ইচ্ছে হতো কিনতো, যার ইচ্ছে হতো না, কিনতো না। কিন্তু যে ব্যক্তি  দুই তিন বছর আগে ৫ শতাংশ উৎসে করকর্তন করা হবে জেনে সঞ্চয়পত্র কিনেছে,  সে কেন ৫ পার্সেন্টের জায়গায় ১০ পার্সেন্ট  কর দেবে? তারপর বিষয়টি যদি ১লা জুলাই  থেকে কেনা সঞ্চয়পত্রের উপর কার্যকর হতো এক কথা। কার্যকরা করা হচ্ছে পূর্বের কেনা সঞ্চয়পত্রের উপরও। কেউ হয়ত অসুস্থ,  অনেকেই বয়সের ভারে ক্লান্ত। কারো হয়ত দুই চার মাস সঞ্চয়পত্রের টাকা তোলা হয়নি, তাকে এখন এই বাড়তি টাকা দিতে হবে। কেন সে এই নতুন উৎস করের ফাঁদে পড়বে, কোন যুক্তিতে? 

বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। অনেক ঋণখেলাপী ঋণ নিয়ে বীরদর্পে  ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদের ঋণ আদায়ের কোন ব্যবস্থা নেই। এই টাকাগুলি দেশের অর্থনীতিতে যোগ হলে অর্থের ফ্লো বাড়ত। সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে স্যানিটারি ন্যাপকিন, চিনি, গুঁড়াদুধে হাত বসাতে হতো না। 

বেড়েছে মোবাইলের করলেট। এদেশের সিংহভাগ মানুষ এখন  যোগাযোগের জন্য মোবাইলের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকের হাতে হাতে  মোবাইল। বাড়ি ঘর- দোরের সাথে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বর্হিবিশ্বে যোগাযোগ সবই এখন মোবাইলের উপর নির্ভরশীল। মোবাইলের কলরেট বৃদ্ধি সাধারণ জনগণের উপর সরাসরি বাড়তি চাপ।  

দেশের সাধাণ মানুষ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে গ্যাসসহ  নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রবাদি ও সঞ্চয়পত্রের উপর করারোপের বিষয়টি বিবেচনায় আনার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি। বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর